অদম্য বাংলাদেশ


বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, বরং ওই ঝুড়ি এখন খাদ্য ও বিদেশি মুদ্রায় পরিপূর্ণি হয়ে উপচে পড়ছে-আতিউর

 এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে ‘এশিয়ার উদীয়মান টাইগার’। মাঝে ৪২টি বছর। যদিও সময়টি একটু দীর্ঘ। তবে অর্জনের তালিকাটাও কম দীর্ঘ নয়। এক জাহাজ খাদ্যের জন্য যেখানে ’৭৪-এর মনন্তরে লাখ লাখ মানুষ মারা গেছে, সেখানে বাংলাদেশ চাল আমদানির ইতি টেনে এখন রপ্তানির দ্বারপ্রান্তে। দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানবসম্পদ। ৩২ কোটি হাত কাজ করে যাচ্ছে অবিরত। গড়ছে দেশ, পৃথিবী। সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) অনেক সূচকেই এগিয়েছে বাংলাদেশ। সময়ের আগেই কিছু সূচক অর্জন হবে- এমন প্রত্যাশা বিশ্ব সভার। ৭২২ কোটি টাকা থেকে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকার বার্ষিক জাতীয় বাজেট। এ থেকেই বোঝা যায়, কতটা এগিয়েছে দেশ। গত এক দশক ধরে ছয় শতাংশের ওপর জিডিপি প্রবৃদ্ধি যা বাংলাদেশকে ‘নেক্সট ইলেভেন’এ জায়গা করে দিয়েছে। প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য মিলিয়ে দেশের মোট জিডিপি ২শ বিলিয়ন ডলারের বড়। আর মাথাপিছু আয় ১শ ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৫০ ডলার।
স্বাধীনতার পর উত্তারাধিকার সূত্রে বাংলাদেশকে একটি দারিদ্র্যপীড়িত ও ভঙ্গুর অর্থনীতির হাল ধরতে হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ শুধু দরিদ্রই ছিল না, দারিদ্র্য দুর করার যে হাতিয়ারগুলো দরকার তাও ছিল না। ছিলনা অর্থ, অবকাঠামো বা দক্ষ জনশক্তি। তখন বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ, অর্ধাহার-অনাহার কবলিত, বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি দেশ হিসেবে। স্বাধীনাতার পর বাংলাদেশের ভঙ্গুর ও নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থা দেখে এর স্থায়িত্ব সম্পর্কে সন্দিহান ছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে বিদেশী সাহায্যনির্ভর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। নরওয়ের অর্থনীতিবিদ ফাল্যান্ড ও ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ পারকিন্সন বাংলাদেশকে বলেছিলেন ‘উন্নয়নের পরীক্ষাগার’। ১৯৭৬ সালে তাদের বই ‘বাংলাদেশ: স্টেট কেস ফর ডেভলপমেন্ট’ -এ উল্লেখ করেন, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব হলে পৃথিবীর যেকোন দেশের পক্ষেই উন্নয়ন সম্ভব। ২০০৭ সালে এরা তাদের মত থেকে সরে আসেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে মন্তব্য করেন, ‘তিন দশকের সীমিত ও বর্ণাঢ্য অগ্রগতির ভিত্তিতে মনে হয় বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।’ এখন বাংলাদেশকে উন্নয়ন পরীক্ষাগারের পরিবর্তে উন্নয়ন মডেল বলছেন।
সম্প্রতি গোল্ডম্যান স্যাক্স সম্ভাবনাময় ১১টি দেশের তালিকা তৈরি করেছে। এ দেশগুলোর অর্থনীতি এগিয়ে আসছে বলে এদের নাম দেয়া হয়েছে ‘নেক্সট ইলেভেন’। এই উদীয়মান ১১টি দেশের একটি বাংলাদেশ। সংস্থাটি বাংলাদেশ সম্পর্কে বলেছে, দেশটির বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার বেশির ভাগই তরুণ। এদের মাধ্যমে দেশটির ভবিষ্যত বদলে দেয়া সম্ভব।
জেপি মরগান ৫টি ফ্রন্টিয়ার অর্থনীতির নাম উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার সব ধরণের সুযোগ বাংলাদেশে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের পূর্ভাভাসে বলেছে, ২০৩০ সাল নাগাদ নেক্সট ইলেভেন সম্মিলিতভাবে ইউরোপিয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশকে ছাড়িয়ে যাবে। লন্ডনের জাতীয় দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, ২০৫০ সালে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির বিচারে পশ্চিমা দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যাবে। তাছাড়া মুডি’স ও স্ট্যান্ডার্ড এন্ড পুওর’স গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশের সন্তোষজনক অর্থনৈতিক রেটিং দিচ্ছে। তাদের প্রক্ষেপণও সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের ইঙ্গিত করে। এসব পূর্বাভাস প্রমাণ করে, বাংলাদেশের সামনে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা।
গত চার দশকে বাংলাদেশের অর্জনের তালিকা কম বড় নয়। কৃষি প্রধান দেশ হলেও বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না। সত্তর দশকের প্রথম দিকে দেশে চাল উৎপাদন হতো এক কোটি টন। জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। উৎপাদিত খাদ্যে ষাটভাগ চাহিদা মিটতো। বাকি খাদ্য আমদানি করতে হতো। বিদেশি মুদ্রার মজুদ ছিল সামান্য। তাই খাদ্যের জন্য বিদেশিদের কাছে হাত পাততে হতো। গত চার দশকে দেশে কৃষি খাতে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে এক খাদ্য বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ খাদ্যে অনেকটাই সয়ংসম্পূর্ণ। একাত্তরের তুলনায় খাদ্য উৎপাদন সাড়ে তিনগুণের বেশি বেড়ে দাড়িয়েছে ৩ কোটি ৫৭ লাখ টন। গত দুবছর বংলাদেশ কোন চাল আমদানি করেনি। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বর্তমানে চালের ভালো মজুদও আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেছেন, বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, বরং ওই ঝুড়ি এখন খাদ্য ও বিদেশি মুদ্রায় পরিপূর্ণ হয়ে উপচে পড়ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির যাত্রায় গামেন্ট শিল্পের ভূমিকা অসামান্য। অথচ স্বাধীনতার আগে-পরে কেউ ভাবেনি, এই শিল্প ২০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি খাতে পরিণত হবে। সত্তরের দশকে কিছু টেইলারিং শপ গড়ে উঠেছিল কমলাপুর এলকায়। সেখান থেকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দ্বিতীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারী দেশ। মোট রপ্তানি আয়ের ৭৮ শতাংশই আসছে এই খাত থেকে। ৪০ লাখ শ্রমজীবী এই শিল্পে জড়িত যার আশি ভাগ নারী। এদের বেশিভাগই এসেছেন কৃষক পরিবার থেকে। শ্রমবাজারে এদের অংশগ্রহণ সামাজিক সূচক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে। ভূমিকা রাখছে নারীর ক্ষমতায়নে।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এখন আমাদের অর্থনীতির অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের টেকসই প্রবৃদ্ধির মূলে ভূমিকা রাখছে রেমিট্যান্স। স্বাধীনতার আগে গুটিকয়েক বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করতেন। এখন দেড়শতাধিক দেশে ৮০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। রেমিট্যান্স প্রবাহের দিক দিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে সপ্তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এই রেমিট্যান্সের পরিমাণ আমাদের মোট জিডিপি’র ১০ শতাংশের বেশি। রপ্তানি আয়ের অর্ধেকের বেশি; এবং বৈদেশিক সাহায্যের ১০ গুণ। গত বছর রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় সাড়ে ১৪ বিলিয়ন ডলার। গত মার্চ থেকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৪ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। এটা দিয়ে দেশের পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। অথচ তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ রিজার্ভকেই সন্তোষজনক হিসেবে ধরা হয়।
আর্থসামাজিক অগ্রগতির পথে দৃঢ়পদক্ষেপে এগুচ্ছে বাংলাদেশ। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের রাজস্ব বাজেট ছিল ২৮০ কোটি টাকা। আর রাজস্ব ও উন্নয়ন মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে এর আকার ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এটা প্রায় আটশ গুণ বড়। স্বাধীনতার পর প্রথম দশকের তুলনায় গত দশকে টাকার গড় নমিনাল জিডিপি ২৮ গুণ বেড়েছে। সত্তরের দশকে বাংলাদেশে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। আর গত এক দশক ধরে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আকাক্সিক্ষত ফলাফল দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রেখেছে। দারিদ্র্যের হার উল্লেখজনক হারে কমেছে। চার দশক আগেও এই হর ছিল ৭০ শতাংশের ওপরে। বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ২৯ শতাংশের নিচে রয়েছে। সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) অন্যতম একটি লক্ষ্য ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। বিশ্বব্যাংক তাদের সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে আশা করেছে, বাংলাদেশ সময়ের আগেই লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে।
স্বাধীনতার সময় মাথাপিছু আয় ছির ১শ ডলারের কাছাকছি। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৮৫০ ডলার। মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়িয়েছে ৭২২ ডলারে।
বিশ্ব ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সালে দেশের মোট দরিদ্র মানুষের মধ্যে দশ শতাংশ বিদ্যুৎ সুবিধা পেত। দশ বছর পর ২০১০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০০০ সালে দেশের কোনো দরিদ্র মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহারের সামর্থ্য রাখতো না। ২০১০ সালের হিসাবে দেশের ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ দরিদ্র মানুষ মোবাইল ফোনের সুবিধা পাচ্ছে। ২০০০ সালে ১ দশমিক ৮ শতাংশ দরিদ্র মানুষ টেলিভিশন দেখার সুযোগ পেত। দশ বছর পর তা বেড়ে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ হয়। অর্থাৎ, মানুষ দরিদ্র থাকলেও তার ব্যয় সক্ষমতা বাড়ছে।
বাংলাদেশের অগ্রগতি সম্পর্কে ড. আতিউর রহমান তার ‘চার দশকের বাংলাদেশ: অর্থনীতির নবযাত্রা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, দুই দশক আগেও যেসব শ্রমিকের দৈনিক আয় ছিল ১শ টাকার নিচে, তাদের দৈনিক আয় এখন প্রায় ৪শ টাকা। সংসারের দৈনিক চাহিদা মিটিয়ে এদের হাতে কিছু টাকা থাকে। এই অর্থ দিয়ে তারা দেশে তৈরি শিল্পপণ্য কিনতে পারছে। এভাবেই দেশের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী চাহিদা কাঠামো তৈরি হয়েছে। আর এ কারণেই আমরা অনেক দেশের চেয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছি।
দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতেও বেশ অগ্রগতি হয়েছে গত চার দশকে। ২০১১ সালে জাতিসংঘের এমডিজি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূল, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, শিশুমৃত্যুর হার, নারীর ক্ষমতায়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই পুরোপুরি বা আংশিক সাফল্য দেখাতে পেরেছে। শিশুমৃত্যুর হার কামানোর স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাতিসংঘের পুরস্কার পেয়েছে। ১৯৭১ সালে  শিশুমৃত্যুর হার ছিল সাড়ে ১৪ শতাংশ। বর্তমানে তা ৩ দশমিক ৮ শতাংশের নিচে। মানুষের গড় আয়ু চার দশকের ব্যবধানে ৫০ থেকে বেড়ে ৬৯ বছরে দাঁড়িয়েছে। এটা ভারতের চেয়ে ৪ বছর বেশি। অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা কমে অর্ধেক হয়েছে।
এ বিষয়ে ড. আতিউর তার চার দশকের বাংলাদেশ প্রবন্ধে লেখেন, বাংলাদেশের এসব সাফল্যের মূলে রয়েছে ব্যাপক জনসচেতনতা। সরকারি ও বেসরকারি প্রচেষ্টার মিলিত সাফল্য এটি। এক সময় যে জনগোষ্ঠীর নিত্যসঙ্গী ছিল কুসংস্কার, আধুনিকতার প্রতি যারা ছিল বিরূপ- তারাই আজ ছুটছেন টিকা দিতে, খাবার স্যালাইন খাওয়াচ্ছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছেন।
গত চার বছরে জনগণের শিক্ষার হার দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১১ সালে দাঁড়িয়েছে ৫৬ শতাংশে। গত ত্রিশ বছরে সামাজিক উন্নয়ন সূচকে ৬৫ শতাংশ এগিয়েছে দেশ। জাতিসংঘের গত বছরের প্রতিবেদনে, মানব উন্নয়ন সূচকে ১৮৭ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬।
আর্থিক খাতেও অনেক এগিয়েছে দেশ। ১৯৭২ সালে দেশে মাত্র ৬টি ব্যাংক ছিল। বর্তমানে মোট ব্যাংকের সংখ্যা ৫৬। এসব ব্যাংকের ৮ হাজার ৩শ শাখার সমন্বয়ে দেশের ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে সাড়ে ৫ কোটির বেশি আমানতকারী ও এক কোটি বেশি ঋণগ্রহীতা রয়েছেন। দেশের মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার কেটি টাকা। আর ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। এটাই প্রমাণ করে, দেশের অর্থনীতি কোথা থেকে কোথায় উঠে এসেছে।
স্বাধীনতার পর জিডিপি শিল্পখাতের অবদান ছিল মাত্র ৯ শতাংশ। এখন এই খাত জিডিপি’র (মোট দেশজ উৎপাদন) ৩১ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৩১৮ কোটি ডলার। আর আমদানি ব্যয় ছিল ৭৬৭ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি ডলার।
দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে  সাফল্যের পাল্লায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে তথ্য প্রযুক্তি ও টেলিকমিউনিকেশন্স খাতের। গার্মেন্টস সেক্টরের পর দেশের সবচেয়ে বেশী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরীতে ভুমিকা রাখা এ খাত সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে পেরেছে।  বিশ্বের অত্যন্ত সুপরিচিত ও নামী-দামী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ রয়েছে বাংলাদেশে। নরওয়ের টেলিনর গ্রুপ, জাপানের ডোকোমো, মালয়েশিয়ার আজিয়াটা, মিশরের ওরাসকম গ্রুপ, ভারতের এয়ারটেলের মত শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের ক্ষেত্র এখন বাংলাদেশ। মোবাইল অপারেটরদের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে শুধু মোবাইল টেলিকমিউনিকেশন্স খাতে বৈদেশিক বিনিয়ো রয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশী। যার সুফল পাচ্ছে গ্রামের তৃণমূলের জনসাধারণ। ১৯৯৮ সালের টেলিকম পলিসিতে ২০১০ সালের মধ্যে ৪ শতাংশ মানুষকে টেলিডেনসিটির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে বর্তমানে মোবাইল ফোনের গ্রাহক প্রায় ১১ কোটি । নেটওয়ার্ক কাভারেরেজ আওতায় এসেছে ৯৯ শতাংশ এলাকা। প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। বর্তমানে ৬ হাজারের বেশী বাংলাদেশী তরুণ-তরুণী এই সেক্টরে বিশ্বেও বিভিন্ন দেশে কাজ করছে। তাদের ওয়েব ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, গ্রাফিক ডিজাইন সেক্টর এখন বিশ্বমানের। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডেলসহ বিভিন্ন কোম্পানি তাদের যাবতীয় গ্রাফিক, ওয়েব ডিজাইনের কাজ বাংলাদেশে হয়।  নিজস্ব ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ  (দোয়েল) তৈরী ও বাজারজাত করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। দেশের ৫৬ টি জেলা বর্তমানে ফাইবার অপটিক্যাল নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে। এছাড়া তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি (থ্রি-জি) সেবা চালুর সফলতা এ খাতে সাফল্যের আরেকটি পালক। বর্তমানে বাংলাদেশের ২০০টি আইসিটি কোম্পানি বিদেশে সফট্ওয়্যার রফতানি করছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির এই বাজারের আকার প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার। এখন দেশের প্রথম ১০টি রফতানি পণ্যের মধ্যে আইসিটি পণ্যও রয়েছে। বর্তমানে আইটি সেক্টরে চাহিদা রয়েছে কয়েক লাখ লোকের। বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনার প্রতিবছর বিশ্বসেরা আউটসোর্সিং দেশের তালিকা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গত ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বের শীর্ষ তিরিশে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ।
রবীন্দ্রনাথ তার ‘বাতায়নিকের পত্র’ -তে লিখেছেন, ‘যে জাতি উন্নতির পথে বেড়ে চলেছে তার লক্ষণ এই যে, ক্রমশই সে জাতির প্রত্যেক বিভাগের এবং প্রত্যেক ব্যক্তির অকিঞ্চিৎকরতা চলে যাচ্ছে। যথাসম্ভব তাদের সকলেরই মনুষ্যত্বের পুরো গৌরব দাবি কারবার অধিকার পাচ্ছে। এই জন্যই সেখানে মানুষ ভাবছে কি করলে সেখানকার প্রত্যেকেই ভদ্র বাসায় বাস করবে, ভদ্রোচিত শিক্ষা পাবে, ভালো খাবে, ভালো পারবে, রোগের হাত থেকে বাঁচবে এবং যথেষ্ট অবকাশ ও স্বাতন্ত্র্য লাভ করবে।’

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+