অভিশপ্ত ইয়াজীদ লানতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে পূর্ব হতেই হযরত নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালামগণ অবগত ছিলেন


কারবালা প্রান্তরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনা ও সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিস মিন আহলে বাইতি রাসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শহীদকারী ইয়াজীদ লানতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে পূর্ব হতেই হযরত নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালামগণ অবগত ছিলেন…

***হযরত আদম শফীউল্লাহ আলাইহিস সালাম

একটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন হযরত আদম আলাইহিস সালাম বেহেস্ত হতে যখন পৃথিবীতে আসেন তখন তিনি হযরত হাওয়া আলাইহিস সালাম উনাকে কাছে না পেয়ে উনার সন্ধান করতে লাগলেন। বহু পথ পাড়ী দেয়ার পর তিনি যখন কারবালা ভূমি অতিক্রম করতে চাইলেন, তখন কোন প্রকার বস্তু ছাড়াই তিনি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। এ ঘটনায় তিনি খুবই ভারাক্রান্ত হলেন। উনার সম্মাণিত বুক ধরে আসলো ও উনার পা মুবারক টলতে লাগলো এবং তিনি আহত হলেন। অতঃপর দেখলেন যে উনার শরীর হতে হতে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। আসমানের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন:
“হে আমার রব! আমি কি অন্য কোন ভুল করেছি যার প্রতিফলে আমি আঘাত প্রাপ্ত হলাম? আমি সকল ভূমিতে ভ্রমণ করেছি কিন্তু কোনরূপ ঘটনাই আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি, কিন্তু এই ভূমিতে আমি হোঁচট খেয়েছি এবং ভারাক্রান্ত হয়েছি।”

মহান আল্লাহ্পাক হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার নিকট ওহী প্রেরণ করলেন: “হে আদম আলাইহিস সালাম! আপনি কোন ভুল করেননি, বরং আপনারই সন্তান সাইয়্যিদুনা হযরত হুসাইন আলাইহিস সালাম এই ভূমিতে নিপীড়িত অবস্থায় নিহত হবেন, আর (আপনার রক্ত মুবারক ঝরার কারণ হল) আপনার রক্ত মুবারক উনার রক্ত মুবারকের সাথে মিশে গেল।”
হযরত আদম আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, সাইয়্যিদুনা হযরত হুসাইন আলাইহিস সালাম উনি কি কোন পয়গম্বর?

মহান আল্লাহ্পাক বললেন, না, উনি পয়গম্বর নন, কিন্তু সাইয়্যিদুনা হযরত মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সন্তান।
হযরত আদম আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, “উনার হত্যাকারী কে?”
মহান আল্লাহ্পাক পুনরায় সম্মাণিত ওহী অবতীর্ণ করলেন, উনার হত্যাকারী হচ্ছে ইয়াজিদ; যে আসমান ও জমিনের অভিশপ্ত ব্যক্তি।
হযরত আদম আলাইহিস সালাম হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম উনাকে বললেন,“ এখন আমি কি করব? (যাতে এই ভূমি হতে সুস্থভাবে অতিক্রম করতে পারি)

হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, “ইয়াজিদের উপর অভিসম্পাত করুন। তখন হযরত আদম শফীউল্লাহ আলাইহিস সালাম চারবার ইয়াজিদের উপর অভিসম্পাত করলেন ও সে স্থান হতে অতিক্রম করে নিজের ভ্রমণ অব্যাহত রাখলেন। অতঃপর সম্মাণিত কাবাগৃহের নিকটবর্তী আরাফাত পাহাড়ের নিকট হযরত হাওয়া আলাইহিস সালাম উনার দেখা পান।

***হযরত নূহ আলাইহিস সালাম

বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত নূহ আলাইহিস সালাম মহাপ্রলয়ের(বন্যা) পর কিস্তিতে আরোহণ করে সমগ্র পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। কিন্তু যখন তিনি কারবালা ভূমি অতিক্রম করতে চাইলেন তখন সে স্থানে উনার কিস্তি থেমে গেল। হযরত নূহ আলাইহিস সালাম উনার কিস্তি ডুবে যাওয়ার ভয়ে সন্ত্রস্ত হলেন।

হাত মুবারক তুলে আল্লাহপাকের দরবারে বললেন, “হে আমার রব! আমি সমস্ত ভূমিতে ভ্রমণ করেছি কিন্তু কোন বিপদই আসেনি যেভাবে এই ভূমিতে এসেছে। আর এ ভূমির মত অন্য কোন ভূমিতে আমি ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়নি।” এমন সময় হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম অবতীর্ণ হয়ে উনাকে বললেন,“ হে হযরত নূহ আলাইহিস সালাম! এটা ঐ স্থান যেখানে শেষ নবী হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দৌহিত্র ও শেষ আওসীয়ার সন্তান নিহত হবেন।
হযরত নূহ আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন,“ উনার হত্যাকারী কে?
হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বললেন,“ সেই ব্যক্তি যে সাত আসমান ও সাত জমিনে অভিশপ্ত।
হযরত নূহ আলাইহিস সালাম চারবার উনার হত্যাকারীর উপর বদ দোয়া করলেন, আর তখনই উনার কিস্তি বিপর্যয় হতে পরিত্রাণ লাভ করে ভ্রমণ অব্যাহত রাখলেন এবং জুদী নামক পাহাড়ের এসে থেমে গেলেন।

***কারবালা প্রান্তরে হযরত ইব্রাহিম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম

বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইব্রাহিম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম ঘোড়ায় আরোহণ করে ভ্রমণ করছিলেন। চলতে চলতে তিনি কারবালা প্রান্তরে এসে পৌঁছুলেন। যখন তিনি “কাতালগাহ” (যেখানে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র মস্তক জিসিম মুবারক হতে আলাদা করা হয়) -এ পৌঁছুলেন তখন হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম উনার ঘোড়া উল্টে পড়ে গেলেন।হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম তিনিও ঘোড়া হতে পড়ে গেলেন এবং উনার মাথা মুবারক ফেটে রক্ত মুবারক প্রবাহিত হল। তিনি ইস্তেগফার (তওবা) করে বললেন, “হে আমার রব! আমি কি কোন গুনাহ আঞ্জাম দিয়েছি?
(যদিও কোন নবী বা রসুল গন কখনো গুনাহ করেন না তবুও বিনয় প্রকাশ করলেন এবং আমাদের শিক্ষা দেয়ার জন্য এমন মেসাল)”

এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম উনার নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, “ হে হযরত ইব্রাহিম আলাইহি সালাম! আপনার হতে কোন পাপকর্ম সংঘটিত হয়নি। বরং এই ভূমিতে সর্বশেষ পয়গম্বর উনার দৌহিত্র নিহত হবেন। আপনার রক্ত মুবারক উনার রক্ত মুবারকের মত এই জমিনে প্রবাহিত হল।
হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, “উনার হত্যাকারী কে?
হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বললেন,“ আসমান এবং জমিনের অধিবাসীরা যাকে অভিসম্পাত করেছে”।”
এমতাবস্থায় হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম আসমানের দিকে হাত মুবারক তুলে যতক্ষণ পারলেন নবী ছল্লাল্লাহু আলািইহি ওয়া সাল্লাম উনার দৌহিত্রের হত্যাকারীর উপর বদ দোয়া করলেন। তখন হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ঘোড়া উঠে দাঁড়ালেন।হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ঘোড়ায় আরোহণ করলেন এবং রওনা হলেন। হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ঘোড়াকে প্রশ্ন করলেন: কিভাবে তুমি সুস্থ হলে?
ঘোড়া বলল: “হে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম! আমি এ কারণে গর্বিত যে, আপনার মত এক ব্যক্তিত্ব আমার পিঠে আরোহণ করেছেন। যখন এই ভূমিতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে আপনাকে ভূমিতে ফেলে দিলাম, তখন খুবই লজ্জিত হয়েছিলাম। এই ঘটনার কারণ ছিল ইয়াজিদ লানতুল্লাহি আলাইহি।

***হযরত ইসমাঈল যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার ভেড়ার পাল ফুরাতের পানি পান করেনি

বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইসমাঈল যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার ভেড়ার পাল চরতে চরতে ফুরাতের কূলে আসলো। রাখাল হযরত ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) উনার নিকট এসে বলল, “ভেড়ারা ফুরাত হতে পানি পান করছে না।” হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম এই ঘটনার কারণ সম্পর্কে আল্লাহপাক উনার নিকট প্রশ্ন করলেন। হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনার নিকট অবতীর্ণ হয়ে বললেন, “এর রহস্য আপনি ভেড়াদেরকেই জিজ্ঞেস করুন।হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ভেড়াদের উদ্দেশ্য করে বললেন: “কেন তোমরা এ পানি পান করছ না?”

ভেড়াগুলো প্রাঞ্জল ভাষায় বলে উঠলো, “আমরা জানতে পেরেছি যে আপনারই সন্তান সাইয়্যিদুনা হুসাইন আলাইহিস সালাম, যিনি হবেন হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দৌহিত্র- এখানে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় নিহত হবেন, এ কারণেই আমরা এই স্থান হতে পানি পান করব না।”

হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “উনার হত্যাকারী কে?”
তারা বলল, “আসমান ও জমিনের অধিবাসীরা এবং পৃথিবীতে বিদ্যমান সকল সৃষ্টি যাকে অভিসম্পাত করে।”
হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বললেন: “হে আল্লাহ্পাক! সাইয়্যিদুণা হযরত হুসাইন আলাইহি সালাম উনার হত্যাকারীর উপর লানত বর্ষিত হোক।”

***হযরত মূসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম

বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম নিজের স্থলাভিষিক্ত হযরত ইউশা বিন নূন আলাইহিস সালাম উনার সাথে কারবালা প্রান্তর অতিক্রম করছিলেন। হঠাৎ হযরত মূসা আলাইহিস সালাম উনার জুতা মুবারক ছিড়ে জুতার মুবারকের ফিতাও ছিরে গেল। এমতাবস্থায় একটি কাঁটা হযরত মূসা আলাইহিস সালাম পা মুবারকে বিদ্ধ হয়ে জখম করলো এবং সাথে সাথে রক্ত মুবারক বের হতে লাগলো।

হযরত মূসা আলাইহিস সালাম বললেন, “হে বারে ইলাহী! আমি কি দোষ করেছি, যার কারণে এমন ঘটনার মুখোমুখি হলাম?” মহান আল্লাহ্ তায়ালা হযরত মূসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার প্রতি সম্মাণিত ওহী অবতীর্ণ করলেন, “এখানে সাইয়্যিদুণা হযরত হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার রক্ত মুবারক ঝরানো হবে ও উনাকে হত্যা করা হবে। এখন আপনার রক্ত মুবারক সাইয়্যিদুণা হযরত হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার রক্ত মুবারকের রাস্তায় প্রবাহিত হল।”
হযরত মূসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, উনি কে?
হযরত মূসা আলাইহিস সালাম উনাকে বলা হল, তিনি আল্লাহপাকের মনোনীত শেষ নবী এবং রসুল হুযুরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দৌহিত্র এবং হযরত আলী মুরতজা আলাইহিস সালাম উনার সন্তান।

হযরত মূসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, উনার হত্যাকারী কে?
হযরত মূসা আলাইহিস সালাম উনার উদ্দেশ্যে বলা হল, উনার হত্যাকারী হল সেই ব্যক্তি, যাকে সমুদ্রের মৎস্য, জঙ্গল ও মরুভূমির হিংস্র জীব ও আকাশে উড়ন্ত পাখিরা অভিসম্পাত করেছে। এমতাবস্থায় হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও হযরত ইউশা বিন নূন আলাইহিস সালাম উনারা ও বললেন (অর্থাৎ সবার মত তিনিও লানত করলেন), অতঃপর উনারা উভয়ে ঐ ভূমি হতে সুস্থ অবস্থায় ও নিরাপদে অতিক্রম করলেন।

[লেখাটি অনলাইন থেকে সংগ্রহ করা]
উনাদের জীবনী মুবারক থেকে স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয় যে, হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনারা ছাড়াও সমস্ত আসমান ও যমীনের মাঝে যা কিছু বিদ্যমান সমস্ত কিছু ইয়াজীদ লানতুল্লাহি আলাইহিকে অভিশম্পাত করেছে।অতএব, ইয়াজীদকে ঈমানদার ভাবা সম্প্রদায় থেকে নিজ দ্বায়িত্বে দূরে থাকুন।আল্লাহপাক সকলেকে সমস্ত প্রকার প্ররোচনা থেকে হেফাজত করুন এবং হাক্বীক্বতে আশেকে আহলেবাইত হওয়ার তৌফিক দান করুন।

Views All Time
1
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

  1. মালউন ইয়াযিদের উপর অনন্তকালব্যাপী লানত…..

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে