‘অমঙ্গল যাত্রা’র কলঙ্কিত ইতিহাসটি জেনে নিন


এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী এবং কথিত কু-বুদ্ধিজীবি ‘অপসাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব’ পহেলা বৈশাখের ‘অমঙ্গল যাত্রা’ নিয়ে হৈচৈ শুরু করেছে। পহেলা বৈশাখের অমঙ্গল যাত্রা যেন অঞ্চলের অপসংস্কৃতির মূল। ব্যবসায়িক স্বার্থে ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়াগুলোতে পহেলা বৈশাখে অমঙ্গল যাত্রাকে সংস্কৃতি হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। বেসরকারি টিভি মিডিয়াগুলো ব্যবসায়িক ‘মওকা’ পেয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে ঘুম হারাম করেছে।
প্রশ্ন হলো- অমঙ্গল যাত্রা ও মূর্তি নিয়ে ঘুরাঘুরি করা কী বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতি? কয়েক দিন থেকে পহেলা বৈশাখের পান্তা-ইলিশ আর অমঙ্গল যাত্রার প্রস্তুতি নিয়ে টিভিতে যে ‘রগরগে বিজ্ঞাপন’ প্রচারের প্রতিযোগিতা চলে, তা কী বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের কৃষ্টি-কালচার?
(১). ১৯৮৪ সালের ১৪ এপ্রিল কর্মহীন কিছু ব্যক্তি পহেলা বৈশাখে এক বেকারকে কিছু উপার্জনের জন্য রমনা পার্কে পান্তা ভাতের দোকান দেয়ার পরামর্শ দেয়। সে মতে ফুটপাতের জনৈক বেকার পান্তা ভাত, ইলিশ মাছ ও বেগুন ভর্তা নিয়ে ঢাকার রমনা বটমূলে খোলা উদ্যানে দোকান দেয়। প্রচ- গরমে পার্কে ঘুরতে আসা মানুষ সে দোকানে এসে সেই পচা পান্তা-গান্দা ও ইলিশ ভাজা এবং ভর্তা নিয়ে ফুটপাতের লোকজনের মতো দুবলা ঘাসের উপর বসেই খায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পান্তা শেষ। অতঃপর দুপুরের রোদে পার্কে ঘুরতে আসা মানুষ পান্তা না পেয়ে পাশের স্টলে থাকা চটপটি, ফুচকা, সিঙ্গারা সমুচা, আইসক্রিম ইত্যাদি খেয়ে ঘুরাফেরা করে। তখন থেকে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে রমনা পার্কে পান্তা-ইলিশের আয়োজন করা হয়। এই হলো পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশের ইতিহাস।
(২). ষাটের দশকে দেশের কিছু দেশপ্রেমিক কবি-সাহিত্যিক-অধ্যাপক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের পরামর্শে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করেছিল। রবীন্দ্রের কবিতা ও গান প্রকাশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে ১৯৬৫ সাল (১৩৭৫ বঙ্গাব্দে) ছায়ানট নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন রমনা পার্কে পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণ উৎসব পালনের আয়োজন করে। রবীন্দ্র সংগীত ‘এসো হে বৈশাখ… এসো, এসো…’ গানের মাধ্যমে তারা স্বাগত জানায় নতুন বছরকে। অতঃপর প্রায় প্রতিবছর বর্ষবরণ করে সংগঠনটি পরিচিতি লাভ করে। ১৯৭২ সালের পর থেকে রমনা বটমূলে বর্ষবরণ ‘জাতীয় উৎসবের’ স্বীকৃতি পায়। ১৯৮৯ সালে তথাকথিত কিছু শিক্ষিত প্রগতিশীল কলকাতার স্টাইলে ঢাকায় বৈশাখী ‘অমঙ্গল যাত্রা’ যোগ করে বাংলা বর্ষবরণে।
(৩). জানা যায়, ১৯৮৯ সালে এই শোভাযাত্রার প্রচলন শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থীরা। পহেলা বৈশাখের দিন সকাল গড়িয়ে যখন রমনা-টি.এস.সি-শাহবাগে কর্মব্যস্ত মানুষের উপচে পরা ভিড় থাকে, তখন শুরু হয় অমঙ্গল যাত্রা। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে অমঙ্গল যাত্রা বের হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এখানে পশু-পাখির মুখাকৃতির ছবি-মূর্তিসহ বিভিন্ন অনুষঙ্গ ফুটিয়ে তোলা হয় নানা রং-বেরংয়ের মুখোশ ও আলপনার মাধ্যমে। হালে বেসরকারি টিভি মিডিয়ার প্রসার ঘটনায় অনেক মিডিয়া ব্যবসায়িক লাভের জন্য বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন নিয়ে এসব অনুষ্ঠান প্রচার করে।
ইতিহাস ঘেটে দেখা যায়, ১৯৬৭ সালের আগে পহেলা বৈশাখ পালিত হয়নি। তাহলে পহেলা বৈশাখে মাটির সানকিতে পান্তা-ইলিশ খাওয়াকে বাংলাদেশের মানুষের আদি সংস্কৃতি হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে কেন? বাংলা ভাষার গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের সংস্কৃতি হাজার বছরের পুরনো। তাহলে ৩০/৩৫ বছর আগে শুরু হওয়া কিছু মূর্খ লোকের পান্তা-ইলিশ খাওয়া আদি সংস্কৃতি হয় কেমন করে? কি করে অমঙ্গল যাত্রা এদেশের ঐতিহ্য হয়?

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে