অস্ট্রেলিয়ায় মুসলমানদের ইতিহাস এবং অবদান(প্রিয়তে রাখার মত একটি পোস্ট)


পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট মহাদেশ অস্ট্রেলিয়া। মহাদেশটি ভারত সাগর ও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত। এখানকার শীলাসমূহের বয়স অনুপাতে এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাদেশ, যা সবার শেষে আবিষ্কৃত হয়। সাধারণত একথা প্রসিদ্ধ যে, বৃটিশ নেভীর ক্যাপ্টেন জেমস কুক সর্বপ্রথম ১৭৭০ খৃস্টাব্দে অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করেন। তবে একথাটি এতটুকু ঠিক হতে পারে যে, একটি সভ্য দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস জেমস কুকের নৌভ্রমনের ফলে সূচিত হয়। কিন্তু ইতিপূর্বেও এ মহাদেশে অনেক জনের পৌঁছানোর সাক্ষী বিদ্যমান আছে। আর একথা তো সুস্পষ্ট যে, ব্রিটিশরা অধিবাস গ্রহণকরার আগে থেকেই একটি জাতি শত শত বছর ধরে বিদ্যমান ছিল যাদেরকে এবোরজিনিস (Aborginies) বলা হয়। এরা যদিও অসভ্য ছিল, তবুও তাদের সংখ্যা সেসময় কমপক্ষে তিন লাখ ছিল।তাদের দেহের গঠন ও অন্যান্য ঐতিহাসিক নিদর্শন দ্বারা বুঝা যায় যে, এরা ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চল থেকে ভ্রমণ করে এখানে এসে পৌঁছে।

যখন ব্রিটিশরা এখানে বসবাস শুরু করে তখন প্রথম দিকে এরা তাদেরকে সাদরে গ্রহণ করে। কিন্তু ব্রিটিশরা যখন নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের বস্তিসমূহ উজাড় করতে আরম্ভ করে, তখন তারা এতে বাধা প্রদান করে। তখন ব্রিটিশরা এদেরকে নির্দয়ভাবে হত্যা করা শুরু করে। হাজার হাজার স্থানীয় অধিবাসী এই গণহত্যার শিকার হয়। কিছুদিন তারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালু রাখে। কিন্তু পরবর্তীতে ব্রিটিশ শক্তির কাছে অস্ত্র সমর্পণ করে তাদের পরিকল্পনায় একাকার হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় তাদের ছিল না। যাক এদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে এদেরকে এখনো অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে, যা তাদের বস্তিগুলোকে অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য শহরের সাথে তুলনা করলে সহজেই বুঝা যাবে।
মুসলমানগণের আগমন যেভাবে:
অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম যে মুসলমানরা পদার্পন করে তারা ছিল ব্যবসায়ী। ইন্দোনেশীয়ার ম্যাকাছান(Macassan) এবং বুগিস(Bugis) ব্যবসায়ীদের সাথে তাদের স্বজাতীয় লোকদের সম্পর্ক ছিল যারা দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় বাস করত।
যখন বৃটিশ বণিকরা অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করে, তখন প্রথম দিকে তারা এই দ্বীপকে সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করত, যে উদ্দেশ্যে তারা কালাপানিকে ব্যবহার করত। অর্থাৎ, যারা ব্রিটিশ আইনে দেশান্তরের সাজা পেত, তাদেরকে এখানে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। ক্রমে ক্রমে দেশান্তরিত সেই লোকদের বংশধর এখানে বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে বহু ব্রিটিশ অধিবাসী এ মহাদেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ দ্বারা উপকৃত হওয়ার জন্যও এখানে এসে বসবাস শুরু করতে থাকে। যখন বৃটিশ অভিবাসীদের সংখ্যা বেশ বৃদ্ধি পেল এবং তারা এ অঞ্চলের সাথে নিজেদের ভবিষ্যতকে জড়িয়ে ফেলল, তখন তাদের সামনে সেখানকার বিভিন্ন অঞ্চলের মাঝে সংযোগ স্থাপন ও মহাদেশের মধ্যবর্তী অঞ্চলগুলোতে খনি আবিষ্কার করার জন্য সড়ক নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু তাদের সমস্যা ছিল এই যে, মহাদেশটির মধ্যবর্তী এলাকাগুলো ছিল অনেকতা বৃক্ষলতাশূন্য মরুভূমি। ব্রিটিশ অভিবাসীদের মরু এলাকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল না। তারা ঘোড়ায় চড়ে এ সমস্ত এলাকায় কাজ করার চেষ্টা করে, কিন্তু তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়। তারা বুঝতে পারে যে, এ মরুভূমিতে যাতায়াত ও মাল আনা নেওয়ার জন্য উট ছাড়া অনয় কোন উপায় কার্যকর হতে পারবে না। অস্ট্রেলিয়ায় উট ছিল দুষ্প্রাপ্য। তাই নাবিকরা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উট কিনে জাহাজে করে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের যেহেতু উট ব্যবহার করা এবং এবং সেগুলোকে সামলানোর কোন অভিজ্ঞতা ছিল না তাই কয়েকবার এমন হয় যে, বেশীরভাগ উট অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে পৌঁছার পূর্বেই পথের মাঝে মারা যায়। এক দুটি উট জীবিত থাকলেও অভিজ্ঞতা বা থাকার কারণে কাজে লাগানোর আগেই সেগুলো রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

এ পর্যায়ে এসে বৃটিশরা বুঝতে পারে, উট দ্বারা সঠিকভাবে কাজ নিতে হলে উটের সাথে তার রাখালকেও আনা জরুরী। সুতরাং এ উদ্দেশ্যে কিছু অস্ট্রেলিয়ান বণিক করাচীর বন্দরনগরীতে অবতরণ করে। তারা সিন্ধু, মাকরান, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের উটের মালিকদের সাথে চুক্তি করে যে, তারা নিজেদের উট নিয়ে অস্ট্রেলিয়া যাবে এবং সেখানকার মরুভূমি অতিক্রম করার কাজে তাদেরকে সহযোগিতা করবে। এই চুক্তির অধীনে উপরোক্ত প্রদেশ থেকে উটের মালিকদের বড় বড় খেপ করাচীর বন্দর থেকে বিভিন্ন সময়ে শত শত উট নিয়ে অস্ট্রেলিয়া পৌঁছায়।

তাদের এই প্রচেষ্টা সফল হয়। এ সমস্ত উটের মালিক মরুভূমিতে কাজ করার পদ্ধতি জানত। তার খুব কষ্টসহিষ্ণু ও শক্তিশালী ছিল। তারা অল্প টাকার বিনিময়ে সেই কাজ করতে আরম্ভ করে, যা বহু বছর ব্যয় করেও অসম্ভব মনে হচ্ছিল। তাদের পরিশ্রম ও প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার ফলে অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমির মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মিত হয়, খনি আবিস্কৃত হয় এবং সুচারুরূপে খনি থেকে মাল আনা নেয়ার কাজ সম্পাদিত হয়। অস্ট্রেলিয়া এসমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদ দ্বারা লাভবান হতে থাকে। অবশেষে ধীরে ধীরে এ সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদের জোরে সমগ্র মহাদেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠে।

এ সমস্ত উটের মালিক- যারা এখানে এ জটিল কাজটি সম্পাদন্ করে- যদিও তাদের বেশীর ভাগ সিন্ধু, মাকরান,বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের লোক ছিল, কিন্তু তাদের মধ্যকার একটি বিরাট অংশ ছিল আফগান বংশোদ্ভূত। তাই অস্ট্রেলিয়াতে তাদেরকে ‘আফগান’ বলা হত। পরবর্তীতে এই নাম সংক্ষিপ্ত করে তাদেরকে ঘান (Ghan) বলা হত। এরা সবাই ছিল মুসলমান। এরা সেখানে নিজ জনবসতি গড়ে তোলে। যেগুলোকে এখানে ‘Ghan town’ অর্থাৎ ‘ আফগান জনপদ’ বলা হয়।

সেই ‘আফগান’ উটের মালিকদের প্রথম সফল কাফেলা করাচী বন্দর থেকে জাহাজে আরোহণ করে ৩১শে ডিসেম্বর ১৮৬৫ খৃস্টাব্দে অস্ট্রেলিয়া পৌঁছে। সে কাফেলায় ১২৪টি উট এবং আরো কিছু পশু ছিল। সেগুলোর তত্ত্বাবধানের জন্য ৩১ জন আফগানকে অস্ট্রেলিয়ায় আনা হয়েছিল। তারা ছিলেন পাক্কা মুসলমান। তারা নিজেদের বৃটিশ অফিসারদের পক্ষ থেকে চরম হতাশাজনক আচরণ করা এবং কঠিন অবস্থা থাকা সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবার ছাপড়া মসজিদ নির্মান করেন।

First mosque in Australia located in Marree, South Australia. The mosque was built in 1861 by Afghan cameleers.

ধীরে ধীরে কিছু মসজিদকে টিনের ছাউনী দেয়া হয়। এজন্য সেগুলোকে Tin Mosque ও বলা হয়।

19th Century mosque in cemetery, Bourke, New South Wales

তারা নিজেদের জনপদের নামও নিজ নিজ কাবিলার নামে রাখে। যেমন- ‘মিরী’ কাবিলার লোকেরা নিজেদের বসতি এলাকার নাম রাখে ‘মিরী’ এবং তাদের নির্মিত মসজিদও ‘মিরী’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। মরুভূমিতে কাজের অগ্রগতির সাথে সাথে আরো আফগানকে সিন্ধু,বেলুচিস্তান,সীমান্ত প্রদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আনা হয়। এমনকি অস্ট্রেলিয়ায় তারা বহু সংখ্যক বসতি স্থাপন করে। শহর এলাকার সর্বপ্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯০ সালের কাছাকাছি এডিলেইড (Adelaide) শহরে। দ্বতীয় মসজিদটি ১৯০৫ সালে পার্থে নির্মিত হয়।

অস্ট্রেলিয়ার কিছু মসজিদ

অস্ট্রেলিয়ার বিনির্মান ও উন্নতিতে এ সমস্ত উট মালিকদের মুখ্য ভূমিকা থাকলেও তাদের সাথে বৃটিশ অভিবাসীদের আচরণ প্রহতম থেকেই ভাল ছিল না। ১৯২০ সালে যখন সড়ক নির্মান কাজ শেষ হয়ে যায় এবং খনিসমূহ আবিস্কৃত হয়ে যায়, তখন উটেরও প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়, এ অবস্থায় সেই আফগানদের জন্য অন্য রোজগারের সুযোগ না দিয়ে তাদেরকে অস্ট্রেলিয়াতে বসবাস করতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। তাদের অনেকে দেশে ফিরে আসে। আর যারা রয়ে যায়, তারা বর অসহায় অবস্থায় জীবন অতিবাহিত করে। এখন অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস থেকে তাদের অবদানকে প্রায় বিস্মৃত করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার একজন গবেষক ক্রিস্টাইন স্টিবেন্স( Christine Stevens) ১৯৮৯ সালে অত্যন্ত পরিশ্রম করে একটি গ্রন্থ সংকলন করেন। বইটির নাম- Tin Mosque And Ghantowns। ৩৭২ পৃষ্ঠার এই বইটিতে তিনি সেই উটের মালিকদের ইতিহাস অনেক অধ্যবসায়ের সাথে সংকলন করেন। বইয়ের ভূমিকাতে তিনি লেখেনঃ
‘ আফগান ও তাদের পশুরা এমন এক সময়ে অস্ট্রেলিয়ার হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব করে দিয়েছে,যখন এ কাজ করতে অন্য লোকেরা বেশীর ভাগই ব্যর্থ হয়। এতদসত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে ভীতি ও ঘৃণা প্রদর্শন করা হয়। তাদের একক সমাজকে পৃথক করে দেওয়া হয়। তাদের মন ও প্রকৃতি এবং তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে খুব কমই বোঝার চেষ্টা করা হয়। বরং আজ পর্যন্ত সাধারণত অনেক ভুল বুঝাবুঝি পাওয়া যায়।’

এই আফগানদের পর জার্মান, তুরস্ক, লেবানন, মিসর, ইন্দোনেশীয়া, মালয়শিয়া, ভারত ও পাকিস্তান থেকে বহু সংখ্যক মুসলমান এখানে এসে অধিবাস গ্রহণ করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী মতে এখানে ৬৭ টি দেশ থেকে আগত মুসলমান অধিবাস গ্রহণ করেছে। সেই সরকারী আদমশুমারি অনুযায়ী মুসলমানদের সংখ্যা ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫ শত ৭ জন। ২০০৬ সালের হিসেবে মুসমানদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩,৪০,৩৯২ জন।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যা ২ কোটি ২৯ লাখের উপরে। বেসরকারী হিসেব মতে মুসলমানদের সংখ্যা ৫ লাখের কাছাকাছি। মুসলমানদের সর্বাধিক অধিবাস নিউ সাউথ ওয়েলসে, দ্বিতীয়ত ভিক্টোরিয়াতে, তৃতীয়ত কুইন্সল্যাণ্ডে আর সম্ভবত চতুর্থ নম্বরে আছে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া।

Sunshine Mosque-The largest mosque in Victoria

একসময় অস্ট্রেলিয়া বিনির্মানে মুসলমানদের ইতিহাস ও অবদানকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হলেও এখ্ন বেশীরভাগ অস্ট্রেলিয়ান ঐতিহাসিকরা তা স্বীকার করে। যেসব মুসলমানরা এ মহাদেশ গড়ার পেছনে অবদান রেখেছিলেন তাদের বের করে দেওয়া হলেও আল্লাহর রহমতে আন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত মুসলমান এবং সেখানে জন্মগ্রহণকারী মুসলমানদের মাধ্যমে আশাব্যঞ্জক ভাবেই মুসলমানদের সংখ্যা বাড়ছে। তবে শুধু মুসলমানদের সংখ্যা বাড়লেই চলবে না, সেখানকার মুসলমানদের উচিৎ তাদেরকে ঈমান আমল চরিত্রকে ঠিক রাখতে যাতে তারা সেখানে নিজেদেরকে একটি আদর্শ জনপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

তথ্যসূত্র-
________
১)Tin Mosque And Ghantowns
২) জাহানে দিদাহ
৩)The Oxford Campanion to Australlian History
৪) Encylopedia Britannica
৫)The Muslims in Australia A Brief History
By Bilal Cleland
৬)Mosques, Ghantowns and Cameleers in the
Settlement History of Colonial Australia By
Peter Scriver
৭)Muslim Australlia- Their belifes,practices and institutions by Professor Abdullah Saeed
৮) wikipedia

Views All Time
1
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

  1. আসলেই খুব সুন্দর পোষ্ট! ধন্যবাদ সুলতান ভাই!
    প্রকিত পক্ষে ইতিহাস ঘাটলে দেখাযাবে সব স্থানই উন্নতির পরশ পেয়েছে মুসলমানদের হাতে তার আর একটি উদাহরন হল আমেরিকা। তারা আফ্রিকা মহাদেশ থেকে মুসলমানদের বন্দি ও গোলাম বানিয়ে আমেরিকা মহাদেশে এনে আমিরিকা আবাদ করেছিল।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে