অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি ডয়েচে ব্যাংক


ডয়েচে ব্যাংককে একসময় জার্মানির আর্থিক খাতের গৌরব মনে করা হতো। কিন্তু একের পর এক কেলেঙ্কারির জের ধরে ব্যাংকটি এখন রীতিমতো অস্তিত্বের সংকটে পড়ার উপক্রম হয়েছে। খবর এএফপি। চলতি সপ্তাহে ডয়েচে ব্যাংকের শেয়ার আরেক দফা দরপতনের শিকার হয়েছে। এবার রেকর্ড নিম্নতম মূল্যে বিক্রি হচ্ছে জার্মানির বৃহত্তম ব্যাংকটির শেয়ার। ফলে ব্যাংকটির আর্থিক স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত সপ্তাহে বৃহস্পতিবার ডয়েচে ব্যাংকের শেয়ার বিক্রি হয়েছে প্রতিটি ১১ দশমিক ৪৪ ইউরো দরে। এর মানে হলো, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ব্যাংকটির শেয়ার ৪৯ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে। মাত্র ১০ বছরে ডয়েচে ব্যাংকের শেয়ারের উদ্বেগজনক অবনতি ঘটেছে। বিগত বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের আগে ২০০৭ সালের মে মাসে ডয়েচে ব্যাংকের শেয়ারমূল্য ১০০ ইউরোর উপরে উঠেছিল। বাজারমূল্যে অভাবনীয় অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে ডয়েচে ব্যাংকের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে এএফপি কোনো সাড়া পায়নি। এতে করে অনেকে ভাবছে, ব্যাংকটি হয়তো নতুন করে পুঁজি সংগ্রহ করবে। অন্যান্য ইউরোপীয় ব্যাংকের মতো ডয়েচে ব্যাংকও সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ব্রেক্সিট গণভোট নিয়ে উদ্বেগের প্রহর গুনেছে। তাছাড়া ইতালির ব্যাংকিং খাতের টানা দুর্বলতা ইউরোপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্যের ব্যাপারে বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। ডয়েচে ব্যাংকের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা কম নয়। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) সম্প্রতি ডয়েচে ব্যাংককে ‘বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রক্রিয়াগত ঝুঁকির বড় উৎস’ বলে অভিহিত করেছে। গত মাসে আইএমএফের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ‘১ লাখ ৬০ হাজার কোটি ইউরোর (১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার) বেশি মূল্যমানের সম্পদ ও এক লাখ কর্মশক্তির অধিকারী ডয়েচে ব্যাংক বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রক্রিয়াগত ঝুঁকির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এক্ষেত্রে ডয়েচে ব্যাংকের পর রয়েছে এইচএসবিসি ও ক্রেডিট সুইস।’ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ গত মাসে জানিয়েছে, ডয়েচে ব্যাংকের মার্কিন শাখা উপর্যুপরি দুটি স্ট্রেস টেস্টে ব্যর্থ হয়েছে। ‘ডয়েচে ব্যাংকের এ অবক্ষয় দেখার মতো’ বলে মন্তব্য করেছে ইউরোপের আরেকটি বড় ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ত সূত্র। সাবেক সিইও হোসে একারম্যানের বিদায়ের পর থেকে ডয়েচে ব্যাংকে একের পর এক কেলেঙ্কারি প্রকাশ হতে থাকে। তখন থেকে ব্যাংকটি বিশ্বজুড়ে প্রায় আট হাজার মামলার মুখোমুখি হয়েছে। মামলা ও কেলেঙ্কারিতে বেসামাল ব্যাংকটি মৌলক কিছু পরিবর্তন আনতে চাইছে। অতি অল্প সুদহার এবং ব্যাংকিং খাতে নীতিমালার কড়াকড়ির মধ্যে থেকেই ডয়েচে ব্যাংককে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করতে হচ্ছে। গত বছর ডয়েচে ব্যাংককে প্রায় ৭০০ কোটি ইউরো লোকসান গুনতে হয়েছে। আকারে ছোট ও প্রতিদ্বন্দ্বী জার্মান ব্যাংক কমার্জব্যাংক গত বছর ১০০ কোটি ইউরো মুনাফা করেছে। আর্থিক সংকটে বিপর্যস্ত ব্যাংকটি চলতি ও আগামী বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। অথচ বৈশ্বিক আর্থিক সংকট তুঙ্গে থাকার সময়ও ডয়েচে ব্যাংক শেয়ারহোল্ডারদের পাওনা নিয়মিত পরিশোধ করেছে। ডয়েচে ব্যাংকের ভেতরের আবহাওয়াও গুমোট। সর্বশেষ ঘরোয়া জরিপে দেখা গেছে, ডয়েচে ব্যাংকের জন্য কাজ করতে পেরে গর্ব বোধ করছেন অর্ধেকের চেয়ে কম কর্মী। একে একে অনেক কর্মকর্তা ব্যাংকটি ছেড়ে যাচ্ছেন। সর্বশেষ বুধবার বিদায় নিয়েছে ডয়েচে ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ ও ইমার্জিং মার্কেট ডেবট ট্রেডিংয়ের প্রধান আহমেত আরিঙ্ক।
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে