আজ মহিমান্বিত ফাতেহায়ে ইয়াযদহম;


যা গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া, মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পবিত্র বিছাল শরীফ-এর দিন।
সঙ্গতকারণেই দিনটির ফযীলত ও তাৎপর্য অনুধাবনে আমাদেরকে অগ্রণী হতে হবে।

বিত্র কালামুল্লাহ শরীফ-এ মহান আল্লাহ পাক, মহান আল্লাহ পাক উনাকে এবং উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন হুযূর পুর নূর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং এরপরে উলিল আমর অর্থাৎ সম্মানিত ওলী আল্লাহগণ উনাদেরকে মানার কথা বলেছেন। আজ রবীউছ ছানী মাসের ১১ তারিখ- যিনি বড় ওলীআল্লাহগণ উনাদের মধ্যে একজন, যিনি বড় পীর ছাহেব হিসেবে মশহুর, যিনি মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, গাউছুল আ’যম হযরত শায়েখ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন মুহম্মদ আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পবিত্র বিছাল শরীফ-এর দিবস হিসেবে সম্মানিত। ফার্সী শব্দে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াযদহম’ হিসেবে যে দিনটি সবার কাছে স্মরণীয়।
‘বাহজাতুল আসরার’ নামক কিতাবে হযরত শায়েখ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, আওলাদে রসূল হযরত গাউছুল আ’যম শায়েখ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ৫৬১ হিজরী সনের রবীউল আউয়াল শরীফ মাস হতে কঠিন রোগে আক্রান্ত হন। ‘তাশারেখে আউলিয়া’ নামক কিতাবে হযরত শায়েখ আব্দুল ফতেহ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, রোববার দিবাগত রাত্রে অর্থাৎ সোমবার রাত্রে আওলাদে রসূল হযরত গাউছুল আ’যম শায়েখ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি গোসল মুবারক করেন। গোসলান্তে ইশার নামায পড়ে তিনি হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উম্মতগণের গুনাহখাতা মাফের জন্য ও তাঁদের উপর খাছ রহমতের জন্য দোয়া করলেন। এরপর গায়েব হতে আওয়াজ আসলো, “হে প্রশান্ত নফ্স! আপনি প্রসন্ন ও সন্তুষ্টচিত্তে নিজ প্রতিপালক উনার দিকে প্রত্যাবর্তন করুন। আপনি আমার নেককার বান্দার মধ্যে শামিল হয়ে যান এবং বেহেশতে প্রবেশ করেন।” এরপর তিনি কালিমা শরীফ পাঠ করে তাআজ্জাজা (অর্থ বিজয়ী হওয়া) উচ্চারণ করতে লাগলেন এবং তিনি আল্লাহ আল্লাহ আল্লাহ বললেন। এরপর জিহ্বা তালুর সাথে লেগে গেল। এইভাবে ৫৬১ হিজরী সনের (১১১৬ ঈসায়ী) রবীউছ ছানী মাসের ১১ তারিখে মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, আওলাদে রসূল হযরত গাউছুল আ’যম শায়েখ সাইয়্যিদ হযরত মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার মহান দরবার শরীফ-এ প্রত্যাবর্তন করলেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন)।
স্বভাবতই এ দিনের তাৎপর্য হাছিলে আমাদেরকে অনুপ্রাণিত হতে হবে তা হল ক্বলব পরিশুদ্ধকরণ তথা ইলমে তাছাউফ অর্জনে।
গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া, মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পবিত্র জীবনকাহিনী পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, প্রথম দিকে না মানলেও পরবর্তীতে সমস্ত হক্বপন্থী আলিমগণ উনারই হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে কামিয়াবীর স্পর্শ পেয়েছিলেন। অর্থাৎ ইল্মে জাহির তাদেরকে পরিশুদ্ধ করতে পারেনি। হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি ইলমে জাহিরকে কেবল খোসা স্বরূপ বলেছেন। এমনি করে সকল মুহাক্কিক ও মুদাক্কিকগণের কথা একই যে, ইসলাম পালন করতে হলে, সংশোধিত হতে হলে, মর্দে মুজাহিদ হতে চাইলে, দরকার পূর্ণ উদ্যমে ইল্মে তাসাউফ চর্চার। হক্ব ওলীআল্লাহ উনার হাতে বাইয়াত হওয়ার।
তাছাউফ অজ্ঞরা যে কথা কল্পনা করে ব্যক্ত করে তা হল-তাছাউফের উপত্তি স্থল-পারস্য। কিন্তু ইসলাম জ্ঞাত ব্যক্তি মাত্রেই জানেন যে, তাছাউফ-এর পবিত্র পরশ জেগেছে আরব ভূমিতে এবং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উছিলায়ই এর প্রবর্তন হয়েছে। যে কারণে সকল হক্ব সিলসিলার সর্বাগ্রে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারকই প্রকাশ পায়। আর ইতিহাস এ সাক্ষ্যই দেয় যে, জাজিরাতুল আরব থেকেই তাছাউফ ইরান, ইরাকে ব্যাপকভাবে অনুশীলিত হয়। এবং সে ধারাবাহিকতায় ইতিহাস প্রসিদ্ধ অনেক বিশিষ্ট ওলী আল্লাহগণের বিকাশ সেখানে সাধিত হয়। উনাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ইরাকের বাগদাদ শরীফ-এর সর্বজনমান্য ও শ্রদ্ধেয় ওলীআল্লাহ্, গাউছুল আ’যম, মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, শায়েখ সাইয়্যিদ হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি। সমগ্র বিশ্বে যিনি হযরত বড় পীর সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি নামে সমধিক খ্যাত। যামানার প্রেক্ষাপটে দ্বীনকে জিন্দা করে যিনি লক্ববযুক্ত হয়েছিলেন ‘মুহিউদ্দীন’ এবং মুজাদ্দিদে যামান। যাঁর সম্পর্কে আলোচনা ও লেখনী রহমত, বরকত এবং হেদায়েতের নূর লাভের কারণ।
উল্লেখ্য, পৃথিবীর ইতিহাসে তাবৎ উলিল আমরগণ উনাদের মাঝে গাউছুল আযম, মাহ্বুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, বড় পীর হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন মুহম্মদ আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এক বেমেছাল দৃষ্টান্ত। স্বীয় চলার পথে শয়তানের হাজারো ওয়াস্ওয়াসা যাকে করতে পারেনি চুল পরিমাণ বিচ্যুত। অথচ সেক্ষেত্রে শয়তানের নিজস্ব স্বীকারোক্তিতেই বিবৃত হয়েছে যে, সে তার ওয়াস্ওয়াসার ফাঁদে ফেলে শত শত আলিম দরবেশকে বিভ্রান্ত করেছে, হালাল ছুরতে হারাম মত-পথে পরিচালিত করে তাদেরকে যেমন গুমরাহ করেছে, তেমনি তাদের হাজার হাজার অনুসারীদেরও একইভাবে পথহারা করেছে।
স্মর্তব্য, পৃথিবীর ইতিহাসে বহু বহু ওলীআল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি অতীত হয়েছেন, যাঁদের মুবারক জীবনীতে হাক্বীক্বী সুলত্বানুল আযকারের অপূর্ব নিদর্শন ফুটে উঠৈছে। আর রবীউছ ছানী মাসের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব গাউছুল আ’যম, মুহিউদ্দীন, সাইয়্যিদুল আউলিয়া, হযরত বড়পীর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পেশাব মুবারক পরীক্ষাকালে দেখা গিয়েছে তা কেবল সুগন্ধযুক্তই নয় বরং প্রতিটি ফোঁটা হতে স্পষ্টরূপে মহান আল্লাহ মহান আল্লাহ যিকির ধ্বনিত হচ্ছে। হাক্বীক্বী সুলত্বানুল আযকার জারির এই অপূর্ব দৃষ্টান্তে সে সময়ে চারশত বিধর্মীর ইসলাম গ্রহণই কেবল অমূল্য ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত নয় বরং এটি অনাগতকালের জন্য এক বিশেষ নছীহত।
আক্ষেপের বিষয়, ক্বালবী যিকির জারীসহ, দশলতিফার বিষয়, সুলতানুল আযকার, বেলায়েতের বিভিন্ন মাকাম হাছিল করা, ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে আজকে আমাদের মূল্যবোধ একেবারেই শূন্যের কোঠায়।
যাবতীয় নামধারী জাহিরী মাওলানাগং তথা তাবৎ উলামায়ে ছূ’ এ বিষয়ে বিশেষ গাফলতী ছাড়াও, তল্পীবাহক সিলসিলাধারীর বর্তমান অযোগ্য উত্তরসূরীদের এ বিষয়ে বিশেষ দখলহীনতা সামগ্রিকভাবে আমাদের জাতীয় জীবনে ক্বলবী যিকির থেকে সুলত্বানুল আযকার, কাশফ, কারামত ইত্যাদি সম্পর্কে কাঙ্খিত আলোড়ন তথা আবেদন সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বলাবাহুল্য, আজ মুসলিম সমাজের আমলের যে করুন অবস্থা তা কেবল হতাশাজনকই নয় বরং গভীর শঙ্কামূলক। গান-বাজনা, সিনেমা, টি.ভি, ভি.সি.আরসহ হাজারো অশ্লীল আর অনৈসলামিক কাজই বর্তমানে মানুষের মনের মূল খোড়াক হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এসব থেকে ফিরে আসার জন্য সাধারণ মাওলানাদের পুনঃ পুনঃ আহবান অরণ্যে রোদনে পরিণত হচ্ছে। এর গূঢ় কারণটি অজানা না হলেও তার মূল্যায়ন ও গুরুত্ব দানের মানসিকতা আলিম নামধারীদের অধিকাংশের মাঝেই অনুপস্থিত। মূলতঃ ক্বল্ব সংশোধন তথা ইল্মে তাছাউফ এর মাক্বামাত অর্জনেই রয়েছে এর সমাধান।
স্মর্তব্য, কেবল ব্যক্তিগত ইছলাহই নয়, মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বত-মারিফত লাভসহ উনার সন্তুষ্টির জন্য খিলাফত আলা মিনহাজিন্ নবুওওয়াহ্’র কাজ করার ক্ষেত্রেও ক্বলবী যিকিরের তথা সুলত্বানুল আযকারের সমৃদ্ধতাই মূল আঞ্জাম। তাবৎ বিষয়টি থেকে উদাসীন বলেই তাদের আবেদন নিবেদন তথা কর্মতৎপরতা একান্তই নিষ্ফল।

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

  1. এ দিনের বরকত হাছিল যেন করতে পারি। আমীন

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে