আন্তর্জাতিক আরবী ভাষা দিবস ও বাংলাদেশে আরবী চর্চা


১৮ ডিসেম্বর পালিত হলো আন্তর্জাতিক আরবী ভাষা দিবস। ১৯৭৩ সালের এদিনে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ২৮তম অধিবেশনে ৩১৯০নং সিদ্ধান্ত মোতাবেক আরবীকে জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ১৯০তম অধিবেশনে ১৮ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক আরবী ভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে শুরু হয় আন্তর্জাতিক আরবী ভাষা দিবসের পথ চলা। আরব বিশ্বে দিবসটি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হলেও শুধুমাত্র মূলধারার মিডিয়ার নির্লিপ্ততার কারণে বাংলাদেশে দিবসটি তেমন কোনো সাড়া জাগাতে পারেনি। অথচ আরবী ভাষার সঙ্গে রয়েছে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর আত্মার সম্পর্ক। এদেশের সর্ব স্তরের জনসাধারণ আরবী ভাষাকে পরম শ্রদ্ধা করেন, মন থেকে ভক্তি করেন ও হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেন। কারণ কুরআন হাদীছের ভাষা আরবী, আখিরী রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ভাষা আরবী, জান্নাতের ভাষা আরবী। পবিত্র হাদীছ শরীফে আরবী ভাষাকে মুহব্বত করতে জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে।

তবে আরবী ভাষার যেমন রয়েছে ধর্মীয় গুরুত্ব, তেমনই রয়েছে বৈষয়িক গুরুত্ব। পৃথিবীর প্রায় ৫৮ কোটি জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা আরবী। আর ৫৫ কোটি মানুষ আরবীকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। তবে পৃথীবীর প্রায় সোয়া তশ’ কোটি মুসলমানের প্রাণের ভাষা আরবী। ২৫টি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের দাপ্তরিক ভাষা আরবী। জাতিসংঘের ৬টি দাপ্তরিক ভাষার একটি আরবী। তাই যুগ ও বাস্তবতার নিরিখে আরবী ভাষা বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী একটি ভাষা।

অর্থনৈতিক বিবেচনায়ও আরবী ভাষা বাংলাদেশের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি ধরা হয় রেমিটেন্স। আর এ রেমিটেন্সের সিংহভাগই অর্জিত আরবী ভাষার দেশসমূহ থেকে। তাই দেশের রেমিটেন্স বাড়ানোর স্বার্থে, দেশের অর্থনীতিকে আর চাঙা করার স্বার্থে, দেশের আয় ও উন্নতির স্বার্থে আরবী ভাষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব দেয়া দরকার।

আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর প্রচুর মানুষ জীবিকার তাগিদে আরব দেশগুলোতে যায়। অথচ আরবী ভাষার সঙ্গে তাদের পূর্ব কোনো সম্পর্ক থাকে না। আরবী ভাষার সঙ্গে মোটামুটি সম্পর্ক থাকলে এ লোকগুলো আরব দেশে নিজেদের অবস্থান আরো মজবুত করতে পারতো। নিজেদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা আরো বেশি আদায় করে নিতে পারতো।

সরকার একটু উদ্যোগী হলে অনেক কিছুই করতে পারে। দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের স্বার্থে সরকার আরব দেশে গমনেচ্ছুক শ্রমিকদের জন্য স্বল্প মেয়াদে ব্যবহারিক আরবী ভাষা শিক্ষাকোর্স চালু করতে পারে। এর সুদূর প্রসারী প্রভাব পড়বে রেমিটেন্সের উপর।

ইসলামের সঙ্গে এ জনপদের সম্পর্ক হাজার বছরেরও বেশি। সুদীর্ঘ এই সময়ের প্রতিদিন এ ভূখন্ডের মানুষ নিদ্রা ত্যাগ করে নতুন দিনের যাত্রা শুরু করে যে আজানের সুমধুর সুর শোনে তা-ও কিন্তু আরবী ভাষার কিছু বাক্য। দলমত নির্বিশেষে এদেশের লক্ষ-কোটি মানুষ সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে প্রতিদিন সামান্য হলেও পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করে থাকে। তারও ভাষা আরবী।

এদেশের ৫ লক্ষাধিক মসজিদে প্রতিদিন পাঁচবেলা দলবদ্ধভাবে ও এককভাবে যে নামায পড়া হয় তার ভাষাও আরবী। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান তিনি যে দল ও মতের হোন কেন; নামাযের কারণে প্রতিদিন তাঁকে কম করে হলেও মোট আধা ঘণ্টা সময় নিবীড়ভাবে আরবী ভাষার সঙ্গে কাটাতে হয়। প্রতি সপ্তাহের জুমুয়াবারে তাকে দশ মিনিট আরবীতে খুতবা শুনতে হয়। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী তাদের জন্মের পর মুহূর্তে সর্বপ্রথম যে শব্দ শোনে, যে বাক্যগুলো দিয়ে পৃথিবীর নতুন জীবনে তারা বরণীয় হয়, সমাদৃত হয়, অভিনন্দিত হয়- সেই আজানের ভাষাও আরবী। আবার পৃথিবী থেকে তাকে চিরবিদায় দেয়া হয় আরবী ভাষায়। জানাযার নামায, লাশ কবরে রাখার দোয়া, কবর মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়ার দোয়া সবই আরবীতে। তাই আরবী ভাষার সঙ্গে এদেশের মানুষের সম্পর্ক জন্ম-মৃত্যুর সম্পর্ক। শুধু জন্ম-মৃত্যু নয়; বরং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নিত্যদিনের সম্পর্ক। এ সম্পর্ক সুকঠিন এক গভীর সম্পর্ক।

তুলনামূলকভাবে বিদেশী ভাষাগুলোর মধ্যে আরবী ভাষা অনেক সহজ। সামান্য উদ্যোগ নিলে মানুষের জন্য আরবী ভাষা শেখার সহজ পথ ও পন্থা বের করা সম্ভব। সঙ্গতকারণেই এবারের আন্তর্জাতিক আরবী ভাষা দিবসের দাবি হোক- মুসলিম দেশের শিক্ষার সর্বস্তরে আরবী ভাষার অন্তর্ভুক্তি।

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে