আফ্রিকার দেশে দেশে সুফী সাধকদের মাজারগুলো ভেঙে ফেলছে কট্টরপন্থী সালাফীরা


ইসলামের সুফী সাধকদের প্রাচীন মাজারগুলোর ওপর আক্রমণের ঘটনা উত্তর আফ্রিকার দেশে দেশে এখন অহরহই ঘটছে। আরববিশ্বে গণজাগরণ আর বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে এসব দেশ যখন নতুন পরিচয়ে আবির্ভূত হচ্ছে তখনই এ ধরনের হামলার ঘটনা বাড়ছে। আল-কায়েদা সমর্থিত কট্টরপন্থী সালাফীরা মিসর, মালি ও লিবিয়ার মাজারকেন্দ্রিক মসজিদগুলোকে তাদের হামলার শিকারে পরিণত করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
সংবাদদাতারা জানাচ্ছেন, ত্রিপোলির পুরনো অংশে এক ব্যস্ত সরুপথে অসংখ্য পথচারী আর ব্যবসায়ীর নিত্যদিনের ব্যস্ততা। লোকজন কেনাকাটা করছে। কিন্তু একই সাথে এখানে রয়েছে ভয়ের একটি আবহ। সম্প্রতি এখানে একজন সুফী সাধকের দুই সন্তান ও তাদের বন্ধুদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ে মারা হয়। একটি সম্ভাব্য হামলার হাত থেকে মসজিদ রক্ষায় সেসময় তারা তাদের মাজার সূফিয়ানা মসজিদের সামনে পাহারায় ছিলেন। গ্রেনেড হামলার চিহ্ন এখনো রয়েছে। সুফীবাদীদের একটি বাড়ি এখন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে এখানকার লোকজন বলছেন, রাতের বেলায় আক্রমণকারীরা এসে দরজায় এখনো লাথি মারে এবং কিছুক্ষণ অবস্থান করে তারা আবার চলে যায়।
সুফী সাধক আব্দুল্লাহ বানুন বলেন, আক্রমণকারীরা সুফীবাদের বিরোধী। তারা শুধু নিজেদের অবস্থান থেকেই বিবেচনা করে এবং তারা সবসময় মধ্যমপন্থার ইসলামের বিরুদ্ধে। এখানে আমাদের সুফীদের যতগুলো বাসস্থান রয়েছে তার সবগুলোতেই তারা হামলা চালিয়ে তছনছ করে দিয়েছে। তারা এসব দখলে নিয়ে এর ভেতরে বসে যা ইচ্ছা তাই করে। মূলত, তারা আমাদের মতকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আমরা আশা করি, সরকার সবার নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হবে।
লিবিয়ায় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় রয়েছে এবং শহরের ব্যস্ততম এলাকায় এক হলুদ রঙের ভবনে এর কার্যালয়। অবহেলিত এ ভবন থেকে রঙ খসে পড়ছে। লিবিয়ার মসজিদগুলোর প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা শেখ মাহমুদ সুমানী বলেন, সাম্প্রতিক যেসব হামলার ঘটনা ঘটেছে তা তাদের বিনা অনুমতিতে কিছু গ্রুপ চালিয়েছে। মাজার কিংবা মসজিদ ধ্বংস করা যাই বলুন না কেন, আমরা এসবের নিন্দা করি। আমরা শিগ্্গিরই একটি নির্দেশ জারি করতে যাচ্ছি যাতে করে মসজিদে কোন মৃত ব্যক্তির কবর দেয়া না হয় এবং সরকারি অনুমতি ছাড়া কবর আছে, এমন মসজিদ ধ্বংস করা না হয়। এমন ঘটনা ঘটলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জ করার অনুমতি থাকবে সরকারের।
কিন্তু ত্রিপোলির ব্যস্ততম সড়কে বড় বড় লোহা আর ইস্পাতের ভাঙা পাতসহ পড়ে থাকা ভাঙা কংক্রিটের টুকরো প্রমাণ করে এখানে আদর্শের এক সংঘাত চলছে। এখানকার আল-সাহাব মসজিদ বহু পুরনো এবং সুফীবাদীদের বেশ কিছু সাধকের কবর রয়েছে এর ভেতরে। গত আগস্ট মাসে কট্টরপন্থী সালাফীরা প্রকাশ্যে ভেঙে ফেলে এ মসজিদ। তাদের অভিযোগ, এখানে ইসলামবিরোধী কর্মকা- হচ্ছিল। মসজিদের সামনের রাস্তার ঠিক ওপারে একটি ক্যাফেতে বসে বিবিসিকে একজন লিবীয় নাগরিক বলেন, যখন তারা কবর ভাঙলো সঠিক হয়েছে, কি হয়নি তা বলব না। শুধু বলব, সরকারিভাবে হলে তা ঠিক হতো। তবে মসজিদ ভাঙা ঠিক হয়নি। আমি যখন শুনলাম মসজিদ ভাঙা হয়েছে তখন আমার খুব দুঃখ হয়। কারণ, এ তো আমাদেরই ইতিহাসের অংশ। আমার মনে হয়, কাজটি আল-কায়েদার। বাইরে থেকে নির্দেশ দিয়ে কাজটি করানো হচ্ছে।
ওদিকে শহরের পুরনো অংশে সুফী শেখের বাড়িতে নাগরিক অধিকার কর্মী আবদুল মোনেম স্পীতা বলেন, চরম পন্থায় লিবীয় তরুণরা যাতে আকৃষ্ট না হয়ে পড়ে সেজন্য যথার্থ কর্মসূচি প্রয়োজন। তিনি বলেন, আমরা জোর দিচ্ছি লিবীয়দের শিক্ষার মানোন্নয়ন করে তাদের মানসিকতার পরিবর্তনের ওপর। তরুণদের এখন কিছু করার নেই। কোথাও যাবার নেই। তাই তারা এসব চরমপন্থী কর্মকা-ে আকৃষ্ট হয়ে যায় সহজেই। তাদের আশার কথা শোনাতে হবে। তাদের জন্য অনেক কিছুই আমাদের করা দরকার যাতে তারা এ সংকট কাটাতে পারে।
মাজার ও মসজিদের ওপর সাম্প্রতিক এসব হামলার ঘটনায় কাউকে দায়ী করা হয়নি। লিবীয়রা বর্তমানে নানা ধরনের বিশ্বাস, মতামত, দাবি ও চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে তারা ধর্মের নামে যা হচ্ছে তার ভয়ে ভীত হলেও এমন বিশ্বাস পোষণ করেন যে, এসব সমস্যা অবশ্যই কেটে যাবে। সূত্র : বিবিসি।

Views All Time
2
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে