আফ্রিকার রাজা জার্জিসের কণ্যার ইসলাম গ্রহন!


হযরত উসমান যুন নুরাইন আলাইহিস সালাম
উনার শাসনকালে নীল ভূমধ্যসাগর তীরের ‘তারাবেলাস’ নগরী মুসলমানদের করতলগত হয়। কাফির রাজা জার্জিসের প্রধান নগরী ছিল এ এলাকা। সে সময় হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সা’দ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে সেনাপতি করে রাজা জার্জিসের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে পাঠান।
 
রাজা জার্জিস ১ লক্ষ ২০ হাজার সৈন্য নিয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবন সা’দ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর অগ্রাভিযানের পথ রোধ করে দাঁড়ালো। স্বয়ং রাজা জার্জিস তার বাহিনী পরিচালনা করছিল। পাশে রয়েছে তার সুন্দরী মেয়ে হেলেন। অত্যন্ত খুবছুরত ছিলো তার সে মেয়ে। আশ্চর্যের কথা হল, হেলেন ছিলো সাহসিনী ও বীরযোদ্ধা। যুদ্ধক্ষেত্রে বড় বড় বীরের সাহস তার কাছে ম্নান হয়ে যেত।তাই প্রতিটি রাজপুত্র,ও সকলের অভিলাষ ছিল তার নৈকট্য অর্জন ও বিশ্বাসভাজন হয়ে যেকোন মূল্যে শাহজাদিকে লাভ করা।
 
যুদ্ধ শুরু হল,
প্রথমদিন আসর পর্যন্ত যুদ্ধ হল।
এখানে কাফেরদের বিশ হাজার সৈন্য নিহত ও ছয় হাজার আহত হল।
পক্ষান্তরে মুসলিম জামাতের দু’শজন আহত ও একশ ষাট জন শহীদ হলেন।
এ অবস্থা দেখে রাজা জার্জিস ভীষণ ভাবে ঘাবড়ে গেল। সে যুদ্ধে নামার সাহস পেল না।
এ পরিস্থিতিতে, সৈন্যদের মাঝে যুদ্ধের মনোবল ফিরিয়ে আনার জন্য রাজা ও তার পুরোহিত পরামর্শ করে ঘোষনা দিল,
“যে বীরপুরুষ মুসলিম সেনাপতি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সা’দ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার ছিন্ন মস্তক নিয়ে আসতে পারবে, শাহজাদী হেলেনকে তার সাথে বিয়ে দেওয়া হবে”।
এ অবস্থায়,মুসলিম সেনাপতি হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে সা’দ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ভাবলেন মুসলিম মুজাহিদদের আরো উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন।
 
তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হযরত যুবায়ের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সাথে পরামর্শ করে পাল্টা ঘোষনা দিলেন,
“যে বীর রাজা জার্জিসের ছিন্ন মাথা আনতে পারবে, তাকে জার্জিসের সুন্দরী কন্যাসহ একলক্ষ দিনার বকশিশ দেওয়া হবে”।
 
আবার যুদ্ধ শুরু হল।
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে যুবায়ের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু খৃষ্টান বাহিনীকে ছত্র ভঙ্গ করে জার্জিসের রক্ষা বাহিনীর সম্মুখে গিয়ে বজ্রকন্ঠে বললেন,
” হে আফ্রিকার দাম্ভিক রাজা!
সাহস থাকে তো বীরের মত এসে যুদ্ধ কর!
জার্জিস ও বাহাদুর ছিল, সে তলোয়ার নিয়ে লাফিয়ে আক্রমন করে বসল।হযরত ইবনে যুবায়ের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু দক্ষতার সাথে হামলা রুখে পাল্টা হামলা চালালেন।
কিন্তু সে কিছুতেই পেরে উঠতে পারছিল না।
হযরত ইবনে যুবায়ের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার কঠিন আঘাতে তার মস্তক দিখন্ডিত হল।
এ অবস্থা দেখে সহ্য করতে না পেরে “হেলেন প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ঝাপিয়ে পড়লো।
 
তিনি আঘাত প্রতিহত করতেই দেখলেন “সে এক নারী!
রণ সাজে সজ্জিত থাকায় তিনি প্রথমে হেলেনকে চিনতে পারেন নি।
তিনি সাথে সাথে দৃষ্টিকে সংযত করলেন এবং তরবারি নামিয়ে নিলেন ও বললেন ইবনে যুবাইরের তলোয়ার কোন নারীর গায়ে উঠতে পারে না।
হেলেন দেখলেন কে সে এ যুবক?
 
জার্জিস নিহতের সংবাদ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল এবং সেই সাথে মুসলমানদের হাতে বন্দি হলো রাজার সুন্দরী কন্যা “হেলেন।
 
অতপর, সিপাহসালার(সেনাপতি) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সা’দ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সকল সাহাবাদের ডেকে ঘোষনা করলেন” আপনাদের মাঝে যিনি জার্জিসকে হত্যা করেছেন, তিনি আসুন ও পুরস্কার গ্রহন করুন।
সবাই নিরব।
সেনাপতি হযরত সা’দ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বারবার আহ্বান জানিয়েও ব্যর্থ হলেন। এই অভূতপূর্ব ব্যাপার দেখে বিস্ময়ে হতবাক হলেন জার্জিস দুহিতাও।
তিনি দেখতে পাচ্ছেন তার পিতার হত্যাকারীকে। কিন্তু তিনি দাবি নিয়ে আসছেন না , টাকার লোভ, সুন্দরী কুমারীর মোহ তিনি উপেক্ষা করছেন। এত বড় স্বার্থকে উপেক্ষা করতে পারে জগতের ইতিহাসে এমন যোদ্ধা-জাতির নাম তো কখনো শুনে নি সে । পিতৃহত্যার প্রতি তার যে ক্রোধ ও ঘৃণা ছিল, তা যেন মুহূর্তে কোথায় অন্তর্হিত হয়ে গেল। অপরিচিত এক অনুরাগ এসে সেখানে স্থান করে নিলো।
অবশেষে সেনাপতির আদেশে জার্জিস দুহিতাই হযরত যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে দেখিয়ে দিলেন। বললেন, “ইনিই আমার পিতাকে হত্যা করেছেন, ইনিই আপনার জিজ্ঞাসিত মহান বীর পুরুষ।”সেনাপতি হযরত সা’দ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হযরত যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনাকে অনুরোধ করলেন ঘোষিত উপহার গ্রহণ করার জন্য।
 
হযরত যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “জাগতিক কোনো লাভের আশায় আমি জিহাদ করিনি। যদি কোনো পুরস্কার আমার প্রাপ্য হয় তাহলে আমাকে পুরস্কৃত করার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা তিনিই যথেষ্ট ।”
 
(সুবহানাল্লাহ)
 
পরবর্তীতে মুসলিম সাহাবী হযরত ইবনে যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার চারিত্রিক সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে হেলেস ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে এবং নিজ পিতার হন্তারককে নিজ ইচ্ছায় বিয়ে করেন।
 
উল্লেখ্য যে, হযরত উসমান যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম তিনি পবিত্র যিলহজ্জ মাসের ১৮ তারিখ শাহাদাত মুবারক গ্রহণ করেন। উনার খিলাফতকালে পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার নিশানা আরব সাগর পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়। অপরদিকে আফ্রিকার শেষ সীমানা পেরিয়ে যায় এবং ইউরোপের সাইপ্রাসেও পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার আলো মুবারক ছড়ায়। এছাড়া হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার অসমাপ্ত অভিযানগুলো তিনি সম্পূর্ণ করেন। উনার মুবারক পৃষ্ঠপোষকতায় আমুরিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো, ফিবরাস, জুরজান, খোরাসান, হিরাত, কাবুল, সিজিস্তান, নিশাপুর, হিসনুর রুয়াত এবং ত্রিপলীসহ আফ্রিকার অধিকাংশ এবং এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল ইসলামী খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে