আমরা কোথায় যাচ্ছি!!!!!!!!


সন্ধ্যা ছয়টা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক তালগাছের নিচে গিয়ে বসে দুই যুবক-যুবতী। কিছুক্ষণ ঘনিষ্ঠভাবে বসে তারা। এরপর যুবকটি একটি সিগারেট ধরায়। টানে আপন মনে। যুবতী সাইড ব্যাগ থেকে এক বোতল ফেনসিডিল বের করে। একটানে খেয়ে ফেলে অর্ধেক। বাকি অর্ধেক তুলে দেয় যুবকের হাতে। যুবতী কিছুক্ষণ মাথা কাত করে শুয়ে থাকে যুবকের কোলে। প্রায় আধাঘণ্টা পর উঠে পরে দু’জন। যু্‌বকটি মোটরসাইকেল স্টার্ট দেয়। যুবকের পেছনে বসে ওই যুবতী। মোটরসাইকেল একটানে পৌঁছে যায় শামসুন্নাহার হলের গেটে। যুবতী হলের ভেতর ঢুকে পরে। যুবকটি মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে চলে আসে টিএসসির দিকে।

রাত আটটা। শাহবাগের ‘ছবির হাটে’র পাশে চলছে বাউল গানের আসর। এর কিছু দূরে দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে দুই যুবতী ও এক যুবক। যুবকটি সিগারেটের ভেতর গাঁজা ঢুকিয়ে তুলে দেয় যুবতীর হাতে। তিনজনই আপন মনে টানে গাঁজাভর্তি সিগারেট। অনেকক্ষণ বুঁদ হয়ে বসে থাকে তিনজন। তাদের কিছু দূরে বসে থাকা একজন জানান, এরা তিনজনই চারুকলার শিক্ষার্থী। এরা গাঁজা খেয়ে ধ্যান করে, গল্প করে চলে যায়।

সূত্র জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, টিএসসি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চারুকলার আশপাশ এলাকায় প্রায়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের মাদক সেবন করতে দেখা যায়। প্রেমে ব্যর্থতা, পারিবারিক কলহ, অন্যের দ্বারা প্রভাবিত ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে এরা মাদকের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। আবার অনেকে শখের বশে ও বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে অতিআধুনিক সাজতে গিয়েও মাদকের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে।

ঢাকা বিশববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল, রোকেয়া হল ও বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে প্রায়ই তাদের হলের ছাদে, বাথরুমে, বারান্দায়, সিগারেটের প্যাকেট, ফেনসিডিলের খালি বোতল ও গাঁজার পোটলা পাওয়া যায়।

শামসুন্নাহার হলের এক ছাত্রী জানান, মাদকাসক্ত বেশির ভাগ ছাত্রী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সাধারণ ছাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কিংবা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে নেশাগ্রস্ত হচ্ছে। আরেক ছাত্রী বলেন, পলিটিক্যাল মেয়েদের কাছে হলের সাধারণ ছাত্রীরা অসহায়। এরা প্রকাশ্যে মাদক সেবন করলে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।
রোকেয়া হলের এক ছাত্রী বলেন, হলের আবাসিক শিক্ষক ছাত্রীদের মাদক সেবন সম্পর্কে অবগত হলেও বাইরের জানাজানির ভয়ে তারা কোন তথ্য ফাঁস করতে চান না। এছাড়া মাদকাসক্ত অনেক ছাত্রী রাজনীতিতে জড়িত থাকায় আবাসিক শিক্ষকরা তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়ার সাহস পান না।

সূত্র মতে- শামসুন্নাহার হলের দুই নেত্রী, রোকেয়া হলের দুই নেত্রী ও বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের এক নেত্রী ছাত্রীদের মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের শেল্টার দিচ্ছে কেন্দ্রীয় এক নেত্রী ও একাধিক ছাত্রনেতা। ওই সিন্ডিকেট বিভিন্ন আবাসিক ছাত্রী হল, চারুকলা ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে সুলভে মাদকদ্রব্য পৌঁছে দিচ্ছে। রোকেয়া হলভিত্তিক একটি সিন্ডিকেট পাশের ইডেন মহিলা কলেজ, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, ও বদরুন্নেসা কলেজে মাদক বিক্রি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের সহযোগিতা করে হলগুলোর একাধিক মহিলা কর্মচারী।
ক্যাম্পাসে মেয়ে মাদকসেবীদের মধ্যে বেশির ভাগ চারুকলারই ছাত্রী। তারা প্রকাশ্যে চারুকলার সামনে ও আবাসিক হলে মাদক সেবন করে। তাদেরকে চারুকলার ভিতর ও বাইরে ছেলেবন্ধুর গায়ে হেলান দিয়ে বসে সিগারেট ও গাঁজা সেবন করতে প্রায়ই দেখা যায়।

চারুকলার একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছে, নেশাকে এখানে প্রগতিশীলতা বলে গণ্য করা হয়। এখানে কেউ বাধা দেয় না। সন্ধ্যার পর চারুকলায় ব্যাপক আকারে বসে মাদকের আড্ডা। গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাদকের আড্ডা। সন্ধ্যার পর চারুকলার নির্দিষ্ট আইডি কার্ডধারী ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করতে না পারায় অনেকটা নিরাপদেই চলে মাদক সেবনের আসর।
সূত্র জানায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, গাউসুল আজম মার্কেট, চানখাঁরপুল, বকশীবাজার মোড়, আজিমপুর মেটার্নিটি হাসপাতাল, আজিমপুর কলোনি এলাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বর, ঢাকা মেডিকেল কলেজের গেইট, শহীদ মিনার, টিএসসি সংযোগ সড়কসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি স্থানে সন্ধ্যার পর থেকে মাদক বিক্রি হয়। রিকশাচালক, চা বিক্রেতা এবং বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে বিক্রি করা হয় মাদকদ্রব্য।
ওদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের একটি সূত্রে জানা গেছে, ইদানীং বিভিন্ন কারণে অনেক ছাত্রী মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। তবে তারা যাতে মাদকের প্রতি আসক্ত না হয়ে পড়ে সেজন্য আবাসিক শিক্ষকরা নিয়মিত মনিটরিং করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, ব্যক্তিগত হতাশা থেকে মুক্তি পেতেই মেয়েরা নেশার জগতে পা বাড়াচ্ছে। অনেক মেয়ে প্রেমে ব্যর্থ হলে মনে করে তার সব শেষ হয়ে গেছে। তখনই আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে মাদক সেবন বা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। অবসর সময়ে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজে ব্যস্ত থাকলে এ ধরনের হতাশা অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের রমনা সার্কেলের পরিদর্শক ওসমান কবির বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আমরা অনেক সময় মাদক সেবন অবস্থায় দেখি। শিক্ষাজীবন ব্যাহত হবে দেখে আমরা তাদের বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা নিই না।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+