আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার খিলাফতকালীন চিকিৎসা ব্যবস্থা


আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি উনার সম্মানিত খিলাফতকালীন সময় জনসাধারণ ও সৈন্যগণ উনাদের স¦াস্থ্য বিষয়ে পরিপূর্ণ মনোযোগী ছিলেন। স্বাস্থ্য রক্ষা করা যে পবিত্র সুন্নত ও ফরয উনাদের অন্তর্ভুক্ত, তা তিনি উম্মত উনাদের শিক্ষা দিয়েছেন, ইহসান মুবারক করেছেন।
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি প্রতিটি প্রদেশ, শহর, এলাকায় সম্মানিত খিলাফত উনার ধারায় চিকিৎসালয় স্থাপন করেন এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসকের ব্যবস্থা করেছিলেন। এ সমস্ত চিকিৎসালয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পরিপূর্ণ চিকিৎসা সেবার নিশ্চয়তা তিনি নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সম্পর্কে উম্মত উনাদের জন্য কায়িনাতের জন্য কতটুকু ইহসান করেছেন তা মুজাহিদ/সৈন্য উনাদের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন তা উল্লেখ করলে উম্মত/কায়িনাতের বুঝতে সুবিধা হবে।
(১) মৌসুম অনুযায়ী মুজাহিদ/সৈন্য চালনা: কোনো দেশে মুজাহিদ/সৈন্য প্রেরণের সময় তথাকার ঋতু ও আবহাওয়ার প্রতি লক্ষ্য রেখে মুজাহিদ/সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করতেন। শীতপ্রধান দেশগুলোতে গ্রীষ্মকালে ও গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে শীতকালে মুজাহিদ/সৈন্য প্রেরণ করতেন। তদানীন্তন সম্মানিত আরব উনাদের পরিভাষায় এ ব্যবস্থাকে ‘শাতীয়া’ এবং ‘সাফীয়া’ বলা হতো। আজ পর্যন্ত এ শব্দ মুবারকদ্বয় ব্যবহার করতে দেখা যায়। এমনকি পাশ্চাত্যের ইতিহাসবিদরা এ শব্দ মুবারকদ্বয় বর্তমানে ব্যবহার করে থাকে। অভূতপূর্ব ইলমে লাদুন্নীপ্রাপ্ত এ সমরকৌশল আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি হিজরী ১৭ সনে প্রবর্তন করেন। উনার এ ব্যবস্থা গ্রহণের পিছনে কি হিকমত রয়েছে, তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। শুধু মানুষ যেন, কায়িনাত যেন, উম্মত যেন বুঝতে পারে তার জন্য কিছু ব্যাখ্যা করার কোশেশ করবো। আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার এ সমরকৌশল উনার মাঝে স্বাস্থ্যগত অসীম ইলম তিনি আমাদের জন্য হাদিয়া করেছেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি শীতপ্রধান দেশে গ্রীষ্মকালীন সময়ে মুজাহিদ/সৈন্য প্রেরণ করতেন। এটা খুব ফিকিরের বিষয়। শীতকালীন দেশের সৈন্যরা শীতে অভ্যস্থ থাকতো এবং শীতও লম্বা সময় থাকতো। কিন্তু যখন ওই দেশে গ্রীষ্মকালীন সময় আসতো তখন তা স¦ল্প সময়ের জন্য থাকতো এবং নাতিশীতোষ্ণ থাকতো। যদি বর্তমানে আমরা ইংল্যান্ড/রাশিয়ার কথা ধরি তাহলে দেখি এসব দেশে শীত প্রচুর ও লম্বা সময় ধরে থাকে। কিন্তু গ্রীষ্মকাল থাকে অল্প সময়ের জন্য। আবার সম্মানিত আরবে শীতও বেশি, গরমও বেশি। ফলে শীতকালীন দেশে যখন গ্রীষ্মকালীন সময়ে মুজাহিদ প্রেরণ করতেন তখন মুজাহিদ উনাদের ওই পরিবেশের সাথে শরীরিকভাবে খাপ খাইতে সমস্যা হতো না এবং স¦াস্থ্যগত সমস্যার উদ্ভব হতো না, গ্রীষ্মপ্রধান দেশে শীতকালীন সময়ে মুজাহিদ প্রেরণের বিষয়টিও একই। মুজাহিদ/সৈন্য উনাদের সুন্নতী লেবাস মুবারকও সে অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি পরাজয়ের অন্যতম কারণের মধ্যে একটি কারণ এই যে, তারা শীতপ্রধান দেশে গরমের পোশাক ও গ্রীষ্মপ্রধান দেশে শীতকালীন পোশাক প্রেরণ করে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলো ও আবহাওয়ার চিন্তা না করেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলো। বর্তমানেও দেখা যায়, সন্ত্রাসী ন্যাটো বাহিনী আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন মুসলিম দেশে আক্রমণ করতে যেয়ে বিপর্যস্ত হচ্ছে। তাহলে এই একটি মাত্র উদাহরণ দিয়ে বুঝা যায়, বর্তমানে কথিত আধুনিক সভ্যতা যা চিন্তাও করতে পারেনি তা আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি ১৪০০ বছর পূর্বেই উম্মতকে শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!
(২) বসন্তকালে মুজাহিদ উনাদের অবস্থান: বসন্তকালে মুজাহিদ উনাদের এমন স্থানে প্রেরণ করা হতো যেখানকার আবহাওয়া উত্তম, স¦াস্থ্যপ্রদ ও ভূমি শস্য-শ্যামলা থাকতো। হিজরী ১৭ সনে মাদায়েন জয় হওয়ার পর যখন সেখানকার আবহাওয়ায় মুজাহিদ উনাদের স¦াস্থ্য ভেঙে পড়ছিলো, তখন এ নিয়ম প্রবর্তন করা হয়। আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি সেনাপতি হযরত উতবা ইবনে গাযওয়ান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে ফরমান মুবারক পাঠিয়েছিলেন যে, ‘বসন্ত ঋতুতে সর্বদা মুজাহিদগণ উনাদের উত্তম আবহাওয়া এবং ফলমুলের এলাকায় পাঠিয়ে দিবেন।” মিশরের গভর্নর হযরত আমর ইবনুল আস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি সর্বদা গ্রীষ্ম ও বসন্তকালে মুজাহিদ উনাদের বাইরে পাঠিয়ে দিতেন এবং নির্দেশ মুবারক দিতেন যেন উনারা বন-জঙ্গলে শিকার করে বেড়ান এবং উন্মুক্ত মাঠে ঘোড়া চরান।”
(৩) সেনানিবাসের আবহাওয়া: সেনানিবাস এবং ছাউনী সর্বত্রই উৎকৃষ্ট আবহাওয়াপূর্ণ স্থানে তৈরি করা হতো এবং ছাউনীর সম্মুখে বিস্তীর্ণ খোলা ময়দান রাখা হতো। কুফা, বসরা, ফুসতাত প্রভৃতি যে শহরগুলো বিশেষ করে সেনাবাহিনীর জন্যই তৈরি করা হয়েছিলো, সেগুলোর রাস্তা, নর্দমা বড় ও প্রশস্ত করে বানানো হতো। আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি স¦য়ং প্রত্যেকটি রাস্তা ও গলির পরিমাণ ঠিক করে দিতেন। সুবহানাল্লাহ!
(৪) বিশ্রাম: কোথাও মুজাহিদ প্রেরণের সময় বিশেষভাবে নির্দেশ মুবারক দেয়া হতো যেন যাত্রাপথে মুজাহিদগণ প্রতি জুমুয়াবার দিন কোথাও পূর্ণ একদিন ও একরাত বিশ্রাম করে এবং পোশাক-পরিচ্ছদ ও অস্ত্র-শস্ত্র গুছিয়ে নেন। বিশেষ করে প্রতিদিন যেন ততটুকু পথ চলেন যাতে কারো মাঝে ক্লান্তি না আসে। শিবির স্থাপন করার সময় স্থান দেখে তাবু স্থাপন করা হয় এবং যেখানে সর্বপ্রকার প্রয়োজনীয় বস্তু বিশেষ করে প্রাকৃতিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়।
(৫) স্বাস্থ্যসম্মত খাবার: আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি যেমন স¦াস্থ্যকর আবহাওয়া অনুযায়ী মুজাহিদ বাহিনী প্রেরণ করতেন, তেমনি উনাদের খাদ্যের উপরও তিনি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতেন। মুজাহিদগণ যাতে সুষম ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পেতে পারেন তিনি তার পূর্ণ ব্যবস্থা করেন।
(৬) চিকিৎসক নিয়োগ: আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি প্রত্যেক সৈন্য বিভাগের সহিত কিছু সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ দিতেন। ফলে স্বাস্থ্যগত কোনো সমস্যা উদ্ভব হলে তার তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো।
সর্বোপরি আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সম্পর্কিত যে শিক্ষা উম্মত, কায়িনাতকে হাদিয়া দিয়েছেন তা ক্বিয়ামত পর্যন্ত উম্মত-কায়িনাতের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়। সুবহানাল্লাহ!

Views All Time
1
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে