আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, আশিদ্দাউল আলাল কুফফার হযরত ফারূক্বে আলাইহিস সালাম উনার সাথে সংশ্লিষ্ট কতিপয় নছীহতমূলক ঘটনা


লোকটি সিরিয়ার অধিবাসী। যুদ্ধের ময়দানে তার গর্জন ছিল সিংহের মতো। এমনকি এক হাজার অশ্বারোহীর চেয়েও তার চিৎকার ছিল ভয়ঙ্কর। তার জ্বালাময়ী ভাষণে সৈন্যরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তো। সে আমীরুল মু’মিনীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার পক্ষে কাজ করতো, কিন্তু আমীরুল মু’মিনীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি কয়েকদিন উনাকে দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, অমুকের ছেলে অমুক কোথায়?
বলা হলো, হে আমীরুল মু’মিনীন! সে নেশা পানে ব্যস্ত আছে।
এ সংবাদ শুনে আমীরুল মু’মিনীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি উনার পত্র লেখককে ডাকলেন। তিনি তাকে বললেন, লিখুন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার পক্ষ থেকে অমুকের ছেলে অমুকে প্রতি। আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমি আপনার নিকট সে মহান আল্লাহ পাক উনার প্রশংসা করছি যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, যিনি অপরাধ ক্ষমাকারী, তওবা কবুলকারী, কঠিন শাস্তিদাতা, বিশাল ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই, উনার নিকট সকলের প্রত্যাবর্তনস্থল। এরপর তিনি উনার সঙ্গীদের বললেন, আপনারা মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে দোয়া করুন, তিনি যেনো তার অন্তরকে পরিবর্তন করেন এবং উনার তওবা কবুল করেন।
যখন লোকটির কাছে আমীরুল মু’মিনীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার চিঠি পৌছলো তখন লোকটি চিঠিটি বার বার পাঠ করতে লাগলো আর বলতে লাগলো, তিনি অপরাধ ক্ষমাকারী, তওবা কবুলকারী, কঠিন শাস্তিদাতা, বিশাল ক্ষমতার অধিকারী। এরপর সে কান্না শুরু করলো। এত বেশি কাঁদলো যে, তার দাড়ি ভিজে গেল। এরপর আর কখনো উনাকে নেশা পান করতে দেখা যায়নি। এটি ছিল আমীরুল মু’মিনীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার দোয়া মুবারক উনার বরকত মুবারক। সুবহানাল্লাহ! (তাফসীরে ইবনে কাছীর ৪র্থ খ-, ৭০ পৃষ্ঠা)
(২)
একদিন আমীরুল মু’মিনীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি শেষ রাতে বের হয়ে পবিত্র মদীনা শরীফ উনার গলিতে হাঁটছিলেন। তখন উনাকে হযরত ত্বালহা বিন উবায়দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু দেখতে পেলেন। হযরত ত্বালহা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জান্নাত উনার সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ জনের একজন। অর্থাৎ আশারায়ে মুবাশশারা। তিনি আমীরুল মু’মিনীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার পিছনে পিছনে গেলেন। তিনি দেখলেন আমীরুল মু’মিনীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি ছোট একটি ঘরে প্রবেশ করলেন। এরপর তিনি সেখান থেকে ফিরে এলেন। সকাল হওয়ার পর হযরত ত্বালহা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি সে বাড়িতে গেলেন। গিয়ে দেখলেন এক অন্ধ বৃদ্ধা মহিলা বসে আছে। সে মহিলা হাঁটতে পারে না। তিনি ওই মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, গত রাতে যিনি এসেছিলেন, তিনি কেন আপনার কাছে এসেছেন?
মহিলা বললো, তিনি অমুক দিন থেকে আমার সেবা করেন এবং আমার থেকে কষ্টকর বস্তু দূর করেন, আমার প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দেন এবং আমার দেখাশোনা করেন। তখন হযরত ত্বালহা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বললেন যে, পৃথিবীতে আমীরুল মু’মিনীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার মতো আর কেউ নেই। সুবহানাল্লাহ! (হিলইয়াতুল আউলিয়া ১ম খ-, ৪৮ পৃষ্ঠা)
(৩)
হিমসবাসীদের জন্যে যে আমীরই নিয়োগ দেয়া হয়েছে তারা উনার বিরুদ্ধেই অভিযোগ করেছে। আর তাই আমীরুল মু’মিনীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি হিমসবাসীদের জন্যে একজন যোগ্য আমীর খুঁজতে লাগলেন। অবশেষে পেয়েও গেলেন। তিনি তাদের আমীর হিসেবে হযরত উমাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে নিযুক্ত করলেন।
হযরত উমাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি হিমসে এক বছর শাসন করলেন। উনার শাসন আমলে উনার বিরুদ্ধে খলীফা উনার কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। সুবহানাল্লাহ!
কিন্তু তিনি এ এক বছরে বায়তুল মালে একটি দিনারও প্রেরণ করেননি। আর এ কারণে আমীরুল মু’মিনীন হযরত হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখতে লাগলেন। তিনি ভয় করলেন যে, উনার গভর্ণরকে না জানি দুনিয়ার লোভ পেয়ে বসলো।
তিনি কাতিব (পত্র লেখক)কে নির্দেশ মুবারক দেন, আপনি হযরত উমাইর বিন সা’দ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে চিঠি লিখে বলুন যে, তিনি যেনো আমার চিঠি পাওয়ার সাথে সাথে আমার নিকট এসে হাযির হন এবং সাথে করে মুসলমানদের থেকে আদায়কৃত সকল ফাই (এক প্রকারের কর) নিয়ে আসেন।
হযরত উমাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি সম্মানিত খলীফা উনার চিঠি পাওয়ার পর পবিত্র মদীনা শরীফ উনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। তিনি সাথে করে উনার সফরের সামান্য পাথেয় নিলেন। তিনি কাধে করে উনার পানপাত্র ও অযুর পাত্রটি নিলেন এবং হাতে বর্শাটি নিলেন। এরপর তিনি হিমস নগরী ত্যাগ করে পবিত্র মদীনা শরীফ উনার দিকে রওয়ানা হন।
দীর্ঘ সফরের কারণে উনার চেহারা মুবারক ফ্যাকাশে হয়ে গেছে এবং উনার চুল মুবারক অনেক লম্বা হয়ে গেছে। উনার শরীর মুবারকে সফরের ক্লান্তি চলে এসেছে।
হযরত উমাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি খলীফা উনার কাছে আসলেন। আমীরুল মু’মিনীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি উনার অবস্থা দেখে অবাক হয়ে বললেন, হে হযরত উমাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! আপনার এ অবস্থা কেন?
তিনি বললেন, হে হযরত আমীরুল মু’মিনীন আমার কিছুই হয়নি। আমি সুস্থ আছি। আমি আমার সাথে দুনিয়াকে পুরোপুরিভাবে নিয়ে এসেছি।
আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, আপনার সাথে কি পরিমাণ দুনিয়া (অর্থকড়ি) আছে? আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি ধারণা করেছেন হয়তো তিনি টাকা-পয়সা নিয়ে এসেছেন।
হযরত উমাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বললেন, আমার সাথে আমার থলিটি আছে, এর মধ্যে আমি আমার পাথেয় রেখেছি। আর আমার সাথে একটি পাত্র আছে যার মধ্যে খাদ্য রেখে খাই এবং গোসল ও কাপড় ধোয়ার সময় তা ব্যবহার করি। আর আমার কাছে আমার অযু করার পাত্রটি আছে। এ হচ্ছে আমার দুনিয়া। এর অতিরিক্ত কিছুই আমার প্রয়োজন নেই এবং অন্য কারোও প্রয়োজন নেই। সুবহানাল্লাহ! (ছুওয়ারুম মিন হায়াতিছ ছাহাবা)
(৪)
একদিন গভীর রাতে আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি উনার খাদিমকে নিয়ে প্রজাসাধারণের খোঁজ খবর নেয়ার জন্যে বের হলেন। তিনি চলতে চলতে এক সময় পাশের একটি দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। ঠিক সে সময় এক মহিলার কণ্ঠস্বর উনার কান মুবারকে গিয়ে পৌঁছলো। মহিলাটি উনার মেয়েকে বলছে, হে মেয়ে! তুমি দুধের সাথে পানি মিশিয়ে দাও। মেয়ে মাকে বললো, মা! আপনি বর্তমান আমীরুল মু’মিনীন উনার নির্দেশ মুবারক জানেন না? তিনি উনার লোককে ঘোষণা দিতে বলেছেন, “দুধের সাথে যেনো কেউ পানি না মিশায়।”
মা বললেন, তুমি দুধের সাথে পানি মিশিয়ে দাও। কেননা তুমি তো এমন জায়গায় আছ যেখানে আমীরুল মু’মিনীন তিনি এবং উনার ঘোষক তোমাকে দেখছেন না।
মেয়ে বললো, মা! খলীফাতুল মুসলিমীন তিনি আমাদেরকে দেখছেন না ঠিক, কিন্তু উনার রব তিনি তো দেখছেন। মহান আল্লাহ পাক উনার শপথ! আমি তো এমন নই যে, প্রকাশ্যে উনার আনুগত্য করবো আর গোপনে অবাধ্য হবো।
আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি এতক্ষণ যাবত মা ও মেয়ের কথোপকথন শুনছিলেন। অতঃপর তিনি উনার খাদিমকে বললেন, এ দরজা ও জায়গা ভালোভাবে চিনে রাখ। তারপর উনারা ফিরে গেলেন।
পরের দিন সকালে আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি উনার খাদিমকে বললেন, গতরাতের ঐ বাড়িতে গিয়ে দেখ, কথাগুলো কে বলেছে আর কাকে বলেছে এবং তাদের কোনো অভিভাবক আছে কিনা।
খাদিম বাড়িতে গিয়ে জানতে পারলেন, গত রাতের কথাগুলো এক কুমারী মেয়ে তার মাকে বলেছিলেন। তাদের কোনো অভিভাবক নেই।
আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার আওলাদ উনাদেরকে ডেকে একিত্রত করে বললেন, আপনাদের মধ্যে কেউ কি শাদী করতে চান?
তখন উনার ছেলে হযরত আব্দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বললেন, আমার একজন আহলিয়া আছেন। উনার আরেক ছেলে হযরত আব্দুর রহমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বললেন, আমারও একজন আহলিয়া আছেন। তখন উনার আরেক ছেলে হযরত আছিম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বললেন, হে আমার সম্মানিত পিতা! আমার কোনো আহলিয়া নেই, আপনি চাইলে আমাকে শাদী করাতে পারেন। আর তখন হযরত আছিম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সেই মেয়েটিকে নিজের আহলিয়া হিসেবে গ্রহণ করলেন। পরে সেই মেয়ে উনার ঘরে উম্মে আছিম নামে এক মেয়ে বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। উনাকে আব্দুল আযীয বিন মারওয়ান নিকাহ করেন। উনাদের ঘরেই হযরত উমর বিন আব্দুল আযীয রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। সুবহানাল্লাহ! (তবাক্বাতুল কুবরা ৫ম খ-, ৩৩০ পৃষ্ঠা)

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে