আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার বেমেছাল মহানুভবতা


সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র খিলাফতকাল। তখন ইরানের একটি প্রদেশের শাসক ছিলেন হযরত হরমুজান রহমতুল্লাহি আলাইহি (তিনি তখনো পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করেননি)। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে হযরত হরমুজান রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি একদিকে যেমন অত্যাচারী, অপরদিকে ঘোর ইসলাম বিরোধী ছিলেন। মুসলমানদের সাথে উনার লড়াই হতো প্রায়ই। লড়াইয়ে পরাজিত হলেই তিনি বিভিন্ন শর্তে সন্ধি করতেন এবং নিজের রাজ্যে ফিরে যেতেন। কিন্তু এরপর আবার যখনই সুযোগ পেতেন মুসলমানদের ক্ষতিসাধন করেতেন।
শেষে আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি আদেশ দিলেন, হযরত হরমুজান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে জীবন্ত ধরে এনে উনার দরবারে হাজির করতে। ইতোমধ্যে এক যুদ্ধে হযরত হরমুজান রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মুসলমানগণের হাতে বন্দি হলেন। আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার হুকুম মোতাবেক তাকে বেঁধে খলীফা উনার দরবারে হাজির করা হলো।
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনাকে লক্ষ্য করে বললেন, “আপনি আমাদের সাথে বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, আর আপনার বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই আমাদের বারবার যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। ফলে অসংখ্য মুসলিম সৈন্যকে অযথা প্রাণ দিতে হচ্ছে। তাদের অর্থ-সম্পদ নষ্ট হয়েছে। অনেকের ঘর-বাড়ি আপনি ধ্বংস করেছেন। নিরীহ অনেক লোকের উপর আপনি অন্যায়ভাবে অত্যাচার চালিয়েছেন। আপনাকে আর সুযোগ দেয়া যায় না। আপনার একমাত্র শাস্তি হলো মৃত্যুদ-। মৃত্যুদ- কার্যকর করার পূর্বে আপনার কোনো কথা থাকলে বলতে পারেন।”
হযরত হরমুজান রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ছিলেন খুব সূক্ষ্মবুদ্ধির লোক। তিনি বললেন, “মহানুভব আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম! আমার বড়ই পিপাসা পেয়েছে, দয়া করে আমাকে একটু পানি পান করতে দিন।”
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার নির্দেশ মুবারকে তাকে একটি পাত্রে পানি পান করতে দেয়া হলো। হযরত হরমুজান রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি তখন পানির পাত্র হাতে নিয়ে তা পান না করে ভীতু ভীতু ভাব দেখাতে লাগলেন এবং ডানে বামে তাকাতে লাগলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, “কি হলো, আপনি পানি পান করছেন না কেন?” তিনি জবাব দিলেন,” আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম! আমার ভয় হচ্ছে যে, পানিটুকু পান করার আগেই আমাকে হত্যা করে ফেলা হয় কিনা?”
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, “আপনি নির্ভয়ে পান করুন। হাতের পানি পান করার পূর্বে আপনাকে হত্যা করা হবে না। এ ব্যাপারে আপনাকে নিশ্চয়তা দিলাম।”
হযরত হরমুজান রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার এ কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই হাতের পানির পাত্রটি মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন; আর বললেন, “মহামান্য খলীফা, আপনি নিজেই বলেছেন, হাতের পানিটুকু পান করার আগে আমাকে হত্যা করবেন না। আমি পানি ফেলে দিয়েছি, সে পানি আর পান করবো না। ওয়াদা অনুযায়ী আপনিও আমাকে আর হত্যা করতে পারবেন না।”
হযরত হরমুজান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার এ কথা শুনে মুসলিম সৈনিকেরা খুব রেগে গিয়ে বললেন, “আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম! আপনি অনুমতি দিন আমরা এখনই তার চাতুরীর সাধ মিটিয়ে দেই। তাকে এখনই হত্যা করে ফেলবো।”
কিন্তু খলীফা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি সকলকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “না, তা হতে পারে না। মুসলমানের কথার মূল্য অনেক। সুতরাং যে কথা আমি বলে ফেলেছি, যেকোনো মূল্যে আমি তা রক্ষা করবোই ইনশাআল্লাহ। যেহেতু আমি তাকে বলেছি, তার হাতের পানিটুকু পান করার পূর্বে তাকে আমি হত্যা করবো না, আর সে যখন পানি পান করেনি, সুতরাং বন্দি হযরত হরমুজান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে হত্যা করা চলবে না।” হযরত হরমুজান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন, “যান। আপনি মুক্ত। আমার কথার খিলাফ আমি করবো না।”
কথার কি অদ্ভুত দাম! ওয়াদা পালনের কি অপূর্ব নজির। হযরত হরমুজান রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি কল্পনাও করতে পারেননি যে, তিনি এতো সহজে মুক্তি লাভ করতে পারবেন। আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার মহানুভবতা দেখে তিনি দারুণভাবে প্রভাবিত হলেন। তিনি ভাবলেন, এই যদি হয় পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার আদর্শ, তবে এর থেকে দূরে থাকা হবে আমার জন্যে চরম দুর্ভাগ্যজনক। পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার অতুলনীয় আদর্শে মুগ্ধ হয়ে তিনি সাথে সাথে পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করে নিলেন। সুবহানাল্লাহ! (ইবনে কাছীর, আল-বিদায়া)

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে