আলহামদুলিল্লাহ, আলুর বাম্পার ফলন- দেশে আলুর চাহিদা ৬০ লাখ টন, উৎপাদন হয়েছে এক কোটি টনেরও বেশি


আলুর আশাতীত ফলনেও কৃষকের চোখে ঘুম নেই

দেশে এ বছর আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯৫ লাখ টন। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে এক কোটি টনেরও বেশি। আলুর এই বাম্পার ফলন সত্ত্বেও উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় কৃষকের হাত মাথায় ওঠার উপক্রম হয়েছে। প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে যেখানে সাত থেকে আট টাকা খরচ পড়েছে সেখানে কৃষক বাধ্য হচ্ছেন তিন থেকে চার টাকা কেজিদরে আলু বিক্রি করতে। হিমাগারগুলোর বুকিং স্লিপ প্রভাবশালীদের হাতে চলে যাওয়ায় সাধারণ কৃষক আলু রাখার সুযোগ পাচ্ছেন না। পথে পথে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যের কারণে সাধারণ কৃষক চাইলেও শহরে এনে একটু বাড়তি দামে বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে আগামী দিনগুলোয় কৃষকেরা আলু উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, সরকার এ বছর ১২ লাখ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। প্রত্যাশা ছিল আলু উৎপাদন হবে ৯৫ লাখ টন। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছু বেশি পরিমাণ জমিতে আলুর চাষ হলেও সারের দাম অপেক্ষাকৃত কম থাকায় এবং ভালো আবহাওয়ার কারণে ফলন হয়েছে এক কোটি টনেরও বেশি। অঞ্চলভেদে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ পড়েছে সাত থেকে আট টাকা। কিন’ অধিকাংশ কৃষক ঋণ করে আলু চাষ করায় ফসল ঘরে ওঠার পরপরই বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। যারা ধরে রাখার সামর্থ্য রাখেন তারাও হিমাগারে আলু রাখার স্লিপ না পেয়ে বাধ্য হচ্ছেন পচনশীল এ পণ্যটি বিক্রি করে দিতে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে ৩৬০টি কোল্ড স্টোরেজ আছে। এগুলোর ধারণক্ষমতা ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন। কিন’ বিদ্যুতের অভাবে ধারণক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অন্তত ১০টি নতুন কোল্ড স্টোরেজ আছে যেগুলো এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ পায়নি। আবার যেগুলোয় সংযোগ আছে লো-ভোল্টেজ এবং লোডশেডিংয়ের কারণে সেগুলোয়ও ধারণক্ষমতা অনুযায়ী আলু রাখা যাচ্ছে না। সর্বোপরি বাড়তি চাহিদার কারণে কোল্ড স্টোরেজের বুকিং স্লিপগুলো আগেই প্রভাবশালীদের পকেটে চলে গেছে। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরকারি দলের নেতারা তাদের আলু রাখতে কোল্ড স্টোরেজের মালিকদের বাধ্য করছেন। আবার অনেক কোল্ড স্টোরেজের মালিকের বিরুদ্ধে পরিসি’তির সুযোগে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগও করছেন কৃষকেরা।
রাজধানীর কাওরানবাজারে আলু বিক্রি করতে আসা বগুড়ার কৃষক ফজলুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, আলু চাষ করে এতই বিপদে পড়েছি যে, ১০ কেজি আলু বিক্রি করে এক কেজি চাল কিনতে হচ্ছে। বেপারীদের কাছে বিক্রি করে দাম না পাওয়ায় নিজেই ট্রাক ভাড়া করে আলু নিয়ে ঢাকায় এসেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে এসে দেখি অবস’া আরো খারাপ। ট্রাক ভাড়া ও ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিয়ে যে পরিমাণ খরচ হয়েছে এর চেয়ে স’ানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি করাই ভালো ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কাওরানবাজারে গতকাল প্রতি কেজি আলুর পাইকারি দাম ছিল ছয় থেকে সাত টাকা। ঢাকার খুচরা বাজারগুলোয় এ আলুই বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১১ টাকায়। অথচ একই আলুর দাম কৃষক পাচ্ছেন মাত্র চার থেকে পাঁচ টাকা। দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষক সময় হয়ে যাওয়ার পরও ক্ষেত থেকে আলু তুলছেন না বলে জানা গেছে। এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে জয়পুরহাট থেকে আলু নিয়ে কাওরানবাজারে আসা বেপারী আতাল ফকীর বলেন, আলু চাষ করা কৃষকের কান্না দেখতে গেলে উত্তরবঙ্গে যাবেন। দাদন ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে সেখানে কৃষকেরা নামমাত্র মূল্যে আলু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ট্রাকভাড়া অনেক বেড়ে গেছে। রাস্তায় খরচও বাড়তি। আমরা চাইলেও কৃষকদের বেশি দাম দিতে পারি না।
জানা যায়, সরকার আলু রফতানির ওপর বর্তমানে ২০ শতাংশ হারে প্রণোদনা দিচ্ছে। গত বছর ৩০ হাজার টনের মতো আলু সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশী আলুর চাহিদা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান পরিসি’তিতে এবার আলু রফতানি ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমতাবস্থায় ভর্তুকি বাড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি কোল্ড স্টোরেজের পরিমাণ বাড়ানো, ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ, কাজের বিনিময়ে খাদ্য ও খোলাবাজারে বিক্রয় কর্মসূচিতে আলু যুক্ত করার এবং মনিটরিং জোরদার করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

 

 

সূত্র : নয়া দিগন্ত 12.03.2012

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+