আল্লাহ্ পাক নূর নন =>হাফিজুল হাদীছ মুফতী মাওলানা মুহম্মদ ফজলুল হক


 

الله نورا لسماوت والارض مثل نوره كمشكوة فيها مصباح المصباح فى زجاجة الزجاجة كانها كوكب درى يوقد من شجرة مباركة زيتونة لا شرقية ولاغربية يكاد زيتها يضيئ ولولم تمسسه نار- نور على نور- يهدى الله لنوره من يشاء ويضرب الله الامثال للناس والله بكل شيئ عليم.

তরজমা ঃ- মহান আল্লাহ্ পাক আসমান ও যমীনের নূর অর্থাৎ আসমান-যমীন আলো করনেওয়ালা। তাঁর আলো বা নূর মোবারকের উদাহরণ হলো যেমন একটি তাক, যার উপরে আছে একটি প্রদীপ। যেই প্রদীপটি একটি কাঁচের পাত্রের মধ্যে রয়েছে। সেই কাঁচ পাত্রটি এমন, যেন উহা একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। সেই প্রদীপটি বরকতময় যাইতুন বৃক্ষের (তৈল) দ্বারা প্রজ্জলিত হয়। সেই বৃক্ষটি পূর্বমুখীও নয়, পশ্চিমমুখীও নয়। সেই তৈল (এমন যে) যদিও উহাকে অগ্নি স্পর্শ না করে তবুও উহা জ্বলে উঠে। নূরের উপরে নূর। আল্লাহ্ পাক যাকে ইচ্ছা তাকেই স্বীয় নূরের দ্বারা পথ প্রদর্শন করেন। মহান আল্লাহ্ পাক মানুষের জন্যই দৃষ্টান্ত পেশ করেন। আল্লাহ্ পাক সর্ব বিষয়ই জ্ঞানী।” (সুরা নূর/৩৫)

তাফসীর ঃ- আলোচ্য আয়াত শরীফের শাব্দিক অর্থে মহান আল্লাহ্ পাককেই আসমান ও যমীনের নূর (আলো) বলা হয়েছে। মূলতঃ মহান আল্লাহ্ পাক নূর নন। কারণ নূর হলো- আল্লাহ্ পাক-এর অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে একটি মাখলুক্ব বা সৃষ্ট বস্তু। আর মহান আল্লাহ্ পাক হলেন- নুর সহ সকল মাখলুকাতের স্রষ্টা বা খালেক। কাজেই আল্লাহ্ পাককে নূর বললে আল্লাহ্ পাক-এর সাথে অংশী স্থাপন বা শরীক করা হয়।

আলোচ্য আয়াত শরীফের তাফসীরে হুজ্জাতুল ইসলাম, হযরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) মেশকাতুল আনওয়ারের মধ্যে উল্লেখ করেছেন- জনৈক বেদুঈন ব্যক্তি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মহান আল্লাহ্ পাক-এর উপমা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিল। তখনই নিম্নোক্ত আয়াত শরীফ অবর্তীণ হয়-

قل هوا لله احد- الله الصمد لم يلد ولم يولد ولم يكن له كفوا احد.

অর্থঃ- “হে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি বলুন, তিনিই এক আল্লাহ্। মহান আল্লাহ্ পাক বেনিয়াজ। তিনি কারো থেকে জন্ম নেননি এবং তিনিও কাউকে জন্ম দেননি। তাঁর সমকক্ষ কেউই নেই।” (সুরা ইখলাছ)

আলোচ্য আয়াত শরীফের তাফসীরে “নূর” শব্দের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে

الله هادى اهل السماوت الارض.

অর্থঃ- “মহান আল্লাহ্ পাক আসমান ও যমীনবাসীদের হিদায়েত দানকারী।” (মাযহারী ৬/৫২২, ইবনে কাসীর ৬/৪৭৮)

তাফসীরে মাযহারীতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে-

 

هو مصدر بمعنى الفاعل يعنى منور السماوت والارض بالشمس والقمر والكواكب وبا لانبياء والملائكة والمؤمنين.

অর্থঃ- “নূর শব্দটি মাছদার, যা ইসমে ফায়েল অর্থে ব্যবহৃত, অর্থাৎ মহান আল্লাহ্ পাক সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজী, নবী-রাসূল (আঃ), ফেরেশ্তাগণ এবং মু’মিনদের দ্বারা আসমান ও যমীনের আলোদানকারী।” (মাযহারী ৬/৫২১)

এ আলোচনা দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হয় যে, মহান আল্লাহ্ পাক নূর নন, বরং তিনি নূরের সৃষ্টিকর্তা। আর মূলতঃ নূর দ্বারা আল্লাহ্ পাক-এর হিদায়েতকে বুঝান হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ্য যে, মহান আল্লাহ্ পাক পবিত্র কালামুল্লাহ্ শরীফে বলেন,

قد جاء كم من الله نور وكتاب مبين.

অর্থঃ- “অবশ্যই তোমাদের নিকট এসেছে মহান আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ থেকে নূর ও প্রকাশ্য কিতাব।” (সুুরা মায়েদা/১৫)

আলোচ্য আয়াত শরীফে نور দ্বারা   হুজুর   পাক   সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এবং كتاب দ্বারা কোরআন  শরীফকে বোঝানো হয়েছে।” (মাযহারী, ইবনে কাসীর, জালালাইন, ত্ববারী, কুরতুবী, ইবনে আবি হাতিম)

এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

اول ما خلق الله نورى وكل شيى ء من نورى.

অর্থঃ- “সর্ব প্রথম মহান আল্লাহ্ পাক আমার (হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর) নূর মোবারককে সৃষ্টি করেছেন। আর আমার সেই নূর মোবারক থেকেই সমস্ত কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে।” অন্য হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে-

كنت نورا بين يدى ربى.

অর্থঃ- “আমি মহান আল্লাহ্ পাক-এর সামনে নূর হিসাবে ছিলাম।” (আল ইনসানূল কামিল)

হাদীস শরীফে আরো উল্লেখ করা হয়েছে,

 

انه صلى الله عليهه وسلم لما ولد رأت امه نورا وخرج معه نور أضائت له قصور الشام.

অর্থঃ- “যখন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভুমিষ্ট হন, তখন তাঁর মাতা (হযরত আমিনা (রাঃ)) দেখতে পেলেন একটি নূর মোবারক, উক্ত নুর মোবারক বের হয়ে শাম দেশের রাজ প্রাসাদকে আলোকিত করেছে।” (মাওয়াহে বুল্লাদুন্নিয়া ১/১২, ইনসানুল কামিল ২১)

মূলতঃ নূর শব্দটি কোরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের বিভিন্ন স্থানে  বিভিন্ন  অর্থে  ব্যবহৃত হয়েছে।

 

যেমন ইতিপূর্বের আলোচনায় نور দ্বারা হিদায়েত ও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুঝান হয়েছে। এছাড়া কিতাবে আরো উল্লেখ করা হয়েছে-

هادى من فى السماوات والارض فهم بنوره يهتدون الى الحق.

অর্থঃ- “আল্লাহ পাক আসমান ও যমীনে যারা বসবাস করে, তাদের হিদায়েত দানকারী। তারা আল্লাহ্ পাক-এর নূরের দ্বারা হক্ব পথে পরিচালিত হয়।” (মুখতাছার তাফসীরে ত্ববারী ৩৫৪)

এ সম্পর্কে মহান  আল্লাহ্ পাক বলেন-

الله ولى الذين امنوا- يخرجهم من الظلمات الى النور.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক মু’মিনদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে গোমরাহী থেকে হিদায়েতের দিকে নিয়ে যান।” (সূরা বাক্বারা/২৫৭)

আবার নূর দ্বারা কোরআন শরীফকেও বুঝানো হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেন-

فالذين امنوا به وعزروه ونصروه واتبعوا النور الذى انزل معه اولئك هم المفلحون.

অর্থঃ- “অতঃপর যারা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ঈমান আনবে, তাঁকে তা’যীম করবে, সাহায্য-সহযোগীতা করবে এবং তাঁর প্রতি যেই নূর (কোরআন শরীফ) অবতীর্ণ করা হয়েছে তার অনুসরণ করবে, তারাই সফলতা লাভ করবে।” (সূরা আ’রাফ ১৫৭) আলোচ্য আয়াত শরীফে নূর দ্বারা কোরআন মজিদকে বুঝানো হয়েছে।

অনুরূপ আল্লাহ্ পাক বলেন

 

يريدون ليطفئوا نور الله بافواههموالله متم نوره ولو كره الكافرون.

অর্থঃ- “তারা চায় তাদের মুখের ফুৎকারের দ্বারা আল্লাহ্র নূর (দ্বীন ইসলামকে) নিভিয়ে দিতে। কিন্তু আল্লাহ পাকই তার দ্বীনকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন। যদিও কাফেররা উহা অপছন্দ করে।” (সূরা ছফ/৮)

প্রদত্ত আয়াত শরীফের তাফসীরে কিতাবে আরো উল্লেখ করা হয়েছে-

وقال الحسن وزيد بن اسلم اراد بالنور القران وقال سعيد بن جبير والضحاك هو محمد صلى الله عليه وسلم وقي اراد بالنور الطاعة سمى طاعة الله نورا- واضاف هذه الانوار الى نفسه.

অর্থঃ- “হযরত হাসান ও যায়েদ বিন আসলাম (রাঃ) বলেন- নূর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কোরআন শরীফ। আর সাইদ ইবনে  জুবায়ের ও যুহাক (রাঃ) বলেন, নূর দ্বারা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুঝান হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, নূর বলতে অনুগত হওয়াকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ্ পাক-এর আনুগত্যতাকেই নূর হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নূরকেই আত্মার সাথে স্থাপন করা হয়েছে।” (মাযহারী-৬/৫২২)

অতঃপর  مثل نوره كمشكوة -এর ব্যাখ্যায় কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে,

قيل مثل نور من امن به وقيل مثل نور محمد صلى الله عليه وسلم وقيل نور القران.

অর্থঃ- “কেউ কেউ বলেন مثل نوره বলতে যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাক-এর প্রতি ঈমান এনেছে, তার নূরের বা হিদায়েতের কথা বলা হয়েছে। কারো কারো মতে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূর মোবারকের কথা বুঝান হয়েছে। আর কারো মতে- কোরআনের নূর বা হিদায়েতকে বুঝান হয়েছে।” (মুখতাছার তাফসীরে ত্ববারী/৩৫৪)

অপরদিকে প্রদত্ত আয়াত শরীফে বর্ণিত উপমা (তাক, কাঁচ, বাতি, বৃক্ষ ও তেল) সম্পর্কে হুজ্জাতুল ইসলাম, হযরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) বলেন- এর দ্বারা ইন্দ্রীয় শক্তি, কল্পনা শক্তি, বুদ্ধি শক্তি, চিন্তা শক্তি, নুবুওওয়াতী ও বেলায়েতের পবিত্র শক্তিকে বুঝানো হয়েছে। (মেশকাতুল আনওয়ার)

উল্লেখ্য, নুবুওওয়াত নবী (আঃ)গণের সাথে সম্পৃক্ত এবং বেলায়েত আওলিয়া-ই-কিরামগণের সাথে সম্পৃক্ত।

মূলতঃ বর্ণিত আয়াত শরীফে মু’মিনের অন্তরে মহান আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ থেকে হাক্বীক্বী হিদায়েতের  বাণী পৌঁছার দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে। অর্থাৎ ঈমানদার ব্যক্তি পূর্ণরূপে হিদায়েত প্রাপ্ত হয়ে আল্লাহ্ পাক-এর মতে ও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাাম-এর পথে পরিচালিত হলে তার যেরূপ অবস্থা হয়, তারই ইঙ্গিত সূচক দৃষ্টান্ত এখানে পেশ করা হয়েছে।

এ সম্পর্কে হুজ্জাতুল ইসলাম, হযরত ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) তাঁর মেশকাতুল আনওয়ার কিতাবে আরো বলেন- “বিশ্বাসী, নবী (আঃ) ও ওলী আল্লাহ্গণের অন্তকরনের বেলায় এ উপমা দেয়া চলে। কাফেরদের বেলায় এ উপমা খাটেনা। কারণ নূর বা আলো কথাটি সৎ পথে চলাকেই বলে।”

আর এজন্যই আল্লাহ্ পাক বলেছেন,

نور على نور.

নূরের উপর নূর। অর্থাৎ হিদায়েত প্রাপ্ত হওয়ার পরে পূর্ণরূপে হিদায়েত লাভ করলেই হয় নূরুন আলা নূর। আল্লাহ্ পাক অন্য আয়াত শরীফে বলেছেন-

يا ايها الذين امنوا امنوا.

অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ঈমান আনয়ন কর।”

অর্থাৎ প্রথমে ঈমান আনার পরে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আল্লাহ্ পাক-এর মতে ও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পথে পরিচালিত হয়ে পরিপূর্ণ ঈমানদার হয়ে যাও। আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়ার তৌফিক দান করুন। (আমীন)              ইতিপূর্বের আলোচনায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, নূর শব্দটি কোরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। মূলতঃ মহান আল্লাহ্ পাক নূর নন, তিনি নূরের স্রষ্টা।        আলোচ্য আয়াত শরীফের তাফসীরে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,

عن عبد الله بن شقيقق قال قلت لابى ذر (رضى) لو كنت رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم لسئالته قال عن اى شيئ قلت اسئاله هل رائ محمد صلى الله عليه وسلم ربه قال فقال قد سئالته فقال نورا انى أراه. অর্থঃ- “হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে শাকীক (রাঃ) বলেন, আমি হযরত আবু জর গিফারী (রাঃ)কে বললাম- আমি যদি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখতাম, তবে আমি অবশ্যই তাঁকে একটি সুওয়াল করতাম। তখন হযরত আবু জর (রাঃ) বলেন, কোন বিষয় তুমি প্রশ্ন করতে? আমি বললাম- আমি জিজ্ঞাসা করতাম যে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহ্ পাককে দেখেছেন কিনা? বর্ণনাকারী বলেন, তখন হযরত আবু জর গিফারী (রাঃ) বলেন, আমিই এ বিষয় হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করেছিলাম। উত্তরে তিনি বলেছেন, আমি মহান আল্লাহ্ পাককে (মেছালী ছুরতে) নূর হিসেবে দেখেছি।” (মছনদে আহ্মদ-৫/১৭১, ১৫৭, ১৭৫, মুসলিম, তিরমিযী, মেশকাত/৫০১)    অন্য হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

قد رأيته نورا أنى أراه.

অর্থঃ- “আমি আল্লাহ্ পাককে নূর হিসেবে দেখতে পেয়েছি।” (মছনদে আহ্মদ- ৫/১৪৭, মুসলিম শরীফ)       বর্ণিত হাদীস শরীফদ্বয়ে স্বয়ং আল্লাহ্র রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহ্ পাককে নূর হিসেবে দেখেছেন, যা তাঁর মেছালী ছূরত সমূহের মধ্যে একটি মেছাল।     আবার অন্য হাদীস শরীফে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

رأيت ربى عزوجل فى صورة شاب أمرد.

অর্থঃ- “আমি মহান আল্লাহ্ পাককে (মেছালী সূরতে) দাঁড়ি-মোছবিহীন যুবকের ছুরতে দেখেছি।”          হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যত্র বলেন,

رأيت ربى عزوجل فى احسن صورة.

অর্থঃ “আমি মহান আল্লাহ্ পাককে উত্তম ছূরত মোবারকে দেখেছি।” (তিরমিযী, হাক্বীক্বতে মুহম্মদী/১৩৩)        আর হযরত আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণও আল্লাহ্ পাককে নানা প্রকার মেছালী ছূরতে দেখেছেন। যেমন হানাফী মায্হাবের ইমাম, ইমামে আ’যম হযরত আবু হানীফা (রঃ)  এবং হাম্বলী মায্হাবের ইমাম, হযরত আহমদ বিন হাম্বল (রঃ)-এর সীরাতে উল্লেখ রয়েছে যে, তাঁরা উভয়ে মহান আল্লাহ্ পাককে মেছালী ছুরতে একশত বার করে দেখেছেন। আরো উল্লেখ আছে যে, গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া, হযরত বড় পীর সাহেব (রঃ), ক্বাইউমে আউয়াল, হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী (রঃ), মহান আল্লাহ্ পাককে যুবকের ছূরতে দেখেছেন। হযরত মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবী (রঃ) মেয়ে লোকের ছূরতে দেখেছেন। আবার অনেক আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)গণ আল্লাহ্ পাককে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছূরত মোবারকে দেখেছেন। এছাড়াও অনেক আউলিয়া-ই-কিরাম আল্লাহ্ পাককে নানা প্রকার মেছালী ছূরতে দেখেছেন।        অতএব বর্ণিত হাদীস শরীফ ও আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ)-এর ক্বওল দ্বারা এটাই ছাবেত হয় যে, আল্লাহ্ পাককে নানা প্রকার মেছালী ছূরত মোবারকে দেখা সম্ভব। তবে অবশ্যই একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, উল্লিখিত ছূরত মোবারক কোনটিই আল্লাহ্ পাক-এর হাক্বীক্বী বা প্রকৃত ছূরত মোবারক নয়। বরং তাঁর মেছালী ছূরত মোবারক মাত্র।     কাজেই বান্দা পৃথিবীতে আল্লাহ্ পাককে যে ছূরত মোবারকেই দেখুক না কেন, আর তা যেভাবেই দেখুক যেমন- স্বপে¦, কাশ্ফে, মোরাকাবায়, রূহানীভাবে, তা প্রত্যেকটিই মূলতঃ মেছালী ছূরত।   এ প্রসঙ্গে ক্বাইউমে আউয়াল, হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী (রঃ) তাঁর মকতুবাত শরীফে বলেন, মহান আল্লাহ্ পাক-এর মেছালী ছূরত দেখেই কেউ যদি তাকে আল্লাহ্ পাক বলে মনে করে, তাহলে তা কুফরী হবে।   আর আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়া হলো- পৃথিবীতে কেউ আল্লাহ্ পাক-এর হাক্বীক্বী ছূরত মোবারক দেখবেনা। তবে হ্যাঁ, বান্দারা পরকালে আল্লাহ্ পাককে স্পষ্টভাবে দেখতে পাবে।                                                                                                                          আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুর জাতে পাক-এর বর্ণনা করতে গিয়ে কাইউমে আউয়াল, আফজালুল আউলিয়া, হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী (রঃ) বলেন, “মহান আল্লাহ্ পাক ‘আল্লাহু’ শব্দ থেকেও পবিত্র, তিনি এ শব্দেরও মুখাপেক্ষী নন। সূরা ইখলাছের মধ্যে এ বিষয়টিই পরিস্ফুটিত হয়েছে-

الله الصمد. لم يلد ولم يولد ولم يكن له كفوا احد.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক (সমস্ত কিছু থেকে) বেনিয়াজ। তিনি কাউকে জন্ম দেন নাই। আর কেউ তাঁকে জন্ম দেয় নাই। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।

এ আয়াত শরীফের তাফসীরে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,

 

عن عمران بن حصين (رضى) قال قال النبى صلى الله عليه وسلم كان الله ولم يكن شيئ غيره كان الله ولا شيئ معه وكان الله ولم يكن شيئ قبله.

অর্থঃ- “ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) বর্ণনা করেন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ্ পাক ব্যতীত কেউই ছিলনা, আল্লাহ্ পাক-এর সাথেও কেউ ছিলনা এবং আল্লাহ্ পাক-এর পূর্বেও কেউ ছিলনা।” (বোখারী, মুসলিম)

আল্লাহ্ পাক অন্য আয়াত শরীফে বলেন,

ليس كمثله شيى.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক-এর অনুরূপ কোন কিছুই নাই।” (সূরা শুয়ারা/১১)

মূলতঃ নূর হলো মহান আল্লাহ্ পাক-এর অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে একটি  مخلوق বা সৃষ্ট বস্তু। আর আল্লাহ্ পাক হলেন, নূরসহ সকল সৃষ্টির خالق বা স্রষ্টা।

তিনি আরো বলেন,

الله خالق كل شيئ.

অর্থঃ- “মহান আল্লাহ্ পাকই সমস্ত কিছুর স্রষ্টা।” (সূরা রা’দ/১৬)

এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

 

خلق الله التربة يوم السبت وخلق الجبال فيها يوم الاحد وخلق الشجر فيها يوم الاثنين وخلق المكروه يوم الثلثاء وخلق النور يوم الاربعاء.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক মাটি (যমীন) সৃষ্টি করেছেন শনিবারে, আর উহাতে পাহাড় তৈরী করেছেন রবিবারে এবং উহাতে বৃক্ষ তৈরী করেছেন সোমবারে। আর অপছন্দনীয় জিনিস তৈরী করেছেন মঙ্গলবারে। আর আল্লাহ্ পাক নূরকে সৃষ্টি করেছেন বুধবারে।”

হাদীস শরীফে আরো উল্লেখ করা হয়েছে,

اول ما خلق الله نورى وكل شيئ من نورى.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক সর্ব প্রথম আমার নূর মোবারক সৃষ্টি করেন। আর আমার নূর হতে সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেন।” (হাক্বীক্বতে মুহম্মদী)

এ সম্পর্কে হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) তাঁর দাকায়েকুল আখবারের মধ্যে উল্লেখ করেন, হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে আল্লাহ্ পাক সর্ব প্রথম চারিকান্ড বিশিষ্ট “শাজারাতুল ইয়াক্বীন” নামে একটি বৃক্ষ সৃষ্টি করেন। তারপর নূরে মুহম্মদীকে ময়ূরের আকৃতিতে সৃষ্টি করতঃ শুভ্র আঁধারে রেখে উক্ত বৃক্ষে স্থাপন করেন। ঐ অবস্থায় হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্তর হাজার বৎসর একাদিক্রমে আল্লাহ্র গুণগানে রত থাকেন। অতঃপর আল্লাহ্ তায়ালা শরমরূপ আয়না তাঁর সম্মুখে রাখেন। উক্ত আয়নায় তিনি তাঁর কান্তিময় উজ্জ্বল চেহারা দেখে লজ্জিত হন এবং অবনত মস্তকে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ্কে পাঁচবার সিজদাহ্ করেন। এ কারণেই তাঁর উম্মতগণ নির্দিষ্ট সময়ে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ আদায় করে থাকেন। পুণরায় আল্লাহ্ তায়ালা উক্ত নূরের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে উক্ত নূর আল্লাহ্র ভয়ে ঘর্মাক্ত ও লজ্জিত হয়ে পড়ে। তাঁর মাথার ঘাম হতে ফেরেশ্তাকুল, চেহারার ঘাম হতে আরশ-কুরসী, লৌহ-মাহ্ফুয, কলম, চন্দ্র, সূর্য, তারকারাজি এবং আকাশ মন্ডলের যাবতীয় কিছু সৃষ্টি করেন। কানের ঘাম হতে ইহুদী, খৃষ্টান, অগ্নি উপাসক এবং অন্যান্য কাফের সম্প্রদায় সৃষ্টি হয়। পদদ্বয়ের ঘাম হতে পৃথিবীর যাবতীয় বস্তু সমূহ সৃষ্টি হয়। এরপর আল্লাহ্ তায়ালা তাঁকে সম্মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করালে তিনি তাঁর  সম্মুখে, পশ্চাতে, ডানে, বাঁয়ে পর্যায়ক্রমে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ), হযরত ওসমান (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ)-এর নূর দেখতে পান। ইহার পর নূরে মুহাম্মদী সত্তর হাজার বৎসর আল্লাহ্র তাসবীহ্-তাহ্লীলে নিমগ্ন থাকেন। আল্লাহ্ তায়ালা সমস্ত নবীদের নূর নূরে মুহাম্মদী হতে সৃজন করেন এবং আল্লাহ্ তায়ালা তৎপ্রতি দৃষ্টি করা মাত্র নবীদের আত্মা পয়দা হয়ে সমস্বরে বলে উঠল- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্। অতঃপর আল্লাহ্ তায়ালা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নামাজরত অবস্থায় লাল আকীক পাথরে তৈরী একটি লক্তনের মধ্যে বসিয়ে রাখেন। নবীদের আত্মসমূহ নূরে মুহম্মদীকে এক লক্ষকাল যাবৎ তাওয়াফ করে আল্লাহ্ পাক-এর শোকরগুজারী করেন।

উপরোক্ত সকল আলোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হলো যে, মহান আল্লাহ্ পাক নূর নন বরং তিনি নূরের স্রষ্টা। আর আল্লাহ্ পাক সর্ব প্রথম সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূর মোবারককে সৃষ্টি করেছেন। (অসমাপ্ত)

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

  1. দরকারী পোস্ট।

    কিন্তু একসাথে একাধিক পোস্ট দেয়ার চেয়ে নিয়মিত একটি করে পোস্ট দিলেই ভালো।

    একই নিক থেকে একাধিক পোস্ট দেখতে ভালো দেখায় না।

    মনে কিছু নিবেন না, আশাকরি।

    অনেক শুকরিয়া।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে