আসছে সামনে কথিত মে দিবস…তাহলে আজ হয়ে যাক কথিত মে দিবস নিয়ে আলোচনা


আসছে ১লা মে। কথিত মে দিবস। প্রায় ১২১ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, ধর্মঘট, শ্রমিকের রক্তের ধারাবাহিকতায় কথিত এই মে দিবস।
১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হেমার্কেট স্কয়ারে শ্রমিকরা শ্রমঘণ্টা ৮ ঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলন করে বুকের তাজা রক্তে আমেরিকার রাজপথ রঞ্জিত করেছিল। এর ইতিহাস হিসেবে জানা যায়, ১৬৮৪ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে সংগঠিত হয় ঠেলাওয়ালারা।
প্রথম ধর্মঘটে যায় চার্লস্টনের চিমনি পরিষ্কারক শ্রমিকরা ১৭৬৩ সালে। ১৭৭০ সালে নিউইয়র্কের পিপা প্রস্থতকারক শ্রমিকদের ইউনিয়ন গঠিত হয়। ১৭৭৮ সালে নিইউয়র্কের ছাপাখানার ঠিকা শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়। আমেরিকার মহিলা দর্জি শ্রমিকরা ধর্মঘট করে ১৮২৩ সালে। শিল্প শ্রমিকরা আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মঘটে যোগ দেয় ১৮২৮ সালে। ১৮৭৪ সালে নিউইয়র্কের টমকিন স্কয়ারে শ্রমজীবীদের জনসভায় পুলিশ গুলিবর্ষণ করে।
১৮৭৫ সালে পেনসিলভানিয়ায় কয়লাখনি শ্রমিকদের আন্দোলনে গ্রেফতারকৃত ১০ জন শ্রমিক নেতার ফাঁসি হয়। নিউইয়র্কে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন বাতিল হয়ে যায় ১৮৭৬ সালে। ১৮৭৭ সালে আমেরিকার রেল ও ইস্পাত শিল্পের শ্রমিকরা ধর্মঘটে যোগ দেয়।
১৮৮২ সালে জাপানের রাজধানী টোকিও’র গাড়ি শ্রমিকরা ধর্মঘট করে। রাশিয়ার মস্কোর বিখ্যাত কারখানা মারাজভের শ্রমিকরা ধর্মঘট করে ১৮৮৪ সালে।
১৮৮৬ সালের প্রথমদিকে ফ্রান্সের কয়লা শ্রমিকরা একটি দীর্ঘ ও তিক্ত ধর্মঘটে অংশ নেয়। ১৮৮৪ সাল থেকে ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত মাত্র ২ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ২ হাজার ২শ’টি শিল্প-কারখানায় ৩০৯২টি ধর্মঘট সংঘটিত হয়।
১৮৮৪ সালের ৭ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত শ্রমিক সম্মেলনে অঋখ ঘোষণা করে। ১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে আমেরিকা ও কানাডার শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টাকে কাজের দিন হিসেবে পালন করবে। কিন’ শাসকগোষ্ঠী ও মালিক পক্ষ এ ঘোষণার বিপরীতে অবস্থান নেয়ায় ১৮৮৫ সালে অনুষ্ঠিত সম্মেলন থেকে অঋখ ১৮৮৬ সালে ১ মে দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেয়।
১৮৮৬ সালের ১৭ এপ্রিল কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের সভায় প্রায় একুশ হাজার শ্রমিক অংশ নেয়। ২৫ এপ্রিলের সভায় প্রায় ২৬ হাজার শ্রমিকের উপস্থিতিতে আলবার্ট, পারসন্স, অগাস্ট স্পাইজ প্রমুখ শ্রমিক নেতা বক্তব্য রাখে। ৮ ঘণ্টা দাবির সমর্থন বাড়তে থাকে। উজ্জীবিত হয়ে উঠে উক্ত শ্রমিক সমাজ। ঘনিয়ে আসে তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ১৮৮৬ সালের ১ মে, শনিবার। আমেরিকা ও কানাডার শ্রমজীবীরা সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করে।
আমেরিকার শিকাগো শহর ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় তিন লাখ শ্রমজীবী ধর্মঘটে প্রায় অচল করে দেয় শিকাগো শহর। শ্রমিক নেতা পারসন্স ও তার স্ত্রী লুসির নেতৃত্বে মিছিলে প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিক অংশ নেয়। শিকাগো শহরে আয়োজিত ১ মে’র বিশাল সমাবেশ থেকে শ্রমিক নেতারা ঘোষণা দেন, ৮ ঘণ্টা দাবি না মানা পর্যন্ত লাগাতার ধর্মঘট চলবে।
ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন ছিল রোববার, ২ মে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন থাকায় অনেক শ্রমিক বিশ্রামে থাকেন। ৩ মে সোমবার লাগাতার ধর্মঘটের মনোভাব নিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠানে আসতে থাকে শ্রমজীবীদের ঢল। আমেরিকার শিকাগো শহরের ম্যাককর্মিক কৃষিযন্ত্রের কারখানায় শ্রমিকরা, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের (পূর্বে ছাঁটাইকৃত) বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধর্মঘট পালন করে আসছিল। ওই কারখানার দিকে অন্য শ্রমিকের মিছিল আসতেই ধর্মঘট পালনরত শ্রমিকরা ওই মিছিলে যোগ দিলে মালিকপক্ষের সহায়তায় পুলিশ আকস্মিক গুলি চালায়; রক্তের বন্যা বয়ে যায় মুহূর্তেই। মারা যায় ৬ জন শ্রমিক। আহত হয় অগণিত।
পরবর্তিতে তাদের স্মরণে ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাইয়ে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বিশ্ব শ্রমিক সম্মেলনে পহেলা মে’কে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই থেকে প্রতি বছর বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের কথিত অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্মরণীয় দিন হিসেবে মে দিবস বিশ্বের সর্বত্র আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে- মে দিবসের আলোচনায় ও চিন্তায় অন্যান্যদের সাথে মুসলমানরাও একই ইতিহাস আলোচনা করে ও একই মনোভাব ব্যক্ত করে। অথচ মুসলমানদের রয়েছে একটা আলাদা ঐতিহ্য ও আদর্শ তথা মূল্যবোধ। বলাবাহুল্য, ইসলামের দৃষ্টিতে মে দিবসের প্রক্রিয়া ও প্রতিপাদ্য অর্থহীন।
উল্লেখ্য, পৃথিবীর প্রতিটি দেশের জাতীয় দিবসগুলো আলাদাভাবে উদযাপিত হলেও একমাত্র মে দিবসটিই পৃথিবীর প্রায় সব দেশে সরকারিভাবে পালন করে থাকে। প্রত্যেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, আমলা, শ্রমিক ফেডারেশন, শিল্পপতি সবাই মে দিবসে শ্রমিকদেরকে উদ্দেশ্য করে সুন্দর সুন্দর বক্তব্য দিয়ে থাকেন। কিন’ মে দিবস পার হয়ে গেলে শ্রমিকদের প্রতি তাদের কর্তব্য ও এ দিনে তাদের প্রদেয় আপ্ত বাণী বেমালুম ভুলে যান। এ তথ্য আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য।
মূলতঃ কথিত সব দিবস পালন তাই শুধুই আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব এবং এ কারণেই তা ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থহীন বটে। কারণ দিবস পালনের মাধ্যমে উক্ত দিনে সংবেদনশীল হয়ে বাকি ৩৬৪ দিন গাফিল থাকার কথাই প্রকারান্তরে প্রতিভাত হয়। পাশাপাশি স্মর্তব্য, কথিত মে দিবসের চেতনা ইসলামের দৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় তথা অনুল্লেখ্য। কারণ প্রথম মানব, প্রথম রসূল হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে আখিরী নবী, আখিরী রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত উনারা সবাই শ্রমের মর্যাদা দিয়েছেন। এমনকি উনারা নিজেরা পর্যন্ত কায়িক শ্রম করেছেন।
প্রথম নবী ও রসূল হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি কৃষিকাজ করেছেন, কাপড় বুনেছেন। হযরত নূহ আলাইহিস সালাম তিনি কিশতী তৈরি করেছেন। হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম তিনি বর্ম তৈরি করেছেন। এমনকি আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিও বকরী চরিয়েছেন। কূপ থেকে পানি তুলেছেন, ঘর ঝাড়- দিয়েছেন।
হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে- নবীদের নবী, রসূলদের রসূল, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “পৃথিবীতে আল্লাহ পাক তিনি এমন কোন নবী পাঠাননি যিনি বকরি চরাননি। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন, আপনিও কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি কয়েকটা কীরাতের বিনিময়ে মক্কার লোকদের ছাগল চরাতাম। (বুখারী শরীফ)
শ্রমজীবী মানুষের মেহনত সম্পর্কে কুরআন শরীফ-এ আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ পাক) মানুষকে সৃষ্টি করেছি শ্রমনির্ভর করে। (সূরা বালাদ আয়াত:৪)
পবিত্র কুরআন শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, “প্রত্যেকের মর্যাদা তার কর্মানুযায়ী; এটা এ জন্য যে আল্লাহ পাক প্রত্যেকের কর্মের পূর্ণ ফল দেবেন এবং তাদের প্রতি অবিচার করা হবে না”। (সূরা আল আহকাফ, আয়াত-১৯)
ইসলামী বিধান অনুযায়ী কৃষক, শ্রমিক বা কোন কর্মজীবীকে কেউ বিনা পারিশ্রমিকে খাটাতে পারবে না। হাদীছ শরীফ-এ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ না করে তাকে কাজে নিয়োগ করতে নিষেধ করেছেন। (বায়হাক্কী) এজন্য সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, “শ্রমিকের পারিশ্রমিক ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে ধনী ব্যক্তিদের টালবাহানা করা জুলুম।” (বুখারী ও মুসলিম শরীফ)
শ্রমিকের মজুরি প্রদান সম্পর্কে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সুস্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, “শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দিয়ে দাও।” (ইবনে মাজাহ শরীফ)
ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্ক ভাইয়ের মতো। শ্রমিক মালিকের অর্পিত দায়িত্ব ভাই হিসেবে আঞ্জাম দেবে আর মালিক থাকবে শ্রমিকের প্রতি সহানুভূতিশীল, দয়াবান ও দরদী। মালিক শ্রমিককে কখনো শোষণ করবে না এবং সাধ্যাতীত কোন কাজের বোঝাও তার উপর চাপিয়ে দেবে না। অকারণে শ্রমিক ছাঁটাই করে তাদের অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দিতে পারবে না। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন- তারা তোমাদের ভাই, আল্লাহ পাক তাদের তোমাদের অধীন করেছেন। অতএব, আল্লাহ পাক কারও ভাইকে তার অধীন করে দিলে সে যা খাবে, তাকে তা থেকে খাওয়াবে এবং সে যা পরিধান করবে তাকে তা থেকে পরিধান করতে দেবে। আর যে কাজ তার জন্য কষ্টকর ও সাধ্যাতীত, তা করার জন্য তাকে বাধ্য করবে না। আর সে কাজ যদি তার দ্বারাই সম্পন্ন করতে হয়, তবে সে তাকে অবশ্যই সাহায্য করবে।” (বুখারী শরীফ)
উল্লেখ্য, শ্রমিক স্বার্থ সম্পৃক্ত মে দিবসের প্রেরণা মাত্র ১২১ বছর আগের। তারপরেও মে দিবসের ঘোষণায় শ্রমিক স্বার্থ পুরোই সংরক্ষিত হয়েছে, এ কথা বললে মহাভুল হবে। অথচ তার চেয়েও বহুপূর্বে চৌদ্দশ’ বছর আগেই ইসলামে শ্রমিক স্বার্থ পুরোই সংরক্ষিত হয়েছে। শ্রমিককে মালিকের ভাই বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সব মুসলমান ভাই ভাই বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তদুপরি মালিককে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে, “প্রত্যেকেই রক্ষক, তাকে তার রক্ষিত বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (বুখারী শরীফ)
উল্লেখ্য, আল্লাহ পাক-এর ভয়, আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুহব্বত তথা ওহীর চেতনা মানুষের মাঝে যতটা প্রভাবিত হতে পারে অন্য কিছু তার কাছেও যেতে পারে না। কাজেই কথিত মে দিবসের ঘটনা ও চেতনা ইসলামে শ্রমিকের স্বার্থ ও মর্যাদার প্রেক্ষিতে কিছুই নয়। তাই মে দিবসের চেতনা পথভ্রষ্টতা ও অপরিপূর্ণতা। এটা বিধর্মীদের কাছে অনেক কিছু হতে পারে, কিন্তু মুসলমানের কাছে প্রাসঙ্গিকও নয়, প্রয়োজনীয়ও নয়। বরং তা বিধর্মীদের অনুসরণ বলে নাজায়িযই বটে। হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, “যে যে জাতির সাথে মিল রাখে তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে।”
মূলতঃ মুসলমানদের রয়েছে সোনালি ঐতিহ্য ও পরিপূর্ণ আদর্শ। কিন্তু মুসলমান নিজেই তা অবগত নয়। এর পেছনে রয়েছে মুসলমানদের গাফলতী ও ইল্‌মের ঘাটতি। যা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন রূহানী অনুপ্রেরণা ও জজবা।  মহান আল্লাহ পাক আমাদেরকে তা নছীব করুন। (আমীন)

Views All Time
2
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+