ইইউ-বহুজাতিক কোম্পানি একজোট হয়ে ঘোষণা করেছে- ‘বাংলাদেশে পুরনো জাহাজ বিক্রি করলে শাস্তি’।


বাংলাদেশকে যে পার্শ্ববর্তী দেশসহ পাশ্চাত্য জগৎ ও খোদ ইহুদীগোষ্ঠী বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে গরিব রাখতে চায়- সে কথা সরকারকে গভীর উপলব্ধিতে রাখতে হবে।
ইইউ-বহুজাতিক কোম্পানি একজোট হয়ে ঘোষণা করেছে- ‘বাংলাদেশে পুরনো জাহাজ বিক্রি করলে শাস্তি’।
ষড়যন্ত্রকারীদের ফাঁদে পড়ে হাজার হাজার কোটি টাকার জাহাজভাঙ্গা শিল্প বন্ধ করা সরকারের জন্য আদৌ ঠিক হবে না।
বিশ্বে জাহাজভাঙ্গা শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। পৃথিবীর মোট জাহাজ ভাঙ্গার ২৪.৮ শতাংশ সম্পাদিত হয় বাংলাদেশে।

বাংলাদেশে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে পুরনো জাহাজ বিক্রি বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। এ ধরনের ইয়ার্ডে পুরনো জাহাজ বিক্রি করলে শাস্তি হিসেবে সংশ্লিষ্ট শিপিং লাইনের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন না করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
তথাকথিত নিম্নমানের ইয়ার্ডের কাছে পুরনো জাহাজ বিক্রি বন্ধে সম্প্রতি একটি নীতিমালা তৈরি করেছে ইইউ। ইইউ’র নিবন্ধিত শিপিং কোম্পানিগুলো যাতে এসব ইয়ার্ডে পুরনো জাহাজ বিক্রি না করে, সেটি উল্লেখ করা হয়েছে নীতিমালায়। পাশাপাশি কোন্ ইয়ার্ডে পুরনো জাহাজ বিক্রি করা হয়েছে, সে-সংক্রান্ত প্রতিবেদন শিপিং কোম্পানিগুলোকে প্রতি বছর ইইউ’র সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ ধরনের ইয়ার্ডে পুরনো জাহাজ বিক্রি করলে সংশ্লিষ্ট শিপিং লাইনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছে ৩২টি বহুজাতিক কোম্পানির জোট ক্লিন শিপিং নেটওয়ার্ক (সিএসএন)। এসব ইয়ার্ডে পুরনো জাহাজ বিক্রয়কারী শিপিং লাইনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহন না করার ঘোষণা দিয়েছে তারা। কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও অটোমেশন কোম্পানি এবিবি, গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগন ও ভলভো, পোশাক ও হোমওয়্যার বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান এইচঅ্যান্ডএম এবং ইলেকট্রনিক পণ্য নির্মাতা কোম্পানি ফিলিপস। পণ্য পরিবহন বিষয়ক চুক্তি সম্পাদনের সময় পুরনো জাহাজ বিক্রির শর্ত যাতে কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়, শিপিং কোম্পানিগুলোকে চিঠির মাধ্যমে তা জানিয়েও দিয়েছে সিএসএন।
তথ্যমতে, ভারতের পরই সবচেয়ে বেশি জাহাজ ভাঙ্গা হয় বাংলাদেশে। আর জাহাজভাঙ্গা ইয়ার্ডগুলো গড়ে উঠেছে সমুদ্রতীরে। তাদের দাবি, সৈকতে খোলা জায়গার এসব ইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙ্গায় পরিবেশদূষণের ঝুঁকি অনেক বেশি। কর্মরত অবস্থায় ইয়ার্ডে শ্রমিক মৃত্যুর হারও কম নয়। এর দায়ভার এড়াতেই নাকি দক্ষিণ এশিয়ার নিম্নমানের ইয়ার্ডে জাহাজ বিক্রি বন্ধ করতে চাইছে ইইউ ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো।
কিছু প্রতিষ্ঠান ইইউ’র সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজও শুরু করেছে। ডেনমার্কের শিপিং গ্রুপ মায়ের্সক ও জার্মানির হ্যাপাং লয়েড আন্তর্জাতিক মান অনুসরণকারী ইয়ার্ড ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে পুরনো জাহাজ বিক্রি না করার নীতি গ্রহণ করেছে। এর বাইরে আরো ১৩টি বড় শিপিং কোম্পানি শুধু পরিবেশ মান অনুসরণকারী ইয়ার্ডের কাছে পুরনো জাহাজ বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইইউ ও সিএসএনের এ সিদ্ধান্তে দেশের জাহাজভাঙ্গা শিল্প সঙ্কটে পড়বে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন।
যৌক্তিক কারণ ছাড়াই একতরফাভাবে ইইউ বাংলাদেশে জাহাজ রফতানি বন্ধের নীতিমালা করেছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে জাহাজভাঙ্গা শিল্পের পাশাপাশি অন্যান্য খাতও সঙ্কটে পড়বে। এদিকে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলে পুরনো জাহাজ বিক্রি বন্ধ হলে সবচেয়ে লাভবান হবে চীন, তুরস্ক, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো। তারা তখন অনেক কম দামে পুরনো জাহাজ কিনতে পারবে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় জাহাজভাঙ্গা ইয়ার্ড বেলজিয়ামের ঘেন্টের গ্যাল্লো শিপ রিসাইকেলিং। প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ৩৫ হাজার টন স্ক্র্যাপের জোগান দেয়।
অপরদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন নিয়মাবলীতে একটি ফাঁকও রয়েছে। জাহাজের মালিকরা তাদের জাহাজ ইইউ বহির্ভূত কোনো দেশে নতুন করে রেজিস্ট্রি করতে পারে, কিংবা তৃতীয় কারো কাছে বেচে দিতে পারে। যার ফলে সেই জাহাজটি ভাঙ্গার পরিস্থিতিতে উপস্থিত হলে শেষমেশ তাদের দেশেই গিয়ে পৌঁছতে পারে।
উল্লেখ্য, আমাদের দেশের এই শিল্প বন্ধ করার জন্য বিদেশীদের ষড়যন্ত্রকারীরা এখানে প্রচুর টাকা খরচ করছে। প্রতিবছর এ শিল্পে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এখান থেকে সরকার প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকার আমদানি শুল্ক পায়। স্টীল রি-রোলিং মিলের মাধ্যমে সরকার পায় আরো দেড় হাজার কোটি টাকার রাজস্ব। প্রতিবছর দেশে যে ৩২ লাখ টন লৌহজাত সামগ্রীর চাহিদা রয়েছে, এর মধ্যে ২২ লাখ টন সরবরাহ করা হয় এ জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে।
রড ব্যবসায়ীরা জানায়, জাহাজভাঙ্গা শিল্প বন্ধ হয়ে পড়লে হু হু করে বাড়বে রডের দাম। দেশে কোনো লোহার খনি না থাকায় একমাত্র জাহাজভাঙ্গা শিল্পই লোহার চাহিদা পূরণ করছে। এছাড়া জাহাজভাঙ্গা থেকে লোহার পাশাপাশি অন্যান্য আসবাবপত্র পাওয়া যাচ্ছে। বিগত ৪৪ বছরে বাংলাদেশে জাহাজভাঙ্গা কার্যক্রম ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে বিশ্বের সর্ববৃহৎ জাহাজভাঙ্গা ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে পরিণত হয়েছে। যা এখন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ইয়ার্ড। অপরদিকে ইউরোপের কৃত্রিম ডকইয়ার্ড ও পুনঃবিক্রয়ের বাধা-নিষেধ থাকার ফলে বাংলাদেশ এই শিল্পের প্রতিযোগিতায় সবার কাছে ঈর্ষণীয়। আর তাই বাংলাদেশকে পুরনো জাহাজ আমদানি থেকে দূরে রাখতে অপপ্রচার চালাচ্ছে দেশী-বিদেশী এনজিও এবং কুচক্রী পরিবেশবাদীরা। পাশাপাশি তারা পরিবেশ ছাড়পত্র গ্রহণের এক বিশেষ জটিল প্রক্রিয়া বিধি (আইন) আরোপ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
জাহাজভাঙ্গা থেকে চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছে অনেক স্টীল রি-রোলিং মিল। যেটা শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারা বিশ্বে স্টিলের বাজারে রফতানি করছে। এই স্টিল আমাদের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করে চলেছে স্বাধীনতার পর থেকেই।
কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা যদি জাহাজভাঙ্গা শিল্প বন্ধ করতে পারে, তাহলে এইসব স্টীল আসবে কোত্থেকে? নিশ্চয় ভারত থেকে। ভারতে বিশাল বিশাল স্টীল মিল রয়েছে, যারা বাংলাদেশে ঢুকতে পারছে না। কারণ বাংলাদেশে স্টীলের চাহিদা পূরণ করে চলেছে জাহাজভাঙ্গা শিল্প।
পাশাপাশি এ শিল্পে যেসব শ্রমিকরা কাজ করে, তারা মোটামুটি সচ্ছল। এতে ব্র্যাক, গ্রামীণব্যাংক, প্রশিকার মতো রক্তচোষা এনজিওদের অসুবিধা হয়। কারণ যারা এই শিল্পে কাজ করে তারা ব্র্যাক অথবা গ্রামীণব্যাংক থেকে ঋণ নেয় না। এ কারণে গ্রামীণ ব্যাংক আর ব্র্যাকের চট্টগ্রামের কার্যক্রম ততোটাও ফলপ্রসূ নয়।
বলাবাহুল্য, এমন অনেক শিল্প কারখানা আছে, যা থেকে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়ে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, অনেক কারখানায় মেশিনজনিত দুর্ঘটনায় অনেকে হাত পা হারিয়ে বেকার হয়। কিন্তু তাই বলে কী সব মিল কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে?
এছাড়া অনেক শ্রমিক বিশাল বিশাল অট্টালিকায় ঝুলে ঝুলে কাজ করছে। তারা উঁচু থেকে পড়ে গিয়ে, দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। তাই বলে কি উঁচু দালান বানানো বন্ধ করে দেয়া হবে?
প্রসঙ্গত, সরকারকে মনে রাখতে হবে- এ খাত ধ্বংস হয়ে গেলে দেশের লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ হারাবে। সরকার বঞ্চিত হবে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব। বন্ধ হয়ে যাবে দেশের অনেক শিল্পকারখানা। পাশাপাশি নির্মাণ শিল্প হবে সম্পূর্ণ ব্যাহত। তাই যেকোনোভাবে এ খাতকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা হবে- সরকারের জন্য চরম আত্মঘাতী ও আত্মশ্লাঘার বিষয়।
সরকারকে শক্তভাবে মনে রাখতে হবে যে, ‘পরিবেশের নামে জাহাজভাঙ্গা শিল্প বন্ধ করা হচ্ছে’ মূলত মিথ্যা প্রচারণা দ্বারা অর্থনৈতিকভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ রেখে এক সময় বাংলাদেশ দখলের জন্য ইহুদী-খ্রিস্টান সাম্রাজ্যবাদীদের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের সোপানকে সফল করে দেয়া।
মূলত ইহুদী লবিং নিয়ন্ত্রিত, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি এবং তাদের মদদকারী তথাকথিত পরিবেশবাদী সংগঠন ও তাদের হাইলাইটকারী মিডিয়া কখনো মুসলমানদের জন্য কল্যাণকামী নয়। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় শত্রু ইহুদী।”
ইহুদীদের প্রটোকলে রয়েছে, তারা অর্থ এবং প্রচারমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে মুসলিম দেশগুলোকে হাতের মুঠোয় রাখবে। সমস্যার বেড়াজালের মূলেও তারা। আবার পরামর্শক রূপেও তারা। ‘সাপ হয়ে কামড়ানো আর ওঝা হয়ে ঝাড়া’র কায়দায় মুসলিম দেশগুলোকে শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রক্রিয়ায় তারা খুব পারদর্শী।

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে