ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত (১-৫৫পর্ব)(ধারাবাহিক)


ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-১

তথাকথিত মুসলমানরা একটি বিষয়ে অর্থহীন গর্ব করে। এই অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে গর্ব করতে গিয়ে তাদের নিজেদের অজান্তেই কুফরী করে থাকে। কোনো হারাম কাজ করে গর্ব প্রকাশ করার অর্থ হচ্ছে নিজেকে লা’নত পাওয়ার উপযুক্ত করা। বিষয়টি হচ্ছে- “সঙ্গীতে এবং কুস্তিতে মুসলমানগণ শ্রেষ্ঠ।” নাঊযুবিল্লাহ!

বাস্তব সত্য হচ্ছে- হারাম বিষয় বাদ দিয়ে সমস্ত প্রয়োজনীয় বিষয় যেমন বিজ্ঞানে, সমরবিদ্যায়, আদর্শে, বুদ্ধিতে, প্রজ্ঞায়, বিচক্ষণতায়, সম্পদে মুসলমানগণ শ্রেষ্ঠ। কিন্তু কাফির-মুশরিকরা অপ্রয়োজনীয় একটি বিষয়ের ফিকির মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। এর নেপথ্য কারণ অনেক দীর্ঘ।

মূর্তি আর বাদ্যযন্ত্রসহ সঙ্গীত ধর্মীয় অনুষঙ্গ হিসেবে হিন্দু ধর্মে মিশে আছে। আর ইসলাম এসেছে মূর্তি এবং বাদ্যযন্ত্র ধ্বংস করতে। বাদ্যযন্ত্রসহ হোক বা বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই হোক- পবিত্র দ্বীন ইসলামে হারাম সঙ্গীতের কোনো স্থান নেই। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম, হযরত ইমাম মুজতাহিদ, ছূফী, দরবেশ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা কখনো সঙ্গীত চর্চা তো দূরে থাক, সঙ্গীতের পাশ দিয়েও হাঁটেননি। অথচ আজকে বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশে মুসলমানগণের মধ্যে সঙ্গীত চর্চা শুরু হয়েছে। নাঊযুবিল্লাহ!

আমাদের ভারত উপমহাদেশে ইসলাম এসেছে হযরত ছাহাবায়ে আজমাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম এবং বিশিষ্ট মুজাদ্দিদ, ছূফী-দরবেশ এবং হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের মাধ্যমে।

এদেশের মুসলমানগণের মাঝে সঙ্গীত চর্চা প্রবেশের নেপথ্যে রয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক গোষ্ঠী, হিন্দু সম্প্রদায় এবং বিভ্রান্ত শাসকশ্রেণী। আমরা পর্যায়ক্রমে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

ইতিহাসের ধুম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-২

৭ম শতকের মুজাদ্দিদ, সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ রহমতুল্লাহি আলাইহি (৫৩৬-৬৩৩ হিজরী) এবং ৮ম শতকের মুজাদ্দিদ, মাহবুব-ই ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি (৬৬০-৭৪৫ হিজরী) ভারতের মাটিতে তাশরীফ নিয়ে আছেন। উনাদের মাজার শরীফ প্রাঙ্গনে ঢোল, তবলা, হারমোনিয়াম বাজিয়ে ছূফী নামধারী একটি বিশেষ বাতিল শ্রেণী কাওয়ালী পরিবেশন করে। এরা নিজেদের চিশতিয়া খান্দানের অনুসারী বলেও দাবি করে থাকে। তাদের এই আচরণে মুসলমানগণের মধ্যে প্রধান দুটি ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। একদল ভাবছে হয় তো প্রকৃতই এই মহান মুজাদ্দিদদ্বয় রহমতুল্লাহি আলাইহিম বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে কাওয়ালী শুনতেন তাই তার ধারাবাহিকতা এখনো বিদ্যমান (নাঊযুবিল্লাহ), অপর দলটি কুরআন শরীফ এবং সুন্নাহ শরীফ-এর দলীলে এসব গায়ক-বাদকদের কাফির ফতওয়া দিচ্ছে এবং মাজার শরীফ যিয়ারতে বাধা এমনকি প্রকৃত ছূফী সম্প্রদায়ের প্রতিও বদআক্বীদা পোষণ করছে। ইনশাআল্লাহ আমরা পর্যায়ক্রমে আলোচনা করবো যে-

১। প্রকৃতই কী উনাদের পক্ষে হারমোনিয়াম তবলাসহ কাওয়ালী শোনা সম্ভব ছিল?

২। যদি সম্ভব না হয়ে থাকে তবে উনারা এবং অন্যান্য ছূফী দরবেশগণ কী শুনতেন?

৩। উনাদের শানে এই বিকৃত তথ্য উপস্থাপনের প্রকৃত কারণ কী?

৪। এই সাজানো মিথ্যা ইতিহাস প্রকাশের নেপথ্যে কারা এবং তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?

৫। সামা কী এবং বর্তমানে তার প্রয়োজনীয় কতটুকু ইত্যাদি।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩

ভারতের আজমীর শরীফ-এ শুয়ে আছেন ৭ম হিজরী শতকের মুজাদ্দিদ, সুলত্বানুল হিন্দ, খাজা গরীবে নেওয়াজ রহমতুল্লাহি আলাইহি (৫৩৬-৬৩৩ হিজরী) এবং দিল্লীতে রয়েছেন ৮ম হিজরী শতকের মুজাদ্দিদ, মাহবুব-ই-ইলাহী হযরত নিযামুদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি (৬৬০-৭৪৫ হিজরী)। এই মহান মুজাদ্দিদদ্বয় সুন্নতের অনুসরণে হামদ-নাত-ক্বাছীদা শুনতেন এবং সামা শরীফ-এর মাহফিলের আয়োজন করতেন। আজকে উনাদের মাযার শরীফ প্রাঙ্গনে আয়োজিত কাওয়ালী অনুষ্ঠান দিয়ে উনাদের সামা শরীফ শোনার বিষয়টি যেমনি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়, তেমনি কিছু কিতাবী ইলম দিয়ে মুজাদ্দিদগণ উনাদের পরিচয় পাওয়া সম্ভব নয়। তবুও আমরা মুজাদ্দিদগণ উনাদের উপর কিছুটা আলোচনা করবো যাতে বোঝা যায় উনাদের পক্ষে কাওয়ালী শোনা কী আদৌ সম্ভব ছিল কিনা। যদিও এ রকম ধারণা করাও আদবের খিলাফ কিন্তু আমাদের লেখার স্বচ্ছতা এবং সাধারণের উপলব্ধিকে শানিত করার লক্ষ্যেই এই চেষ্টা।

হাদীছে কুদছী শরীফ-এ রয়েছে, যা আবূ দাউদ শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে যে, “প্রত্যেক হিজরী শতকের শুরুতে মহান আল্লাহ পাক তিনি একজন মুজাদ্দিদ পাঠাবেন, যিনি দ্বীনের তাজদীদ করবেন।” একজন মানুষ কষ্ট সাধনা করে ওলীআল্লাহ হতে পারেন কিন্তু মুজাদ্দিদ হিসেবে আসা মানুষের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল নয়। মুজাদ্দিদগণ উনারা বিশেষভাবে মনোনীত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যে দ্বীন রেখে গেছেন, মুজাদ্দিদগণ উনারা এর প্রকৃত ওয়ারিছ। উনারা হুবহু সেই দ্বীনকে আবার জাগরিত করেছেন, করে যাচ্ছেন এবং করবেন। সামান্য কমও নয়, বেশিও নয়।

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪

 

হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের যুগের পর প্রথম মুজাদ্দিদ হিসেবে আসেন হযরত ইমাম আবূ হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি। এভাবে ৭ম হিজরী শতকের মুজাদ্দিদ ছিলেন সুলত্বানুল হিন্দ খাজা গরীব নেওয়াজ রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং ৮ম হিজরী শতকের মুজাদ্দিদ ছিলেন মাহবুব-ই ইলাহী হযরত নিযামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি। হাদীছ শরীফ-এ রয়েছে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, “আমি প্রেরিত হয়েছি বাদ্যযন্ত্র ও মূর্তি ধ্বংস করার জন্য।” সুতরাং মুজাদ্দিদগণ উনারা কিভাবে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে কাওয়ালী শোনার বা গাওয়ার অনুমতি দেবেন? এসব বলা এবং ভাবাও চরম পর্যায়ের বেয়াদবি ও কুফরী। উনাদের অন্তরের পবিত্রতা সাধারণের উপলব্ধির বাইরে। কিন্তু যারা নফসের অনুসরণ করে তারাই অবলীলায় বলতে পারে- ভারতে শুয়ে থাকা এই মহান মুজাদ্দিদদ্বয় উনারা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সামা, কাওয়ালী শুনতেন। নাঊযুবিল্লাহ!

মুজাদ্দিদগণ উনারা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সুন্নতের আমল করেন এবং সেই সময়ের অবলুপ্ত সুন্নতগুলোকেও জিন্দা করার চেষ্টা করেন।

ক্বাছীদা শরীফ শোনা, লেখা, পাঠ করা, শোনার আয়োজন করা, উৎসাহ দিয়ে লিখানো সবই খাছ সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মসজিদে নববী শরীফ-এ একটি আলাদা মিম্বর শরীফ বানিয়ে দিয়েছিলেন যেখানে বসে বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত হাসসান বিন ছাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি ক্বাছীদা শরীফ পরিবেশন করতেন এবং পাশের মিম্বর শরীফ-এ বসে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওযা সাল্লাম তিনি তা শুনতেন এবং কখনো আওড়াতেন। মূলত, ৭ম এবং ৮ম হিজরী শতকের মুজাদ্দিদগণ উনারা সেই সুন্নতের হুবহু অনুসরণে ক্বাছীদা বা সামা শরীফ শোনার আয়োজন করতেন। যা সম্পূর্ণ শরীয়তসম্মত এবং খাছ সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৫

মহান আল্লাহ পাক তিনি কুরআন মজীদের সূরা শূয়ারার ২২৪ নম্বর আয়াত শরীফ-এ ইরশাদ করেন, “বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের (মিথ্যুক, অশ্লীল, কুৎসা বর্ণনাকারী) অনুসরণ করে।”

আর একই সূরার ২২৭ নম্বর আয়াত শরীফ বা উক্ত সূরার শেষাংশ যারা ঈমানদার ও নেককার কবিদের উত্তম, রুচিসম্পন্ন ও শরীয়তসম্পন্ন কবিতাসমূহ যে গ্রহণযোগ্য তা বুঝানো হয়েছে। সেখানে উল্লেখ রয়েছে তবে তাদের কথা ভিন্ন, যারা বিশ্বাস স্থাপন করেও সৎকর্ম করে এবং মহান আল্লাহ পাক উনাকে খুব স্মরণ করে।”

ফলে ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করা, লিখা, শোনা, আয়োজন করা মূলত কুরআন শরীফ-এর নির্দেশেরই অন্তর্ভুক্ত। আর যারা সঙ্গীত লিখে, গায়, শোনে তারা মূলত কুরআন শরীফ-এ বর্ণিত বিভ্রান্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। ফলে চিশতিয়া খান্দানের বুযূর্গগণ বিশেষত সুলতানুল হিন্দ খাজা গরিবে নেওয়াজ রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং মাহবুব-ই-ইলাহী হযরত নিযামউদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা কুরআন শরীফ এবং হাদীছ শরীফ-এর অনুসরণে সামার আয়োজন করতেন এবং শুনতেন আর এখন উনাদের মাযার শরীফ প্রাঙ্গনে যারা তবলা-হারমোনিয়াম বাজিয়ে উনাদের শানে মিথ্যারোপ করে কাওয়ালী করছে তারা কুরআন শরীফ-এ বর্ণিত বিভ্রান্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৬

 

চিশতিয়া তরীক্বার যিনি মূল নক্ষত্র সুলতানুল হিন্দ, খাজা গরীবে নেওয়াজ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সামা শুনতেন এবং ব্যাপকভাবে এই সুন্নতের প্রচলন ঘটান। কিন্তু সুন্নতী সামা শরীফ নিয়ে ইতিহাস বিকৃতির (অর্থাৎ বাদ্যযন্ত্রসহ কাওয়ালী পরিবেশনের) উপাদান এসেছে মাহবুব-ই-ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিশিষ্ট মুরীদ, খালিছ আল্লাহ পাক উনার মাহবুব ওলী হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে সঠিক উপলব্ধি না করার কারণে। সমালোচকগণ, হিন্দু ঐতিহাসিকরা পরবর্তীতে অনেক তথাকথিত মুসলিম ঐতিহাসিকরাও উনাকে খেয়ালের জনক, তবলা এবং সিতারের জনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। যা বর্তমানে ইতিহাসের পাতা উল্টালেই দেখা যায়। আর এসব বিভ্রান্তিকর ইতিহাসের কারণে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণের মনে এ রকম ধারণার জন্ম হতে পারে যে, মাহবুব-ই-ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারসহ সামা শুনতেন। নাঊযুবিল্লাহ!

আবার সামার ব্যাপক প্রচলন যেহেতু করেছিলেন সুলতানুল হিন্দ খাজা গরীবে নেওয়াজ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনিও হয় তো এসব যন্ত্রের ব্যবহার অনুমোদন দিতেন। নাঊযুবিল্লাহ!

তাহলে আমরা যদি প্রমাণ করতে পারি যে, হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি খেয়াল গানের জনক নন, তবলা এবং সিতারের আবিষ্কারক নন; এছাড়াও আমরা ইতিহাস থেকে তুলে ধরতে পারি- তিনি প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত উচ্চ শ্রেণীর ওলীআল্লাহ ছিলেন তখন সহজেই এই ভ্রান্তি কাটিয়ে উঠা সাধারণের পক্ষে সম্ভব হবে।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৭

 

হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বাবা ছিলেন তুর্কী বংশোদ্ভূত। আমীর আলাচিন হিসেবে খ্যাত হলেও উনার মূল নাম ছিল সাইফুদ্দিন মাহমুদ শামসী। মহাযালিম চেঙ্গিস খানের আক্রমণের সময় উনার মূল বাসস্থান কেশ (সমরখন্দের নিকট) থেকে বলখে চলে আসেন। তিনি ছিলেন হাজারা এলাকার সর্দার। দিল্লীর শাসনকর্তা শামসুদ্দীন আলতামাশ উনাকে দিল্লীতে আহ্বান করেন এবং এই সম্ভ্রান্ত আমীর এবং বিদ্যান ব্যক্তির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেন। এটা ১২২৬ ঈসায়ী সনের কথা। তিনি বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের ইটাহতে বসবাস শুরু করেন। হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্মানিতা মাতা ছিলেন দিল্লীর অধিবাসী। ১২৫৩ সালে হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি বিলাদত শরীফ লাভ করেন। উনার মূল নাম আবুল হাসান ইয়ামিনউদ্দিন খসরু (১২৫৩-১৩২৫)। উনার সম্মানিত পিতা অধিকাংশ সময় যুদ্ধ-জিহাদে থাকতেন এবং ১২৬০ সালে একটি যুদ্ধে শহীদ হন। হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্মানিতা মাতা ছিলেন অত্যন্ত বিদুষী একজন মহিলা। তিনি উনার এই সন্তানের বিচক্ষণতা, বুদ্ধিমত্তা লক্ষ্য করে উনার ৮ বছর বয়স মুবারকেই বিশিষ্ট মুজাদ্দিদ মাহবুব-ই ইলাহী হযরত খাজা নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুবারক ছোহবতে পাঠান। ৮ বছর বয়স মুবারক থেকেই উনার কাব্য প্রতিভা দেখা দেয়।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৮

 

 

মায়ের আদেশে ৮ বছর বয়স মুবারকে তিনি যখন প্রথম মাহবুব-ই ইলাহী হযরত নিযামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবার শরীফ-এ আসেন। তিনি ভিতরে প্রবেশ না করে বাইরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উনার আধ্যাত্মিকতার বিষয়টি উপলব্ধির জন্য কয়েকটি কবিতার লাইন রচনা করে পাঠ করেন। তিনি বলেন-

(যার ভাবার্থ হলো)- “আপনি এমনি এক শাহেনশাহ, যেখানে একটি কবুতর বাজপাখিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। একজন অত্যন্ত সাধারণ মুসাফির আপনার দরজার ভেতরে প্রবেশ করবে কি করবে না?”

মাহবুব-ই ইলাহী হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এ কথাগুলো শোনার সাথে সাথে একজন খাদিমকে দিয়ে উনার কথার উত্তর দেন। তিনি বলে পাঠান-

(যার ভাবার্থ হলো)- “তুমি একজন বাস্তববাদী মানুষ ভেতরে আসো। তুমি অল্প সময়ের জন্য আমার প্রিয়ভাজন হতে পারো। যদি এ ব্যক্তি বুদ্ধিহীন হয় তবে যে যেভাবে এসেছে সেভাবেই ফেরত যেতে পারে।”

সুতরাং জীবনের শুরুতেই, বাইয়াতের শুরুতেই হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সঙ্গে শায়েখের যে নিছবত ছিল তাতেই উনার হাক্বীক্বী পরিচয় পাওয়া যায়।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৯

মুজাদ্দিদুয যামান, মাহবুব-ই ইলাহী হযরত নিযামউদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সঙ্গে উনার বিশিষ্ট মুরীদ মহান আল্লাহ পাক উনার বিশিষ্ট ওলী, জগদ্বিখ্যাত কবি হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সঙ্গে কী গভীর নিছবত ছিলো তা নিচের ঘটনা শুনলেই বোঝা যাবে।

একদিন এক ভিক্ষুক মাহবুব-ই ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবার শরীফ-এ এসে কিছু সাহায্যের জন্য আবেদন করলো। কিন্তু সে সময় দরবার শরীফ-এ সেই ভিক্ষুককে দেয়ার মতো কিছুই ছিল না। কিন্তু মহান আল্লাহ পাক উনার মহান ওলী খালি হাতে ভিক্ষুককে ফিরিয়ে দিতেও পছন্দ করলেন না। উনার কাছে নিজের এক জোড়া স্যান্ডেল (পাদুকা বা নালাইন) দেখতে পেয়ে তিনি তাই সেই ভিক্ষুককে দান করে দিলেন। ভিক্ষুক সেই মুবারক স্যান্ডেল শরীফ নিয়ে যাওয়ার পথে দূর থেকে তাকে দেখতে পেলেন হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি। হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট তখন বেশ অর্থকড়ি ছিলো এবং মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রীও ছিল। ভিক্ষুক উনার কাছে আসতেই তিনি বলে উঠলেন’ ‘ওহে ভিক্ষুক তোমার কাছে আমার শায়েখ উনার খুশবু পাই।’ ভিক্ষুক সব খুলে বললে হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অর্থ বা মূল্যবান উপঢৌকনের বিনিময়ে স্যান্ডেল মুবারক ফেরত নিয়ে নেন। তিনি সেই স্যান্ডেল মুবারকসহ আবার উনার শায়েখ হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবার শরীফ-এ গিয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন, তখন মাহবুব-ই ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেছিলেন, “হে আমীর খসরু! তুমি অতি সস্তায় এ স্যান্ডেল ফেরত নিয়েছো।”

এ ঘটনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে বিশিষ্ট মুজাদ্দিদ মাহবুব-ই ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সঙ্গে উনার বিশিষ্ট মুরীদ হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি উনার কী নিবিড় আত্মিক যোগ ছিল! এই আত্মিক বিকাশসম্পন্ন ওলীআল্লাহগণ উনাদের সম্পর্কে কাফিররাই অপবাদ ছড়ায় যে, উনারা হারমোনিয়াম-তবলাসহ কাওয়ালী শুনতেন। নাঊযুবিল্লাহ!

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-১০

 

মহান আল্লাহ পাক উনার বিশিষ্ট ওলী হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পক্ষে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে কাওয়ালী করা এবং তবলা এবং সেতার যন্ত্র আবিষ্কার করা যে সম্ভব নয়, তা উনার তাক্বওয়া, পরহেযগারী এবং উনার শায়েখের সঙ্গে নিছবতের বিষয়টি বুঝলে সহজেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আজকে উনার আরো একটি মুবারক ঘটনা এখানে তুলে ধরছি।

বিশিষ্ট মুজাদ্দিদ, মাহবুব-এ ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ক্ষমতাবান লোকদের থেকে, বিশেষ করে দিল্লীর সুলতানদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেন। এক সময় দিল্লীর সুলতান জালালউদ্দিন খিলজী হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে ডেকে সেই সময়কার মহান আল্লাহ পাক উনার লক্ষ্যস্থল ওলী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি উনার সাথে দেখা করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। সুলতান নিজেই দিনক্ষণ ঠিক করেন কিন্তু সেই দিন তারিখ হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে জানাতে নিষেধ করেন। কিন্তু হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এই সংবাদ হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে জানিয়ে দিলে তিনি ভিন্ন জায়গায় চলে যান। ফলে সুলতান গিয়ে আর দেখা পাননি। পরে জালালউদ্দিন খিলজি হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে ওয়াদা ভঙ্গের কারণ জিজ্ঞাসা করলে হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সুলতানকে উত্তর দেন ‘সুলতানের সাথে ওয়াদা ভঙ্গ করাতে শাস্তিস্বরূপ আমার জীবন সংহার হতে পারে- তবে আমার মুর্শিদের সাথে একই রকম আচরণ করলে আমার ঈমানহানি হবে এবং পরকালে এর জবাবদিহি করতে হবে।’ এ ঘটনাটি হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার তাক্বওয়া, পরহেযগারী এবং উনার শায়েখের সঙ্গে হৃদ্যতার বিষয়টি বোঝার জন্য যথেষ্ট।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-১১

 

 

যে সকল বদআক্বীদার লোক মাহবুব-ই-ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে কাওয়ালী করেছেন, সামা করেছেন বলে অপপ্রচার চালায় এবং এই অজুহাতে নিজেরাও এ সমস্ত হারাম কাজে লিপ্ত রয়েছে তাদের জবাব দেয়ার জন্য নিচের ঘটনাটিই যথেষ্ট।

একবার হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবার শরীফ-এ সামা শরীফ-এর অনুষ্ঠান হচ্ছিল। সেই সামা শরীফ-এর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি। সামা শরীফ শুনতে শুনতে হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাঝে হাল সৃষ্টি হয়ে যায় এবং উনার অজান্তেই তিনি দাঁড়িয়ে শরীর দোলাতে থাকেন। উনার এ অবস্থা দেখে হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে এভাবে দুলতে বারণ করলেন এবং শিখিয়ে দিলেন এ অবস্থায় হাত উঠিয়ে মুনাজাতের ভঙ্গিতে দোয়া করতে এবং পা দ্বারা মাটিতে মাঝে মাঝে আঘাত করতে। পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করার অর্থ হচ্ছে পৃথিবীর মায়া-মোহকে পরিত্যাগ করা।

তাহলে আমরা দেখতে পেলাম, সামা শরীফ শুনে হাল উঠলে এবং তাতে শরীর দুলালে যাতে নাচের মতো মনে না হয় এ বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিলেন মাহবুব-ই ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি। ফলে তিনি কী করে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সামা করার অনুমতি দিতে পারেন? মূলত নফসের পূজারীরাই এ সমস্ত অপপ্রচার চালায়।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-১২

হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বলা হয় খেয়ালের জনক, তবলা এবং সেতার যন্ত্রের আবিষ্কারক। নাঊযুবিল্লাহ!

কিতাবের পাতা উল্টালেই শুধু এই ইতিহাস চোখে পড়বে। আর সে কারণেই আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি বিশিষ্ট মুজাদ্দিদ, মাহবুব-এ-ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সঙ্গে হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কী গভীর নিছবত ছিল এবং উনার তাক্বওয়া, পরহেযগারী কোন পর্যায়ের ছিল- আজকে আমরা আরো একটি বিষয় তুলে ধরবো। আশা করি যে কোনো বুদ্ধিমান এবং নেকবখত মানুষের জন্য এ ঘটনাই যথেষ্ট।

নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক বিছাল শরীফ-এর মাত্র ছয় মাস পর বিছাল শরীফ লাভ করেন খাতুনে জান্নাত, উম্মু আবিহা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম। এই ছয় মাস তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ইশকের মধ্যেই গরক ছিলেন।

সেই সুন্নতের অনুসরণ দেখতে পাই হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জীবনে। মাহবুব-এ-ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বিছাল শরীফ লাভ করার মাত্র ছয় মাস পর বিছাল শরীফ লাভ করেন হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি।

বলা হয়, যদি শরীয়তে একই মাজার শরীফ-এ দু’জনকে রাখা জায়িয এবং আদব হতো তবে হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে উনার শায়েখের মাজার শরীফ-এই রাখা হতো। কিন্তু হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার শায়েখ হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাযার শরীফ-এর পাশেই শায়িত আছেন। একজন সঙ্গীত শিল্পী, বাদক, বাদ্যযন্ত্রের উদ্ভাবক কখনো একজন মহান মুজাদ্দিদ উনার পাশে অবস্থান করার যোগ্যতা রাখে না। বরং তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার খালিছ ওলী ছিলেন এবং হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অত্যন্ত সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত মুরীদ ছিলেন।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-১৩

 

যে সকল ঐতিহাসিকরা হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে খেয়ালের জনক, তবলা ও সেতারের আবিষ্কারক বলেছে, তারা সুনির্দিষ্টভাবে ইতিহাসের সত্যতা প্রমাণ করতে পারেনি। তারা ইতিহাস রচনার সময় ‘বলা হয়ে থাকে’, ‘ধারণা করা হয়’ এভাবে বাক্য ব্যবহার করেছে। যে বিষয়গুলো ঐতিহাসিকদের মধ্যে ধারণার জন্ম দিয়েছে যে তিনি বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ‘খেয়াল’ গাইতেন, তবলা আবিষ্কার করেছেন- সে বিষয়গুলো আমরা পর্যায়ক্রমে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

প্রথম কারণ: ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল ‘ধ্রুপদ’ জাতীয় সঙ্গীতের। মন্দিরে হিন্দু ধর্মীয় সঙ্গীত হিসেবে ধ্রুপদ পরিবেশন করা হতো। কিন্তু ধারণা করা হয় হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সময় থেকে শুরু হয় খেয়াল গানের। আর খেয়াল গানের ঢং হচ্ছে পারস্যের সঙ্গীতের মতো। আর হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বাবা যেহেতু পারস্য থেকে এসেছেন, তাই ধরে নেয়া হয় তিনিই পারস্য সঙ্গীতের অনুকরণে খেয়ালের প্রবর্তন করেন। নাঊযুবিল্লাহ!

দ্বিতীয় কারণ: ‘খেয়াল-এর মধ্যে থাকে- দুই প্রেমাস্পদের মধ্যে কথোপকথন। সেখানে কথায় একটি আবেগকে ফুটিয়ে তোলা হয়। হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার রচিত সকল সাহিত্যকর্মকে চারভাগে ভাগ করা হয়েছে তার মধ্যে একটি ভাগ হচ্ছে ‘রোমান্টিক’ রচনা। আর এ বিষয়টির গূঢ় অর্থ না বোঝার কারণে ঐতিহাসিকরা বিভ্রান্ত হয়েছে।

তৃতীয় কারণ: সে সময়কার রাজা-বাদশাহদের দরবারে কাব্য ও সঙ্গীত চর্চা আয়োজন ছিল। হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জীবদ্দশায় মোট ৭ জন বাদশাহ রাজকবি হিসেবে মনোনীত ছিলেন। ফলে ঐতিহাসিকরা ধরে নিয়েছে তিনি রাজ দরবারে সঙ্গীত লিখে, সুর করে বাদ্যযন্ত্রসহ পাঠ করতেন। নাঊযুবিল্লাহ!

চতুর্থ কারণ: বাজারে অনেক ক্বাছীদা, কাওয়ালী পাওয়া যায়, যার রচয়িতা হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং সেগুলো বাদ্যযন্ত্রসহ পাঠ করা হয়। এ বিষয়টিতেও বিভ্রান্ত হয়েছে ঐতিহাসিকরা।

পঞ্চম কারণ: হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অনুমতিক্রমে হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সামা পরিবেশনে একটি নিজস্ব পদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন আর তাতেই ঐতিহাসিকরা বিভ্রান্ত হয়েছে যে, তিনি হয়তো খেয়াল গানের জনক ছিলেন। নাঊযুবিল্লাহ!

ষষ্ঠ কারণ: মুসলমানগণকে আউলিয়া কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য এবং উনাদের শানে অপবাদ দেবার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে মুসলমান বিদ্বেষী ঐতিহাসিকরা ইতিহাস বিকৃতি করেছে।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-১৪

 

 

ভারতবর্ষে ‘ধ্রুপদ’ জাতীয় সঙ্গীতের প্রচলন ছিল। মন্দিরে হিন্দুদের ধর্মীয় সঙ্গীত হিসেবে ‘ধ্রুপদ’ গাওয়া হতো। পরবর্তীতে ভারতে ‘খেয়াল’-এর প্রচলন ঘটে। খেয়ালের ঢং যেহেতু পারস্য অঞ্চলসমূহের সঙ্গীতের মতো, তাই ধারণা করা হয়- ‘খেয়াল’-এর জনক হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি। নাঊযুবিল্লাহ!

অথচ ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পিতা তুরস্ক-বলখ হয়ে ভারতের উত্তর প্রদেশে আসেন। তিনি কখনো সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন উনার এলাকার আমীর। আর হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ভারতেই জন্মগ্রহণ করেন এবং উনার মাতা বিবি দৌলতনাজ ছিলেন দিল্লীর অধিবাসী। হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ৮ বছর বয়স মুবারক থেকে হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুবারক ছোহবত পান। তাহলে যিনি পারস্যের সংস্কৃতির পরিচয় পাননি, যিনি ৬ বছর বয়স মুবারকে বাবা হারিয়ে মাত্র ৮ বছর মুবারক থেকে মাহবুব-ই ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ছোহবত পান, তিনি কী করে পারস্য সঙ্গীতের অনুকরণে ‘খেয়াল’-এর জন্ম দিতে পারেন? কী করে তা ধরে নেয়া যায়?

সাধারণত একজন সন্তান মায়ের ভাষা এবং সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকেন। যদি হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্মানিতা মাতা পারস্যের অধিবাসী এবং সাংস্কৃতিক পরিম-লে বড় হওয়া মানুষ হতেন তবুও কিছু যুক্তি দেয়া যেতে পারতো। কিন্তু উনার মাতা ছিলেন দিল্লীর এবং আল্লাহওয়ালী। সঙ্গীতের কোনো ছোঁয়া হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে স্পর্শ করতে পারেনি। সুবহানাল্লাহ

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-১৫

হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সমগ্র জীবনের সাহিত্যকর্মকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়-

১. দিওয়ান রচনা: কবিতাসমগ্র যেমন তুহফাত-উস-সিগার, ওয়াসতুল হায়াত ইত্যাদি।

২. ঐতিহাসিক রচনা: যেমন মিফতা-উল-ফাতহ। বাদশাহ জালালউদ্দিন খিলজীর চারটি বিজয় অভিযানের উপর রচিত।

৩. গদ্য রচনা: আফজালুল ফায়িয হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি উনার কর্তৃক দেয়া তালিমের উপর রচিত।

৪. রোমান্টিক রচনা: হাশত-বেহেশত, শিরিন ওয়া খসরু, মজনু ওয়া লাইলী ইত্যাদি।

উনার রচিত কিতাব সংখ্যা অনেক। এখানে উদাহরণের জন্য কয়েকটি নাম প্রকাশ করা হলো। তবে আমাদের আলোচ্য বিষয় উনার রোমান্টিক রচনাবলী নিয়ে। ঐতিাহিসকরা উনার রোমান্টিক রচনাবলীগুলোকে দুনিয়াবী প্রেমপ্রীতির বিষয় ধারণা করে, বস্তুগত প্রেম-ভালোবাসার গান, ‘খেয়াল’ রচনা মনে করে উনাকে ‘খেয়াল’-এর জনক, বাদ্যের আবিষ্কারক ইত্যাদি ভাবতে সাহস দেখিয়েছে। ঐতিহাসিকদের বিভ্রান্ত হবার একটা মূল কারণ এখানে তুলে ধরা প্রয়োজন মনে করছি।

হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার রোমান্টিক রচনাসমগ্রকে বলা হয় ‘খামছা-এ-নিযামী’ এবং রচনাকাল ১২৯৮। সেখানে তিনি পাঁচটি অধ্যায় রচনা করেন।

১. হাশত- বেহেশত

২. মাতলাউল আনওয়ার

৩. শিরিন ওয়া খসরু

৪. মাজনু ওয়া লাইলী

৫. আয়না-ই সিকান্দারী।

কিন্তু উনার আরো অনেক আগে ১১৪১-১২০৯ ঈসায়ী সালে বৃহত্তম পারস্যের আজারবাইজান অঞ্চলের কবি নিযাম গানজাবী (নিযামউদ্দিন আবু মুহাম্মদ ইলিয়াস বিন ইউসুফ বিন যাক্কি) তিনি প্রথম ‘খামছা-এ-নিযামী’ রচনা করেন। তার রচনাসমগ্রের মধ্যে ছিল ১. মাখযান আল আসরার ২. খসরু ও শিরিন ৩. লাইলী ও মজন ৪. ইস্কান্দার নামা ৫. হাপ্ত পেকার। কিন্তু নিযামী গানজাবী কোনো দরবারের কবি ছিল না এবং তার এই রচনা ছিল মূলত বস্তুগত প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে। আর এখানে নিযামী হলো লেখক নিজেই। পরবর্তীতে পারস্যের এবং অন্যান্য অঞ্চলের কবিগণ নিযামী গানজাবীর এই ধারা অনুযায়ী পাঁচ অধ্যায়ের রচনাসমগ্র তৈরি করেছিলেন। হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি তার ব্যতিক্রম নন। তবে তিনি উনার কিতাবের নামকরণ করেছিলেন উনার শায়েখ হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নাম মুবারক-এ এবং উনার রচনা বিষয় ছিল মহান আল্লাহ পাক উনার ইশক, শায়েখের নিছবত সেসব বিষয়ে। ঐতিাহিসকগণ তা ‘খামছা-এ নিযামী’ নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকেও সস্তা রোমান্টিক গানের, ‘খেয়াল’-এর রচয়িতা হিসেবে অপব্যাখ্যা করেছে। নাঊযুবিল্লাহ!

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-১৬

আমরা দেখতে পাই অনেক মুসলিম ছূফী কবি-সাহিত্যিক উনারা মুরীদ এবং শায়েখের নিছবতের বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে বান্দা এবং মহান আল্লাহ পাক উনার মধ্যে গভীর ইশকের বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে ‘সুরা-সাকী’ এবং নানা রকম কল্পিত বিষয় উপমা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার রচিত ‘মজনু ওয়া লাইলী’, ‘শিরিন ওয়া খসরু’ ইশকের গভীরতার উপর রচিত। উনার রচিত এই রোমান্টিক রচনাসমূহ থেকে তারা ধারণা করেছে তিনি ‘খেয়াল’-এর জনক। কেননা ‘খেয়াল’-এর মধ্যে থাকা দুই প্রেমাস্পদের কথোপকথন। দুই থেকে আট লাইনের মধ্যে থাকে ‘খেয়াল’-এর কথাগুলো। কাল্পনিক একটি বিষয়কে ফুটিয়ে তোলা হয় ‘খেয়াল’-এর মাধ্যমে।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যারা শায়েখ এবং মুরীদের বিষয়টি বোঝে না, মহান আল্লাহ পাক এবং উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের মা’রিফাত মুহব্বতের বিষয়টি বোঝে না তারা হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ইশকের উপর রচিত সাহিত্যকর্মকে রোমান্টিক কর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করবে এবং ‘খেয়াল’-এর জনক বলবে- এটাই স্বাভাবিক। কেননা যে যেমন সে আরেকজনকে তেমনি বিবেচনা করবে।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-১৭

হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুবারক জীবদ্দশায় দিল্লীতে তিনটি রাজবংশের শাসন পান। প্রথমত মামলুক (১২০৬-১২৯০) দ্বিতীয়ত খিলজী বংশ (১২৯০-১৩৩০), তৃতীয়ত তুঘলক বংশ (১৩২১-১৩৯৮)

তিনি মামলুক বংশের শেষের দিকের সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের ভাতিজা এবং একটি প্রদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত গভর্নর মালিকে কাজুর দরবারের কবি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি গিয়াসউদ্দিন বলবনের ছেলে বুগরা খান বাংলার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পেলে তার দরবারের কবি হিসেবেও নিয়োজিত হন এবং বাংলা ছফর করেন। বলবনের দ্বিতীয় ছেলে সুলতান মাহমুদ তিনি মুলতানের দায়িত্ব পেলে হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে মুলতান নিয়ে যান। এর পরেই আসে খিলজী বংশ এবং তিনি দিল্লীতেই থেকে যান। খিলজী বংশের অনেক শাসকের শাসনামল পর্যন্ত তিনি দরবারের কবি হিসেবেই সম্মানিত ছিলেন। এরপরে আসে তুঘলক বংশ তুঘলক বংশের প্রথম সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক এবং দ্বিতীয় সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলক। মুহম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে মাহবুব-এ ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বিছাল শরীফ লাভ করেন এবং উনার বিছাল শরীফ-এর প্রায় ৬ মাস পর তিনিও বিছাল শরীফ লাভ করেন।

আমরা দেখতে পেলাম ক্ষমতার পট পরিবর্তনে নতুন রাজবংশ ক্ষমতায় এলেও তিনি দরবারের কবি হিসেবেই সম্মানিত ছিলেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন প্রদেশের গর্ভনরগণ উনাকে সভার কবি হিসেবে পেতে চাইতেন এবং সঙ্গে নিয়ে যেতেন। হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বেমেছাল যোগ্যতা, প্রতিভা, তাক্বওয়া, পরহেযগারী সবাইকে আকৃষ্ট করতো। তিনি একাধারে ফার্সী, হিন্দাভী এবং ব্রিজ ভাষায় (উত্তর প্রদেশে চালু এক প্রকার ভাষা) সাহিত্য রচনা করতেন। উনাকে উর্দু ভাষার জনকও বলা হয়। তিনি রাজ দরবারের কবি ছিলেন বলেই সঙ্গীত চর্চা করতেন, বাদ্য বাজাতেন, খেয়াল গেয়েছেন, রচনা করেছেন এসব বলা অবান্তর। রাজ দরবারের কবি থাকাতে ঐতিহাসিকরা বিভ্রান্ত হয়েছে অথচ কোনো ইতিহাস প্রমাণ করেন না তিনি সঙ্গীতের ধারে কাছেও ছিলেন। কিন্তু অসংখ্য মাসনাবী, কাছীদা রচনা করেছেন, ইতিহাস রচনা করেছেন, উনার শায়েখের নছীহত সঙ্কলন করেছেন এসবের প্রমাণ আজও বিদ্যমান। তিনি যে সুলতানদের তোয়াজ করে চলতেন না তার প্রমাণ পাওয়া যায় সুলতান জালালউদ্দিন খিলজীর ঘটনায়।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-১৮

হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি একজন ছূফী-সাধক। মহান আল্লাহ পাক উনার খালিছ ওলী হওয়ার পরেও গান-বাজনা করেছেন, বাজনা বাজিয়েছেন- এ অজুহাত দিয়ে যে সকল তথাকথিত মুসলমানরা গান-বাজনা চর্চা করে যাচ্ছে, তাদের বিভ্রান্তির পেছনে দায়ী কিছু মুসলমান নামধারী ছূফী, সঙ্গীতশিল্পী, অনুবাদক এবং সাহিত্যিক। যেমন বাজারের সঙ্গীতশিল্পীরা নিজেরাই তাদের মতো করে সুর করে হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার লিখা অনেক কাছীদা বাদ্যযন্ত্রসহ গেয়েছে এবং এখনো গাইছে। অথচ এই সুর উনার দেয়া নয়।

আবার অনেক তথাকথিত ছূফী এবং সাহিত্যিক উনার অনেক লেখার মধ্যে নিজেদের মতো করে বাক্য সংযুক্ত করেছে। এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য, ‘নামি দানাম চে মানজিল’ এই শিরোনামে একটি কাছীদা। বর্তমানে বাজারে পাওয়া এই কাছীদা শরীফ-এর মধ্যে অনেক নতুন বাক্য আছে, যা মূল কাছীদা শরীফ-এ নেই।

এছাড়াও ‘জিহাল-এ-মিসকিন’ এই শিরোনামে লেখাটি তিনি ফার্সী এবং ব্রিজ ভাষার সমন্বয়ে লিখেছিলেন। একটি লাইন ফার্সীতে পরের লাইন ব্রিজ ভাষায়। অথচ বাজারে একই শিরোনামে, অনুকরণে এবং একটি ভাষায় লেখা পাওয়া যায়, যা লিখেছে অন্য এক লেখক।

আবার ‘চাপ তিলক সাব চেনি রে মুঝে নায়না মিলাকে’ এই শিরোনামে লিখা হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার লিখিত একটি কাছীদা পড়লে মনে হয় যেন একজন প্রেমিক তার প্রেমাস্পদকে উদ্দেশ্য করে বলছে। অথচ এই কাছীদার মধ্যে তিনি উনার শায়েখের নাম যুক্ত করে বুঝিয়েছেন এটি হচ্ছে শায়েখের প্রতি মুরীদের ইশক। কিন্তু সঙ্গীতশিল্পীরা তাদের দিলের চরম নাপাকির কারণে এই কাছীদা শরীফকে রোমান্টিক গানের মতো পরিবেশন করে থাকে। নাঊযুবিল্লাহ!

আর অনুবাদকদের জন্য বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে শতগুণে। যেমন সামার অনুবাদে অনুবাদকগণ সামা শরীফকে গান হিসেবে উল্লেখ করেছে। নাঊযুবিল্লাহ!

সামা শরীফ পরিবেশনের বিশেষ উপস্থাপনকে ‘রাগ’ পরিবেশন হিসেবে উল্লেখ করেছে। নাঊযুবিল্লাহ!

সামা শরীফ শুনে দাঁড়িয়ে মত্ততা বা হাল প্রকাশকে নাচের সাথে তুলনা করেছে ইত্যাদি। নাঊযুবিল্লাহ!

এ বিষয়গুলো আমাদের আবারো মনে করিয়ে দেয় ‘যে দেখে আর যে দেখে না, তা কখনো সমান হয় না।’

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-১৯

মুজাদ্দিদগণ উনারা সুন্নতকে প্রতিষ্ঠান করেন এবং বিদয়াত দূর করেন। এছাড়াও মুজাদ্দিদগণ উনারা উনাদের নিজ নিজ যুগে যদি নতুন কোনো বিষয় উপস্থিত হয়, যা পূর্বে ছিল না সেক্ষেত্রে শরীয়তসম্মত পথে ইজতিহাদ করে তা প্রতিষ্ঠা করেন।

ভারতবর্ষে হিন্দুরা মন্দিরে ধর্মীয় সঙ্গীত হিসেবে ধ্রুপদ গাইতো। ধ্রুপদ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। সুলত্বানুল হিন্দ খাজা গরীবে নেওয়াজ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সময় থেকেই দলে দলে হিন্দুরা মুসলমান হতে থাকে। হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবার শরীফ-এও অসংখ্য বিধর্মী এসে ঈমান লাভ করেছিলো। কিন্তু যেহেতু ইসলামে গান-বাজনার কোনো সুযোগ নেই; কিন্তু সামা শরীফ বা কাছীদা শরীফ-এর সুযোগ ছিল; তাই সুন্নতের অনুসরণে উনারা সামা শরীফ শুনতেন। কিন্তু হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সামা শরীফ পরিবেশনের একটি নতুন পদ্ধতি উপহার দিয়েছিলেন, যা বাদ্যযন্ত্রহীন এবং রাগ-রাগিনী বিবর্জিত। মাহবুব-ই ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি নিজেও ‘রুবাইয়া’ এবং ‘মাসনবী’ পাঠ করতেন।

কিন্তু হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বিভিন্ন ভাষার সমন্বয়ে, বিভিন্ন অলঙ্কারে কাছীদা, কবিতা, মাসনবী রচনা করতেন। সূর দিয়ে পাঠ করার মধ্যেও নতুন বৈচিত্র্যতা এনেছিলেন। আর সেটাই উপলব্ধি না করে বিভ্রান্ত ঐতিহাসিকরা উনাকে ‘খেয়াল’-এর জনক বলেছে। উনাদের পক্ষে গান-বাজনা শোনা যে কস্মিনকালেও সম্ভব নয়, তা একটি ঘটনা শুনলেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি নিজেই উনার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রাহাতুল মুহিব্বীন’-এ বর্ণনা করেন যে, উনার শায়েখ একদিন ইরশাদ করেন, “হযরত শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বাসনা ছিলো শয়তানকে দেখবেন। এক রাত্রে শয়তানেক তিনি দেখতে পেয়ে ভীত হয়ে পড়লেন। হযরত শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি শয়তানকে কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলেন; তার মধ্যে একটি ছিলো, মহান আল্লাহ পাক উনার পথের পথিকদের উপর তোর কোনো কর্তৃত্ব চলে কিনা? উত্তরে ইবলিস বলেছিলো- যখন সামা শরীফ-এর মাহফিলে সে মহান আল্লাহ পাক উনার ছাড়া অন্য কারো সন্তুষ্টিতে গান শ্রবণ করে, তখন তার অন্তর অমনোযোগী হয়ে পড়ে, তখন আমি আমার কর্তৃত্ব চাপিয়ে পরাস্ত করি।” নাঊযুবিল্লাহ!

এ ঘটনা থেকে সহজেই বোঝা যায় উনারা শুধু মহান আল্লাহ পাক উনার ইশকে নিমজ্জিত হয়েই সামা শরীফ শুনতেন। আর যেখানে সঙ্গীত এবং বাদ্যযন্ত্রের সুর অন্তরে নেফাকী সৃষ্টি করে, সেখানে কী করে উনারা সঙ্গীত চর্চা, বাদ্যচর্চা করতে পারেন? নাঊযুবিল্লাহ! শুধু কাফিররাই এ ধরনের অপবাদ ছড়াতে পারে।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-২০

 

 

শত শত বছর ভারতবর্ষ মুসলমান শাসকদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। হিন্দু কুচক্রীরা সবসময়ই ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে। মুসলমান শাসকদের হাত থেকে ক্ষমতা সরিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে, মুসলমানগণের উন্নত চরিত্রকে কলুষিত করার ক্ষেত্রে, মুসলমানগণের স্থাপত্য শিল্পে অবদান নষ্ট করার ক্ষেত্রে, সর্বোপরি ইসলামকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য অতীতে চলেছে এবং বর্তমানেও চলছে তাদের এই কূটকৌশল। মুসলমানগণের ইতিহাসকেও তারা বিকৃত করেছে পরিকল্পিতভাবে। আর এক্ষেত্রে রাজা-বাদশাহরা তো রয়েছেই, ভারতবর্ষে আসা ওলীআল্লাহগণ উনাদেরকে তারা সমালোচনার লক্ষ্যস্থলে পরিণত করেছে। মুসলমানগণ যেন ছূফী-দরবেশ, ওলীআল্লাহগণ উনাদের কাছ থেকে দূরে থাকে- সে কারণে পরিকল্পিতভাবে মুনাফিকদের দ্বারা উনাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার সৃষ্টি করা হয়েছে। সুলত্বানুল হিন্দ খাজা গরীবে নেওয়াজ রহমতুল্লাহি আলাইহি, মাহবুব-ই ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা বাদ্যযন্ত্রসহ গান-বাজনা, কাওয়ালী শুনতেন- এসব কথা হচ্ছে ইতিহাসের চরম মিথ্যাচারিতা।

নামে মুসলমান কিন্তু হালাল-হারাম বাছ-বিচার করে না; যাদের আক্বীদা বিনষ্ট, বল্গাহীন চলাফেরা তাদের ব্যাপারে আমাদের এই আলোচনা নয়। কিন্তু যারা মুসলমান হিসেবে দাবি করে, ইসলামের উপর টিকে থাকতে চান কিন্তু বাদ্যযন্ত্রসহ সঙ্গীতকে হালাল মনে করেন এ কারণেই যে, পূর্বযুগের অনেক আউলিয়ায়ে কিরাম বাদ্যযন্ত্রসহ সামা শরীফ শুনতেন বলে বিশ্বাস করেন, তাদের জন্যই আমাদের এই আলোচনা।

আমরা প্রথমেই আলোচনা করেছি, এ রকম বিশ্বাসীরা তাদের বিশ্বাসের উপাদান সংগ্রহ করেছে হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিশিষ্ট মুরীদ হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জীবন ইতিহাস থেকে। উনার প্রতি অপবাদ দেয়া হয় যে, তিনি তবলা, সেতার, খেয়াল-এর জনক এবং উনারা বাদ্যযন্ত্রসহ কাওয়ালী করতেন।  নাঊযুবিল্লাহ! আমরা প্রথমে আলোচনা করেছি একজন মুজাদ্দিদ উনার পরিচয় সম্পর্কে এবং উনাদের আগমনের তাৎপর্য কী? এরপর আলোচনা করেছি বাল্য বয়স থেকেই একজন মুজাদ্দিদ উনার নেক ছোহবত প্রাপ্ত মানুষ এবং যিনি উচ্চ তাক্বওয়া পরহেযগারীসম্পন্ন এবং যিনি উনার কিতাবেই সঙ্গীতের বিরুদ্ধে আলোচনা করেছেন- তিনি কখনো সঙ্গীত শ্রবণ করতে পারেন না, বাদ্যযন্ত্র বানাতে পারেন না। আমরা এরপর তুলে ধরেছি অনেকগুলো কারণ; ঐতিহাসিকরা যে কারণে বিভ্রান্ত হয়েছে, উনাদের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে। আগামীতে আমরা আলোচনা করবো প্রকৃতপক্ষে ‘খেয়াল’ এবং ‘তবলা’র উৎপত্তি কোন সময় থেকে।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-২১

হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যে ‘খেয়াল’ সৃষ্টি করেননি তা ইতিহাস থেকেই সহজে প্রমাণ করা যায়।

একটি ইতিহাসে লেখা হয় ‘১৬ শতকে আমীর খসরু খেয়ালের রীতি বা ঢং চালু করেন এবং তারপর মুগল সম্রাট মুহম্মদ শাহ রঙ্গীল (১৭১৯-১৭৪৮ ঈসায়ী)-এর দরবারের সঙ্গীত শিল্পী সদারং, আদারং এবং মানরং-এর দ্বারা ব্যাপক প্রচলন ঘটে।” এই ইতিহাস থেকে দুটি বিষয়ে প্রশ্ন আসতে পারে যে,

১. হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সময়কাল হচ্ছে ১২৫১-১৩২৫ ঈসায়ী। তাহলে ১৬ শতকে তিনি কিভাবে ‘খেয়াল’ আবিষ্কার করলেন?

২. যদি ১৬ শতকে আমীর খসরু ‘খেয়াল’ আবিষ্কার করে থাকে, তবে কী সে ভিন্ন কোনো আমীর খসরু?

এবার আমরা অন্য একটি ইতিহাসে তাকাই। “১৭০০ সালের শুরু দিকে দিল্লীর নিয়ামত খাঁন ‘খেয়াল’ তৈরি করেন এবং ১৮ শতকে হাঁসু খান এবং হাদ্দু খান নামে গোয়ালিয়রের দুই ভাইয়ের মাধ্যমে এর প্রচার লাভ করে।”

এই ইতিহাস থেকে আবারো দেখা গেলো ‘খেয়াল’-এর জন্ম হয়েছে ১৬ শতক এবং ১৭ শতকের মধ্যে অর্থাৎ হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সময়কালে নয়।

আবার অন্য এক ইতিহাসে পাওয়া যায় “জৈনপুর-এর রাজা সুলতান হুসেইন শাহ শারকী ১৪৫২-১৪৮৯ ঈসায়ী সাল পর্যন্ত শাসন করেন এবং সে সময় নতুন ধরনের ‘খেয়াল’-এর সৃষ্টি হয় এবং তিনি কাওয়ালী চালু করেন। আমীর খসরু নামীয় একজন এসব চালু করেন।”

এইp ইতিহাসে থেকে আমরা যে সিদ্ধান্তগুলোতে আসতে পারি তা হচ্ছে-

১. এখানেও সময়কাল পাওয়া যাচ্ছে ১৫ শতক অর্থাৎ হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সময়কালের প্রায় ১২৭ বছর পর।

২. কিন্তু এই সময়ে আমীর খসরু নামীয় একজন ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে।

আবার অন্য এক ইতিহাসে পাওয়া যায় ১৮ শতকে ফকীর আমীর খসরু নামে একজন সঙ্গীত শিল্পী ছিলো যে সম্রাট আকবরের নবরতেœর একজন মিয়া তানসেনের মেয়ের জামাই নহবত খানের বংশধর।

উল্লেখিত ইতিহাস থেকে প্রকৃতপক্ষে কে ‘খেয়াল’ তৈরি করেছেন এবং কারা প্রচার করেছেন তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো না গেলেও একটি বিষয়ে কোনো মতপাথর্ক্য নেই যে হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সময়কালে অর্থাৎ ১২৫১ থেকে ১৩২৫ সালে কোনো ‘খেয়াল’-এর সৃষ্টি হয়নি। বরং ইতিহাস থেকে জানা যায়, তিনি সামা শরীফ পরিবেশনের একটি রীতি চালু করেছিলেন। কিন্তু ‘সামা’ শরীফ আর ‘খেয়াল’ এক বিষয় নয়। সামা হালাল আর খেয়াল হারাম। সামা শরীফ-এ থাকে মহান আল্লাহ পাক উনার ইশকের বিষয় আর খেয়ালে থাকে বস্তুগত প্রেম-ভালোবাসার বিষয়। আমরা বলবো পরিকল্পিতভাবে এই ইতিহাস বিকৃতি ঘটানো হয়েছে, যাতে একজন মহান ওলীআল্লাহ উনার সম্পর্কে মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায়। নাঊযুবিল্লাহ!

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-২২

 

আজ আমরা ইতিহাস থেকেই প্রমাণ করবো যে হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সিতার এবং তবলা যন্ত্রের আবিষ্কারক নন। এসব বাদ্যযন্ত্রের আবিষ্কারক বলার অর্থ হচ্ছে উনার প্রতি মিথ্যারোপ করা।

প্রাচীন চিত্র এবং তথ্য প্রমাণ করে যে, ইসলাম আসার পূর্ব থেকেই ভারতবর্ষে ধর্মীয় উৎসবগুলোতে সিতারের মতো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হতো। প্রকৃতপক্ষে ভারতে বীণা এবং সেনী- রবাব নামক দুটি তারের সুরের যন্ত্র এবং পাখোয়াজ নামক একটি বাদ্যযন্ত্র (ঢোলক জাতীয়) ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে ঈসায়ী ১৮-১৯ শতকে বীণা যন্ত্র থেকে সেতার যন্ত্র, সেনী রবাব থেকে সরোদ যন্ত্র এবং পাখোরাজ থেকে তবলার আধুনিকায়ন ঘটে। ভারতবর্ষে মুগল সম্রাট আকবরের রাজ দরবারে নাচ-গানের প্রচলন ছিলো। নাঊযুবিল্লাহ!

তার নবরতেœর একজন ছিলো মিয়া তানসেন। মিয়া তানসেনের সময়কাল হচ্ছে ১৫২০ থেকে ১৫৮৯। মিয়া তানসেন যে নিজে সম্রাট আকবরের ফতেহপুর সিক্রী রাজ দরবারে বীণা, সেনী-রবাব এবং পাখোয়াজ ব্যবহার করতো, তা ইতিহাস থেকেই প্রমাণিত। যদি তানসেনের সময়কাল পর্যন্ত বীণা এবং পাখোয়াজের মতো যন্ত্র ব্যবহার হয়ে থাকে, তবে তারও দুইশত বছর আগে কি করে হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সিতার এবং তবলা আবিষ্কার করতে পারেন?

এছাড়াও মুগল সম্রাট আকবরের রাজ দরবারের ইতিহাস রচয়িতা আবুল ফাজিলের গ্রন্থে তবলা নামক যন্ত্রের ব্যবহারের কোনো ইতিহাস পাওয়া যায় না। প্রকৃত ইতিহাস হচ্ছে- সিতার এবং তবলার জন্ম হয় ঈসায়ী ১৮ শতকের দিকে এবং সেই সময় আমীর খসরু নামক একজন সঙ্গীত শিল্পীর উপস্থিতির কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়।

সুতরাং এ যাবৎ আমরা ইতিহাসের নিরীখে প্রমাণ করলাম- হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচ্চস্তরের একজন ওলীআল্লাহ। তিনি কখনো সঙ্গীত চর্চা, সঙ্গীত শ্রবণ, সঙ্গীতের বাদ্যযন্ত্র বানানো এসবের ধারে কাছেও ছিলেন না। উনাকে ‘খেয়াল’-এর জনক এবং সিতার ও তবলার আবিষ্কারক বলার অর্থ হচ্ছে উনার প্রতি পরিকল্পিতভাবে মিথ্যারোপ করা। তবে তিনি অত্যন্ত উচ্চমানের এবং প্রতিভাধর কবি ছিলেন, তিনি অসংখ্য ক্বাছীদা রচনা করেছেন এবং সুন্নতের অনুসরণে সামা শরীফ পাঠ করতেন, শুনতেন। ফলে যে সকল তথাকথিত ছূফী এবং মুসলমানরা ‘চিশতিয়া খান্দানের বুযূর্গগণ গান-বাজনা করতেন’ এই অজুহাতে সঙ্গীতকে জায়িয বলার অপচেষ্টা করে, তারা আসলে ধোঁকার মধ্যে নিমজ্জিত। তাদের এই কুফরী আক্বীদার কারণে জাহান্নামে নিক্ষেপ হওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকবে না। এ সকল বাতিল আক্বীদার লোকগুলো সঙ্গীতকে জায়িয বলার আরো উপকরণ সংগ্রহ করে সম্রাট আকবরের নবরত্নের এক রত্ন মিয়া তানসেনের কাছ থেকে। আগামীতে আমরা সঙ্গীত শিল্পী মিয়া তানসেন এবং ছূফী মিয়া তানসেনের বিষয়ে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

ইতিহাসের ধূম্রজালে  হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-২৩

ইতিহাসে মিয়া তানসেন বিখ্যাত একজন সঙ্গীতজ্ঞ এবং মোঘলসম্রাট আকবরের নবরত্নের একজন রত্ন হিসেবে। মিয়া তানসেনের জন্ম গোয়ালিয়রের একটি গ্রামের হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে ১৪৯৩ বা ১৫০৬ সালে। তার বাবার নাম ছিল মাকরান্দ পান্ডে। মাকরান্দ পান্ডে ছিল একজন কবি এবং সঙ্গীত শিল্পী। যেহেতু হিন্দুধর্মের সঙ্গে সঙ্গীতের একটি যোগ রয়েছে, ফলে তানসেনও তার বাবার কাছে সঙ্গীত শিখেছিলো। তানসেনের বাবা ছিল মন্দিরের গুরু এবং মন্দিরে সঙ্গীত পরিবেশন করতো। জীবনের দীর্ঘ সময় মিয়া তানসেন সঙ্গীত চর্চা করে এবং অনেক রাগ-রাগিনীও তৈরি করে। কিন্তু পরিণত একটি বয়সে সে সেই সময়কার একজন বিখ্যাত ওলীআল্লাহ হযরত সাঈদ মুহম্মদ গাউস রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ছোহবতে আসার পর ইসলাম কবুল করেন। হযরত সাঈদ মুহম্মদ গাউস রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ছিলেন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক বংশধর অর্থাৎ আওলাদে রসূল। মিয়া তানসেন ইন্তিকাল করেন ১৫৮৬ সালে। কিন্তু তিনিও শায়িত আছেন উনার প্রাণপ্রিয় শায়েখ হযরত সাঈদ মুহম্মদ গাউস রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পাশে। ইতিহাস তা সাক্ষী। মিয়া তানসেন উনার শায়েখের সংস্পর্শে আসার পর রাগ-রাগিনী করেছেন তার কোনো প্রমাণ কোনো ঐতিহাসিক দিতে পারবে না।

কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায় তার এই ইসলাম কবুলের বিষয়টিকে কখনো ভালো চোখে দেখেনি। ফলে ইসলাম কবুলের পর উনার সঙ্গীত বর্জনের বিষয়টি আলোচনায় না এনে আকবরের নবরতেœর একজন থাকা অবস্থায় সৃষ্ট রাগ-রাগিনীগুলো প্রচার-প্রসারেই ব্যস্ত রয়েছে। উনার সঙ্গীত প্রতিভাকে নিয়ে আলোচনা করেছে বিস্তর। আর এই আলোচনা করতে গিয়ে মিথ্যা গল্পের আশ্রয়ও নিয়েছে তারা। যেমন মিয়া তানসেনের ইতিহাস পড়লেই দেখা যায় তাতে লেখা রয়েছে যে, তিনি রাগ পরিবেশন করে বৃষ্টি ঝরাতেন এবং আগুন জ্বালাতেন। নাঊযুবিল্লাহ! এসব কল্পকাহিনী বানিয়ে হিন্দুরা মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। মূলত মেঘমালার রাগ পরিবেশনে একটা আবহ সৃষ্টি হয় যেন বৃষ্টি ঝরছে আবার বৃন্দাবনি সাং রাগ পরিবেশনে মনে হয় যেন বাগানে ফুল ফুটছে এ রকম আবহ সৃষ্টি করা যায় সুরের মাধ্যমে। কিন্তু বাস্তবে রাগ পরিবেশনে বৃষ্টি ঝরানো, ফুল ফুটানো এগুলো নিছক কল্পকাহিনী। অথচ তানসেনের জীবন ইতিহাসে আজো এসব মিথ্যা ইতিহাস চলে আসছে। এসব মিথ্যা ইতিহাস প্রচার করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে এবং এসবের জন্য দায়ী হিন্দু সম্প্রদায় এবং নফছের গোলামী করা তথাকথিত মুসলমানরা।

ইসলাম এসেছে সঙ্গীত এবং বাদ্যযন্ত্র ধ্বংস করতে এটাই সঠিক এবং মিয়া তানসেনও তার জীবনের শেষে তা প্রমাণ করেছেন। সুতরাং মিয়া তানসেন মুসলমান হয়ে একজন ওলীআল্লাহ উনার মুরীদ হয়েও সঙ্গীত চর্চা করেছেন বলে যারা দলীল দেয় তারা মূলত মিথ্যার আশ্রয় নেয়। এসব মিথ্যা দলীল দিয়ে বাদ্যযন্ত্রসহ সঙ্গীতকে জায়িয করার কোনো সুযোগ নেই। অবশ্য মিয়া তানসেন তা করে থাকলেও তা দলীল হতো না। দলীল হচ্ছে কুরআন শরীফ এবং সুন্নাহ শরীফ। ইসলামে সামা শরীফ-এর মাহফিল করা, কাছীদা পাঠ করা, ক্বাছীদা লেখা, কাছীদা ছন্দাকারে পাঠ করা ইত্যাদি সুন্নত আর গান-বাজনা করা হারাম। কোনো ওলীআল্লাহ কখনো বাদ্য বাজিয়ে রাগ গেয়ে কখনো সামা শরীফ-এর মাহফিল করেননি।

ইতিহাসের ধূম্রজালে  হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-২৪

 

 

আমরা ইতোমধ্যেই আলোচনা করেছি, হিজরী ৭ম শতকের মুজাদ্দিদ, সুলত্বানুল হিন্দ খাজা গরীবে নেওয়াজ রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হিজরী ৮ম শতকের মুজাদ্দিদ, মাহবুব-এ ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং উনাদের সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত কোনো মুরীদ বা এই সিলসিলার হক্বপন্থী কোনো আউলিয়ায়ে কিরাম কখনো বাদ্যযন্ত্রসহ সামা শরীফ শোনেননি, কাওয়ালী করেননি। আমরা এও আলোচনা করেছি হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি খেয়ালের জনক নন, তবলা এবং সিতারের উদ্ভাবকও নন। এছাড়াও সঙ্গীত শিল্পী মিয়া তানসেন তিনিও মহান আল্লাহ পাক উনার বিশিষ্ট ওলী হযরত সাইয়্যিদ মুহম্মদ গাউস রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার হাতে বাইয়াত হওয়ার পর সঙ্গীত থেকে দূরে সরে ছিলেন। সুতরাং সকল আউলিয়ায়ে কিরাম সামা শরীফ-এর অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে, ক্বাছীদা শরীফ শোনার ক্ষেত্রে উনারা পরিপূর্ণভাবে সুন্নতের অনুসরণ করতেন এবং শরীয়তে নিষিদ্ধ হারাম গান-বাজনা থেকে দূরে থাকতেন। পূর্ববর্তী মুজাদ্দিদ এবং আউলিয়ায়ে কিরামগণের এই বিষয়টি বোঝার জন্য আমরা এখানে হিজরী ১৪ শতকের মুজাদ্দিদ হযরত মাওলানা আব্দুল্লাহিল মারুফ মুহম্মদ আবু বকর ছিদ্দীক্বী ফুরফুরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার একটি মুবারক ঘটনা তুলে ধরছি। তিনি একবার সুলত্বানুল হিন্দ হযরত খাজা সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাযার শরীফ যিয়ারতে যান। মাযার শরীফ-এ অজ্ঞ মুসলমানদের সিজদা, বুছা দেখে, মাযার শরীফ-এর বাইরে গান-বাদ্য, কাওয়ালী-করতালী, নৃত্যগীত দেখে এসবের প্রতিকারার্থে তুমুল আন্দোলনে অবশেষে তর্ক জিহাদ ঘোষণা করলেন। তিনি প্রবলভাবে ওয়াজ-নছীহত করলেন এবং বিদয়াত দমনের ইশতিহারসমূহ (যা তিনি কলিকাতা থেকে ছাপিয়ে নিয়ে এসেছিলেন) বিলিয়ে দিলেন। আলিমগণকে কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ ও তাছাউফের দলীল দিলে হক্ব তালাশীগণ সমর্থন করলেন। শুধু অর্থলোভী বাতিল লোকগুলো উগ্রমূর্তি ধারণ করেছিলো। তিনি সমন্বরে সকলকে এ কথাই বলেছিলেন বাংলা-আসামের বহু মুসলমান এখানে এসে এই হারাম বিষয়গুলোকে জায়িয মনে করে গুমরাহ হয়ে যাচ্ছে, তাদেরকে হিদায়েত করার জন্যই আমার এ স্থানে আগমন। (পীর ক্বিবলার জীবন চরিত্র- আব্দুস সাত্তার)

আগামীতে আমরা ইনশাআল্লাহ আলোচনা করবো- বর্তমানে সমস্ত মুসলিম দেশসহ সারা বিশ্বের মুসলমানগণ যেভাবে হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করছে, সামার আয়োজন করছে, সে বিষয়ে। এছাড়াও আলোচনা করবো এ পদ্ধতিগুলো মুসলমানগণের মধ্যে প্রবেশের নেপথ্য কারণ কী এবং সবশেষে সামা বা ক্বাছীদা শোনার শরীয়তসম্মত পদ্ধতি কী?

ইতিহাসের ধূম্রজালে  হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-২৫

উপমহাদেশে ভা-ারী, চিশতী, ছূফী, নামধারী অনেক মুসলমান যেমনি ইসলামে সঙ্গীত জায়িয করার লক্ষ্যে হক্ব চিশতিয়া সিলসিলার মহান বুযূর্গগণ উনাদের এবং বিশেষত হযরত আমীর খসরু রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নাম ব্যবহার করে উনাদের উপর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে যাচ্ছে একইভাবে তুরস্ক, ইরান, মিশর, আজারবাইজান এসব অঞ্চলে ছূফী দাবিদার অনেক বাতিল সম্প্রদায় রয়েছে, যারা মহান আল্লাহ পাক উনার বিশিষ্ট ওলী হযরত জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নাম মুবারক ব্যবহার করে উনার নামে অনেক মনগড়া আচার-অনুষ্ঠান মুসলমান সমাজে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে কথিত ‘ছূফী নৃত্য’।

উপমহাদেশে হযরত জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মশহুর মাওলানা হিসেবে আর তুরস্ক-ইরান অঞ্চলে তিনি মশহুর মেভলভী (মৌলভী) হিসেবে। ফলে এই কথিত ‘ছূফী নৃত্যকারী’ দলকে বলা হয় মৌলভী রুমী তরীক্বার অনুসারী (নাঊযুবিল্লাহ)। এরা সামা শরীফ পরিবেশনের সময় নৃত্য করে থাকে। অথচ এসব বলার অর্থ হচ্ছে- এতবড় একজন মহান ওলীআল্লাহ উনার শান মুবারকে মিথ্যারোপ করা। আজকে পাশ্চাত্যে উনার লেখাসমূহ পাঠ করা হয় গির্জায়, সেনাগোগে। ভারতে কথিত ‘ছূফী নৃত্য’-এর স্কুল চালু হয়েছে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে আত্মার মুক্তির নামে। অথচ তিনি উনার মসনবী শরীফ সম্পর্কে এটা লিখতে গিয়ে নিজেই এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “পবিত্র লোকগণ ইহাকে উপভোগ করিবেন এবং আনন্দ লাভ করিবেন। এটা মিশরের নীল নদের ন্যায়। নেককার লোকদের জন্য পানি এবং ফিরআউন গোষ্ঠী এবং কাফিরদের জন্য রক্ত।”

তিনি আরো লিখেছেন, “আমার এই গ্রন্থ অন্তর রোগে আরোগ্য দান করিবে, আভ্যন্তরীণ ময়লা পরিষ্কার করিবে।”

অর্থাৎ তিনি একজন মহান ওলীআল্লাহ; উনার রচিত কিতাব মানুষের অন্তরকে বিশুদ্ধ করবে, সেখানে উনার তরীক্বায় কিভাবে নৃত্যবাদ্য থাকতে পারে? উনার এই বিষয়ে আলোচনা এ কারণেই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে যে, আজকে ওহাবী, সালাফী সম্প্রদায় ‘ছূফী’ শব্দটিকে গালি অর্থে, মন্দ অর্থে ব্যবহার করে। নাঊযুবিল্লাহ! দলীল হিসেবে তারা তুরস্ক, ইরান, মিশরে সামা পরিবেশনকারী, কথিত ‘ছূফী নৃত্যকারী’ দলের উদাহরণ পেশ করে। আমরা পর্যায়ক্রমে আলোচনা করার চেষ্টা করবো যে,

১। হযরত জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ পাক উনার মাহবুব ওলী ছিলেন। উনার তরীক্বায় এসব ছিল না।

২। তাহলে ‘মৌলভী রুমী তরীক্বার’ নামে এই বিভ্রান্ত দলের উৎপত্তি কবে থেকে? এর নেপথ্যে কারা এবং কেন?

৩। মূলত, কারা প্রকৃত ছূফী সম্প্রদায়কে অপবাদ দেবার লক্ষ্যে বা মানুষকে তাসাউফ থেকে সরিয়ে দেবার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে এই ‘ভ্রান্ত ছূফী’ দলের পৃষ্ঠপোষকতা করছে।

ইতিহাসের ধূম্রজালে  হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-২৬

 

 

হযরত জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পিতার দিক থেকে ছিদ্দীক্বে আকবর হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্ব আলাইহিস সালাম এবং মাতার দিক থেকে হযরত আলী কারামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনাদের সঙ্গে মিলিত। হযরত মাওলানা রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পিতা হযরত বাহাউদ্দিন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বুযূর্গ আলিম ছিলেন। বিশিষ্ট ওলীআল্লাহ হযরত শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী তিনিও হযরত বাহাউদ্দিন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে যথেষ্ট তা’যীম-তাকরীম করতেন। হযরত মাওলানা রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পিতা বলখ থেকে বাগদাদ শরীফ হয়ে মক্কা শরীফ যান এবং সেখান থেকে আজারবাইজান এলাকার লারেন্দাহ নামক স্থানে আসেন। লারেন্দা থেকে তিনি বর্তমান তুরস্কের কৌনিয়া চলে আসেন। কৌনিয়ার বাদশাহ আলাউদ্দিন কায়কোবাদ (১) বিন কায়কাউস উনাদেরকে কৌনিয়ায় বসবাসের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। সম্ভাব্য হিজরীর ৬২৬ সনে (১২২৮ ঈসায়ী) তিনি লরেন্দা থেকে কৌনিয়া পৌঁছেছিলেন। সে সময় হযরত জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বয়স মুবারক ২২ বছর।

সম্ভাব্য হিজরীর ৬৪২ সনে প্রায় ৩৮ বছর বয়স মুবারক পর্যন্ত হযরত জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি কৌনিয়াতে একটি মাদরাসায় অধ্যাপনা, ওয়াজ-নছীহত এবং ফতওয়া প্রদান করতে থাকেন। এই সুদীর্ঘ সময় পর্যন্ত তিনি ফিক্বাহ নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। পরে তিনি বাইয়াত হন আজারবাইজানের তাবরেজ অঞ্চলের অধিবাসী বিশিষ্ট বুযূর্গ হযরত মুহম্মদ বিন আলী শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার হাত মুবারকে। কোনো ইতিহাসে হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা সামা-নৃত্য চালু করেছিলেন তার কোনো প্রমাণ নেই এবং ঐতিহাসিকরা তা বলেও না। কিন্তু ঐতিহাসিকরা বলে ‘মৌলভী রুমী তরীক্বা’র মধ্যে সামা-নৃত্য চালু করে হযরত জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পর উনার সন্তান হযরত বাহাউদ্দিন সোলতান অলাদ (উনার দাদার নামে উনার নাম রাখা হয়)। আগামীতে আমরা আলোচনা করবো যে, প্রকৃতপক্ষে উনার সন্তানের পক্ষে ‘মৌলভী রুমী তরীক্বা’র মধ্যে এই সামা-নৃত্যের নামে নর্তন-কুর্দন চালু করা সম্ভব কিনা?

ইতিহাসের ধূম্রজালে  হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-২৭

‘মৌলভী রুমী ত্বরীকা’র মধ্যে ছূফী নৃত্য প্রচলন করার সম্পূর্ণ অপবাদ দেয়া হয় হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সন্তান ‘সুলতান অলাদ’ উনাকে। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস ভিন্ন রকম। হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার প্রথম সন্তান জন্ম লাভ করলে তিনি উনার পিতার নামেই নাম রাখেন ‘বাহাউদ্দিন’ এবং উপনাম ‘সুলতান-অলাদ’। মাওলানা রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বাবার মতোই এই সন্তান অত্যন্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন। হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার এই সন্তানকে অতিশয় মুহব্বত করতেন, অনেক ক্ষেত্রে উনার প্রশংসাও করেছেন। এমনকি একদিন হালের মধ্যে বলেছিলেন “হে বাহাউদ্দিন! দুনিয়াতে আমার আগমনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তোমার জন্ম।” হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাদরাসার দেয়ালে লিখে রেখেছিলেন “আমার বাহাউদ্দিন অতি নেকবখত। দুনিয়াতে তার আগমন যেরূপ আনন্দের সাথে হয়েছে প্রস্থানও তদ্রƒপ আনন্দের সাথে হবে।” তিনি পুত্রকে ¯েœহভরে বলতেন- “আকৃতি ও চরিত্র উভয় দিক দিয়ে তুমি আমার সমতুল্য।” এই যদি সন্তান সম্পর্কে বাবার সুধারণা হয়, তবে সেই সন্তান কি করে বাবার ত্বরীকার মধ্যে নর্তন-কুর্দন চালু করতে পারে? কখনোই পারেন না।

বস্তুত, হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দুনিয়াবী বয়স মুবারক যখন কম তখন থেকেই তিনি ফিক্বাহ ও তাছাউফের শিক্ষা লাভ করেন উনার পিতার সুযোগ্য খলীফা মাওলানা সৈয়দ বোরহানুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার তত্ত্বাবধানে থেকে এবং পরবর্তীতে ইলমে তাছাউফের বিশেষ নিয়ামত লাভ করেন হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কাছ থেকে। কিন্তু হযরত শামছ তাবরিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে পেয়ে তিনি এতোটাই নিমগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন যে তখন উনার ছাত্র এবং অনুরাগীরা হযরত শামছ তাবরিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিরোধিতা শুরু করে। এক পর্যায়ে হযরত শামছ তাবরিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান অথবা শাহাদাত বরণ করেন। তারপর থেকে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেননি। ফলে উনার সকল শিক্ষা তেমন গোছানো পর্যায়ে ছিল না। পরবর্তীতে উনার সন্তান সুলতান অলাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এই শিক্ষাকে একটি ত্বরীকার মধ্যে বিন্যস্ত করেন। হযরত জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার এই সন্তান উনার পিতার শায়েখ হযরত শামছ তাবরিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারও যথেষ্ট খিদমতের আয়োজন দিয়েছেন বলে হযরত শামছ তাবরিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনিও হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সন্তানের প্রতি যথেষ্ট সন্তুষ্ট ছিলেন এবং অন্তর থেকে দোয়া করেছিলেন। তিনি মূলত ত্বরীকার খিদমতের আঞ্জাম দিয়েছিলেন কিন্তু সামা নৃত্যের নামে কোনো নর্তন-কুর্দন চালু করেননি।

ইতিহাসের ধূম্রজালে  হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-২৮

 

বলা হয়, একজন ওলীআল্লাহ উনার সন্তানের জন্য ওলীআল্লাহ হওয়া সহজ। কেননা ছোটবেলা থেকেই সন্তানগণ জানতে পারেন হালাল-হারাম কি? তাক্বওয়ার বিষয় কি? মুয়ামেলাত-মুয়াশারাত কি ইত্যাদি। হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার প্রথম সন্তান হযরত বাহাউদ্দিন সুলতান-অলাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার প্রতি অপবাদ দেয়া হয় যে, তিনি ‘মৌলভী রুমী ত্বরীকা’র মধ্যে কথিত সামা-নৃত্য বা নর্তন-কুর্দন চালু করেন। নাঊযুবিল্লাহ!

এখন- ‘সামা-নৃত্য’ সম্পর্কে পাঠকদের কিছুটা ধারণা দিতে চাই; তাহলে আপনারাই বিচার করবেন এমন সামা-নৃত্য একজন ওলীআল্লাহ উনার পক্ষে দূরের কথা, একজন নামমাত্র মুসলমানের পক্ষেও প্রচলন করা সম্ভব নয়। সামা-নৃত্য চলে সামা পরিবেশনের সাথে। এই নৃত্যের মাধ্যমে নর্তনকারী নাকি পূর্ণতায় (কামালিয়াত) পৌঁছে। গান-বাদ্য চলতে থাকে; তা শুনে এবং ঘুরে ঘুরে নেচে একজন তার নফস, কাম, ক্রোধ ইত্যাদি থেকে মুক্তি লাভ করে। চারবারে নর্তনকারীর ঘূর্ণন শেষ হয়। প্রথম ঘূর্ণনের অর্থ হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক উনার দর্শন, দ্বিতীয় ঘূর্ণনের অর্থ হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক উনার বড়ত্ব, তৃতীয় ঘূর্ণনের অর্থ হচ্ছে জ্ঞান অর্জন এবং শেষের ঘূর্ণনের অর্থ হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক উনার সঙ্গে বা উনার সামনে উপস্থিত থাকা। এই সামা-নৃত্যের সময় ছুফী দাবিদার ব্যক্তিরা পরিধান করে উটের লোমের তৈরি টুপি যা আমিত্বের ফলক। এক ধরনের সাদা জামা পরিধান করে যার অর্থ নফসের কাফন। কালো জুব্বা পরিহিত হয়ে তা খুলে ফেলা হয় আর এর অর্থ সত্যের উপর নতুন জন্মলাভ করা। সামার শুরুতে দুই হাত ক্রস করে রাখা হয়; এর অর্থ হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক উনার পথে একতা। ঘূর্ণনের সময় বাহু খোলা হয়, ডান হাত থাকে আকাশের দিকে উত্তোলিত। এর অর্থ মহান আল্লাহ পাক উনার করুণা গ্রহণ করতে প্রস্তুত আর বাম হাত দ্বারা চোখ থাকে বাঁধা, যা মাটির দিকে নিবন্ধ থাকে। নর্তনকারীরা ডানদিক থেকে বামদিকে ঘুরে এর অর্থ প্রেম-ভালোবাসা দ্বারা সকল মানব সম্প্রদায়কে আলিঙ্গন করা হয়। এই নর্তনের সাথে সাথে এক প্রকার যিকির করার হয়। এই মাহফিলের এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকে তাদের তথাকথিত পীর দাবিদার ভন্ডগুরু এবং নর্তনকারীরা তাকে তিনবার অতিক্রম করে এবং প্রতিবার শুভেচ্ছা বিনিময় করে।

উপরে যা বর্ণিত হলো তা কখনোই প্রকৃত ছূফী সম্প্রদায়ের কাজ নয় এবং এভাবে কোনোদিনই আত্মার বিশুদ্ধতা অর্জন সম্ভব নয়, বরং নফসের খোরাক পেয়ে আত্মা কলুষিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সুতরাং এটা নিশ্চিত হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং উনার সন্তান হযরত বাহাউদ্দিন মুহম্মদ সুলতান অলাদ উনার পক্ষে এসব বিদয়াত চালু করা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। এসব রীতি-নীতি প্রবেশ করেছে অনেক পরে। (ইনশাআল্লাহ চলবে)

ইতিহাসের ধূম্রজালে  হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-২৯

হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার বিশিষ্ট মুরীদ হযরত সালাহউদ্দিন জারকব রহমতুল্লাহি আলাইহি (তিনি হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পীর ভাইও ছিলেন) উনাকে উনার মুরীদদের তা’লীম-তালক্বীন দেয়ার জন্য নিয়োজিত করেছিলেন। হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যখন উনার পিতার বিশিষ্ট খলীফা হযরত সাইয়্যিদ বুরহানউদ্দিন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট তা’লীম-তালক্বীন নিতেন তখন হযরত সালাহউদ্দিন জারকব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনিও তা’লীম-তালক্বীন নিতেন। আবার পরবর্তীতে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যখন বিশিষ্ট ওলীআল্লাহ হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেন তখন হযরত সালাহউদ্দিন জারকব রহমতুল্লাহি আলাইহিও বাইয়াত হয়ে ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ হাছিল করেছিলেন। হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সন্তানকেও হযরত সালাহউদ্দিন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খিদমতে থাকতে বলেছিলেন এবং হযরত সালাহউদ্দিন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মেয়ের সঙ্গে নিজ সন্তানের বিয়ে দিয়েছিলেন। ১০ বছর শিক্ষাদান করার পর হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জীবিতবস্থায় তিনি ইন্তিকাল করেন। হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পরবর্তীতে উনার বিশিষ্ট খলীফা হযরত হুসামউদ্দিন চালাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে দায়িত্ব প্রদান করেন। হযরত হুসামউদ্দিন চালাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হচ্ছেন সেই ছাত্র যিনি একদিন বাগানে হাঁটা অবস্থায় উনার শায়েখ হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে হযরত ফরীদউদ্দিন আত্তার রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার লিখিত ‘মানতিকু তয়ায়ির’ অনুরূপ মসনবী শরীফ লেখার জন্য বিশেষ আরজি পেশ করেছিলেন। তিনি উনার শায়েখের উপস্থিতিসহ প্রায় ২৫ বছর আর উনার শায়েখের বিছাল শরীফ-এর পর প্রায় ১০ বছর তা’লীমের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। হযরত হুসামউদ্দিন চালাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পর হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অপর মুরীদ হযরত করীমউদ্দিন ওলাদ-এ বাকতামুর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। উনার পর হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতল্লাহি আলাইহি উনার সন্তান সুলতান অলাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এবং পিতার শিক্ষাকে কৌনিয়ার বাইরেও ছড়িয়ে দেন।

তাহলে দেখা যাচ্ছে- হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সন্তানসহ কোনো বিশিষ্ট মুরীদ ‘মৌলবীয়া তরীক্বা’র মধ্যে কথিত ছূফী-নৃত্য চালু করেননি, করতে পারেন না। উনারা প্রত্যেকেই বিশিষ্ট বুযূর্গ ছিলেন। কিন্তু সে সময় তরীক্বতপন্থী দাবিকারী অনেক বাতিল পন্থীদের মধ্যে গান-বাজনা প্রবেশ করে গিয়েছিলো। আর হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সন্তান হযরত সুলতান অলাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি যেহেতু উনার পিতার শিক্ষাকে ব্যাপক ছড়িয়ে দেন, তখন কোনো এক পর্যায়ে এসে ‘মৌলবীয়া তরীক্বা’র দাবিদার পীর আদিল চালাবী নামে একজন সে ছূফী-নৃত্য প্রবেশ করিয়ে দেয়। সে মারা যায় ১৪৬০ ঈসায়ী সনে অর্থাৎ হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার প্রায় দু’শ বছর পর এই ছূফী নৃত্যের প্রচলন হয় তাও আবার ‘মৌলভীয়া ত্বরীক্বা’র নামে। নাঊযুবিল্লাহ!

ইতিহাসের ধূম্রজালে  হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩০

সম্মানিত পাঠক! হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “মৌলীয়া ত্বরীকা’-এর মধ্যে- কথিত ছূফী-নৃত্যের অনুপ্রবেশ নিছক একটি সাধারণ ঘটনা নয়। তুরস্কের কৌনিয়াতে শায়িত এই মহান ওলীআল্লাহ উনার শুধু ত্বরীকাকেই ভিন্ন ¯্রােতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা করা হয়নি, বরং উনার মুবারক জীবনী, উনার লিখিত কবিতা-কাছীদা, কিতাব, উনার সঙ্গে উনার শায়েখ হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সাথে যে নিছবত, উনার সন্তান ইত্যাদি সকল বিষয় নিয়েই পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র হয়েছে, হচ্ছে।

ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে এবং বিকৃত ইতিহাস বিশ্বব্যাপী ছড়ানো হয়েছে যেন সাধারণ মানুষরা উনার সুমহান জীবনী মুবারক, লিখিত গ্রন্থসমূহ থেকে, তরীক্বা থেকে নিয়ামত হাছিল করতে না পারে। আমরা জেনেছি ‘মৌলবীয়া ত্বরীক্বা’-এর অনুসারী সেজে, পীর মুখোশ ধারণ করে আদিল চালাবী নামে এক ব্যক্তি হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার প্রায় দু’শ বছর পর এই ছূফী-নৃত্যের প্রচলন ঘটায়। কিন্তু আমরা বলি, এ সকল অপকর্মের পেছনে রয়েছে গভীর ষড়যন্ত্র। পাঠকদের উপলব্ধির জন্য আমরা তুরস্কের বর্তমান ইতিহাস থেকেই তা তুলে ধরবো, তখন বুঝতে সুবিধা হবে যে, কারা এবং কেন এই মহান ওলীআল্লাহ উনার সমগ্র জীবন এবং কর্ম নিয়ে মিথ্যাচার করেছে।

১৯৬৩ সালে যখন তুরস্ক ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের (পূর্বের ইউরোপিয়ান কমিটি) সহযোগী সদস্য পদ লাভ করে তখন থেকেই এই দেশটি পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়ার চেষ্টা করছে। অবশেষে ১৯৮৭ সালে পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়ার জন্য আবেদন করে। কিন্তু ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এই আবেদনপত্র ফাইল বন্দি করে রাখা হয়। কিন্তু তখন থেকেই আর্থ-সামাজিক কারণ দেখিয়ে অন্যান্য সদস্যরা তুরস্কের পূর্ণ সদস্যপদ প্রাপ্তির বিষয়টিতে বাধা দিয়ে আসছে। কিন্তু প্রকৃত কারণ তুরস্কের আর্থ-সামাজিক, মানবাধিকার এসব বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে- তুরস্কের বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী। যদি তুরস্ক ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যপদ পায়, তবে ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতে তুরস্কের মুসলমানগণ অবাধে প্রবেশ করবেন এবং ইসলাম ইউরোপে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যাবে।

তাই অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তুরস্ককে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যপদ দেয়া হচ্ছে না। এটা যদি বুঝা যায়, তবে এটা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মতো উঁচুমাপের ওলীআল্লাহ উনার শিক্ষা, অনুসারীগণ যদি পার্শ্ববর্তী ইউরোপ এবং এশিয়ার দেশগুলোতে ছড়িয়ে যায়, তবে কাফিরদের মাথাব্যথার কারণ ঘটবে। আর সে কারণেই যুগ যুগ ধরে উনার সমগ্র জীবন এবং কর্মের বিরুদ্ধে চলেছে ষড়যন্ত্র। আর এ ষড়যন্ত্রে জড়িত রয়েছে:

১. বিভ্রান্ত শাসকরা

২. নামধারী মুসলিম এবং কাফির ঐতিহাসিকরা ৩. এক শ্রেণীর লেখক, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী

৪. সরাসরি জাতিসংঘ তথা ইহুদীসংঘের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান টঘঊঝঈঙ.

আমরা পরবর্তীতে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩১

ইসলামের মধ্যযুগে ছূফী-দরবেশগণ মুসলমান শাসিত অঞ্চলগুলোর সামাজিক, ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। প্রায় সকল খলীফা, গভর্নরগণ ওলীআল্লাহ উনাদের দরবারে আসা-যাওয়া করতেন। অনুরূপ ঘটনা হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পিতা এবং উনার জীবনেও সংঘটিত হয়েছিলো। হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পিতা সুলত্বানুল মাশায়েখ হযরত বাহাউদ্দিন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে কৌনিয়াতে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য সে সময়ের সুলত্বান আলাউদ্দিন কায়কোবাদ বিশেষ আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছিলেন। ফলে ইহুদী-মুশরিকরা চাইতো যেন মুসলিম বাদশাহগণ দরবেশগণের কাছ থেকে দূরে সরে থাকেন। আর তাই পরিকল্পিতভাবে উনাদের তরীক্বাগুলোর মধ্যে, জীবনী ইতিহাসে মানুষের মনে সংশয় সৃষ্টিকারী উপাদান প্রবেশ করিয়েছে।

‘মৌলবী তরীক্বা’র মধ্যে কথিত ছূফী-নৃত্য প্রবেশ করলেও হক্ব দলটিও পাশাপাশি অবস্থান করছিলো। এই তরীক্বার দরবেশগণ তুরস্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। অটোম্যান সা¤্রাজ্যের সময় এই তরীক্বা বলকান, সিরিয়া, লেবানন এবং মিশরে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই তরীক্বার দরবেশগণ নিয়ে “মৌলভী রেজিম্যান্ট” তৈরি হয়েছিলো, যাঁরা চতুর্থ আর্মির নেতৃত্বে সিরিয়া এবং ফিলিস্তিনে যুদ্ধ করেছিলেন। ১৯১৪ সালে কৌনিয়াতে প্রায় ৮০০ দরবেশের একটি বাহিনী তৈরি হয়েছিলো, যাঁরা দামেস্কে পৌঁছেছিলেন যুদ্ধের জন্য। কিন্তু পরবর্তীতে চরম নাস্তিক ও কাট্টা কাফির কামাল পাশা ১৯২৩ সালে এই দরবেশগণের সঙ্গে আলোচনায় বসার কোশেশ করে এবং ১৯২৫ সালের ১৩ই ডিসেম্বর মানুষের জীবন থেকে ইসলাম, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, বিশ্বাস ইত্যাদি তুলে দেওয়ার জন্য একটি ডিক্রি জারির মাধ্যমে তরীক্বার সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। সকল খানকা শরীফ বন্ধ হয়ে যায়। যদিও হক্বপন্থী, নাহক্বপন্থী সকল কার্যক্রমই বন্ধ হয়, তবে উদ্দেশ্য ছিল হক্বপন্থীদের কার্যক্রম বন্ধ করা। তবে ১৯২৭ সালে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাযার শরীফ প্রাঙ্গণ, ইবাদতখানা খুলে দেয়া হয় শুধু যাদুঘর হিসেবে পর্যটকদের দর্শনের জন্য। আবার ১৯৫০ সালে বছরে একবার কৌনিয়াতে কথিত ‘ছূফী-নৃত্য’ বা ‘দরবেশ-নৃত্য’ করার অনুমতি দেয় সরকার।

অন্য একটি সূত্র মতে জানা যায়, ১৯৫৪ সালে কৌনিয়াতে ২ সপ্তাহের জন্য দরবেশ-নৃত্যের অনুমোদন দেয় সরকার। আবার এই সেক্যুলার তুরস্কের পরবর্তী সরকার ১৯৭৪ সালে কথিত দরবেশ-নৃত্য বা ছূফী-নৃত্যকারী ভন্ড দরবেশদেরকে পশ্চিমা বিশ্বে ভ্রমণেরও অনুমতি দেয়া হয়।

সম্মানিত পাঠক! এটা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, চরম নাস্তিক ও কাট্টা কাফির কামাল পাশা’র নেতৃত্বধীন সরকার পরিকল্পিতভাবে তাছাউফের মূল শিক্ষাকেন্দ্র সমস্ত খানকা শরীফগুলো বন্ধ করে দিয়ে পরবর্তীতে পর্যটকগণের আনন্দ দানের জন্য তাদের নফসের উপযোগী একটি পদ্ধতি চালু রাখার জন্য অনুমতি প্রদান করে এবং তা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ করে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা বুযূর্গ দরবেশ মুজাহিদীন থেকে কামাল পাশা এই শিক্ষাই গ্রহণ করেছিলো যে, প্রকৃত ছূফীগণ হয়তো এই সেক্যুলার রাষ্ট্রের জন্য বিপদজনক হবে।

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩২

তুরস্ক সরকার প্রথমদিকে পাবলিক লাইব্রেরীতে এই কথিত ‘ছূফী-নৃত্য’ করার অনুমতি দেয়। পরবর্তীতে জিমনেসিয়ামগুলোতে এবং তারপরে স্টেডিয়ামগুলোতে। সারা বিশ্ব থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দর্শনার্থীরা আসতো এবং টিকেট কেটে এই সামা এবং নৃত্য উপভোগ করতো। বর্তমানে এই নৃত্যের জন্য সরকারি তরফ থেকেই বড় বড় বিল্ডিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংস্কৃতি এবং পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে বর্তমানে এ আয়োজন করা হয়। বর্তমানে তুরস্ক সরকার তাদের পর্যটন শিল্পকে চাঙ্গা করার জন্য এই নৃত্যের প্রচলনের দায়িত্ব নিয়েছে। এখন ‘মৌলবীয়া ত্বরীকা’ নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে সরকারের কোনো মাথা ব্যথা নেই; বরং বিগত যুগগুলোতে তারা এই তথাকথিত তরীক্বতপন্থীদের কাছ থেকে অনেক কবি এবং সঙ্গীত শিল্পী পায়। আর বর্তমানে সঙ্গীতের স্কুল থেকে পাস করা শিল্পীদের দিয়ে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার লিখিত ক্বাছীদা এবং পরবর্তী কবিদের রচিত সঙ্গীতগুলো মৌলবীয়া সঙ্গীত বা সামা সঙ্গীত হিসেবে শেখানো হয়। আর এ ধরনের সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য তৈরি করা হয় এক ধরনের নতর্কদের। বর্তমানে এই নৃত্যের নাম দেয়া হয়েছে ঋঙখক উঅঘঈঊ. নাউযুবিল্লাহ!

হায়রে দুর্ভাগা তুরস্কের শাসকসহ মুসলিম সমাজ এক শুভক্ষণে মহান আল্লাহ পাক উনার বিশিষ্ট ওলী হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি তাশরীফ নিয়েছিলেন বৃহত্তর পারস্যের এক অঞ্চলে। কিন্তু জীবনের দীর্ঘ সময় কাটান এবং শায়িত আছেন তুরস্কের কৌনিয়াতে। সুন্নতের অনুসরণের কারণে এবং ইশকের টানে যেই সামা তিনি শুনতেন, সেই সামাতে পরবর্তীতে প্রবেশ করলো ‘ছূফী-নৃত্য’ নামে এক ধরনের নাচ। পরে সেখানে যোগ হয় বাদ্য-বাজনা। আরো দুঃখের বিষয়, উনার লিখিত ক্বাছীদা ও কবিতাগুলোই বাদ্যসহ পাঠ করা হতে থাকলো সেই সব অনুষ্ঠানে। পরবর্তীতে তথাকথিত ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানগুলো পরিবর্তিত হলো পর্যটন শিল্পের উপাদান হিসেবে। নাঊযুবিল্লাহ! কাট্টা নাস্তিক কামালপাশাসহ তুরস্কের পরবর্তী শাসকরা কখনোই এই গুনাহর দায়ভার এড়াতে পারবে না। এমন মহান ওলীআল্লাহ উনার শিক্ষা থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখার জন্যই পরিকল্পিতভাবে এসব ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩৩

সাধারণ কোনো মানুষের জীবনী যখন লেখা হয় তাকে ইংরেজিতে বলে ইরড়মৎধঢ়যু আর কোনো ওলীআল্লাহ এবং দরবেশগণ উনাদের জীবনী মুবারককে বলা হয় ঐধমরড়মৎধযঢ়ু. দরবেশগণ উনাদের জীবনী মুবারক-এ অনেক কারামতের বর্ণনা থাকে, যা সাধারণ মানুষের উপলব্ধির বাইরে অথচ সত্য। ওলীআল্লাহগণ উনাদের কারামত সত্য কুরআন শরীফ এবং সুন্নাহ শরীফ-এর আলোকেই। ইতিহাসে দেখা গেছে, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম এবং ওলীআল্লাহগণ উনাদের জীবনী মুবারক কেবল ওলীআল্লাহগণ উনাদের পক্ষেই লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছ্ েকিন্তু কাফিররা যখন ঐতিহাসিক হিসেবে এ কাজে হাত দিয়েছে তখন ইতিহাস বিকৃত করে ফেলেছে। যা তাদের উপলব্ধিতে এসেছে তা-ই বর্ণনা করেছে, যা আসেনি তা বাদ দিয়েছে। যেমন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জীবনী মুবারক লিখতে গিয়ে সূরা ফিলের ঘটনায় আবাবিল পাখির আক্রমণকে অনেকে প্লেগের আক্রমণ বলেও উল্লেখ করেছে। নাঊযুবিল্লাহ! একইভাবে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জীবনী মুবারক লিখতে গিয়ে মনগড়াভাবে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। একটি উদাহরণ তুলে ধরা যেতে পারে। হযরত শায়েখ সালাহউদ্দিন জারকব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিশিষ্ট খলীফা আবার পীর ভাই ছিলেন। উনারা দু’জনেই হযরত সৈয়দ বুরহানউদ্দিন মুহাক্কিক্বী তিরমিযী (হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পিতার প্রধান খলীফা) রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কাছে তাছাউফের তা’লীম নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে আবার দু’জনেই হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কাছ থেকেও ফায়েজ-বরকত লাভ করেন। হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যখন নিরুদ্দেশ হয়ে যান তখন হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুরীদদের তা’লীম-তালক্বীনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন হযরত শায়েখ সালাহউদ্দিন জারকব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে এবং উনার মেয়ের সঙ্গে নিজ সন্তানের শাদীও দিয়েছিলেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি স্বর্ণের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী ঐতিহাসিকরা ইতিহাস বিকৃতি ঘটিয়ে লিখেছে, হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ছিলেন উচ্চ বংশীয় এবং ধনাঢ্য পরিবারের কিন্তু হযরত সালাহউদ্দিন জারকব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ছিলেন একজন অশিক্ষিত স্বর্ণকার এবং উনাদের মধ্যে গভীর সখ্যতা ছিল। সখ্যতাকে আরো বৃদ্ধির জন্য এবং এ সম্পর্কে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সন্তানের সঙ্গে উনার বন্ধু হযরত সালাহউদ্দিন জারকব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন।

হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ঐধমরড়মৎধযঢ়ু রচয়িতাদের একজন হচ্ছেন শামসুদ্দীন আহমেদ আফলাকি। তার রচনা মানাক্বিব উল আরিফিন এবং রচনার সময়কাল হচ্ছে- ১৩১৮ থেকে ১৩৫৩ ঈসায়ী সাল। অথচ সম্প্রতিকালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর ফ্র্যাঙ্কলিন লুইস, যে কিনা হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্পূর্ণ জীবনী মুবারক লিখেছে, সেখানে সে ঐধমরড়মৎধঢ়যরপধষ নরড়মৎধঢ়যু নামে আলাদা অধ্যায় রচনা করেছে। হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যে বংশ পরম্পরায় হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম উনার পর্যন্ত পৌঁছেছেন, সেই ইতিহাসকে এই প্রফেসর অস্বীকার করেছে। এ রকম উদাহরণ আরো অনেক দেয়া যাবে, তবে আমাদের বলার উদ্দেশ্য পরিকল্পিতভাবে এবং কখনো ইসলামের শিক্ষা, তাছাউফ না বুঝার কারণে কাফির ঐতিহাসিকরা হযরত জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার শিক্ষাকে, জীবনী মুবারককে মনগড়াভাবে ব্যাখ্যা করেছে।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩৪

তুর্কী খিলাফতের সময় অনেক সঙ্গীত শিল্পী, কবি, সাহিত্যিকের জন্ম হয়; তাদের মধ্যে গালিব, ইসমাইল রুসুহি, ইসরার দিদি, হালিত ইফেন্দি, গাভিস দিদি প্রমুখের নাম উল্লেখ্য। এছাড়া ইরানও হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে একজন প্রসিদ্ধ কবি হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। ইরানে অনেক শহরের দেয়ালে দেয়ালে উনার কবিতা লেখা রয়েছে। অথচ ২০০৭ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার স্মরণে ইরানের সকল স্কুলগুলোতে ঘণ্টা বাজিয়ে উনার প্রতি সম্মান দেখানো হয়। নাঊযুবিল্লাহ! ২০০৭ সালেই তেহরানে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে ইরানের প্রেসিডেন্ট এবং ইরানের পার্লামেন্টের চেয়ারম্যান। এতে ২৯টি দেশের গবেষকরা ৪৫০টি প্রবন্ধ পাঠ করে। সেই অনুষ্ঠানে ইরানের সঙ্গীত শিল্পী শাহরাম নাজেরীকে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কাজের উপর গবেষণার জন্য সর্বোচ্চ সঙ্গীত পুরস্কার দেয়া হয়। নাঊযুবিল্লাহ!

মৌলবীয়া সিলসিলার অন্তর্ভুক্ত দাবীকৃত তরীক্বতপন্থীদের মধ্যে যারা বাতিল ছিল তারা সামানৃত্যে এক ধরনের বাঁশি ব্যবহার করতো একে ‘নে’ বলে। এরা রিড বাঁশিও ব্যবহার করতো। তাদের ঘুরে ঘুরে নৃত্য করে গান করাকে বলা হয় ‘আয়িন’। কবি দিদি ইফেন্দি এসব নৃত্যের জন্য অনেক সঙ্গীত রচনা করে। বাতিল ছূফী দলের সদস্যদের লিখিত কবিতাগুলো ‘আয়িন’ হিসেবে পাঠ করা হয়। কেউ যদি তুরস্কে সামার সিডি কেনে, তবে দেখা যাবে সবই হচ্ছে এসব বাতিল ছূফী কবিদের লেখা আয়িনের কবিতা। এসব অনুষ্ঠানে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কবিতাও আয়িনের সময় পাঠ করা হয়। অথচ পরবর্তীতে ‘কথিত রয়েছে’ এই বাক্য ব্যবহার করে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি রবাব, নে, রিড বাঁশি বাজিয়েছেন বলে এক শ্রেণীর ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছে। নাঊযুবিল্লাহ! অথচ হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জীবনী লেখকদের মধ্যে প্রথম হচ্ছেন উনার সন্তান হযরত সুলতান অলাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি, পরবর্তীতে সিপাহসালার এবং তৃতীয় শামসুদ্দীন আহমেদ আফলাকি। অথচ উনাদের লিখিত গ্রন্থে কোথাও উল্লেখ নেই তিনি গান-বাজনা নৃত্য করেছেন। শামসুদ্দীন আহমেদ আফলাকি লিখেন, “মাওলানা সাহেব সামার অনুষ্ঠানে যুবক বয়সে যোগ দেননি। যখন তিনি যোগদান শুরু করেন তখন হালে কখনো তিনি হাত নাড়তেন।” (আফলাকি পৃষ্ঠা ৬৮১)

আবার ঐতিহাসিক সিপাহসালার তথ্য অনুযায়ী হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সাথে সাক্ষাতের পূর্ব পর্যন্ত তিনি কোনো সামার মাহফিলেই যোগদান করেননি (লুইস পৃষ্ঠা ১৭২, পৃষ্ঠা ৩১৪-৩১৫)

অথচ আজকে এই মহান ওলীআল্লাহ উনার নামে মিথ্যা ইতিহাস রচিত হচ্ছে, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় তা প্রচারিতও হচ্ছে। নাঊযুবিল্লাহ!

 

 

 

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩৫

ঐধমরড়মৎধঢ়যু-তে লিপিব্ধ রয়েছে হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি অনেকদিন মহান আল্লাহ পাক উনার দববার শরীফ-এ এ আরজি পেশ করেছেন, উনার কাছে রক্ষিত নিয়ামত দেওয়ার মতো উপযুক্ত খলীফার জন্য (প্রত্যেক ওলীআল্লাহ উনাদের নিকটই কিছু বিশেষ বিশেষ নিয়ামত থাকে যা উপযুক্ত মানুষের কাছে দিয়ে যান)। তখন উনার কাছে ইলহাম হয় বা গায়েবী আওয়াজ আসে “তার প্রতিদানে আপনি কী দিবেন?” তিনি উত্তর দেন- “আমার শির বা মস্তক।” তখন উত্তর আসে- “আপনি যাঁকে খুঁজছেন তিনি হচ্ছেন হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি, যিনি কৌনিয়াতে আছেন।” পরবর্তীতে তিনি কৌনিয়াতে যান এবং সে নিয়ামত হস্তান্তর করেন।

হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে পেয়ে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জীবন সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যায়। তিনি ছিলেন ফিক্বাহর অনেক বড় আলিম; কিন্তু তাছাউফের হাক্বীক্বী শিক্ষা পাওয়ার পর, মা’রিফাতের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচিত হওয়ার পর তিনি পরিপূর্ণরূপে উনার শায়েখের প্রতি ফানা হয়ে যান; আর এই ফানার বিষয়টি এতোটাই গভীর ছিল যে, উনার অস্তিত্বের মধ্যে তিনি উনার প্রাণপ্রিয় শায়েখ উনাকে উপলব্ধি করতে পারতেন।

কিন্তু কাফির ঐতিাহিসকরা এ বিষয়গুলো অনুধাবন করতে না পেরে তারা বিকৃত তথ্য উপস্থাপন করেছে তারা লিখেছে। “হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অপর এক নাম ছিল পাখী। তিনি ঘুরে বেড়াতেন। উনার স্বভাব ছিল রুক্ষ, সবার সামনে মানুষকে বকাবকি করতেন এবং অত্যন্ত অসামাজিক ছিলেন। তিনি হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে সামার মাহফিল করা এবং নৃত্য শেখান।” নাঊযুবিল্লাহ!

আরো উল্লেখ করা হয়েছে, যা শাহরাম শিবা একজন ইরানের ইহুদী কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী, সে তার গ্রন্থের “ঞযব টহঃড়ষফ ঝঃড়ৎু” অধ্যায়ে উল্লেখ করেছে, হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ছিলেন সম্পদশালী এবং ক্ষমতাধর পরিবারের সন্তান এবং সমাজের উঁচুস্তরের মানুষ। উনার সম্মানিতা মাতা ছিলেন খোরাসানের বাদশাহর নিকটাত্মীয়া। কিন্তু হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যদিও একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন; কিন্তু তিনি ছিলেন একজন ভবঘুরে, গরিব, গৃহহীন মানুষ। নাঊযুবিল্লাহ! উনার প্রতি হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এতোটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েন যে, এ কারণে হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বিরুদ্ধবাদীরা বারবার শহীদ করার হুমকী দিতে থাকে। এতে তিনি শহর ছেড়ে চলে যান। পরে যখন আবার কৌনিয়া ফিরে আসেন তখন হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে নিজের কাছে রাখার জন্য উনার সৎ মেয়ে কিমিয়ার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেন। তখন কিমিয়ার বয়স ১৫ আর হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বয়স ৬০। পরে অসুখে অথবা গভীর দুঃখে কিমিয়া মারা যায়। আর এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সন্তান হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে শহীদ করেন।” নাঊযুবিল্লাহ!

প্রিয় পাঠক! বাস্তবে কিমিয়া নামে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কোনো সৎ মেয়ে ছিল না। মূলত, দুষ্টপ্রকৃতির ঐতিহাসিকরা এখানে হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং উনার সন্তান সম্পর্কে ইতিহাস বিকৃত করেছে পরিকল্পিতভাবে, যেন উনাদের সমৃদ্ধ জীবন থেকে মানুষ নছীহত গ্রহণ করতে না পারে; বরং এ ধারণাই করে যে, হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সামা, নৃত্য শিখিয়ে এবং হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মেয়েকে ৬০ বৎসর বয়সে শাদী করে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করেছিলেন। নাঊযুবিল্লাহ!!

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩৬

 

 

বিকৃত করা ইতিহাসে রয়েছে, হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সন্তান মুহম্মদ আলাউদ্দিন তিনি হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে শহীদ করেন। নাঊযুবিল্লাহ! কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক কিন্তু তা প্রমাণ করতে পারেনি। হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার সৎ মেয়ে কিমিয়ার সঙ্গে হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সঙ্গে শাদী দেওয়ার কারণে উনার শহীদ হওয়ার বিষয়টি যদি ‘সত্য নয়’ বলে প্রমাণ করা যায়। তাহলেও আমরা স্পষ্ট ধারণা পাবো যে- উনার সন্তান এই শাহাদতের সঙ্গে জড়িত নয়।

প্রথম যুক্তি: হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সন্তান বিশিষ্ট ওলীআল্লাহ হযরত সুলতান অলাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং উনার ছাত্র সিপাহসালার উনাদের কেউ এই শহীদ হওয়ার বিষয়ে উল্লেখ করেননি। এ বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে উনাদের অনেক পরে শামসুদ্দীন আফলাকি।

দ্বিতীয়ত: এই শহীদ হওয়ার বিষয়ে কখনো কোনো সাক্ষী পাওয়া যায়নি। কেউ তা দেখেনি।

তৃতীয়ত: হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার প্রথম স্ত্রীর সন্তান হচ্ছেন হযরত বাহাউদ্দিন সুলতান অলাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং দ্বিতীয় জন মুহম্মদ আলাউদ্দিন। তিনি দ্বিতীয়বার শাদী করেন যাঁকে উনার পূর্বের ঘরের একজন ছেলে সন্তান ছিল, আর উনার তরফ থেকে আসেন মুহম্মদ মুজাফফরউদ্দিন এবং কন্যা সন্তান মালিকা।

চতুর্থ কারণ: হযরত শামছ তাবরিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি শাদী করেছিলেন যাঁকে তিনি হচ্ছেন হযরত কিমিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহা; যিনি কিনা হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সন্তান নন, উনার সৎ মেয়েও নন, বরং উনার বাড়িতে বড় হওয়া একজন। আর ‘গভীর দুঃখে’ হযরত কিমিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহা উনার ইন্তিকালের বিষয়টি যোগ করা হচ্ছে দুষ্ট ঐতিহাসিকদের চাতুরতা। কেননা কোনো ওলীআল্লাহ উনার সান্নিধ্যে এসে শোকে ইন্তিকাল করার বিষয়টি অবান্তর। তাহলে বোঝা যাচ্ছে- তিনি অসুস্থতার কারণেই ইন্তিকাল করেন, যা সিপাহসালার উনার কিতাবে ১৩৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন। বরং সঠিক যে ইতিহাস তাতে পাওয়া যায়, হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সুযোগ্য সন্তান হযরত বাহাউদ্দিন সুলতান অলাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং সিপাহসালার উনাদের কিতাবে হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার একটি ক্বওল শরীফ উল্লেখ করেন। তিনি বলেছিলেন, “আমি হঠাৎ এমন নিরুদ্দেশ হবো যে, আমার কোনো খোঁজই পাওয়া যাবে না।” (সিপাহসালার ১৩৪, সুলতান ওলাদ ৫০-৫১)

তিনি আরো ইঙ্গিত করেছিলেন যে, এটা হবে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার আরো আত্মিক উন্নতির জন্যই।

তাহলে হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যে বলেছিলেন, উনার সুযোগ্য খলীফা হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে তৈরি করতে সর্বোচ্চ উনার শির বা মাথা দেবেন। বিভ্রান্ত ঐতিহাসিকরা সেখান থেকেই উনার শহীদ হওয়ার বিষয়টি ইতিহাসে চালিয়ে দিয়েছে। তবে সকল বিভ্রান্তির মূল কারণ ওলীআল্লাহ উনাদের শান, মান না বোঝার, ইলহাম-ইলকার বিষয় না বোঝা। বরং পরিকল্পিতভাবে উনাদের শানে মিথ্যা ইতিহাস রচিত হয়েছে, যেন মানুষ উনাদের জীবনী মুবারক থেকে নছীহত গ্রহণ করতে না পারে। লেখকদের ইতিহাস বিকৃতির বিষয়টি সামনে আরো তুলে ধরার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ!

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩৭

প্রায় শত শত বছর ধরে হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে একজন অশিক্ষিত ও ঘুরে বেড়ানো দরবেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। নাঊযুবিল্লাহ! অথচ উনার ছোহবত পাওয়া হযরত বাহাউদ্দিন সুলতান অলাদ রহমতুল্লাহি (হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সুযোগ্য সন্তান) ‘মাকালাত-এ শামছ তাবরিজী’ কিতাবে উল্লেখ করেন যে, উনি ধর্মের উপরে, আরবী ভাষার উপরে গভীর জ্ঞান রাখতেন। তিনি সুন্নী মুসলমান ছিলেন এবং সম্ভবত হাফিযও ছিলেন যেহেতু হিফজখানাতেও তালিম দিতেন। সুবহানাল্লাহ!

আবার যত ইংরেজি অনুবাদ রয়েছে তার খুব কম কিতাবে পাওয়া যাবে যে, হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি তিনি একজন মুসলমান ছিলেন। নাঊযুবিল্লাহ! উনার বিখ্যাত কবিতাসমূহের যত ইংরেজি অনুবাদ পাওয়া যায় সেখানে ইসলামের সাথে উনার সম্পৃক্ততার বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। যেখানে কুরআন শরীফ এবং হাদীছ শরীফ-এর উদ্ধৃতি রয়েছে সেখানে তা পরিবর্তন করা হয়েছে নতুবা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনাকে এমনভাবে পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন যে তিনি একজন কথিত সার্বজনীন কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। সমস্ত ধর্মের মধ্যে তিনি কোনো পার্থক্য দেখতেন না। সব ধর্মের ইবাদত উপাসনার মধ্যে তিনি কোনো পার্থক্য করতেন না। নাঊযুবিল্লাহ! এসব কারণে আজকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি অত্যন্ত সুপরিচিত একজন কবি।

সচেতন পাঠক! উনাকে ওলীআল্লাহ হিসেবে বা প্রকৃত মুসলিম হিসেবে প্রকাশ করলে মানুষরা যারা উনার ভক্ত হবে তারা ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হবে। ফলে এখান থেকে মানুষকে বিরত রাখার জন্য উনার ইসলামের সাথে সম্পৃক্ততার বিষয়টি গোপন করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত উনার কর্মসামগ্রীকে পুঁজি করে তথাকথিত লেখক-শিল্পীরা ফায়দা লুটার চেষ্টা করেছে বলে উনাকে কথিত সার্বজনীন কবি বানাবার চেষ্টা করেছে। আবার উনার কবিতাসমূহ বাদ্য-সুর দিয়ে পাঠ করা জায়িয করার হীন উদ্দেশ্যে হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা সঙ্গীত করতেন, নৃত্য করতেন, বাদ্য বাজাতেন এই বিকৃত ইতিহাস রচনা করা হয়েছে। নাঊযুবিল্লাহ! পরবর্তীতে আমরা এ নিয়ে আরো আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩৮

 

 

আমরা এ যাবত তুলে ধরার চেষ্টা করেছি বৃহত্তর পারস্যে সুন্নতের অনুসরণে যে সামার প্রচলন ছিল- বিশেষত হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ‘মৌলবীয়া তরীক্বা’র মধ্যে যে সামার প্রচলন ছিল পরে পরিকল্পিতভাবে এই তরীক্বাকে নষ্ট করার গভীর ষড়যন্ত্র হয় এবং সামার পরিবর্তে প্রবেশ করানো হয় কথিত ‘ছূফী-নৃত্য’ এবং বাদ্যযন্ত্রসহ গান।

এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে বিভ্রান্ত শাসক শ্রেণী, কাফির ঐতিহাসিক, লেখক, শিল্পী এবং আরো অনেকে। ষড়যন্ত্রকারীরা শুধু ‘মৌলবীয়া তরীক্বা’কেই ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা করেনি, বরং মহান আল্লাহ পাক উনার মহান ওলী হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকেসহ উনার পরিবারের অনেকের প্রতি কলঙ্ক লেপন করার অপচেষ্টা করেছে, যেন মানুষ উনার জীবনী মুবারক থেকে, উনার রচিত কিতাব পড়ে পরিপূর্ণ ইসলামের অনুসারী না হয়। নাঊযুবিল্লাহ!

এদিকে বাতিল ফিরক্বাগুলো বিশেষত ওহাবী, সালাফী, দেওবন্দী, খারিজী সম্প্রদায় এসব গান-বাদ্য, কথিত ‘ছূফীনৃত্য’কে প্রকৃত ছূফী সম্প্রদায়ের কর্মকা- বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করে। নাঊযুবিল্লাহ!

অথচ বাস্তব সত্য হচ্ছে- সামা হলো খাছ সুন্নতের অনুসরণ, যা সকল পূর্ববর্তী আউলিয়ায়ে কিরামগণ উনারা তা জারি রাখার চেষ্টা করেছেন। বর্তমানে দেওবন্দী, জামাতী ঘরানার উলামায়ে ছূ’ এবং ওহাবী সম্প্রদায় সামার বিরুদ্ধে বলায় সুন্নতী সামার প্রচলন উঠে যাচ্ছে আর সেখানে প্রবেশ করছে গান-বাজনার মতো হারাম বিষয়গুলো।

আমাদের হাতে অসংখ্য, অগণিত দলীল রয়েছে, যা দিয়ে প্রমাণ করা যায়- অত্যন্ত সূক্ষ্ম কৌশলে সারা বিশ্বব্যাপী বিশেষত বর্তমান তুরস্ক, বলকান, মিশর, সিরিয়া এসব অঞ্চলে যাতে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ‘মৌলবীয়া তরীক্বা’ এবং উনার কিতাবাদি, সাহিত্য কর্মের মূল শিক্ষা যেন ছড়াতে না পারে, তার জন্য দিনের পর দিন উনার লেখাগুলোকে অনুবাদের সময়, প্রকাশনার সময় বিকৃত করা হয়েছে।

তথাকথিত ঐতিহাসিকদের মনগড়া ইতিহাসের বর্ণনার কিছু নমুনা আমরা তুলে ধরেছি। আগামী সংখ্যায় ইনশাআল্লাহ আমরা তুলে ধরবো বিভ্রান্ত অনুবাদকরা কিভাবে উনার সমৃদ্ধ লেখাসমূহকে বিকৃত করেছে এবং নিজেদের ধারণাগুলোকে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার লেখা বলে চালিয়ে দিয়েছে। নাঊযুবিল্লাহ!

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩৯

 

 

হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ‘রুবাইয়াত’ এবং অন্যান্য কবিতাসমূহ যারা অনুবাদ করেছে তাদের মধ্যে রয়েছে দুই ইহুদী। এদের একজন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যজন ইরানের। এদের নাম যথাক্রমে কোলম্যান বার্কস এবং শাহরাম শিবা। রয়েছে দুই ভারতীয় একজন হিন্দু দীপক চোপরা অন্যজন খ্রিস্টান অ্যান্ড্র হার্ভে। এছাড়াও রয়েছে একজন তুর্কী কবীর হেলমিনিস্কি এবং বুলগেরিয়ান আজিমা কোলিন। নেভিট এরগিন নামে যুক্তরাষ্ট্রের আরো একজন এবং রয়েছে ব্রিটেনের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এরবেরি এবং নিকলসন।

এখানে যতজনের নাম উল্লেখ করা হলো এদের প্রত্যেকের ভুল অনুবাদের প্রমাণ রয়েছে। এছাড়াও এমন অনুবাদও রয়েছে, যা হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মূল লেখার মধ্যে নেই।

আরো অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে- হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কবিতার লাইন যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তার বিলবোর্ডে, নিউজলেটারে, মানুষের ই-মেইলের শেষ লাইনে, প্রবন্ধে শোভা পায়। আর যুক্তরাষ্ট্রের অনুবাদক এবং লেখকদের কারণেই তা সম্ভব হয়েছে।

হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অনেক লেখা যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদী লেখক বার্কস কোলম্যান অনুবাদ করেছে, যা কিনা ফার্সী ভাষায় লিখিত। অথচ সে ফার্সীর একটি বর্ণও জানতো না। সে অন্য একজনের কাছ থেকে শুনে তার ভাবধারায় অনুবাদ করেছে। ফলে সেগুলোকে সে ঞৎধহংষধঃরড়হ না বলে ঠবৎংরড়হ বলতো। এক্ষেত্রে সে একজন ইরানী দোভাষী এবেল মঈনের সাহায্য নিয়েছিলো। কিন্তু দেখা গেল বই প্রকাশিত হওয়ার পর সেখানে অনুবাদক হিসেবে বার্কস কোলম্যান তার নিজের নাম বসিয়ে দিয়ে নিচে ছোট্ট করে লিখে দিতো এবেল মঈনের নাম।

বার্কস কোলম্যান অনুবাদ করেছে (বার্কস পৃষ্ঠা- ৩২): “না খ্রিস্টান, না ইহুদী, না মুসলিম, না হিন্দু, না বুদ্দিস্ট, না ছূফী, না জৈন। আমি কোনো ধর্মের অথবা সংস্কৃতির নই।”

আবার নিকলসন অনুবাদ করেছে (নিকলসন ১৮৯৮, পৃষ্ঠা ১২৫) : “হে মুসলিম, কি করতে হবে? আমি তো নিজেকে খুঁজে পাই না, আমি না খ্রিস্টান, না ইহুদী, না গাবর, না মুসলমান।”

অথচ এ রকম কোনো উক্তি বা লাইন হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাবাদিতে নেই; বরং রয়েছে এই মিথ্যাচারিতার জবাব। উনার বিখ্যাত রুবাইয়াতের চারটি লাইন নিচে তুলে ধরছি:

 

মান বান্দা ইয়ে কুরআন-আম, আগার জান দার আম

মান খাক এ রাহে মুহাম্মদ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ মুখতার আম

গার নকিল কন-আদ জযইন, কাস আজ গোফতার আম

বেজার আম আজ-ও, ওয়া আজ শকহান বেজার আম।

(রুবাইয়াত ১১৭৩)

অর্থ: আমি কুরআন শরীফ-এর খাদেম যতোদিন এ জীবন আছে

আমি রসূল উনার পথের ধুলা, নির্বাচিত পথে খাড়া

যদি কেউ বলে ব্যতিক্রম এর চাইতে কিছু

আমি তার থেকে আলাদা, প্রতিবাদী এসব উক্তির দ্বারা।

অর্থাৎ এসব কথিত সাহিত্যিক, অনুবাদকদের মিথ্যাচারিতার জবাব তিনি শত শত বছর পূর্বেই উনার রুবাইয়াতে দিয়ে গেছেন। এভাবেই উনার জীবনী, সাহিত্য, কর্ম, সব কিছু নিয়েই গভীর ষড়যন্ত্র চলেছে, এখনো চলছে। (ইনশাল্লাহ চলবে)

 

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪০

 

 

আমরা ইতঃপূর্বে আলোচনা করেছি কিভাবে এক শ্রেণীর ঐতিহাসিক এবং অনুবাদকগণ প্রখ্যাত ওলীআল্লাহ হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জীবন ইতিহাস এবং রচনাসমগ্রকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে। আজকে ‘মৌলবীয়া ত্বরীক্বা’র মধ্যে গান-বাজনা ও কথিত ‘ছূফী-নৃত্যে’র প্রচলন ঘটেছে কিছু নামধারী ছূফীদের মাধ্যমে এবং উনার প্রায় দুইশত বছর পর থেকে।

বস্তুত হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এসবের অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন। আমরা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব বাতিল বিষয়ের অনুপ্রবেশ এবং ইতিহাস বিকৃতি ঘটানো হয়েছে পরিকল্পিতভাবে, সুক্ষ্মকৌশলে। তবে কখনো কখনো এমনটাও ঘটেছে যে- উনার লেখার গভীরতা উপলব্ধি করতে না পেরে অনুবাদকগণ তাদের মতো করে ব্যাখ্যা করছে। এর মূল কারণ ‘যে দেখে এবং যে দেখে না তারা কেউ সমান হতে পারে না।’ যেমন হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সময়কালীন ওলীআল্লাহগণ উনারা ছিলেন ওহাদাতুল ওজুদ-এ বিশ্বাসী অর্থাৎ “সবকিছুই মহান আল্লাহ পাক”। যেমন উনার একটি লেখাতে তিনি লিখেছেন-

যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় :

“না আমি হই আমি, না তুমি হও তুমি

না তুমি হও আমি আবার আমি হই আমি। তুমি হও তুমি

এবং তুমি হও আমি।…………….।”

এখানে ওহাদাতুল ওজুদের বিষয়টি স্পষ্ট।

কাফির শিল্পী-সাহিত্যিকরা এটিকে অত্যন্ত দুর্বোধ্য ভালোবাসার কবিতা হিসেবে বিবেচনা করে উনাকে চরম রোমান্টিক কবি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। নাঊযুবিল্লাহ!

কিন্তু মুসলমান শাসক, ধর্মপ্রাণ মুসলমান সাহিত্যিকদের এ বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার প্রয়োজন ছিল। বার্কস কোলম্যানের মতো এক বর্ণ ফার্সী না জানা ইহুদী অনুবাদক যদি উনার লিখনীসমূহ অনুবাদ করে ছড়াতে পারে, তবে ফার্সী জানা খোদাভীরু মুসলমান লেখকগণ কেন উনার লেখার সত্যিকারের সুবাস ছড়াতে ব্যর্থ হয়েছে? আবার এই কাফির-মুশরিক লেখক-অনুবাদকরা এককভাবে কাজ করেনি, এদের নেপথ্যে কাজ করেছে এবং করছে জাতিসংঘ নামক ইহুদীসংঘ। আগামীতে আমরা এ নিয়ে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ!

 

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪১

 

 

ইহুদীসংঘ (জাতিসংঘ) শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিকভাবে সহায়তা দানের জন্য একটি বিশেষ সংস্থাকে তৈরি করেছে; যা হচ্ছে টঘঊঝঈঙ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, টঘঊঝঈঙ ইসলামী তাহযীব-তামুদ্দুনকে নষ্ট করে ইসলামের অনেক বিষয়কে তথাকথিত বাতিল ধর্মগুলোর সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের মতো চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র করেছে, করছে এবং এক্ষেত্রে অর্থায়নও করে থাকে। যেমন ‘মৌলবীয়া তরীক্বা’র মধ্যে কখনোই গান-বাজনা-নৃত্য ইত্যাদি হারাম বিষয় ছিল না। এসব প্রবেশ করে অনেক পরে।

কাট্টা নাস্তিক, মুরতাদ, কামাল পাশার সরকার তুরস্কের ক্ষমতায় এসে প্রথমে সকল ইসলামী কর্মকা-, খানকা শরীফ, মৌলবীয়া তরীক্বার হক্বপন্থী এবং বাতিলপন্থী সকলের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে বাতিলপন্থীদের কথিত ছূফী-নৃত্য চালু করার এবং প্রদর্শনীর অনুমতি দেয়। নাঊযুবিল্লাহ! এক্ষেত্রে টঘঊঝঈঙ এক ধাপ এগিয়ে ২০০৫ সালে তুরস্কের এই কথিত ছূফী-নৃত্যকে সহায়তা দানের জন্য এই নৃত্য উৎসবকে মানবতার এক শ্রেষ্ঠ শিল্প কর্ম এবং তুরস্কের প্রাচীন ঐতিহ্য হিসেবে আখ্যায়িত করে। নাঊযুবিল্লাহ!

আবার ২০০৭ সালকে ‘আন্তর্জাতিক রুমী বৎসর’ হিসেবে ঘোষণা করে। আবার এই সালেই হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়।

ইরান, আফগানিস্তান, তুরস্ক এই তিনটি দেশ একত্রে হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ৮০০তম বিলাদত শরীফ দিবস উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে- সেখানে যোগ দেয় টঘঊঝঈঙ। হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জীবনী মুবারক এবং কিতাবাদির উপর যারা গবেষণা করছে তাদের উৎসাহ দেয়ার নামে টঘঊঝঈঙ মেডেল বানিয়ে প্রদান করে। এখন এটা সহজেই অনুধাবনীয়, যারা কথিত ছূফী-নৃত্যের প্রচলনে সহযোগিতা করে, তারা কোন ধরনের সাহিত্যিক এবং গবেষকদের মেডেল দিয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা ইতঃপূর্বে ঐসব সাহিত্যিক, অনুবাদকদের কর্মকা- নিয়ে আলোচনা করেছি।

তাহলে আমরা সবশেষে বলতে পারি- আজকে তুরস্ক, সিরিয়া, মিসর, ইরান এবং বলকান অঞ্চলে ‘মৌলবীয়া তরীক্বা’র নামে, সামার নামে যে কথিত ‘ছূফী-নৃত্য’ ও গান-বাজনা চলছে তা কখনোই মহান আল্লাহ পাক উনার বিশিষ্ট ওলী হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহতুল্লাহি আলাইহি উনার দ্বারা প্রচলিত নয়।

শুধু তাই নয়, উনার গ্রন্থাদি, কাব্যসমূহ, যা বাজারে পাওয়া যায়, তার অধিকাংশই ভুল অনুবাদে ভরা। আর এসব মনগড়া অনুবাদের নেপথ্যে রয়েছে ইহুদী, হিন্দু, খ্রিস্টান এবং নামধারী মুসলমান সাহিত্যিক অনুবাদক। এর উদ্দেশ্য- যেন উনার মহান আদর্শ থেকে মানুষ দূরে সরে থাকে, মুসলমানগণ যেন উনার শিক্ষার দ্বারা উজ্জীবিত হতে না পারে। এছাড়াও কাফির ঐতিহাসিকরা উনার এবং উনার সম্মানিত শায়েখ হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের জীবন ইতিহাসে এমন কিছু স্পর্শকাতর বিষয় যোগ করেছে যেন মানুষ উনাদের সম্পর্কে সন্দেহপ্রবণ হয়। অথচ তিনি সুন্নতের অনুসরণে হালাল সামা শুনতেন, আয়োজন করতেন এবং মহান আল্লাহ পাক উনার ইশকে হারিয়ে যেতেন।

মহান আল্লাহ পাক তিনি যেন গান-বাজনা-নৃত্যকে ধ্বংস করে আবার সামার সুন্নত জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের তাওফীক দ্বান করেন।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪২

 

 

ইসলামে বাদ্যযন্ত্র এবং সঙ্গীতের কোনো স্থান নেই। কুরআন শরীফ এবং হাদীছ শরীফ-এর দলীল দ্বারাই বাদ্যযন্ত্রসহ বা ছাড়া সঙ্গীত হারাম হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত। অনেকে পাখির শব্দের সঙ্গে কিয়াস করে দফকে জায়িয বলেছেন, বিশেষত শাফী মাযহাবে এবং হযরত ইমাম গাযযালী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ‘এহইয়াউলুল উলুমুদ্দীন’ কিতাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন; তবে দফ বাজানোর বর্তমান প্রেক্ষাপট একেবারে ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে।

ইসলামের শুরুর দিকে আরব দেশে দফ নামক একটি যন্ত্র ব্যবহার হতো। দফ প্রাণীর চামড়া দিয়ে তৈরি, যাতে আঘাত করলে জোরে শব্দ হয়। দফে বিভিন্ন প্রকার শব্দ সৃষ্টি করে বিভিন্ন প্রকার সঙ্কেত দেয়া হতো। ধরা যাক, ক্রমাগত আঘাত করে শব্দ সৃষ্টি করে যদি শত্রু আক্রমণের ঘোষণা দেয়া হয় তবে একটি বড় একটি ছোট আঘাত করে হয়তো কোথাও সমবেত হওয়ার ঘোষণা দেয়া হলো- এ রকম। এছাড়া অগ্নিউপাসক, পৌত্তলিকরা তাদের নাচ-গানের আসরে এই দফ ব্যবহার করতো। কিন্তু ইসলাম কখনোই গান-বাজনার আসর এবং সেখানে দফ বাজানো সমর্থন করেনি। পূর্বে সামার মাহফিলগুলোতে কখনো কখনো দফের ব্যবহারের কথা শুনা গেলেও বর্তমানে সে পরিস্থিতি নেই।

এর ব্যাখ্যায় বলা যেতে পারে, একবার একজন স্বর্ণকার তিনি অলঙ্কার বানানোর সময় হাতুড়ি দিয়ে যখন আঘাত করছিলেন সেই আঘাতের শব্দের মধ্যে ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ যিকির শুনতে পেয়ে বিখ্যাত ওলীআল্লাহ হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ওজুদের হালে চলে যান; যা উনার জীবনী মুবারকেও লিখা আছে। এর কারণ, অন্তরে যিনি মহান আল্লাহ পাক উনার সঙ্গে ইশকে নিমজ্জিত থাকেন। আর উনাদের পক্ষেই এই হাতুড়ির আওয়াজ বা দফের আওয়াজে সেই হালতে পৌঁছা সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে দেখা যায়, আজকে তুরস্কে, মধ্যপ্রাচ্যে, মিশরে শুধু দফ বাজানোর অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। সেখানে কয়েকজন দফ বাদক স্টেজে নানান তালে দফ বাজিয়ে, নেচে গেয়ে থাকে। এখনকার দফের শব্দ মানুষের অন্তরে মুনাফিকী সৃষ্টি করে।

মূল বিষয় হচ্ছে- পূর্বের দফের সঙ্কেতটি বর্তমানে বাদ্যের তালে পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে এ দফই শুধু নয়, যে কোনো শুষ্ক কাঠের টুকরাতেও কেউ যদি তাল বাজানোর চেষ্টা করে, তবে সেটাও শরীয়তসম্মত হবে না। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অনেকেই নাশিদ পাঠের সময় (হামদ, না’ত, কাছীদা শরীফ মধ্যপ্রাচ্যে নাশিদ নামে মশহুর) ‘শাফী মাযহাবে জায়িয’ এই দোহাই দিয়ে দফ ব্যবহার করে থাকে। অথচ দফের ব্যবহার এখন কোনোভাবেই শরীয়তসম্মত নয়। এ নিয়ে আমরা আগামীতে বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪৩

আরব বিশ্বে নাশিদের প্রচলন রয়েছে। তবে এই নাশিদ (হামদ, না’ত, কাছীদা) বাদ্যযন্ত্রসহ, বাদ্যযন্ত্র ছাড়া সবভাবেই পঠিত হচ্ছে। বাদ্যযন্ত্র ছাড়া পাঠ করাই শরীয়তসম্মত। সুতরাং যারা বাদ্যযন্ত্র ছাড়া পাঠ করেন তারা হক্বের উপর রয়েছেন। কিন্তু বাদ্যযন্ত্রসহ যারা নাশিদ পাঠ করে তাদের মধ্যে দুটো দল দেখা যায়। একদল বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হারাম জেনেই পাঠ করছে আর দ্বিতীয় দল শুধু দফের ব্যবহার জায়িয মনে করে দফ বাজিয়ে নাশিদ পাঠ করে থাকে। কিন্তু বর্তমানে দফ বাজিয়ে নাশিদ পাঠ করা এবং সামার আয়োজন করা শরীয়তসম্মত কিনা সে নিয়েই আমরা বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। কোনো কোনো মাযহাবে এবং কোনো কোনো কিতাবে দফ বাজিয়ে সামা পরিবেশনকে জায়িয বলাতে এ নিয়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে পূর্ববর্তীকালে দফের ব্যবহার আর বর্তমানে দফের ব্যবহারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এছাড়াও কিতাবে দফ বাজিয়ে সামা শোনার যেসব শর্ত-শারায়েত বর্ণনা করা হয়েছে তা বর্তমানে খুঁজে পাওয়া যায় না। যদিও বর্তমানে দফ বাজিয়ে সামা শোনার শর্ত পূরণ হলেও দফ বাজিয়ে সামা শোনা জায়িয হবে না। কেননা দফের ব্যাখ্যাকৃত বিষয়টিতে আরো ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের আালোচনার সুবিধার্থে সামা কী? দফের আওয়াজ কি? এবং সামার মাহফিলে দফ বাজানোর জায়িযের পক্ষে যেসব যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে তা আমরা তুলে ধরছি।

সামা হচ্ছে সুললিত ও ভারসাম্যপূর্ণ স্বরের মাধ্যমে অর্থবোধক বাক্য পরিবেশন করা এবং তার অর্থ হৃদয়াঙ্গম করা। সুললিত স্বর দুই প্রকার। ১. ভারসাম্যপূর্ণ স্বর  ২. ভারসাম্যহীন স্বর। ভারসাম্যপূর্ণ স্বর আবার দুই প্রকার। প্রথমত, যার অর্থ বোঝা যায়; যেমন কবিতা, কাছীদা, সামা ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত, যার অর্থ বোঝা যায় না; যেমন, জীবজন্তুর স্বর। ভারসাম্যপূর্ণ স্বর বলতে উৎপত্তি স্থলের দিক থেকে তা আবার তিন প্রকার।

১. জড় পদার্থ থেকে নির্গত সুর, যেমন বাঁশির সুর।

২. মানুষের কণ্ঠ থেকে নির্গত স্বর।

৩. প্রাণীর শব্দ যেমন বুলবুলি, ঘুঘু, কোকিল ইত্যাদির স্বর।

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪৪

কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “ক্রীড়া কৌতুকের শব্দ, তারের বাদ্য শরীয়তে নিষিদ্ধ। এগুলো হারাম হওয়ার কারণ আনন্দ পাওয়া নয়, এগুলো হারাম বিষয়ের অনুগামী বস্তু; যেমন শরাব পান।” আরো উল্লেখ করা হয়েছে, “শরাব নিষিদ্ধ হওয়ার শুরুতে আরবে প্রচলিত চার প্রকারের বিশেষ শরাবপাত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। কারণ এগুলো দেখলেই শরাবের স্মরণ হতো। আবার এসব বাদ্যযন্ত্র নিয়ে সমাবেশ করা ফাসিকদের অভ্যাস।”

অর্থাৎ এক্ষেত্রে তিনটি যুক্তি দেখানো হয়েছে: যে সমস্ত বাদ্যযন্ত্র শরাবের অনুগামী, যা দেখলে শরাবের কথা স্মরণ হয় এবং যা ফাসিকী কাজের সহায়ক এসব কারণে তারের বাদ্যযন্ত্র যেমন বীণা, সারেঙ্গী ইত্যাদি হারাম। “এগুলো ছাড়া অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র যেমন ঢাক, দফ (যেগুলো সঙ্গীতের বাদ্যযন্ত্র হিসেবে নয়, বরং আওয়াজ সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষকে কোনো বিশেষ বিষয়ে তথ্য দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়) ইত্যাদি বৈধ। এগুলোকে পাখিদের আওয়াজের উপর কিয়াস করে বৈধ করা হয়েছে।”

হাদীছ শরীফ-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে, “আমি বাদ্যযন্ত্র ও মূর্তি ধ্বংস করতে প্রেরিত হয়েছি।” এখানে যে যন্ত্রই বাদ্যের কাজে ব্যবহৃত হবে তা সকলই হারাম বোঝায়।”

দ্বিতীয়ত, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে কেউ যদি শরাব পানে অভ্যস্ত না হয় তবে কী তার জন্য বাদ্যযন্ত্র বাজানো জায়িয হবে? না তাও না। তাহলে এক্ষেত্রে আমাদের যুক্তি হচ্ছে হাদীছ শরীফ-এ রয়েছে, “গান-বাজনার সুর অন্তরে নিফাকী সৃষ্টি করে।” সুতরাং বাজনার সুর নিফাকীর অনুগামী সে কারণেই বাজনা নিষিদ্ধ।

তবে এটাও সত্য যে, বাদ্যযন্ত্রের সাথে শরাবের যোগ রয়েছে আর বাদকরা শরাবখোর হয়ে থাকে। তাছাড়া বাদ্যযন্ত্র দেখলে শরাবের কথাও স্মরণ হয় আর অবশ্যই এটা কাফির-মুশরিক এবং ফাসিকদের উপকরণ। কিন্তু এগুলো প্রধান কারণ নয়। হারাম হওয়ার মূল কারণ হলো- কুরআন শরীফ এবং হাদীছ শরীফ-এ স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষনা করা হয়েছে। আগামীতে আমরা ঢাক, দফ বৈধ এবং হারাম হওয়ার প্রেক্ষাপট সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪৫

অনেকে পাখির আওয়াজের উপর কিয়াস করে দফের ব্যবহার বৈধ বলেছেন। কিতাবে লিখা আছে, “ঢাক, দফ ইত্যাদি বৈধ। কারণ মদের সাথে এগুলোর সম্পর্ক নেই। মদ্যপায়ীরা এগুলো বাজায় না এবং এতে মদের মজলিসের স্মরণ হয় না। এতে মদ্যপায়ীদের সাথে মিলও প্রকাশ পায় না।”

প্রকৃতপক্ষে ঢাক-দফের বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন রয়েছে। পাখি জন্মগতভাবে একটি স্বর পায়, যা দিয়ে সে ডাকে, সে স্বর শোনা জায়িয যেমন বউ কথা কও পাখি, কোকিল পাখি ইত্যাদির ডাক। একইভাবে প্রাণীর পাতলা চামড়া দিয়ে যখন ঢাক, দফ বাজানো হয় তখন স্বাভাবিক আঘাতে সেখান থেকে একটা আওয়াজের সৃষ্টি হয়, সেটি নিছক একটা শব্দ। এই শব্দের সাথে হাতুড়ী পেটানোর শব্দ, মেশিনের শব্দ-এর কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু যখনই এসব যন্ত্রের মধ্যে কৃত্রিমভাবে কোনো তাল সৃষ্টি করা হবে, যা কিনা একটা ঝোক সৃষ্টি করবে তা কখনোই জায়িয হবে না। বিষয়টি হচ্ছে এ রকম: যদি কোনো পাখিকে হারাম গান শেখানো হয় আর সে যদি তা শোনায় তবে তখন সে গান শোনাও জায়িয হবে না। তাহলে দেখা গেলো- পাখির আওয়াজের উপর কিয়াস করে ঢাক, দফ বাজানো জায়িয বলার বিষয়টি শুদ্ধ নয়। এছাড়াও আরো বাস্তব সত্য হচ্ছে, কোনো যন্ত্রের সুর তা কীবোর্ড যুক্ত যন্ত্র (যেমন হারমোনিয়াম, পিয়ানো ইত্যাদি) তারের যন্ত্র (যেমন সেতার, সরোদ ইত্যাদি) বা রীড যন্ত্রের (যেমন বাঁশি, বীণা ইত্যাদি) সুর হোক না কেন, তালের যন্ত্র ছাড়া তা কখনোই পূর্ণতা পায় না। তালের যন্ত্র বলতে ঢোল, তবলা, পাখোয়াজ, ইত্যাদিকে বোঝায়। অর্থাৎ গায়ক বাদকদের কাছে তালের যন্ত্র একটি অপরিহার্য জিনিস। বরং যখন কোনো তালের যন্ত্র থাকে না, তখন গায়করা হাত দিয়ে বা পা দিয়ে তাল রাখারও চেষ্টা করে। নাঊযুবিল্লাহ! তাহলে সুরের যন্ত্র যেমনি শরাবের অনুগামী, শরাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, কাফির-মুশরিক, ফাসিক-ফুজ্জাররা ব্যবহার করে, এসবের সুর অন্তরে নিফাকীর সৃষ্টি করে একইভাবে বরং তার চেয়ে বেশি বাদ্যের সুর অন্তরে নিফাকী সৃষ্টি করে, এবং এগুলোও শরাবের অনুগামী, দেখলে শরাবের স্মরণ হয় এবং কাফির-মুশরিক, ফাসিক-ফুজ্জারদের বড় অস্ত্র। তাহলে বর্তমানে কোনো কাছীদা বা নাশিদ পাঠে সামার মাহফিলে ঢোল, ঢোলক, দফ এসব বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার কোনোভাবেই শরীয়তসম্মত হবে না।

 

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪৬

আমরা এ পর্যায়ে পাশ্চাত্যে যে ধরনের হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ প্রচলিত রয়েছে, সে ব্যাপারে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। তবে তার পূর্বে কয়েকটি বিশেষ বিষয় আমাদের জানা প্রয়োজন।

আমরা আরবী ভাষাকে মুহব্বত করি। কেননা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ভাষা আরবী, কুরআন শরীফ-এর ভাষা আরবী এবং আখিরাতের ভাষা আরবী। কিন্তু ক্বাছীদা শরীফ বিভিন্ন ভাষায় পাঠ হয়ে থাকে, যদিও এর অনেক কারণ। তবে প্রধান কারণসমূহের একটি হচ্ছে- ভাষার উচ্চারণের প্রভাব এবং অন্যটি হচ্ছে- সেই ভাষায় ক্বাছীদা শরীফ পঠনে কিছু প্রচলিত তরতীবের ব্যবহার। এখন আরবী ভাষাভাষীগণের কাছে আমাদের বাংলা ভাষা হচ্ছে বিজাতীয় ভাষা এবং আমাদের ভাষার উচ্চারণ এবং পঠন পদ্ধতি উনাদের নিকট অপরিচিত। কিন্তুআমরা যখন সঙ্গীতের প্রভাব বর্জিত ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করি, তা জায়িয এবং মাতৃভাষায় পাঠ করার সুন্নত আদায় হয়।

একইভাবে ইংরেজি ভাষাও আমাদের নিকট বিজাতীয় ভাষা এবং সেই ভাষায় হামদ, না’ত, ক্বাছীদা পঠন পদ্ধতি আমাদের চেয়ে ভিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক। আবার ইংরেজি হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পঠনে ইংরেজি ভাষাভাষীগণ তাদের প্রচলিত রীতিই অনুসরণ করবে। কিন্তু যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হচ্ছে- আমাদের বাংলা ভাষাভাষীগণ যখন হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করবেন, তা যেন প্রচলিত সঙ্গীত যেমন নজরুলগীতি, রবীন্দ্র সঙ্গীত, পল্লীগীতি, আধুনিক গান ইত্যাদি গানের সুরে পঠিত না হয়। একইভাবে ইংরেজি ভাষায় রয়েছে জড়পশ, জধঢ়, ঈড়ঁহঃৎু, ঈষধংংরপধষ, এড়ঃযরপ, উরংপড়, ঔধুু- এ জাতীয় গান-বাজনা। ফলে ইংরেজি ভাষায় পঠিত কোনো হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ যেন তাদের প্রচলিত সঙ্গীতের অনুরূপ না হয়। পৃথিবীর সকল ভাষাতেই হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করা জায়িয এবং সুন্নত; যদি তা সেই ভাষায় প্রচলিত সঙ্গীত থেকে এবং বাদ্যযন্ত্র থেকে মুক্ত হয়।

ধরা যাক, কোনো পাহাড়ি সঙ্গীতে আমরা অভ্যস্ত নই। এখন কোনো পাহাড়ি মানুষ যদি তাদের মধ্যে প্রচলিত কোনো উৎসবের গান বা পাহাড়ি গানের তরতীবে হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করে, তবে তা কখনোই জায়িয হবে না।

হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করার জন্য কোনো সার্বজনীন সুর তৈরি করা বাস্তবিক পক্ষে কঠিন। কেননা ভাষা, ভাষার উচ্চারণ এবং সেই ভাষায় পঠনের তরতীবের কারণে হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পঠনেও ভিন্নতা প্রকাশ পাবে এবং এটাই স্বাভাবিক।

সমস্ত মুসলিম দেশসহ সারাবিশ্বের মুসলমানগণ বর্তমানে যতোভাবে হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করছেন, সামা শরীফ-এর মাহফিলের আয়োজন করছেন এবং এর মধ্যে সঠিক পদ্ধতিটি নিয়ে আমরা পরবর্তীতে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪৭

মুসলিম বিশ্ব ছাড়াও অনেক কাফির দেশে অনেক মুসলমান রয়েছেন, যারা সেই দেশের ভাষা অনুযায়ী হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করেন এবং সামা মজলিসের আয়োজন করে থাকেন। সারা বিশ্বের মুসলমানগণ বর্তমানে কয়েকটি পদ্ধতিতে হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করেন এবং সামা মাহফিলের আয়োজন করে থাকেন। যেমন-

১। বাদ্যযন্ত্রসহ হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ।

২। কোনো প্রকার বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার না করলেও দফ জাতীয় বাদ্য বাজিয়ে হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ।

৩। কোনো প্রকার বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার না করলেও মুখে যিকিরের ভঙ্গিতে শব্দ করে তাল-লয় রক্ষা করে পাঠ।

৪। কোনো প্রকার বাদ্যযন্ত্র ও মুখে শব্দ ব্যবহার না করলেও মেশিনে কৃত্রিম শব্দ যোগে পাঠ।

৫। কখনো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে, কখনো না করে কথিত ‘ছূফী-নৃত্য’ নামে এক ধরনের নাচের মাধ্যমে পাঠ।

৬। সমস্ত প্রকার বাদ্যযন্ত্র, বাদ্যের মতো শব্দ ব্যতীত কিন্তু প্রচলিত গানের সুরে পাঠ।

৭। সমস্ত প্রকার বাদ্যযন্ত্র ব্যতীত, রাগ রাগিনী ও প্রচলিত গানের সুর বিবর্জিত কিন্তু যে কোনো একটি সুর করে পাঠ।

৮। উপরের সমস্ত পদ্ধতিতে পাঠের সাথে পাঠকের ভিডিও ধারণপূর্বক উপস্থাপন; আবার প্রাণীর ছবি ও বাজনা ব্যতীত উপস্থাপন।

বাদ্যযন্ত্র বা দফসহ এবং রাগ-রাগিনী এবং প্রচলিত গানের সুরে হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ যে হারাম এবং নাজায়িয তা আমরা ইতঃপূর্বে আলোচনা করেছি। এছাড়াও আমরা আলোচনা করেছি সামা শুনে ওজুদের হাল আসা এক বিষয় আর কথিত ছূফী-নৃত্যের নাম দিয়ে ইচ্ছাকৃত নর্তন-কুর্দন করা ভিন্ন বিষয়। কোনো প্রকার নর্তন-কুর্দন করে হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ এবং সামা মজলিসের আয়োজন করা সম্পূর্ণ হারাম ও কুফরী।

বর্তমানে একটি সম্প্রদায় দেখা যায়, যারা কোনো বাদ্যযন্ত্র, দফ, প্রচলিত গানের সুর ব্যবহার না করলেও তারা তাদের সামা পরিবেশনের সময় মুখে যিকিরের ভঙ্গিতে এক ধরনের শব্দ করে থাকে- এটিও সম্পূর্ণ হারাম ও কুফরী। আবার অনেকে মুখে কৃত্রিম শব্দ না করলেও যন্ত্রের সাহায্যে এক ধরনের শব্দ সৃষ্টি করে তাল-লয় রক্ষা করে হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করে- এ বিষয়গুলোও শরীয়তসম্মত নয়। আগামীতে আমরা এ নিয়ে আরো আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪৮

যিকির শব্দের অর্থ মহান আল্লাহ পাক উনার স্মরণ। আর যিকিরের ছবক করার জন্য প্রয়োজন হয় একজন কামিল মুর্শিদ বা শায়েখ উনার নিছবত। সারাজীবন যিকিরের ভঙ্গিতে শব্দ করলেও ফায়দা পাবে না, যদি না কোনো মহান ওলীআল্লাহ উনার হাত মুবারককে বায়াত হয়ে ছবক না করবে। এছাড়াও যিকিরের জন্য প্রয়োজন বিশুদ্ধ নিয়ত। প্রথমত যিকির করতে হয় মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টির জন্য আর যিকিরের পূর্বে যিনি কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ হবেন উনার প্রতি থাকতে হবে চূড়ান্ত হুসনে যন বা বিশুদ্ধ ধারণা, নতুবা যিকিরকারী কোনো ফায়দা পাবে না। বর্তমানে যারা সামা পরিবেশনে যিকিরের ভঙ্গিতে শব্দ করছে তারা একই সঙ্গে অনেকগুলো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। যেমন-

১। এখানে মহান আল্লাহ পাক উনার স্মরণে যিকির না করে তাল রক্ষার্থে যিকির করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ হারাম।

২। এখানে যিকিরের ভঙ্গিতে সুরের তাল রক্ষার শব্দ করাতে যিকিরকে ইহানত করা হচ্ছে যা কুফরী।

৩। যিকিরের শব্দকে তাল-লয় হিসেবে ব্যবহার করায় বাদ্যযন্ত্রের সহযোগিতা নেয়ার মতো গুনাহ হচ্ছে যা কবীরা গুনাহ।

৪। এভাবে বিশুদ্ধ নিয়তবিহীন, মহান আল্লাহ পাক উনার স্মরণ ব্যতীত যিকিরের ভঙ্গিতে মহান আল্লাহ পাক উনার নাম মুবারক উচ্চারণে ইহানত করাতে দিল মুর্দা হয়ে গুমরাহ হয়ে যায়।

সুতরাং এ পদ্ধতিতে হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করা সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়িয এবং কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও আরো একটি সম্প্রদায় রয়েছে, যারা মুখে কোনো যিকিরের ভঙ্গিতে শব্দ না করলেও মেশিনের সাহায্যে এক ধরনের কৃত্রিম শব্দ সৃষ্টি করে, যাতে ক্বাছীদা শরীফ পাঠের মধ্যে এক ধরনের ঝোঁক সৃষ্টি হয়। এ ধরনের ঝোঁক সৃষ্টি করার নেপথ্যে থাকে আসলে তাল-লয় রক্ষার প্রবণতা। ফলে এ ধরনের শব্দ সৃষ্টি করাও জায়িয নয় বরং হারাম।

অনেকের আওয়াজকে বুলন্দ করার জন্য যে ইকো সৃষ্টি করা হয়, তা ভিন্ন ব্যাপার। কেননা এর উদ্দেশ্য থাকে হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠকে হৃদয়গ্রাহী করা। ফলে আমরা উপলব্ধি করতে পারলাম- হারাম বাদ্যযন্ত্র, সুর দ্বারা হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করা, সামা মাহফিলের আয়োজন করা কখনোই জায়িয নয়; এমনকি কৃত্রিম শব্দ যোগেও পাঠ করা যাবে না, যদি তা তাল-লয়ের অনুরূপ হয়।

আসলে ক্বাছীদা শরীফ লেখা, পাঠ করা, শোনা, শোনার আয়োজন করা, উপস্থিত থাকা সুর করা (যা গানের সুর নয়), সব খাছ সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। যে আমল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেই আমল হুবহু সুন্নতী নকশায় আদায় করা তখনই সম্ভব যখন মহান আল্লাহ পাক এবং উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারা দয়া করবেন, ইহসান করবেন, রহমত করবেন। এই সুন্নতের আমলের মধ্যে যেহেতু যথেষ্ট খায়ের, বরকত রয়েছে, তাই যুগে যুগে ইবলিস এবং তার অনুসারী কাফির মুশরিকরা মুসলমানগণকে সামার সঠিক পথ থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য নানা ষড়যন্ত্র করেছে, করে যাচ্ছে। আমাদের অবশ্যই কাফিরদের এসব ষড়যন্ত্র থেকে বেঁচে থেকে ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করার ও শোনার হাক্বীক্বী সুন্নত জিন্দা করার লক্ষ্যে কোশেশ করে যেতে হবে। মহান আল্লাহ পাক তিনি যতটুকু কবুল করেন। আগামীতে হালাল সামার রীতি-নীতি, বিশুদ্ধ ক্বাছীদা শরীফ পাঠের তরতীব নিয়ে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

 

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪৯

যে কোনো কিছু পাঠের ক্ষেত্রে আমরা কণ্ঠের স্বর এবং সুর ব্যবহার করি। গদ্য এবং কবিতা পাঠের ক্ষেত্রে ব্যবহার করি স্বর এবং হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠের ক্ষেত্রে ব্যবহার করি স্বরের সঙ্গে সুর। এখন সুরের বিষয়টি আমাদের বোঝা প্রয়োজন।

আমরা যখন কথা বলি তখন বাক্য ব্যবহার করি। আর একটি বাক্যে থাকে অনেক শব্দমালা। আর একটি শব্দ তৈরি হয় কয়েকটি বর্ণের সমন্বয়ে। এখন মানুষ যে ভাষাতেই কথা বলুক না কেন, তার সে ভাষায় রচিত একটি বাক্য বিশ্লেষণ করলে সে ভাষার বর্ণ পাওয়া যাবে।

একইভাবে আমরা যখন কোনো সুর তৈরি করি বা কোনো সুরকে কণ্ঠে ধারণ করি, তখন সেই সুরকে বিশ্লেষণ করলে স্বরের বিন্যাস পাওয়া যাবে। পাক-ভারত উপমহাদেশে এই স্বরের বিন্যাসকে উপস্থাপন করা হয় সা-রে-গা-মা এসব নাম দ্বারা আবার পাশ্চাত্যে একে উপস্থাপন করা হয় উড়, জব, ঋর, গধ এ রকম নাম দ্বারা। যাকে স্বরলিপি বা নোটেশন বলা হয়। মূলত, মানুষ বিভিন্ন প্রকার স্বর উচ্চারণ করতে পারে; তবে বিভিন্ন ভাষায় এগুলোকে বিভিন্নভাবে নামকরণ করা হয়েছে। তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম- যেকোনো সুরকেই আমরা বিশ্লেষণ করি না কেন, আমরা পাবো সা-রে-গা-মা নামক স্বরের বিন্যাস। আমরা যদি এই স্বরগুলোর নতুন নামকরণও করি তথাপি সেই নতুন নামকৃত স্বরের একটি বিন্যাস পাওয়া যাবে। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে, একটি ক্বাছীদার সুরের বিন্যাসকে আমরা জায়িয বলি অথচ একটি গানের সুরের বিন্যাসকে নাজায়িয বলি তার কী কারণ?

সঙ্গীত নিয়ে যারা কাজ করেছে তারা স্বর উপস্থাপনের কতগুলো পদ্ধতি বা ধরন তৈরি করেছে। এগুলোকে সঙ্গীত শাস্ত্রে বলা হয় ঠাঁট। এ রকম কয়েকটি প্রচলিত ঠাঁটের নাম হচ্ছে বিলাবল, ইমন, ভৈরব ইত্যাদি। অর্থাৎ প্রতিটি ঠাঁটের স্বরের বিন্যাস নির্দিষ্ট। এই বিন্যাসের উপর ভিত্তি করে রাগ-রাগিনী গাওয়া হয়। যেহেতু শরীয়তে সঙ্গীত, রাগ-রাগিনী গাওয়াকে হারাম করা হয়েছে, ফলে কোনো সুরে হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করলে, সেই সুরের বিন্যাসের মধ্যে যদি ঠাঁটের বা রাগ-রাগিনীর বিন্যাস পাওয়া যায়, তবে সেই সুর অবশ্যই পরিত্যাজ্য। বিষয়টি সহজভাবে বলতে গেলে এভাবে বলা যেতে পারে- একটি বাক্যকে বিশ্লেষণ করলে অবশ্যই বর্ণ পাওয়া যাবে, বর্ণের বিন্যাস পাওয়া যাবে কিন্তু কয়েকটি বর্ণের সমন্বয়ে গঠিত কয়েকটি শব্দ যোগ করলে একটি অশ্লীল বাক্য পাওয়া যাবে আবার কয়েকটি বর্ণের সমন্বয়ে গটিত কয়েকটি শব্দ যোগ করলে একটি নছীহতমূলক বাক্য পাওয়া যাবে। তাহলে এখানে পার্থক্য হচ্ছে বর্ণের বিন্যাসের উপর ভিত্তি করে। আর এ কারণেই একটি স্বরের বিন্যাস জায়িয এবং অন্যটি নাজায়িয। (চলবে)

 

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৫০

 

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো একটি সুরকে বিশ্লেষণ করলে কোনো একটি নির্দিষ্ট রাগের আবহ পাওয়া যায় না; বরং কয়েকটি রাগের মিশ্রণ পাওয়া যায়, সেগুলোও বর্জনীয়। আবার এমন অনেক সুর আছে, যা নির্দিষ্ট রাগ-রাগিনীতে না পড়লেও সেগুলো কোনো গানের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে সেই সুর শুনলে কোনো নির্দিষ্ট গানেরই স্মরণ হয়, তাই সেই সুরগুলোও পরিত্যাজ্য। ক্বাছীদা পাঠের সময় যে বিষয়গুলো পরিহার করা প্রয়োজন:

১। কোনো ক্বাছীদা এমন কোনো সুরে পাঠ করা উচিত নয়, যা কোনো নির্দিষ্ট রাগের উপর রচিত

২। কোনো ক্বাছীদা এমন কোনো সুরে পাঠ করা উচিত নয়, যেখানে কয়েকটি রাগের মিশ্রণ খুঁজে পাওয়া যাবে।

৩। কোনো ক্বাছীদা এমন কোনো সুরে পাঠ করা উচিত নয়, যা কোনো নির্দিষ্ট রাগে না হলেও তা প্রচলিত কোনো গানের সুরে পঠিত।

৪। আবার রাগ-রাগিনী ছাড়াও পরিবেশনের উপর ভিত্তি করে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। যেমন একটি নির্দিষ্ট রাগে নজরুল সঙ্গীত এবং রবীন্দ্র সঙ্গীতের পরিবেশন ভিন্ন হয়। এটাকে বলা হয় গায়কী। ফলে ক্বাছীদা শরীফ পাঠের সময় এ বিষয়টিও লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। পল্লীগীতি, লালনগীতি এগুলোও ভিন্ন ভিন্ন গায়কীতে পরিবেশন করা হয়।

৫। পূর্বে বিভিন্ন সঙ্গীত শিল্পীরা যে সকল শাস্ত্রীয় শিল্পীদের ঘরে থেকে গান-বাজনা শিখতো তারা সেই বিশেষ স্টাইলে সঙ্গীত পরিবেশন করতো, এগুলোকে ঘারানা বলে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘারানা হচ্ছে পাতিয়ালা, কিরানা, সেহেশবান ইত্যাদি। কোনো ক্বাছীদা পাঠ এমনভাবে পাঠ করা উচিত নয় যাতে নির্দিষ্ট ঘারানার স্টাইলকে উপস্থাপন করে।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য, যারা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সম্পর্কে ধারণা রাখে না, তাদের জন্য রাগ-রাগিনীতে, ঘারানার স্টাইলে, নির্দিষ্ট গায়কীতে পাঠ করা সম্ভব নয়, যদি না কেউ অনুকরণ করার চেষ্টা করে। তবে প্রচলিত গানের সুরে পাঠ করার বিপদ থেকে যায় এ কারণে যে, যদি অন্য ভাষাভাষী (যেমন উর্দু, হিন্দি, পাঞ্জাবীতে) কেউ কোনো ক্বাছীদা শরীফ বা হামদ, না’ত কোনো প্রচলিত গানের সুরে পাঠ করে থাকে আর অজ্ঞতার কারণে সেই সুরকে অনুসরণ করে নতুন কোনো ক্বাছীদা শরীফ বাংলা ভাষায় পাঠ করার চেষ্টা করলে সেখানে বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে যারা এ বিষয়ে বুঝেন তাদের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে নতুবা মৌলিক সুরে পাঠ করাই শ্রেয়। মৌলিক সুর কী? তা আমরা পরবর্তী লেখাতে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

 

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৫১

 

 

‘মৌলিক সুর’ বলতে সহজে যা বোঝানো হয়, তাহলো যা প্রচলিত কোনো গানের অনুরূপ নয়, কোনো রাগাশ্রয়ী সুর নয়, প্রচলিত কোনো গায়কী বা ঘারানার আদলে নয়- এমন একটি সুর। অবশ্যই এটি একটি নতুন নামকরণ। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে মৌলিক সুর বলতে বোঝায় বিশেষ একটি রাগাশ্রয়ী সুরকে, যেখানে অন্য কোনো রাগের মিশ্রণ নেই। কিন্তু সেখানে মৌলিক সুর নামকরণটি প্রচলিত নয়। বিশেষভাবে মৌলিক সুর বলতে আমরা যা বোঝাতে চাই তা হচ্ছে, এটি ক্বাছীদা পাঠের সুর, সামার মাহফিলের সুর তবে একটি সুর নয়, একাধিক সুর হতে পারে। এই সুর শুনলে যেন ক্বাছীদা পাঠের কথাই স্মরণ হয়, সামার কথাই স্মরণ হয় অন্য কিছু নয়।

ইতিহাসে থেকে আমরা স্পষ্টভাবে ধারণা করতে পারি না যে, বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত হাসসান বিন সাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি কিভাবে ক্বাছদিা পাঠ করতেন। তিনি কী কবিতা পাঠের মতো কেবল স্বর ব্যবহার করতেন নাকি বর্তমান ক্বাছীদা শরীফ পাঠের মতো সুর ব্যবহার করতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে হযরত ছূফীয়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা যখন সামা শুনতেন সেখানে যে সুরের ব্যবহার ছিল তা ইতিহাস পড়লে সাম্যক ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে জটিলতা যেটা রয়েছে আরব অঞ্চলের ছূফী সম্প্রদায় রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা যে রকম সুরে ক্বাছীদা পাঠ করতেন, পারস্য অঞ্চলের ছূফী সম্প্রদায় রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা ভিন্ন সুরে পাঠ করেছেন। এটা সহজেই আমাদের উপলব্ধিতে আসে। কেননা ভাষা এবং অঞ্চলের কারণে সামা পরিবেশনে ভিন্নতা থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু তারপরেও সে সময়ে ক্বাছীদার সুর শুনলে ছূফীগণ সেটাকে সামার সুর বা ক্বাছীদার সুর হিসেবেই গ্রহণ করতেন। সামার সুরকে কখনো গানের সুরে খেয়াল করেননি। সুতরাং সময়ের পরিক্রমায় যেহেতু ক্বাছীদা শরীফ এবং সামা শরীফ-এর সুন্নত প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। তাই সামার বা ক্বাছীদার সুর হারিয়ে গিয়ে সেখানে ভারত উপমহাদেশে জায়গা করে নিয়েছে বাদ্যযন্ত্রসহ হারাম কাওয়ালী গানের সুর; যা বর্তমানে কখনো শোনা জায়িয নেই। ফলে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সুরের খুব বৈচিত্র্যতাকে পরিহার করে স্বাভাবিক সুললিত সুরে ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করা প্রয়োজন। এখানে সুর শুধু বাণীগুলোকে হৃদয়স্পর্শী করার জন্যই ব্যবহৃত হবে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়। আশা করা যায়, ক্বাছীদা পাঠের ক্ষেত্রেও একটি নিজস্ব তরতীব সময়ের পরিক্রমায় আমাদের মাঝে আবারো জন্ম নেবে এবং তা প্রচলিত থাকবে ক্বিয়ামত পর্যন্ত ইনশাআল্লাহ।

 

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৫২

সমস্ত প্রকার গান-বাজনা শরীয়তে হারাম তা কুরআন শরীফ এবং হাদীছ শরীফ দ্বারাই প্রমাণিত। আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে হামদ-নাত ও ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করা, সামার মজলিস করা সুন্নত, যদি সঠিক তরতীব অনুযায়ী পঠিত হয়। আর যদি বাদ্য-যন্ত্রসহ, গানের সুরে, হামদ, না’ত ও ক্বাছীদা শরীফ পাঠ করা হয়, সামার মজলিসের আয়োজন করা হয়, তবে তা কখনোই শরীয়তসম্মত নয়। ইতিহাসের পরিক্রমায় এই হালাল সামার মাঝে কখনো পরিকল্পিতভাবে, কখনো শয়তানের ওয়াছওয়াছায় প্রবেশ করেছে বাদ্য-যন্ত্রসহ বিভিন্ন হারাম বিষয়। হালাল সামাতে হারাম বিষয়ের অনুপ্রবেশ শুধু উপমহাদেশেই ঘটেনি, ঘটেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাও আমরা আলোচনা করেছি।

উপরের শিরোনামে আমরা কথিত লালনগীতি বা বাউল সঙ্গীতের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার একটু প্রয়োজন মনে করছি এ কারণেই যে, অনেকেই লালনের কথাগুলোকে ছূফীতত্ত্ব, এর হারাম গানগুলোকে উচ্চাঙ্গের ধর্মীয় সঙ্গীত, বাউল সম্প্রদায়কে এক ধরনের ছূফী বলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। আবার অনেকে লালনের হারাম বিষয়গুলো বুঝতে পারলেও হামদ, না’ত, ক্বাছীদা শরীফ লেখা বা পাঠের সময় এসব বাউলদের ব্যবহৃত শব্দ যেমন ভবের মাঝার, অচিন পাখি, সাধন, কারিগর এসব শব্দ ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু আসলে এসব শব্দ দিয়ে এইসব ভ্রান্ত, কাফির সম্প্রদায় কী মনে করে বা কি বুঝিয়ে থাকে- তা জানা প্রয়োজন।

এছাড়াও আরো একটি বিশেষ কারণে এই বিষয়ের আলোচনা অনেকটা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কারণ এই লালনের গীতকে বর্তমানে সরকারি, বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এমনকি আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতায় চলছে প্রচার-প্রসারের ষড়যন্ত্র। বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। এর নেপথ্য কারণ দীর্ঘ। লালনের আখড়া পরিণত হয়েছে মাজারে; কাফির বাউল পরিণত হয়েছে দরবেশে, দেহতত্ত্ব রূপান্তরিত হচ্ছে ছূফী তত্ত্বে। নাঊযুবিল্লাহ! এখনই এসবের প্রতিরোধ ফরয-ওয়াজিব।

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৫৩

আমাদের এ সংখ্যার আলোচনায় বর্তমান লেখকদের আলোচনার কিছু কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরবো- যাতে স্পষ্টই ধরা পড়বে, অকারণেই এবং মূর্খের মতো না বুঝেই অথবা পরিকল্পিতভাবে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য হাছিলের লক্ষ্যে বাউল তত্ত্বকে ছূফী মতের সাথে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। নাঊযুবিল্লাহ!

১। আরেক ধারার গবেষকদের মতে, চৈতন্যের পূর্বেই বাউল ধারার জন্ম হয়েছে। তাদের মতে ষোড়শ শতকেই না’ত, বৈষ্ণব ও ছূফী মতের প্রভাবে বাউল মতের উদ্ভব হয়েছে। (নিটোল, ডিসেম্বর ০১, ২০১১, ১৬:২৫ বিভাগ : ইতিহাস, ঐতিহ্য, সঙ্গীত) (প্রাগুক্ত)

২। কুষ্টিয়া ও সিলেট অঞ্চলে সংখ্যা ও মানের দিক থেকে উৎকৃষ্ট বাউল সঙ্গীত জন্ম নিয়েছে। কারণ এখানেই ছূফী ও বৈষ্ণব মতের প্রভাব ছিল বেশি। (-প্রাগুক্ত)

৩। এক কথায় বলা চলে- লালন ছিল মিস্টিক, যে অর্থে বৈষ্ণববাদে ছূফীয়ানা মিস্টিক, সেই একই অর্থে লালনের ধ্যান-ধারণা ‘মিস্টিক’। (নিটোল, ডিসেম্বর ০১, ২০১১, ১৬:২৫ বিভাগ : ইতিহাস, ঐতিহ্য, সঙ্গীত) (-প্রাগুক্ত)

৪। ছূফী ও বৈষ্ণব প্রভাবিত অঞ্চলেই বাউল সঙ্গীতের উদ্ভব। (বাউল ও সুফিবাদের আলোয় লালন দর্শন -প্রদোষ কান্তি সরকার) (-প্রগুক্ত)

৫। ছূফীসন্তদের মত, বাউল সেই অজানাকে জানা ও চেনার দুর্জেয় রহস্য ভেদ করতে চায় প্রেমের মাধ্যমে, যা মনের গভীরে আগুনের মতো সর্বদাই জ্বলছে। এই প্রেমানলে ছূফী দরবশে যেমন পাগল, বাউলও হয় বাতুল বা উন্মাদ। (-প্রাগুক্ত)

৬। বাউল সব সময় সেই অজ্ঞাত রহস্যময়কে জানার চেষ্টা করে চলে। স্বভাবতই পারে না। তাই ছূফী কিংবা বেদান্ত জ্ঞানীর মতো দৃষ্টি ফেরায় নিজের ভেতর।

৭। ছূফী সাধক এবং হিন্দু তত্ত্বজ্ঞানীর মতো বাউলও বিশ্বাস করে সংসার মায়াময়। (বাউল ও সুফিবাদের আলোয় লালন দর্শন -প্রদোষ কান্তি সরকার) (-প্রগুক্ত)

একজন ছূফীর প্রকৃত পরিচয় যারা জানে না, তাদের পক্ষেই এসব প্রলাপ বকা সম্ভব। অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছূফীগণের শিক্ষার বিষয়টিকে হালকাভাবে উপস্থাপন করার লক্ষ্যে একটা কূট-কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই ছূফীগণের সঙ্গে বৈষ্ণবাদের মিলিয়ে একাকার করা হয়েছে। আর বাউল মতবাদের সৃষ্টি ছূফী আর বৈষ্ণবদের থেকে- এটা প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছে।

 

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৫৪

 

আমরা বাউলের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরলে এটা বুঝতে কোনো অসুবিধাই হবে না যে, এরা ছূফী তো দূরে থাক, মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট জীব হিসেবে তারা প্রমাণিত হবে। তথাকথিত সাহিত্যিকরা শব্দ প্রয়োগে যতোই চাতুরতা দেখাক না কেন, সব কাফির বাউলদের কাছ থেকে শুধু দুর্গন্ধই ছড়াবে। তবে এদের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরার পূর্বে বাউলদের জন্মের ইতিহাস কিছুটা তুলে ধরা প্রয়োজন। কেননা এতে পাঠকের জন্য কিছু চিন্তার খোরাক থাকবে, যা দিয়ে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এদের নিয়ে মাতামাতির কিছুটা স্বরূপ উদঘাটনে সহজ হবে।

কেউ-ই সঠিক জানেন না- বাউল সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা কে বা কারা? একটি বিশেষ ব্যাপার উল্লেখ্য যে, এইসব ফকির বা বাউলরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার অধিবাসী ছিল এবং প্রায় সবাই ঈসায়ী ষোড়শ শতাব্দীর পরের দিককার।

নদীয়া অবিভক্ত বাংলার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইখতিয়ারউদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজী উনার হাত ধরে বাংলায় মুসলিম শাসন চালু হয়। ছূফীগণের প্রভাব তখন এ অঞ্চলে সর্বত্র। ছূফীগণের কারণে এ অঞ্চলের মানুষগণ শান্তি খুঁজে পেতেন। সে সময় অনেক ব্রাহ্মণরাও হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মসনবী শরীফ পড়তো। অনেক গবেষকরা মনে করেন হিন্দু চৈতন্যদেবের উপরেও ছূফীগণের প্রভাব পড়েছিলো। আর নদীয়ার চৈতন্যদেবই সনাতন বৈষ্ণব ধর্মের নব ব্যাখ্যাকার। নব বৈষ্ণব ধর্মে যে পৌত্তলিকতা বর্জিত একেশ্বরবাদী চিন্তার ধারণ আছে তা মূলত ইসলাম থেকেই এসেছে। আর সে কারণেই প্রায়শই এক শ্রেণীর লেখকরা ছূফীগণের সঙ্গে বৈষ্ণবগণের তুলনা করার চেষ্টা করেছে। নাঊযুবিল্লাহ! অর্থাৎ আমরা এখান থেকে এ ধারণা করতে পারি- মূলত, ছূফীগণের মূল শিক্ষা থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যেই হিন্দুরা নতুন একটি মতের জন্ম দিয়েছিল; যা ছিল বৈষ্ণব মত, পরে আসে বাউল মত।

বাউল লালন যেহেতু গানের আড়ালে মুসলমানগণের পার্থিব ও পারলৌকিক সর্বনাশ সাধনে এক বিশুদ্ধ ইবলিছি পথের পথ প্রদর্শক, ইসলামের চরম দুশমন, ইসলামের সকল সুন্দর দিকের এক অপব্যাখ্যাকার। ফলে কেউ কেউ লালনকে ইসলামের পৃষ্ঠদেশে ছুরিকাঘাতে পটু এমন এক নিপূন ও মারাত্মক ভ- আউলিয়ারূপী আঁততায়ী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। নবুওওয়তের দাবিদার গোলাম কাদিয়ানীকে লালনের কাছে যথেষ্ট ছেলে মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছে।

ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৫৫

বাউলতত্ত্ব আর লালনের হাক্বীক্বত প্রকাশ করা এখানে অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। দেহতত্ত্বই বাউল সম্প্রদায়ের মূল ভিত্তি। তাদের মতে দেহই সকল রহস্যের মূল। দেহকে দেখার অর্থ দেহকে পাঠ করা বা আত্মদর্শন করা। (নাঊযুবিল্লাহ)

বাউলদের অসংখ্য কুফরী আক্বীদা রয়েছে; যেমন তারা বলে যে, ‘নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ পাক) মানুষকে তৈরি করেছেন নিজের আদলে, মানুষের মাধ্যমেই নিজেকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশিত করেছেন।’ নাঊযুবিল্লাহ! তাই তারা বলে, ‘সকলের মূল মানুষ নিধি, তার উপরে নাইরে বিধি।’

প্রকৃতপক্ষে বাউলরা মনে করে- ইন্দ্রিয় ভোগের মধ্য দিয়েই তাদের দেহ সাধনা পূর্ণতা লাভ করবে। এরা যদিও কোনো পরিবার বা সমাজে আবদ্ধ হয় না, তথাপি তারা বিবাহিতের মতো জীবন-যাপন করে। এদের সঙ্গিনী একাধিক হলেও নির্দিষ্ট আখড়ায় নির্দিষ্ট একজন সঙ্গীকেই সুনির্দিষ্ট মাস বা বছরের জন্য সঙ্গী হিসেবে রাখে। তাদের ঔরসে জন্ম লাভ করা সন্তানকে বলে ঈশ্বরের সন্তান। নাঊযুবিল্লাহ! বাউলরা দেহকে কেন্দ্র করে নানা গান সৃষ্টি করে বলে দেহের প্রতীক হিসেবে পিঞ্জর, গাড়ি, নৌকা, কারখানা ইত্যাদি হিসেবে ব্যাখ্যা করে থাকে। এরা বলে যে, ‘যা নেই ভা-ে, তা নেই ব্রহ্মান্ডে।’ এখানে ভা- বলতে শরীর বোঝানো হয়েছে।

লালনের বাউলধর্ম হলো পুরোপুরি ব্যভিচার নির্ভর। লালন যে আধ্যাত্মিকতার কথা বলে- যেমন ‘টলে জীব, অটলে ঈশ্বর।’ অটল সাধনা হচ্ছে বিশেষ মুহূর্তে নিজেকে সংবরণ। অর্থাৎ অটল সাধনা মানে লালনের নোংরা যৌনাচার। নারী-পুরুষের মিলনের মধ্যেই বাউলধর্মের মোক্ষ নিহিত, যুগল চর্চা হলো সিদ্ধি সাধনার ঊর্বর ক্ষেত্র। শব্দ আর বাক্যের আড়ালে এরা নিজেদের নোংরামিকে এমনভাবে লুকিয়ে রাখে তাতে সাধারণ মানুষ ধোঁকায় পতিত হয়।

যেমন ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ এর অর্থ স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়, যে সময় চলে যায় তা আর ফিরে আসবে না। ফলে সময় কাজে লাগাতে হবে আখিরাতের তরে। কিন্তু লালনের অর্থ হচ্ছে- বিশেষ মুহূর্ত, যেদিন শুক্রাণু-ডিম্বানু থেকে ভ্রƒণ তৈরি হয়। আসলে ইবলিসের সার্বক্ষণিক ও প্রত্যক্ষ সহায়তা না পেলে এতো নিপুনভাবে কেউ কখনো কদর্য যৌনাচারকে ধর্মের আড়ালে লোকসম্মুখে সাফল্যের সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারে না।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Views All Time
1
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

৭টি মন্তব্য

  1. ভোরের কথা says:

    সরাসরি প্রিয়তে

  2. এভাবেই ভাল হয়েছে। পুরো তথ্য একসাথে পেলে ভাল হয়। বাকি অংশও এভাবে একবারে দিবেন আশাকরি।

  3. কিছু কিছু ক্ষেত্রে এডিট করা প্রয়োজন সেগুলো ঠিক করে দিলে ভাল হয়। যেমনঃ
    ইতিহাসের ধূম্রাজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩০
    ৪. সরাসরি জাতিসংঘ তথা ইহুদীসংঘের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান টঘঊঝঈঙ.
    ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩৩
    সাধারণ কোনো মানুষের জীবনী যখন লেখা হয় তাকে ইংরেজিতে বলে ইরড়মৎধঢ়যু আর কোনো ওলীআল্লাহ এবং দরবেশগণ উনাদের জীবনী মুবারককে বলা হয় ঐধমরড়মৎধযঢ়ু.
    হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ঐধমরড়মৎধযঢ়ু রচয়িতাদের একজন হচ্ছেন শামসুদ্দীন আহমেদ আফলাকি। তার রচনা মানাক্বিব উল আরিফিন এবং রচনার সময়কাল হচ্ছে- ১৩১৮ থেকে ১৩৫৩ ঈসায়ী সাল। অথচ সম্প্রতিকালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর ফ্র্যাঙ্কলিন লুইস, যে কিনা হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্পূর্ণ জীবনী মুবারক লিখেছে, সেখানে সে ঐধমরড়মৎধঢ়যরপধষ নরড়মৎধঢ়যু নামে আলাদা অধ্যায় রচনা করেছে।
    ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩৫
    ঐধমরড়মৎধঢ়যু-তে লিপিব্ধ রয়েছে হযরত শামছ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি অনেকদিন মহান আল্লাহ পাক উনার দববার শরীফ-এ এ আরজি পেশ করেছেন…………………………।
    আরো উল্লেখ করা হয়েছে, যা শাহরাম শিবা একজন ইরানের ইহুদী কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী, সে তার গ্রন্থের “ঞযব টহঃড়ষফ ঝঃড়ৎু” অধ্যায়ে উল্লেখ করেছে, হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ছিলেন সম্পদশালী এবং ক্ষমতাধর পরিবারের সন্তান এবং সমাজের উঁচুস্তরের মানুষ।
    ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩৯
    হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অনেক লেখা যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদী লেখক বার্কস কোলম্যান অনুবাদ করেছে, যা কিনা ফার্সী ভাষায় লিখিত। অথচ সে ফার্সীর একটি বর্ণও জানতো না। সে অন্য একজনের কাছ থেকে শুনে তার ভাবধারায় অনুবাদ করেছে। ফলে সেগুলোকে সে ঞৎধহংষধঃরড়হ না বলে ঠবৎংরড়হ বলতো।
    ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪১
    ইহুদীসংঘ (জাতিসংঘ) শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিকভাবে সহায়তা দানের জন্য একটি বিশেষ সংস্থাকে তৈরি করেছে; যা হচ্ছে টঘঊঝঈঙ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, টঘঊঝঈঙ ইসলামী তাহযীব-তামুদ্দুনকে নষ্ট করে ইসলামের অনেক বিষয়কে তথাকথিত বাতিল ধর্মগুলোর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মতো চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র করেছে, করছে এবং এক্ষেত্রে অর্থায়নও করে থাকে।
    এক্ষেত্রে টঘঊঝঈঙ এক ধাপ এগিয়ে ২০০৫ সালে তুরস্কের এই কথিত ছূফী-নৃত্যকে সহায়তা দানের জন্য এই নৃত্য উৎসবকে মানবতার এক শ্রেষ্ঠ শিল্প কর্ম এবং তুরস্কের প্রাচীন ঐতিহ্য হিসেবে আখ্যায়িত করে। নাঊযুবিল্লাহ!
    জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ৮০০তম বিলাদত শরীফ দিবস উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে- সেখানে যোগ দেয় টঘঊঝঈঙ। হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জীবনী মুবারক এবং কিতাবাদির উপর যারা গবেষণা করছে তাদের উৎসাহ দেয়ার নামে টঘঊঝঈঙ মেডেল বানিয়ে প্রদান করে।
    ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪৬
    একইভাবে ইংরেজি ভাষায় রয়েছে জড়পশ, জধঢ়, ঈড়ঁহঃৎু, ঈষধংংরপধষ, এড়ঃযরপ, উরংপড়, ঔধুু- এ জাতীয় গান-বাজনা।
    ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪৯
    পাক-ভারত উপমহাদেশে এই স্বরের বিন্যাসকে উপস্থাপন করা হয় সা-রে-গা-মা এসব নাম দ্বারা আবার পাশ্চাত্যে একে উপস্থাপন করা হয় উড়, জব, ঋর, গধ এ রকম নাম দ্বারা।
    ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৫৫
    এরা বলে যে, ‘যা নেই ভা-ে, তা নেই ব্রহ্মান্ডে।’ এখানে ভা- বলতে শরীর বোঝানো হয়েছে।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে