ইতিহাস কথা বলে: আফসুস ! বাঙালি মুসলমান আজ মূর্তিপূজারীদের ‘ভাই’ বলে ডাকে!


ব্রিটিশ আমলে ভারতে কর্মরত ইংরেজ আমলা উইলিয়াম হান্টার লিখেছিল ‘দ্য ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ নামক বইটি। চরম মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যে পরিপূর্ণ এই বইটি লেখা হয়েছিল তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড মেয়োর একটি প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানে, তাহলো “ভারতীয় মুসলমানগণ কি তাদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বাধ্য?”

বইটির একদম শুরুতেই ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে প্রবলতম শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়কে। লেখকের ভাষানুযায়ী, সমীক্ষার মাধ্যমে জানা গিয়েছে, পরিকল্পিতভাবে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ (বাংলাদেশ) থেকে অর্থ ও মুজাহিদ সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং দুহাজার মাইল দূরে বিদ্রোহী শিবিরে প্রেরণ করা হচ্ছে। রানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া মুসলমান উনাদের কর্তব্য কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে বাংলার শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলোতে। বাংলার অভ্যন্তরভাগ থেকে মাসের পর মাস ধরে সীমান্তের ওপারের বিদ্রোহী ঘাঁটির জন্য লোকবল সরবরাহ করা হচ্ছে।”
হান্টারের কথিত এই ‘সীমান্তের বিদ্রোহী শিবির’ই হলো আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার জিহাদী কাফেলা, ব্রিটিশদের মতে যা গঠিত হয়েছিল মূলত বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে। সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনাকে সর্বপ্রথম ‘ওহাবী’ অপবাদ দেয়া হয়েছিল হান্টারের এই বইটিতে।

মুসলিম রক্তে রাঙা এই যে স্বাধীনতা আমরা পেলাম, তাতে আমাদের প্রতিবেশী মূর্তিপূজারীদের ভূমিকা কি ছিল? ইতিহাসবিদ গোলাম আহমদ মোর্তজা তার ‘বজ্রকলম’ বইটিতে মূর্তিপূজারী ঐতিহাসিকের বরাতে উল্লেখ করেছেন, ব্রিটিশ আমলের কথিত অভিজাত মূর্তিপূজারীরা তাদের আভিজাত্য অর্জন করেছিল নিজের স্ত্রী কিংবা পুত্রবধূকে ব্রিটিশদের নিকট পাঠিয়ে পরিবারকে শ্বেতাঙ্গ করার মাধ্যমে। এসব শ্বেতাঙ্গ মূর্তিপূজারীদেরকে পরবর্তীতে আমলা এবং জমিদার বানানো হয়। তারাই পরবর্তীতে সিপাহী বিদ্রোহের সময় সমগ্র ভারতে ব্রিটিশদের সক্রিয় সহযোগিতা করে। (১৪৭ পৃষ্ঠা)

একাত্তরের ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠানের পাঠক আখতার মুকুলের ‘কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী’ বইটিতে রয়েছে, সিপাহী বিদ্রোহের পর যখন উত্তরপ্রদেশের শহরগুলোতে গোরা সৈন্যরা বাড়ি বাড়ি ঢুকে তল্লাশি চালাত, তখনও কোন বাড়ির দরজায় ‘বাঙালি বাবুজ’ কথাটি লেখা থাকলে সেখানে সৈন্যদের প্রবেশ করাটাই ছিল আইনত নিষিদ্ধ! বাঙালি মূর্তিপূজারীদের আনুগত্যের প্রতিদানস্বরূপ সিপাহী বিদ্রোহ চলাকালীন সময়েই ব্রিটিশরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। (পৃষ্ঠা ১৩৭)

এসব ইতিহাস কিন্তু মাত্র দেড়শ বছর আগের ইতিহাস। তাতেই প্রমাণিত হয়, বাঙালি মুসলমান আর বাঙালি মূর্তিপূজারীর রক্ত আলাদা, জাতি আলাদা। বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি আর বাঙালি মূর্তিপূজারীর সংস্কৃতি ভিন্ন। যেই বাঙালি মুসলমান হান্টারদের রাজত্বের ভিত কাঁপিয়ে দিত, সেই বাঙালি মুসলমান নিশ্চয়ই দুর্গাপূজায় যেতোনা। সেই বাঙালি মুসলমান নিশ্চয়ই নববর্ষে যেতোনা। সেই বাঙালি মুসলমান ছিল সত্যিকারের মুসলমান, সেই বাঙালি মুসলমান ছিল মুজাহিদ।

অথচ আফসোস! ব্রিটিশ আনুগত্যের মাধ্যমে পার্থিব স্বার্থ হাছিল করার কারণে তৎকালীন মূর্তিপূজারীদেরকে বর্তমান সময়ের স্কুল-কলেজে পড়া বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায় উপাধি দিয়েছে ‘বুদ্ধিমান’! ‘শিক্ষিত’! বিপরীতে চৌকস গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে একের পর এক বিদ্রোহ সংঘটিত করেছিল বাঙালি মুসলিমগণ, যা হান্টারের মত চরম মুসলিম বিদ্বেষীও দেখেছে ‘তীক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা’র স্বাক্ষর হিসেবে। কিন্তু সেগুলো আজ বাঙালি মুসলমানদের বর্তমান প্রজন্মের নিকট তাদের পূর্বপুরুষগণ কর্তৃক ‘প্রভুগোষ্ঠী’র বিরুদ্ধে ব্যর্থ বিদ্রোহের ‘বোকামি’সুলভ প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই বলে গণ্য হয়না।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে