ইতিহাস পর্যালোচনা: আপনি কি কথিত ভদ্রলোক, না কি মুসলমান?


ভারতবর্ষে সিপাহী বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের মুসলমানগণ, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানগণ উনাদের উপর দমননীতি গ্রহণ করে। তারা সম্ভ্রান্ত মুসলমানগণ উনাদেরকে সমস্ত সরকারি উচ্চপদ থেকে বরখাস্ত করে সেখানে হিন্দুদের নিয়োগ দেয়, কারণ সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে বাঙালি হিন্দুরা ছিল ব্রিটিশদের একনিষ্ঠ অনুগত গোলামগোষ্ঠী।
তৎকালীন বাংলায় নিয়োজিত ব্রিটিশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও চরম মুসলিমবিদ্বেষী উইলিয়াম হান্টারও তার ১৮৭১ সালে লেখা ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ বইটিতে ব্রিটিশদের এসব অন্যায়-অবিচারের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ কলকাতার ‘চিরায়ত প্রকাশন’ থেকে প্রকাশিত বইটির বাংলা অনুবাদ থেকে নিম্নোক্ত অংশগুলো তুলে ধরা হলোÑ
“একশো সত্তর বছর আগে বাংলার কোনো উচ্চবংশ জাত মুসলমানের পক্ষে দারিদ্র্যের মধ্যে পতিত হওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার ছিল, বর্তমানে তার পক্ষে ধনী হয়ে থাকা প্রায় অসম্ভব।” (পৃষ্ঠা ১১০)
“একশো বছর আগে সমস্ত সরকারি পদে মুসলমানদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। হিন্দুদের প্রাক্তন বিজেতারা তাদের টেবিল থেকে যে অনুগ্রহ বিতরণ করতো, হিন্দুরা সেটাই ধন্যবাদের সঙ্গে গ্রহণ করতো, এবং দু’চারজন কুঠিয়াল, গোমস্তা ও কেরানি ছিল ইংরেজ। এখন মুসলমানদের সংখ্যা হিন্দুদের এক-সপ্তমাংশও নয়।” (পৃষ্ঠা ১১৯)
রাজারবাগ শরীফ উনার মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি প্রায়শই একখানি ফারসী কবিতা আবৃত্তি মুবারক করে থাকেন, যার বাংলা অর্থ হলো- “কোনো কমজাত বা নিচুশ্রেণীর লোককে উঁচুপদ প্রদান করলে সে সম্মানী লোকদের মানহানি করে থাকে।”
এখন ব্রিটিশদের মদদে একলাফে উপরে উঠা কমজাত হিন্দুরা যেরূপ আচরণ করতো মুসলমানদের সাথে, তা নিয়ে কমরেড মুজফ্ফর আহমদ তার রচিত ‘আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’ বইটির ৪২০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছে যে “কোনো হিন্দুর সাথে কোনো শিক্ষিত মুসলমানের দেখা হলে সে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কি ভদ্রলোক, না মুসলমান?” (নাউযুবিল্লাহ)
ব্রিটিশআমলের সেই বিভীষিকা থেকে মুক্ত হতেই কিন্তু বাঙালি মুসলমানরা পাকিস্তান আন্দোলন করেছে। তাতেও যখন কাজ হলো না, তখন করলো ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।
বাঙালি মুসলমানদের এই শত বছরের স্বাধীকার আন্দোলনের যে ঐতিহ্য, তার হিস্যা কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগই কেবল দাবি করতে পারে। কারণ তার প্রধান নেতা শেখ সাহেবের যেমন পাকিস্তান আন্দোলনে ভূমিকা রয়েছে, ঠিক তেমনি রয়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধে। কিন্তু এই সরকারের হিন্দুতোষণের কারণেই বাঙালি মুসলমানদের এই শত বছরের অর্জন নস্যাৎ হতে চলেছে, তারা ঠিক সেই ব্রিটিশ আমলের মতোই প্রশাসন থেকে মুসলমানদের সংখ্যা কমিয়ে গণহারে বিধর্মীদের নিয়োগ দিচ্ছে।
সরকারী আমলারা কি তাদের কয়েক দশকের অর্জিত ইতিহাস ধারাকে ছুড়ে ফেলতে চায়? তারা কি চায়, ইতিহাসের নির্মমতার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে ব্রিটিশআমলের বিভীষিকাকে এই একবিংশ শতাব্দীতে ফের ফিরিয়ে আনতে? এই আওয়ামীরা ও তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি বিধর্মীদের দ্বারা জিজ্ঞাসিত হতে চায় যে, “আপনি কি ভদ্রলোক, না মুসলমান?”

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে