ইমামুল আউওয়াল মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার ব্যাপক ইলম মুবারকের অনুপম দৃষ্টান্ত


খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি সর্বপ্রকার নাজ-নিয়ামতের মালিক বানিয়েছেন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সমস্ত নিয়ামতের মালিক এবং মহাসম্মানিত বণ্টনকারী। তিনি যাবতীয় নিয়ামত কায়িনাতের মাঝে বণ্টন করেন। তিনি আখাছছুল খাছ ব্যক্তিত্বগণ উনাদেরকে বিশেষ খুছুছিয়ত মুবারকে বৈশিষ্ট্যম-িত করেছেন। তেমনিভাবে ইমামুল আউওয়াল মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনাকে অগণিত বৈশিষ্ট্য মুবারকে বৈশিষ্ট্যম-িত করা হয়েছে। সুবহানাল্লাহ!
সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার মুবারক শানে অসংখ্য পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে একখানা বিশেষ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
انا مدينة العلم و حضرة على عليه السلام بابها
অর্থ: “আমি হলাম ইলমের শহর তথা ভা-ার। হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি সেই ভা-ার মুবারক উনার দরজা বা দ্বার।” সুবহানাল্লাহ!
অর্থাৎ সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি যেহেতু ‘বাবুল ইলম’, সেহেতু অনেক অজানা ও গোপন বিষয় উনার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিতাবে অসংখ্য ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে উনার ‘বাবুল ইলম’ হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ‘কিতাবু কালয়ুবী’তে একখানা বিশেষ ঘটনা মুবারক বর্ণিত হয়। যা নি¤œরূপ-
একদা একদল ইহুদী পাদ্রী সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার মুবারক খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলো- হে আমীরুল মু’মিনীন! আমাদের কতিপয় সুওয়াল রয়েছে। আপনি যদি সেগুলোর জওয়াব দিতে পারেন, তাহলে আমরা ইসলাম গ্রহণ করবো। অন্যথায় আমরা ধরে নিবো আপনারা বাতিল। আমাদের প্রশ্ন হলো, আসমানসমূহ হতে বড় কোন বিষয়? কোন বিষয় যমীন হতে অধিক প্রশস্ত? আগুন হতে অধিক গরম কোন জিনিস? কোন বিষয় বাতাস হতে অধিক দ্রুতগতি সম্পন্ন? কোন বিষয় সাগর হতে অধিক ধনী? কোন বিষয় পাথর হতে অধিক শক্ত? কোন বিষয় আমরা দেখি কিন্তু মহান আল্লাহ পাক তিনি সেদিকে মুবারক নজর দেন না? কোন বিষয় মহান আল্লাহ পাক উনার জন্য? আর কোন বিষয় বান্দাদের জন্য? কোন বিষয় মহান আল্লাহ পাক এবং বান্দাদের মাঝে বিদ্যমান?
তারা বললো, ঘোড়া, উট, গরু, গাধা বকরী, কুকুর, শিয়াল, বিড়াল, সিংহ, ঈগল, কাক, চিল, কবুতর, ব্যাঙ, হুদহুদ, তিতির, ঘুঘু, কুমবুরাহ বা ভরত পাখি, চড়ুই, বুুলবুলি, মোরগ, মুরগি প্রভৃতি প্রাণী ও পাখি তারা তাদের ডাকে কি বলে? অর্থাৎ তাদের ডাকের অর্থ কি?
তারা বললো, আগুন ও বাতাস তাদের শো শো শব্দে কি ব্যক্ত করে? তাছাড়া যমীন, আসমান, সমুদ্র, সূর্য এবং চন্দ্র তারা কি বলে?
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন, নিশ্চয়ই আমার নিকট ইলমের ষাটটি দরজা মুবারক রয়েছে। প্রত্যেক দরজার ইলম বহনে কমপক্ষে এক হাজার বাহন প্রয়োজন। অর্থাৎ উনার ইলম মুবারক উনার কোনো সীমা নির্ধারণ অসম্ভব বিষয়। কাজেই হে ইহুদী সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে যে কোনো বিষয়ে সুওয়াল করতে পারো। তোমাদের সুওয়ালের জওয়াব আমার নিকট অত্যধিক সহজ।
অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা শুনে রাখো। সৎ ব্যক্তির উপর অপবাদ আসমান হতে বড়। হক্ব যমীন হতে প্রশস্ত। সম্পদ জমা করার ক্ষেত্রে লোভীর অন্তর আগুন হতে গরম। মজলুমের দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে বাতাস হতে অধিক দ্রুতগতি সম্পন্ন। অল্পে তুষ্ট অন্তর সমুদ্র হতেও অধিক ধনী। আর বদকার ব্যক্তির অন্তর পাথর হতেও অধিক শক্ত। আমাদের রূহ মহান আল্লাহ পাক উনার জন্য আর আমাদের আমল আমাদের নিজেদের জন্য। আমাদের দায়িত্ব দোয়া করা। মহান আল্লাহ পাক তিনি কবুল করার মালিক।
হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, ঘোড়া তার হ্রেষা ধ্বনিতে বলে- “আয় আল্লাহ পাক! মুসলিম উম্মাহকে সম্মানিত করুন এবং কাফিরদেরকে লাঞ্ছিত করুন।” উট বলে, “পরকালীন পাথেয় না থাকা সত্ত্বেও যে আমলের ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় থাকে, তার জন্য আশ্চর্য।” গরু বলে, “হে গাফিল ব্যক্তি! মৃত্যু তোমার জন্য অবধারিত। তাই তুমি আমলে মশগুল হও। হে গাফিল ব্যক্তি! তুমি অতি অল্প সময়ের জন্য দুনিয়াতে আগমনকারী। হে গাফিল ব্যক্তি! যা তুমি পরকালের জন্য প্রেরণ করেছ, সেটাই কেবল তোমার জন্য রয়ে যাবে। অতি শীঘ্রই তুমি তোমার আমলের বদলা লাভ করবে।” গাধা বলে, আয় আল্লাহ পাক! সুদ প্রদানকারী এবং সুদের মাধ্যমে উপার্জনকারীর উপর লা’নত বর্ষণ করুন।” বকরী বলে, “হে মৃত্যু! কে তোমাকে বেদনাদায়ক করলো। কে তোমাকে পরিতৃপ্ত করলো। কে তোমাকে কর্তিত করলো। হে বনী আদম! কে তোমাকে গাফিল বানালো।” কুকুর বলে, “আয় আল্লাহ পাক! আমি রহমত হতে মাহরুম। তাই যে আমার উপর রহম করে আপনিও তার উপর রহম করুন।” শিয়াল বলে, “হে রিযিকের বণ্টনকারী! আমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তা আমার জন্য যথেষ্ট করুন।” বিড়াল তার ডাকে পবিত্র তাওরাত শরীফ উনার দশখানা পবিত্র আয়াত শরীফ তিলাওয়াত করে। সিংহ বলে, “আয় আল্লাহ পাক! যে ব্যক্তি আপনার নাফরমানী করে, আমাকে তার উপর কর্তৃত্ব দিন।”
সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন, ঈগল বলে, “যত দিন ইচ্ছা বেঁচে থাকো কিন্তু একদিন মৃত্যুবরণ করতে হবে। যা ইচ্ছা সঞ্চয় করো কিন্তু একদিন তরক করতে হবে। যাকে ইচ্ছা মুহব্বত করো কিন্তু একদিন পৃথক হতে হবে।” কাক বলে, “হে উম্মত! নিয়ামত সরে যাওয়াকে ভয় করো। গযব নাযিল হওয়াকে ভয় করো।” কবুতর বলে, “যে ব্যক্তি তোমার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছেদ করেছে, তার সাথে সদাচরণ করো। যে ব্যক্তি তোমার উপর যুলুম করেছে, তাকে ক্ষমা করো। যে তোমাকে বঞ্চিত করেছে, তাকে তুমি দান করো। যে তোমার সাথে পর্দা করেছে, তার সাথে কথা বলো। তাহলে জান্নাত হবে তোমার আবাস্থল।” ব্যাঙ বলে, “সুবহানাল্লাহ! সমুদ্রের তলদেশে, পাহাড়ের চূড়ায় এবং গর্তে অবস্থানকারী সকলেই মহান আল্লাহ পাক উনার তাসবীহ মুবারক পাঠ করে। জিব্বা ও জবানওয়ালা সকলেই মুবারক তাসবীহতে মশগুল রয়েছে।”
সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি ইহুদীদের প্রশ্নের জবাবে আরো ইরশাদ মুবারক করেন, হুদ হুদ পাখি বলে, “আয় আল্লাহ পাক! আমি নিজের নফসের উপর যুলুম করেছি। আপনি আমার গুনাহ ক্ষমা করুন। আপনি ব্যতীত গুনাহ ক্ষমা করার কেহ নেই।” তিতির পাখি বলে, “রহমানুর রহিম মহান আল্লাহ পাক তিনি আরশে আ’যীমে ইসতাওয়া হয়েছেন। সমস্ত কিছু উনার রবুবিয়াতের সাথে সম্পৃক্ত। সর্ব বিষয়ে তিনি অবগত।” ঘুঘু পাখি বলে, “মৃত্যু নিকটবর্তী। প্রত্যাশা অপূরণীয়। আমলের প্রতিদান গ্রহণ অত্যাবশকীয়।” কুমবুরাহ বা ভরত পাখি বলে, “আয় আল্লাহ পাক! নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীগণের প্রতি লা’নত বর্ষণ করুন।” চড়ুই পাখি বলে, “মহান আল্লাহ পাক তিনি সমস্ত গোপন বিষয় সম্পর্কে অবগত। হে বিপদ ও বালা মুছিবত দূরকারী! যে ব্যক্তি আপনার হক্ব আদায় করে না, আমাকে তার শস্য ক্ষেতে আধিপত্য দান করুন। বুলবুলি পাখি বলে, “দুনিয়াবী নিয়ামত যখন আমার জন্য যথেষ্ট হয়, তখন আমি শুকরিয়া আদায় করি।” মোরগ বলে, “মহিমাময় পূত-পবিত্র মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদের এবং হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের সম্মানিত রব। হে গাফিল সম্প্রদায়। মহান আল্লাহ পাক উনার যিকির করো।” মুরগি বলে, “আয় আল্লাহ পাক! আপনি হক্ব। আপনার ওয়াদা মুবারকও হক্ব।” সুবহানাল্লাহ!
সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল আউওয়াল মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন, আগুন বলে, “আয় আল্লাহ পাক! আমি জাহান্নামের আগুন হতে পানাহ চাই।” বাতাস বলে, “আমি আদিষ্টিত। আয় আল্লাহ পাক! যে আমাকে দোষারোপ করে আপনি তার উপর লা’নত বর্ষণ করুন।” পানি বলে, “সুবহানাল্লাহ! মহান আল্লাহ পাক উনার মুবারক পবিত্রতা সম্পর্কে তিনি ব্যতীত অন্য কেউ অবগত নন।” প্রতিদিন যমীন বলে, “হে আদম সন্তান! তুমি আমার পিঠের উপর নাফরমানী করছো। আমার পেটের ভিতর (কবরে) তোমাকে বিষাক্ত পোকা ভক্ষণ করবে।” প্রতিদিন আসমান বলে, “আয় আল্লাহ পাক! আমার নিচে অবস্থানকারী সকলের ব্যাপারে আমি সাক্ষী।” সমুদ্র বলে, “আয় আল্লাহ পাক! যে ব্যক্তি আপনার নাফরমানী করে, তাকে ডুবিয়ে মারতে আমাকে মুবারক অনুমতি প্রদান করুন।” প্রতিদিন অস্ত যাওয়ার সময় সূর্য বলে, “আয় আল্লাহ পাক! আমার আলো যাদের উপর পতিত হয়েছে, আমি তাদের সকলের আমলের সাক্ষীস্বরূপ।” সুবহানাল্লাহ!
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতিভাত হয় যে, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল আউওয়াল মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি সমস্ত পশু-পাখি, কীট পতঙ্গসহ পুরো কায়িনাতবাসীর ভাষা সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত ছিলেন। এবং সেই ইলম মুবারক তিনি প্রকাশও করেছেন। সুবহানাল্লাহ।
সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনিই সর্বপ্রথম আরবী ক্বাওয়ায়িদ বা ব্যাকরণের মূল উছূল প্রণয়ন করেন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক বিষয় উনারই মুবারক অবদান। আধুনিক বিজ্ঞানের মৌলিক কতিপয় সূত্র তিনি উদ্ভাবন করেন। যা পরবর্তীতে ইমামুস সাদিস হযরত ইমাম জা’ফর ছাদিক্ব আলাইহিস সালাম তিনি বাস্তবায়িত করেন। তাছাড়া নকশবন্দিয়ায়ে মুজাদ্দিদিয়া ত্বরীক্বা ব্যতীত ইলমে তাসাউফের সমস্ত ত্বরীক্বা উনার মুবারক উসীলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর এ সমস্ত বিষয়ের মাধ্যমে উনার বাবুল ইলম শান মুবারক বারবার জাহির হয়েছে। (সুবহানাল্লাহ)

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে