উসমানীয় সুলতানদের স্বভাব চরিত্র


সাম্রাজ্য শাসন ও নানা ধরনের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি বিদ্রোহ দমন এবং নতুন নতুন রাজ্য জয়ের সামরিক নেতৃত্ব দিতেন ওসমান সুলতানরা। ফলে দিনরাত তাদের সময় কাটতে ভীষণ ব্যস্ততায়।

রাজা-মহারাজা, সুলতানদের জীবনে এটি স্বাভাবিক নিয়ম। তবে মানুষ হিসেবে প্রত্যেকে ভালোলাগা থাকে ওসমানী সুলতানদের ও কিছু ব্যক্তিগত শখ আহ্লাদ ছিল যা সাধারন প্রজাদের খানিক ভিন্ন।

সুলতানদের ব্যক্তিগত রুচি পছন্দ ও দৈনন্দিন অভ্যাসে তাদের প্রিয় বিষয় গুলো সাধারণ প্রজাদের কাছে কৌতূহলের বিষয় ছিল। রাজ্যের প্রসিদ্ধ কয়েকজন সুলতানের কিছু শখ ও ব্যতিক্রমী চরিত্র উল্লেখ করা হলো ।

সুলতান উসমান গাজী
================

তিনি উসমানীয় সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন ও প্রতিষ্ঠাতা । শারীরিক গঠনে তিনি ছিলেন অন্যান্য সাধারণ মানুষের চেয়ে দীর্ঘ আকৃতির ।উনার দুই হাত ছিল বেশ লম্বা ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকে জানা যায় তিনি যখন দাঁড়াতেন। তখন উনার দুই হাত প্রায় হাঁটু পর্যন্ত শুয়ে থাকতো।
তিনি এক পোশাক কখনো একদিনে বেশি ব্যবহার করতেন না দিন শেষে পরিধেয় পোশাকটি গরীবদের জন্য দান করে দিতেন।শখের বশে অবসরে মাঝেমধ্যে মঙ্গোলিয়ান কুস্তি চর্চা করতেন ।সেকালে ওসমানী রাজ্যে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ বছরভর অপেক্ষায় থাকতো একটি নির্দিষ্ট দিনের জন্য ঐদিন সুলতান উসমান গাজী সর্বসাধারণের জন্য প্রাসাদ খুলে দিতেন। সেদিন সবাই উনার রাজপ্রাসাদে ঢুকে যার যা খুশি নিয়ে যেত নিজের বাড়িতে।

সুলতানুল উরখান গাজী
=================

দেশী-বিদেশী বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন তিনি। তবে কোথাও একদিনের বেশি অবস্থান করতেন না। সাম্রাজ্যের পরিধি বাড়াতে যুদ্ধ পরিচালনা ও নতুন রাজ্য জয়ের সাহসী ভূমিকা
ছিল উনার।
সামরিক যোগ্যতা ও প্রতিভায় তিনি প্রবাদতুল্য পুরুষ ছিলেন ।দরবারের প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন ধর্মানুরাগী সুলতান। তিনি সপ্তাহে মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখতেন ।রাজ্যে আলেম-ওলামা , পীর-মাশায়েখদের প্রতি উনার অনেক শ্রদ্ধাবোধ । দরবারে কোন আলেম এলে তাদের সম্মানে নিজেই উঠে দাঁড়াতেন।

সুলতান প্রথম মুরাদ
===============

উসমানী ইতিহাসের সুলতানদের মধ্যে সুলতান প্রথম মুরাদ বিভিন্ন কারণে ব্যতিক্রম এবং অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিলেন। সাধারণের কাছে তিনি ছিলেন বেশ জনপ্রিয় এমনকি উনাকে ঘিরে বেশ কিছু প্রবাদ বাক্য মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল।
বই পড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল সুলতান মুরাদের ।সাম্রাজ্য পরিচালনা অবসরে তিনি প্রচুর বই পড়তেন এবং সুলতান হিসেবে তিনি নিজের জন্য একটি ব্যাক্তিগত লাইব্রেরী তৈরি করেছিলেন ।জাগতিক ও অপার্থিব জ্ঞানে যাঁরা বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ তাদের প্রতি তিনি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। উসমানী সাম্রাজ্যের সীমানা বিস্তারে বিভিন্ন অঞ্চল জয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করতে ভালবাসতেন সুলতান মুরাদ। তিনি একমাত্র সুলতান যিনি যুদ্ধের ময়দানে ইন্তেকাল করেছিলেন।

সুলতান বায়েজিদ
================
সুলতান বায়েজিদ কেবল সাম্রাজ্যের শাসক নন বরং তিনি ছিলেন একজন কবিও।  দরবারে প্রশাসনিক কাজকর্মের অবসরে তিনি কবিতা লিখতেন । উনার মত কাব্যপ্রীতি ও কাব্য প্রতিভা অন্য উসমানী সুলতানদের  মধ্যে বিরল।  সুলতান বায়যেজিদের  অলংকারের প্রতি আকর্ষণ ছিল ।গোসল করার জন্য রুপা চৌবাচ্চা তৈরি করেছিলেন  তিনি। মংগোলিয়ান  কুস্তিতে আগ্রহী ছিলেন ,মাঝেমধ্যে চর্চা করতেন ।পাশাপাশি তীর ছোড়া ও পশুপাখি শিকারের শখ ছিল উনার। সুলতান মুরাদের ব্যতিক্রমী গুন ও প্রতিভায় মুগ্ধ হতেন উনার সহচর দরবারের পরিষদ।
সুলতান মুহাম্মদ
=================
তৈমুর লঙের আক্রমণে বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত উসমানী সাম্রাজ্যের যার হাতে আবারো ফিরে পায় শান্তি শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা তিনি হলেন সুলতান মুহাম্মদ। ঐতিহাসিকেরা ওনাকে উসমানী সাম্রাজ্যের তৃতীয় প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন ।সূচিকর্ম সুলতান মুহাম্মদের নিপুন দক্ষতা ছিল সুই-সুতার ।সেলায়ের এমন প্রতিভার গুণে সুলতান মুহাম্মদের উপাধি ছিল  ‘সুদক্ষ সেলাইকারক` । ধর্মানুরাগ  ছিল উনার অন্যতম একটি স্বভাবজাত গুণ। রাজ্য পরিচালনার  নানা ব্যস্ততায় নিজে পবিত্র হজ্বে যাওয়ার সুযোগ পেতেন না, কিন্তু প্রতিবছর মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফের জন্য বিশেষ উপহার ও মূল্যবান উপঢৌকন সহ অর্থ বরাদ্দ পাঠাতেন। উনার প্রবর্তিত এই রীতি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত সব সুলতানের আমলে চালু ছিল ।শুক্রবার ছিল সুলতানের জন্য বিশেষ একটি দিন এদিন তিনি নিজ  হাতে  নানা পদের খাবার রান্না করতে ভালোবাসতেন । তারপর তিনি নিজে সেগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করতেন । পিতা সুলতান বায়েজিদের মত সুলতান মুহাম্মদও শিকারে দক্ষ ছিলেন । অবসরে শিকারে গিয়ে নিজের শখ পূরণ করতেন ।
সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতেহ
===================
ইস্তাম্বুল বিজয়ের মহানায়ক সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতেহের প্রকৃতিপ্রেম অন্য সুলতানদের চেয়ে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। উসমানী প্রসাদের চারপাশ জুড়ে নিজের বাগানে ফুল-ফলের নানা গাছের চারা রোপণ করতে ভালবাসতেন তিনি। তোপকাপি প্রসাদের চারপাশ ঘিরে সাজানো সুশোভিত সবুজ উদ্যানে কাটতো উনার অবসর সময়। বিভিন্ন জাতের গাছের সেবায় তিনি মানসিক আনন্দ খুজে পেতেন। পাশাপাশি সেকালের গাছ বিশেষজ্ঞদের সমাদর করতেন ।
সুলতান প্রথম মাহমুদ
================
সুবিশাল উসমানী সম্রাজ্যের অধিপতি হয়েও নিজ হাতে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করতে ভালোবাসতেন সুলতান প্রথম মাহমুদ।তারপর সেগুলো বিক্রি করতেন বাজারে। মন্ত্রিপরিষদ ও দরবারের কর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলতেন,
‘নিজের হাতে উপার্জনের যে আনন্দ, তা বলে বুঝানো যায় না’।
 
সুলতান প্রথন আহমদ
==================
শৌখিন শাসক হিসেবে সুলতান প্রথম আহমদ ছিলেন একটু অন্য রকম।তিনি নিজ হাতে আংটি বানাতেন এবং বাশেঁর লাঠি তৈরি করতেন। বিদেশি অতিথি, দরবারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ নেতাদের বাশেঁর লাঠি উপহার দিতেন তিনি। হস্তশিল্পের প্রতি এমম আকর্ষণ অন্য সুলতানদের মাঝে বিরল বলা চলে।
 
সুলতান দ্বিতীয় উসমান
==================
 
উসমানি সাম্রাজ্যের সুলতান ছিলেন অথচ ঘোড়ায় চড়ার জন্য ব্যবহৃত জিন তৈরি করতে পছন্দ করতেন তিনি। নিজেরর বানানো ঘোড়ার জিন ব্যবহার করে আনন্দ পেতেন। উনাকে যখন ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, তখন ইনকেশারি বাহিনীর লোকেরা উনাকে ধরে জিন ছাড়া ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে হাট-বাজে ঘুরিয়েছিল।উনাকে অপমান করতেই এমন দুর্ব্যবহার করেছিল দুর্বৃত্তকারীরা।
 
সুলতান সেলিম
=================
মূল্যবান ধাতু ফিয়ে বানানো নানা ধরনের দামি জিনিসপত্রের প্রতি গভীর আকর্ষণ ছিল সুলতান সেলিমের স্বভাবজাত বিষয়। বিভিন্ন জায়গা থেকে এসব মূল্যবান জিনিস সংগ্রজ করতেন এবং একেক উপলক্ষে ঘনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তা উপহার দিতেন।
কবিতা ও বইপাঠে উনার আগ্রহ ছিল প্রশংসনীয়। উসমানী সুলতানদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম চশমা ব্যবহার করেছেন। অতিরিক্ত বই পড়ার কারণ্র উনার দৃষ্টিশক্তি দূর্বল হয়ে পড়ে, এ দাবি ঐতিহাসিকদের।
 
সুলতান তৃতীয় আহমদ
==================
উসমানী সম্রাজ্যের যেসব সুলতান অনেক নারীকে বিয়ে করার কারণে প্রসিদ্ধ,
সুলতান আহমদ তাদের অন্যতম।তার স্ত্রী ও দাসীদের গর্ভে জন্মগ্রহণ করে অর্ধশতাধিক সন্তান সন্ততি।
সুলতান ৩য় আহমদের শাসনকালকে লিলিযুগ বলা হয়। লিলি ছিল সুলতানের প্রিয় ফুল।উনার আমলে লিলি ফুলের বিভিন্ন জাতের চাষ বেড়ে যায়। এ সময় উসমানী সাম্রাজ্যে প্রায় ২৩৪ প্রকারের লিলি ফুল চাষ করা হতো।উনার শাসনামলকে (১৭১৮-১৭৩০) উসমানী সম্রাজ্যেত সংস্কৃতি এ আধুনিকতা এবং বিলাসিতার যুগ হিসেবে ধরা হয়।
===================

মুসলিম ইতিহাস তো বটেই , পৃথিবীর ইতিহাসে বংশানুক্রমিক সবচেয়ে দীর্ঘ ও সর্বশেষ খেলাফত শাসনব্যবস্থা উসমানীয়দের  । হাদীস শরীফে এসেছে, গোটা মুসলিম সমাজ একটি দেহের ন্যায়। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে কিংবা ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না…এই উক্তি গুলোর সাথে আমরা বেশ পরিচিত।তাই মুসলিম হিসেবে স্বজাতি উসমানীয়দের উত্থান পতন সম্পর্কে জানা, তা থেকে শিক্ষা নেয়া  , ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আগে  সজাগ হওয়া…এখন সময়ের দাবি।

 

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে