একবার তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা ওয়াজিব আর তিনবার পাঠ করা সুন্নত


পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ মাস উনার ৯ তারিখ পবিত্র ফজর থেকে ১৩ তারিখ পবিত্র আছর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত পুরুষ হোক, মহিলা হোক, মুক্বীম হোক, মুসাফির হোক, একা হোক বা জামায়াতে হোক, শহরে হোক, গ্রামে হোক, প্রত্যেকের জন্য প্রতি ফরয নামায উনার পর একবার তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা ওয়াজিব আর তিনবার পাঠ করা সুন্নত

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, ‘তোমরা (পবিত্র হজ্জ ও পবিত্র কুরবানী উনাদের) নির্দিষ্ট কয়েক দিন মহান আল্লাহ পাক উনাকে স্মরণ করো।’
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ মাস উনার ৯ তারিখ পবিত্র ফজর থেকে ১৩ তারিখ পবিত্র আছর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরয নামায উনাদের পর তাকবীর বলবে-
‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’
যা এ বছরের জন্য আগামী ইয়াওমুছ ছুলাছায়ি বা মঙ্গলবার পবিত্র ফজর থেকে ইয়াওমুস সাবতি বা শনিবার পবিত্র আছর পর্যন্ত।
ছহীহ ও গ্রহণযোগ্য ফতওয়া হলো- পুরুষ হোক, মহিলা হোক, মুক্বীম হোক, মুসাফির হোক, একা হোক বা জামায়াতে হোক, শহরে হোক, গ্রামে হোক, প্রত্যেকের জন্য প্রতি ফরয নামায উনার পর একবার তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা ওয়াজিব আর তিনবার পাঠ করা সুন্নত।
যারা এর ব্যতিক্রম বলে তাদের কথা সম্পূর্ণ অশুদ্ধ ও দলীলবিহীন।

তাকবীরে তাশরীক উনার উৎপত্তি ইতিহাস সম্পর্কে বলা হয়, মহান আল্লাহ পাক উনার খলীল হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট দোয়া করলেন, হে বারে ইলাহী! আমাকে একজন নেক সন্তান হাদিয়া করুন। মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম উনাকে একজন ধৈর্যশীল সন্তানের সুসংবাদ হাদিয়া করেন। অর্থাৎ হযরত ইসমাঈল জাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার বিলাদত শরীফ উনার সুসংবাদ হাদিয়া করেন।

মুজাদ্দিদে আ’যম, ইমাম রাজারবাগ শরীফ উনার মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, ইহুদীরা বলে ও প্রচার করে থাকে যে, ‘হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার ছেলে হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম উনাকে পবিত্র কুরবানী করেছিলেন।’ মূলত তাদের এ মতটি সম্পূর্ণই মিথ্যা, বানোয়াট ও দলীলবিহীন। নির্ভরযোগ্য সমস্ত কিতাবেই উল্লেখ আছে যে, হযরত ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম তিনি উনার ছেলে হযরত ইসমাঈল জাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে পবিত্র মিনাতে কুরবানী করেছেন। কেননা, পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে স্পষ্টই উল্লেখ আছে, ‘আমি দুই যবেহ উনার সন্তান।’ অর্থাৎ একজন হচ্ছেন হযরত ইসমাঈল জাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি আর অন্যজন হচ্ছেন হযরত খাজা আব্দুল্লাহ আলাইহিস সালাম। কেননা, হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম উনার পূর্বপুরুষ নন। পূর্বপুরুষ হচ্ছেন হযরত ইসমাঈল জাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম।

অতঃপর হযরত ইসমাঈল জাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি পবিত্র বিলাদত শরীফ লাভ করলেন এবং যখন হাঁটাহাঁটির বয়সে উপনীত হলেন তখন হযরত ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম তিনি হযরত ইসমাঈল জাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে মিনায় নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘হে আমার প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি আপনাকে যবেহ বা পবিত্র কুরবানী করছি। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?’ হযরত ইসমাঈল জাবীবুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি জবাব দেন, ‘হে আমার সম্মানিত পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তা বাস্তবায়িত করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ সুবহানাল্লাহ!

অতঃপর হযরত ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম তিনি যখন হযরত ইসমাঈল জাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার গলা মুবারক উনার মধ্যে ছুরি চালাতে থাকেন; মহান আল্লাহ পাক উনার কুদরত! যতই ছুরি চালানো হচ্ছে হযরত ইসমাঈল জাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার গলা মুবারক কিন্তু কাটছে না। সুবহানাল্লাহ! হযরত ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম তিনি ছুরির ধার পরীক্ষা করার জন্য ছুরিটি একটি পাথরে আঘাত করলেন। সাথে সাথে পাথরটি দ্বিখ-িত হয়ে গেলো। হযরত ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, হে ছুরি! তুমি পাথরকে দ্বিখ-িত করে দিলে অথচ হযরত ইসমাঈল জাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার গলা মুবারক কাটতে পারছো না? মহান আল্লাহ পাক তিনি ছুরির যবান খুলে দেন। ছুরি বললো, ‘হে মহান আল্লাহ পাক উনার খলীল হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম! আপনি একবার কাটার জন্য আদেশ করেন আর আমার রব মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে সত্তরবার কাটতে নিষেধ করছেন। সুবহানাল্লাহ!

যাই হোক হযরত ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম তিনি হযরত ইসমাঈল জাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে যবেহ করার চেষ্টায় নিয়োজিত ছিলেন ঠিক এমতাবস্থায় মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম উনাকে বেহেশত থেকে একটি দুম্বা এনে হযরত ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম উনার নিকট দেয়ার নির্দেশ মুবারক দিলেন।

হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি যখন দুম্বা নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন দেখলেন, হযরত ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম উনার প্রাণাধিক প্রিয় সন্তান হযরত ইসমাঈল জাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার গলা মুবারক উনার মধ্যে ছুরি মুবারক চালাচ্ছেন। হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি আশ্চর্যান্বিত হয়ে মহান আল্লাহ পাক উনার বড়ত্ব, মহত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে বলে উঠলেন, ‘আল্লাহ আকবার, আল্লাহু আকবার।’ একথা বলে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি হযরত ইসমাঈল জাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে সরিয়ে ছুরির নিচে দুম্বাটি দিয়ে দিলেন। হযরত ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরে তখন তিনিও মহান আল্লাহ পাক উনার একত্ববাদের ঘোষণা দিয়ে বললেন, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার’।
এদিকে হযরত ইসমাঈল জাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনিও যখন বুঝতে পারলেন যে, তিনি যবেহ না হয়ে উনার পরিবর্তে একটি দুম্বা যবেহ হচ্ছে তিনিও তখন মহান আল্লাহ পাক উনার প্রশংসা করে বললেন, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ সম্মানিত শরীয়ত উনার মধ্যে এটাই তাকবীরে তাশরীক নামে মশহুর।’

পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ মাস উনার ৯ তারিখ পবিত্র ফজর থেকে ১৩ তারিখ পবিত্র আছর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরয নামায উনার পর তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা সম্মানিত শরীয়ত উনার নির্দেশ মুবারক। পুরুষ হোক, মহিলা হোক, শহরে হোক, গ্রামে হোক, মুক্বীম হোক, মুসাফির হোক, একা হোক বা জামায়াতে হোক প্রত্যেকের জন্য প্রত্যেক অবস্থায় প্রতি ফরয নামাযের পর একবার তাকবীর পাঠ করা ওয়াজিব আর তিনবার পাঠ করা সুন্নত।

কেউ কেউ বলে ‘তাকবীর’ একবার পাঠ করতে হবে; তিনবার পাঠ করা যাবে না- তাদের কথা সম্পূর্ণ অশুদ্ধ ও দলীলবিহীন।

সর্বজনমান্য এবং স্বীকৃত ইমাম-মুজতাহিদ ও ফুক্বাহায়ে কিরামগণ উনাদের বিশ্ববিখ্যাত ফতওয়ার কিতাবে একাধিকবার তাকবীরে তাশরীক বলা মুস্তাহাব বা ফযীলতের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন, “দুররুল মুখতার” কিতাব উনার মধ্যে উল্লেখ আছে যে, “তাকবীরে তাশরীক একবার বলা ওয়াজিব, তবে যদি (কেউ) একাধিকবার বলে, তাহলে তা ফযীলতের কারণ হবে।” আর “ফতওয়ায়ে শামীতে” উল্লেখ আছে, “কেউ কেউ বলেছেন (তাকবীরে তাশরীক) তিনবার।”

“গায়াতুল আওতার”, “শরহে দুররুল মুখতার” কিতাব উনার মধ্যে উল্লেখ আছে, “বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে (মহান আল্লাহ পাক উনার পক্ষ থেকে) আদিষ্ট হওয়ার কারণে একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। আর যদি একবারের চেয়ে অতিরিক্ত বলে তবে সওয়াবের অধিকারী হবে।” “মুলতাক্বাল আবহুর” কিতাব উনার মধ্যে উল্লেখ আছে, যদি “তাকবীরে তাশরীক” একাধিকবার বলে তাহলে তা নফল হবে। “মারাকিউল ফালাহ” কিতাব উনার ৩৫১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “সাধারণভাবে একাধিকবার “তাকবীরে তাশরীক পড়া মুস্তাহাব।” “শরহে নেকায়া” কিতাব উনার মধ্যে ৩০৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “তাকবীরে তাশরীক একবার পাঠ করা ওয়াজিব। আর একাধিকবার পাঠ করা মুস্তাহাব।”

মূল ফতওয়া হলো- পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ মাস উনার ৯ তারিখ পবিত্র ফজর থেকে ১৩ তারিখ পবিত্র আছর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরয নামায উনার পর তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা সম্মানিত শরীয়ত উনার নির্দেশ মুবারক। পুরুষ হোক, মহিলা হোক, মুক্বীম হোক, মুসাফির হোক, শহরে হোক, গ্রামে হোক, একা হোক বা জামায়াতে হোক প্রত্যেক অবস্থায় প্রতি ফরয নামাযের পর একবার তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা ওয়াজিব আর তিনবার পাঠ করা মুস্তাহাব-সুন্নত।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে