এতোদিন পরে পথশিশুদের স্বার্থে নির্দেশ। বাস্তবায়ন কবে হবে? পথশিশুরা ইতোমধ্যে ব্যাপকহারে মাদক ও অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। পথশিশুদের হক্ব আদায়ে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ রাষ্ট্রযন্ত্র ন্যক্কারজনকভাবে চলছে।


 
প্রতিটি পথশিশুর পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গত ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম বা সোমবার বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “এ দুই মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিচ্ছি, একটি শিশুও আবাসন ছাড়া থাকবে না। মানবেতর জীবনযাপন করবে না।
একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে ‘৩৪ লাখ শিশুর রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর’ তথ্য এসেছে জানিয়ে এই নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশ তখন এসেছে, যখন পথশিশুরা অনেক আগেই পথ হারিয়ে বিপথগামী হয়েছে। নাঊযুবিল্লাহ!
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, পথশিশুদের ৮৫ ভাগই কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবন করে। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট ও ৮ শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে। সংগঠনটির তথ্য মতে, ঢাকা শহরে কমপক্ষে ২২৯টি স্পটে ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা মাদক সেবন করে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান মতে, ঢাকা বিভাগে মাদকাসক্ত শিশুর প্রায় ৩০ শতাংশ ছেলে এবং ১৭ শতাংশ মেয়ে। মাদকাসক্ত ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ছেলে এবং মেয়ে শিশুরা দৈহিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন জানায়, মাদকাসক্ত ৮০ শতাংশ পথশিশু মাত্র ৭ বছরের মধ্যে অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। দারিদ্র্য ও সামাজিক অবক্ষয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবহেলা, এমনকি নগরীতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠা মাদকের আস্তানা দিন দিন পথশিশুদের নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যু দিকে।
পথশিশু ও তাদের নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পথশিশুদের মধ্যে ‘ড্যান্ডি’র মতো সস্তা মাদক জনপ্রিয় হওয়ার মূল কারণ, ক্ষুধা নিবারণ এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা ও অবহেলা। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় জেলা শহরগুলোতেও অনেক পথশিশু ‘ড্যান্ডি’ সেবন করছে। তবে ‘ড্যান্ডি’ সেবনকারীদের সংখ্যা কত- এমন কোনো তথ্য সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছে নেই।
মাদক বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ড্যান্ডি’ স্থানীয় একটি শব্দ। এর আক্ষরিক তেমন কোনো অর্থ নেই। মূলত ভারতে তৈরি ‘ড্যান্ডরাইট’ নামক একটি আঠা (গাম) থেকে ‘ড্যান্ডি’ শব্দের উৎপত্তি। মূলত, জুতো তৈরির কাজে ব্যবহারের জন্য এই আঠাটি আমদানি করা হয়ে থাকে। এই আঠা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে তার গন্ধ নেয়াই হচ্ছে ড্যান্ডি সেবনকারীদের কাজ। নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ‘ড্যান্টরাইট’ সেবন করলে এর গন্ধে সেবনকারীদের শ্বাসতন্ত্রের মধ্যে এক ধরনের অনুভূতির সৃষ্টি হয়, যার কারণে তাদের নাকে অন্য কোনো গন্ধ কাজ করে না। এছাড়া শরীরের নেশা জাতীয় এক ধরনের অনুভূতির সঞ্চার হয়। পথশিশুরা মূলত ভাঙ্গাড়ি ব্যবসায়ীদের দ্বারাই ড্যান্ডি সেবন করতে শুরু করে।
জানা গেছে, কোনো পথশিশু ‘ড্যান্ডি’ খেতে না চাইলে মহাজনরা (যাদের কাছে কাগজ ও ভাঙ্গাড়ি বিক্রি করে) জোর করে তাদের ‘ড্যান্ডি’র প্রতি আসক্ত করে তোলে। কারণ ‘ড্যান্ডি’ সেবন করে কাজে বের হলে একজন শিশু অনেক বেশি কাগজ ও ভাঙ্গাড়ি সংগ্রহ করতে পারে। আর তাই বাড়তি টাকা আয় করার জন্য মহাজনরা অনেকটা জোর করেই তাদের নেশায় আসক্ত করে তোলে। এদিকে এই ‘ড্যান্ডি’ সেবন করে শিশুরা শ্বাসনালীর জটিল সব রোগে আক্রান্ত হয়ে করুণ মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে মনে করছে মাদক বিশেষজ্ঞরা।
সিআইডি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট অপরাধীর ৫ ভাগ হচ্ছে পথশিশু। আর ঢাকায় এ সংখ্যা শতকরা ১৫ ভাগ। পথশিশুরা এখন গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি সহজলভ্যতার কারণে নিজেরাও হয়ে পড়ছে মাদকাসক্ত। তাছাড়া প্রতিনিয়ত এসব শিশুরা দৈহিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের ‘ঢাকা শহরের পথশিশুদের দৈনন্দিন জীবন’ শীর্ষক সমীক্ষায় দেখা যায়, শতকরা ৯৮ দশমিক ৬৭ ভাগ শিশুই জীবনযাপনে নির্যাতনের শিকার হয়। আমাদের শ্রমশক্তির ৩০ ভাগই শিশুশ্রমিক, যার মধ্যে অনেকেই পথশিশু। বিদেশে পাচারেরও শিকার হচ্ছে পথশিশুরা। পথশিশুদের মধ্যে মাদকাসক্তি থাকলেও সরকারের মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে তাদের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই।
মূলত, এসব পথশিশু এবং তাদের নেশা; সম্পূর্ণই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতার ফসল। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণ। রাষ্ট্রযন্ত্র এসব পথশিশুকে তার নাগরিক বলে মনে করে না। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সেবা দেবার জন্য দায়বদ্ধ- সেটা মালুম করে না। পথশিশুরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে না পায় খাদ্য, না পায় শিক্ষা। ফলে তাদের জীবন হয়ে উঠেছে পশুর মতো। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের উদাসীনতায় পথশিশুরা ক্রমশ মানবরূপী পশুতে পরিণত হচ্ছে।
অপরদিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালকরা তাদের কথিত রাজনীতি আর ক্ষমতার লড়াই নিয়ে বুঁদ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় শেয়ারবাজার থেকে লাখো কোটি টাকা লুট হয় কিন্তু পথশিশুর জন্য কোনো কিছু বরাদ্দ হয় না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় হলমার্ক আর ডেসটিনি কর্তৃক দশ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়; কিন্তু পথশিশুদের জন্য কোনো বরাদ্দ মেলে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য হন্যে হয়ে ঘর্মাক্ত হয়; কিন্তু পথশিশুদের কল্যাণের কথা চিন্তা করতে পারে না।
মূলত, রাষ্ট্রযন্ত্রের এ ব্যর্থতার কথা এবং পথশিশুদের বঞ্চনার কথা জোরদারভাবে বলতে হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর জোর চাপ প্রয়োগ করতে হবে।
রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান এতোদিনে পথশিশু সম্পর্কে মুখ খুলেছে। আমরা আশা করবো এটা যেন মুখে মুখেই না থাকে। এ নির্দেশনা যাতে শতভাগ বাস্তবায়িত হয়। তবে আমরা মনে করি- পথশিশুদের বিষয়ে সামাজিক সচেতনতাও বাড়াতে হবে। মানবিক মূল্যবোধ তথা ইসলামী অনুভূতির প্রসার ঘটাতে হবে। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে- “গোটা সৃষ্টিজগৎ মহান আল্লাহ পাক উনার পরিবার। উনার কাছে সেই প্রিয়, যে উনার পরিবারের কাছে প্রিয়। অর্থাৎ সে তাদের কল্যাণ সাধন করে।”

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে