কলকাতা থেকে বাংলাদেশে এসেও বিধর্মীদের দ্বারা চাকরিক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানের অপমানের পালা শেষ হলো না!


শামসুল হুদা চৌধুরী ছিলেন জিয়াউর রহমান আমলের তথ্যমন্ত্রী, পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের স্পীকার। ১৯২০ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে জন্মগ্রহণ করেন। পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় হিসেবে সাতচল্লিশের দেশবিভাগের পর তিনি বাংলাদেশে আসতে চাননি, পশ্চিমবঙ্গেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে চাকরিক্ষেত্রে হিন্দুদের দ্বারা অপমানিত হয়ে বাংলাদেশে চলে আসতে হয়।

কলকাতা রেডিওতে চাকরির সময়ে শামসুল হুদা চৌধুরীর কলিগ ছিলো সুধীন্দ। এই সুধীন্দ্রনাথের ছেলে হলো গায়ক সুমন চট্টোপাধ্যায়। পরবর্তীতে সুমন চট্টোপাধ্যায় দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করে ‘কবীর সুমন’ নাম ধারণ করে। কবীর সুমন তার ফেসবুক একাউন্টে শামসুল হুদা চৌধুরীকে নিয়ে তার পিতা সুধীন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণ সম্পর্কে লিখেছেন-
“দেশ ভাগের সময়ে কলকাতা রেডিও’র মুসলমান কর্মীদের তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে চলে গিয়ে রেডিও পাকিস্তানে যোগ দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। একমাত্র হুদা সাহেব যেতে চাননি। ভারতেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন তিনি।
সুধীন: বুঝলি, বছর দুই তিনের মধ্যেই হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা কাকে বলে টের পেয়ে গেলাম পুরোপুরি। হুদাকে উঠতে বসতে অপমান করতে লাগলো যে হিন্দু সহকর্মীরা – সকলেই বাঙ্গালি ভদ্রলোক – তাদের স্বরূপ যে এমন তা দেশভাগের আগে জানতে পারিনি। আমি হুদার বন্ধু ছিলাম, পারিবারিকভাবেও বন্ধু ছিলাম আমরা, হুদার স্ত্রী তোর মায়ের বন্ধু ছিলেন, তা আমি হুদার বন্ধু তাই আমাকেও ঠেস দিয়ে দিয়ে কথা বলতে লাগলো অনেকে। আশ্চর্য, আর কেউ হুদার পাশে এসে দাঁড়ালো না। হুদা কিন্তু হাসি মুখে সব সহ্য করতো। আমি রেগে যেতাম। হুদা আমায় ঠা-া করতো।
… কিন্তু আমিই একদিন ওকে বললাম, হুদা, তোমার এই অপমান তো নিতে পারছি না আর। বাথরুমে গিয়ে কেঁদেছিলাম আমি। তার কিছুদিন পরে হুদা আমায় কাঁদতে কাঁদতে বলল – আমি আর পারছি না। কবে যে কী করে বসব। তার চেয়ে ঢাকায় চলে যাই। ওটা আমার কাছে ‘দেশ’ না। আমার দেশ এখানে। আমি বীরভূমের ছেলে। কলকাতায় বড় হয়েছি। কিন্তু ঢাকাতেই মানিয়ে নিতে চেষ্টা করি, কী করবো। – সুধীনও মেনে নিলো অগত্যা।”
ভারতে যে মুসলমানরা কেন চাকরিক্ষেত্রে স্থান পায় না, তা বোঝার জন্য শামসুল হুদা চৌধুরীর উদাহরণটিই যথেষ্ট। ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ আমলে উত্তরপ্রদেশের প্রশাসন ও বিচারবিভাগে মুসলিম কর্মকর্তা ছিল ৪৫ শতাংশ। আজ সেখানে ১ শতাংশ মুসলিমও নেই।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর সদ্য বহিষ্কৃত এপিএস মন্মথ বাড়ৈকে নিয়ে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। মাদরাসা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (যুগ্ম-সচিব) বিল্লাল হোসেনকে পিটিয়েছে এই মন্মথ বাড়ৈ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিন্ডিকেটের কারণে যে মাদরাসা অধিদপ্তরের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে ছিল, তাতে গতি সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন বিল্লাল হোসেন। বাড়ৈ গংদের চোখে এটিই ছিল তার অপরাধ।
একজন যুগ্ম সচিবের গায়ে একজন পিয়ন শ্রেণীর হিন্দু এপিএসও হাত তুলতে পারে, এই কী আমাদের বাংলাদেশ? সম্মান ও নিরাপত্তা লাভের আশায় এই বাংলাদেশের জন্যই কী একদা বাঙালি মুসলমান কলকাতায় নিজেদের মাতৃভূমি ছেড়ে এসেছিল?
এখন কলকাতা থেকে না হয় বাংলাদেশে আসা গেল। কিন্তু এই বাংলাদেশও যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, তাহলে বাঙালি মুসলমান কই যাবে? বাঙালি মুসলমান কী বীরের মতো রুখে দাঁড়াবে, যেভাবে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল? নাকি তারা বিধর্মীদের হাতে এদেশের সেক্টরগুলো ছেড়ে দিয়ে বঙ্গোপসাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করবে?

Views All Time
2
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে