কারবালা প্রান্তর


কারবালা প্রান্তরে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনা সম্পর্কে পূর্ব হতেই নবীগণ (আলাইহিস সালাম) অবগত ছিলেন। কেননা নবীগণ (আলাইহিস সালাম)-এর জীবনীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলে পরিলক্ষিত হয় যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন উনার নবীগণকে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে কারবালা ও ইমাম হুসাইন (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে অবগত করেছেন।

(হলুদ নির্দেশিত দাগটি ইমালুল হুমাম হযরত হুসাইন আলাইহি সালাম উনার চলার পথ যেখানে থেমেছিলেন তা র্নিদেশ করছে)

 

হযরত আদম (আলাইহিস সালাম)

একটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন হযরত আদম (আলাইহিস সালাম) বেহেস্ত হতে পৃথিবীতে আসেন তখন তিনি হযরত হাওয়া (আলাইহিস সালাম) উনাকে কাছে না পেয়ে তাঁর সন্ধান করতে লাগলেন। বহু পথ পাড়ী দেয়ার পর তিনি যখন কারবালা ভূমি অতিক্রম করতে চাইলেন, তখন কোন প্রকার বস্তু ছাড়াই তিনি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। এ ঘটনায় তিনি খুবই ভারাক্রান্ত হলেন। উনার বুক ধরে আসলো ও উনার পা টলতে লাগলো এবং তিনি আহত হলেন। অতঃপর দেখলেন যে উনার শরীর হতে হতে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। আসমানের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন: “হে আমার রব আমি কি (যা কিছু আমি বেহেস্তে সম্পাদন করেছি তা ব্যতীত) অন্য কোন ভুল করেছি যার প্রতিফলে আমি আঘাত প্রাপ্ত হলাম? আমি সকল ভূমিতে ভ্রমণ করেছি কিন্তু কোনরূপ ঘটনাই আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি, কিন্তু এই ভূমিতে আমি হোঁচট খেয়েছি এবং ভারাক্রান্ত হয়েছি।”

মহান আল্লাহ্‌ তায়লা হযরত আদম (আলাইহিস সালাম)উনার নিকট ওহী প্রেরণ করলেন: “হে আদম!( আলাইহিস সালাম) আপনি কোন ভুল করনি, বরং আপনারই সন্তান হুসাইন(আলাইহিস সালাম) এই ভূমিতে নিপীড়িত অবস্থায় নিহত হবে, আর (আপনার রক্ত ঝরার কারণ হল) আপনার রক্ত তার রক্তের সাথে মিশে গেল।”

হযরত আদম (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞেস করলেন: হুসাইন (আলাইহিস সালাম) কি কোন পয়গম্বর?

মহান আল্লাহ্‌ পাক বললে: না, সে পয়গম্বর নয়, কিন্তু মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সন্তান।

হযরত আদম (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞেস করলেন: উনার হত্যাকারী কে?

মহান আল্লাহ্‌ পাক পুনরায় ওহী অবতীর্ণ করলেন: তার হত্যাকারী হচ্ছে ইয়াজিদ; যে আসমান ও জমিনের অভিশপ্ত ব্যক্তি।

হযরত আদম (আলাইহিস সালাম)হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) কে বললেন: এখন আমি কি করব? (যাতে এই ভূমি হতে সুস্থভাবে অতিক্রম করতে পারি)

হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন: ইয়াজিদের উপর অভিসম্পাত করুন। তখন হযরত আদম (আলাইহিস সালাম) চারবার (ইয়াজিদের উপর) অভিসম্পাত করলেন ও সেস্থান হতে অতিক্রম করে নিজের ভ্রমণ অব্যাহত রাখলেন। অতঃপর কাবাগৃহের নিকটবর্তী আরাফাত পাহাড়ের নিকট হযরত হাওয়া (আলাইহিস সালাম) এর দেখা পান।

হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম)

বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম) মহাপ্রলয়ের(বন্যা) পর কিস্তিতে আরোহণ করে সমগ্র পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। কিন্তু যখন তিনি কারবালা ভূমি অতিক্রম করতে চাইলেন তখন সে স্থানে তাঁর কিস্তি থেমে গেল। নূহ (আলাইহিস সালাম) তাঁর কিস্তি ডুবে যাওয়ার ভয়ে সন্ত্রস্ত হলেন। হাত তুলে আল্লাহর দরবারে বললেন: “হে আমার রব! আমি সমস্ত ভূমিতে ভ্রমণ করেছি কিন্তু কোন বিপদই আসেনি যেভাবে এই ভূমিতে এসেছে। আর এ ভূমির মত অন্য কোন ভূমিতে আমি ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়নি।” এমন সময় হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) অবতীর্ণ হয়ে উনাকে বললেন: হে নূহ!(আল্লাইহিস সালাম) এটা ঐ স্থান যেখানে শেষ নবী হুজুর পাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দৌহিত্র ও শেষ আওসীয়ার সন্তান নিহত হবে।

হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞেস করলেন: তার হত্যাকারী কে?

হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) উত্তরে বললেন: সেই ব্যক্তি যে সাত আসমান ও সাত জমিনে অভিশপ্ত।

হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম) চারবার তাঁর হত্যাকারীর উপর বদ দোয়া করলেন, আর তখনই তাঁর কিস্তি বিপর্যয় হতে পরিত্রাণ লাভ করে ভ্রমণ অব্যাহত রাখলেন এবং জুদী নামক পাহাড়ের এসে থেমে গেল।

কারবালা প্রান্তরে হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)

বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) ঘোড়ায় আরোহণ করে ভ্রমণ করছিলেন। চলতে চলতে তিনি কারবালা প্রান্তরে এসে পৌঁছুলেন। যখন তিনি “কাতালগাহ” (যেখানে ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এর পবিত্র মস্তক শরীর হতে আলাদা করা হয়) -এ পৌঁছুলেন তখন হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) উনার ঘোড়া উল্টে পড়ে গেল। ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) ঘোড়া হতে পড়ে গেলেন এবং হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) উনার মাথা মুবারক ফেটে রক্ত প্রবাহিত হল। তিনি ইস্তেগফার (তওবা) করে বললেন: “হে আমার রব! আমি কি কোন গুনাহ আঞ্জাম দিয়েছি?(যদিও কোন নবী বা রসুল গন কখনো গুনাহ করেন না তবও বিনয় প্রকাশ করলেন এবং আমাদের শিক্ষা দেয়ার জন্য এ সব মেসাল বা উদাহরণ )”

এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন: হে ইব্রাহিম! আলাইহি সালাম আপনার হতে কোন পাপকর্ম সংঘটিত হয়নি। বরং এই ভূমিতে সর্বশেষ পয়গম্বরের দৌহিত্র ও সর্বশেষ আউলিয়ার সন্তান নিহত হবে। আপনার রক্ত উনার রক্তের মত এই জমিনে প্রবাহিত হল।

হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞেস করলেন: তাঁর হত্যাকারী কে?

হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন: আসমান এবং জমিনের অধিবাসীরা যাকে অভিসম্পাত করেছে…

এমতাবস্থায় হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) আসমানের দিকে হাত তুলে যতক্ষণ পারলেন নবী দৌহিত্রের হত্যাকারীর উপর বদ দোয়া করলেন। তখন হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) ঘোড়া উঠে দাঁড়াল। ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) ঘোড়ায় আরোহণ করলেন এবং রওনা হলেন। ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) ঘোড়াকে প্রশ্ন করলেন: কিভাবে তুমি সুস্থ হলে?

ঘোড়া বলল: “হে হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)! আমি এ কারণে গর্বিত যে, আপনার মত এক ব্যক্তিত্ব আমার পিঠে আরোহণ করেছে। যখন এই ভূমিতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে আপনাকে ভূমিতে ফেলে দিলাম, তখন খুবই লজ্জিত হয়েছিলাম। এই ঘটনার কারণ ছিল ইয়াজিদ (তার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক)।

হযরত ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)এর ভেড়ার পল ফুরাতের পানি পান করেনি

বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এর ভেড়ার পাল চরতে চরতে ফুরাতের কূলে আসলো। রাখাল ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এর নিকট এসে বলল: “ভেড়ারা ফুরাত হতে পানি পান করছে না।” হযরত ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এই ঘটনার কারণ সম্পর্কে আল্লাহর নিকট প্রশ্ন করলেন। জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এর নিকট অবতীর্ণ হয়ে বললেন: “এর রহস্য আপনি ভেড়াদেরকেই জিজ্ঞেস করুন। ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) ভেড়াদের উদ্দেশ্য করে বললেন: “কেন তোমরা এ পানি পান করছ না?”

ভেড়াগুলো প্রাঞ্জল ভাষায় বলে উঠলো: “আমরা জানতে পেরেছি যে, তোমারই সন্তান হুসাইন (আলাইহিস সালাম), -যিনি হবেন হুজুর পাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দৌহিত্র- এখানে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় নিহত হবে, এ কারণেই আমরা এই স্থান হতে পানি পান করব না।”

ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) পুনরায় প্রশ্ন করলেন: তাঁর হত্যাকারী কে?

তারা বলল: আসমান ও জমিনের অধিবাসীরা এবং পৃথিবীতে বিদ্যমান সকল সৃষ্টি যাকে অভিসম্পাত করে।

হযরত ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন: “হে আল্লাহ্‌! হুসাইন আলাইহি সালাম উনার হত্যাকারীর উপর লানত বর্ষিত হোক।”

হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম)
বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম) নিজের স্থলাভিষিক্ত ইউশা বিন নূন (আলাইহিস সালাম) এর সাথে কারবালা প্রান্তর অতিক্রম করছিলেন। হঠাৎ হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম) এর জুতা ছিড়ে তার জুতার ফিতাও ছিরে গেল। এমতাবস্থায় একটি কাঁটা হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম) এর পায়ে বিদ্ধ হয়ে পা জখমী করলো এবং সাথে সাথে রক্ত বের হতে লাগলো।

হযরত মূসা আলাইহিস সালাম বললেন: “হে আমার বারে ইলাহী! আমি কি দোষ করেছি, যার কারণে এমন ঘটনার মুখোমুখি হলাম?” মহান আল্লাহ্‌ তায়ালা হযরত মূসা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি ওহী অবতীর্ণ করলেন: “এখানে হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার রক্ত ঝরানো হবে ও তাকে হত্যা করা হবে। এখন তোমার রক্ত হুসাইনের রক্তের রাস্তায় প্রবাহিত হল।”

হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞেস করলেন: হুসাইন কে? হযরত মূসা আলাইহিস সালাম উনাকে বলা হল: সে আল্লাহ মনোনীত শেষ নবী এবং রসুল হুজুরপাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দৌহিত্র এবং আলী মুরতাজা আলাইহিস সালাম উনার সন্তান।

হযরত মূসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন: তার হত্যাকারী কে?

হযরত মূসা আলাইহিস সালাম উদ্দেশ্যে বলা হল: তার হত্যাকারী হল সেই ব্যক্তি, যাকে সমুদ্রের মৎস্য, জঙ্গল ও মরুভূমির হিংস্র জীব ও আকাশে উড়ন্ত পাখিরা অভিসম্পাত করেছে। এমতাবস্থায় হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও ইউশা বিন নূন আলাইহিস সালাম উনারা ও বললেন (অর্থাৎ সবার মত তিনিও লানত করলেন), অতঃপর উনারা উভয়ে ঐ ভূমি হতে সুস্থ অবস্থায় ও নিরাপদে অতিক্রম করলেন।

Views All Time
1
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+