গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ক্বলব মুবারকে যিকির জারি থাকার কারণেই তিনি আজীবন শরীয়তের উপর ইস্তিকামত ছিলেন।


সাইয়্যিদুল আউলিয়া, গাউছুল আ’যম হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন মহান আল্লাহ পাক উনার খাছ লক্ষ্যস্থল। উনার বিলাদত শরীফ থেকে বিছাল শরীফ পর্যন্ত পুরো হায়াত মুবারকেই মুসলমানদের জন্য রয়েছে নছীহত, ইবরত।

সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি যিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খাছ ওয়ারিছ, নায়িব, আওলাদ। যাঁকে মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশেই হাবীবুল্লাহ নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ছয়শ’ হিজরীতে পাঠিয়েছেন ‘মুজাদ্দিদ’ হিসেবে তাজদীদ করার জন্য। দ্বীনের মধ্যে যে সমস্ত কুফরী, শিরকী, বিদয়াতী আমল ও আক্বীদা প্রবেশ করেছিল সেগুলো বের করে দেয়ার জন্য।
মূলতঃ মহান আল্লাহ পাক তিনি উনাকে অনেক মর্যাদা-মর্তবা দান করেছেন। তিনি পিতার দিক থেকে হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম এবং মাতার দিক থেকে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম  উনাদের বংশধর অর্থাৎ তিনি হচ্ছেন আওলাদুর রসূল। সুবহানাল্লাহ!
গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আজীবন শরীয়তের উপর অবিচল বা ইস্তিকামত ছিলেন।

হযরত গাউসুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া, শায়েখ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল ক্বাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি দীর্ঘ পঁচিশ বৎসরকাল ইরাকের নির্জন বন-জঙ্গলে, মাঠে-প্রান্তরে এবং ভগ্ন প্রায় বাড়ি-ঘরে কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি যখন ইরাকের জঙ্গলে সাধনা বা রিয়াজত করতাম তখন একদা আমার খুব পানির তৃষ্ণা পেলো, এমন সময় মহান আল্লাহ পাক উনার কুদরতে আকাশ থেকে শিশিরের ন্যায় বৃষ্টি বর্ষিত হলো তাতে পিপাসা মিটে গেল। এরপর আকাশে একটা আলো জাহির হলো, যা সমস্ত আকাশকে আলোকিত করে ফেললো। অতঃপর ঐ আলো থেকে আওয়াজ এলো- ‘হে হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি! আমি আপনার আল্লাহ। আমি আপনার ইবাদত-বন্দেগীতে সন্তুষ্ট হয়ে সমস্ত হারামগুলিকে আপনার জন্য হালাল করে দিলাম।’ এটা ইবলিসের ধোঁকা বা প্রতারণা বুঝতে পেরে সাথে সাথে পড়লেন, ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনির রজীম’ মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে বিতাড়িত শয়তানের ওয়াওয়াসা থেকে আমি পানাহ চাচ্ছি। তখন ঐ ছুরতটা দূরে সরে গেল এবং বললো, হে হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি! আপনার ইলম আপনাকে বাঁচিয়ে দিল। হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি একথা শুনে বললেন, ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ’। হে ইবলিস শয়তান! আমার ইলম আমাকে বাঁচায়নি বরং মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। তখন ইবলিস শয়তান বললো, আপনি মহান আল্লাহ পাক উনার রহমতে বেঁচে গেলেন। কিন্তু এভাবে আমি অনেক ছূফী-দরবেশ, আলিম-উলামা, মাওলানা, মুফতী, মুফাসসির, খতীব, আমীরকে ধোঁকা দিয়ে গুমরাহ করে দিয়েছি। যার ফলে তারা হারাম কাজে লিপ্ত হয়েছে এবং হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম ফতওয়া দিয়েছে। নাউযুবিল্লাহ!

এই ওয়াকিয়া দ্বারা প্রথমতঃ প্রমাণিত হয় যে, একজন লোক যত উপরের মাক্বামেই উঠুক না কেন তার জন্য ইবাদত বন্দেগী বা শরীয়ত মাফ নেই। অথচ আজকাল এক শ্রেণীর বাতিনী ফকীর নামধারী ভ- ব্যক্তিরা বলে থাকে যে, উপরের মাক্বামে উঠলে ইবাদতের প্রয়োজন হয় না। তারা কুরআন শরীফ-এর নিম্নোক্ত আয়াত শরীফ-এর ভুল ব্যাখ্যা দেয়। যেমন, মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন, “ইয়াক্বীন বা মৃত্যু আসা পর্যন্ত তোমরা ইবাদত কর।” ভণ্ডরা ‘ইয়াক্বীন’-এর শাব্দিক অর্থ বিশ্বাস ধরে নিয়েছে। ইবাদত বন্দেগীতে মোটামুটি বিশ্বাস এসে গেলে তাদের মতে আর ইবাদত না করলেও চলবে। নাঊযুবিল্লাহ!

অথচ সমস্ত মুফাসসিরীণে কিরামগণ একমত যে, এখানে ইয়াক্বীন শব্দের অর্থ হচ্ছে মৃত্যু। তাছাড়া যিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিও বিছাল শরীফ পর্যন্ত এত বেশি যিকির আযকার ও ইবাদত বন্দিগী করতেন যে, নামায পড়তে পড়তে রসূলুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পা মুবারক ফুঁলে যেত। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা জিজ্ঞাসা করতেন, ইয়া রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি তো মা’ছুম, তবে আপনি কেন ইবাদতে এত কষ্ট করেন? রসূলুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, “আমি কি মহান আল্লাহ পাক উনার শোকরগুজারি বান্দা হব না?” তাই ইন্তিকাল পর্যন্ত মানুষকে ইবাদত বন্দেগী করে যেতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ প্রমাণিত হয় যে, ক্বিয়ামত পর্যন্ত কারো জন্য কোনো হারাম বিষয় হালাল হবে না। কেননা ইসলাম পরিপূর্ণ দ্বীন। আর ওহীর দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, নতুন করে ওহী নাযিল হবে না। হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, “হালাল স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে এবং হারামকেও স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে।” তাই আক্বাইদের কিতাবে ফতওয়া দেয়া হয়েছে, “হারামকে হালাল বলা কুফরী।” অর্থাৎ যে ব্যক্তি হারামকে হালাল বা হালালকে হারাম বলবে সে কাট্টা কাফির।
গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ক্বলব মুবারকে মহান আল্লাহ পাক উনার যিকির জারি থাকার কারণেই ইবলিস উনাকে ওয়াসওয়াসা দিতে পারে নাই। বরং তিনি সর্বদাই হক্বের উপর, শরীয়তের উপর ইস্তিকামত ছিলেন। পক্ষান্তরে আরেক শ্রেণী হচ্ছে জাহিরী ফক্বীর- যারা উলামায়ে ‘ছূ’, তারা হক্কানী-রব্বানী ওলী উনার নিকট বাইয়াত হয়ে ত্বরীকা অনুযায়ী ক্বলবী যিকির না করার কারণেই অর্থাৎ তাদের ক্বলবে যিকির জারি না থাকার কারণে তারা নির্দ্বিধায় হারাম কাজগুলো করে যাচ্ছে এবং অসংখ্য হারাম কাজগুলোকে তারা ইসলামের দোহাই দিয়ে হালাল বা জায়িয ফতওয়া দিচ্ছে। যেমন কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ-এ দৃঢ়তার সাথে পর্দা পালনের নির্দেশ দেয়া সত্ত্বেও তারা বেপর্দা হচ্ছে এবং বেপর্দা হওয়াকে জায়িয বলছে। হাদীছ শরীফ-এ ছবি তোলা, আঁকা, রাখা ইত্যাদি হারাম ঘোষণা দেয়ার পরও তারা ছবি তুলছে এবং টিভি চ্যানেলে প্রোগ্রাম করছে এবং বলছে বর্তমানে ছবি তোলা, টিভি চ্যানেলে প্রোগ্রাম করা জায়িয। অনুরূপ শরীয়তে নারী নেতৃত্ব মানা, ইসলামের নামে ভোট নির্বাচন করা, হরতাল করা, লংমার্চ করা, কুশপুত্তলিকা দাহ করা, পুরুষ মহিলাদের খেলাধুলা করা ইত্যাদি সবই হারাম ও নাজায়িয হওয়ার পরও তারা এগুলো করছে ও এগুলোকে জায়িয বলে ফতওয়া দিচ্ছে। নাঊযুবিল্লাহ! মূলতঃ এরাই হচ্ছে জাহিরী ফকীর অর্থাৎ উলামায়ে ‘ছু’ বা ধর্মব্যবসায়ী। আর এদের সম্পর্কেই হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে যারা উলামায়ে ‘ছূ’ তাদের জন্য জাহান্নাম। যারা ইলমকে ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করেছে। আর তা যামানার রাজ-বাদশাহ, আমীর-উমরাদের নিকট বিক্রি করে থাকে দুনিয়াবী ফায়দা হাছিল করার জন্য। মহান আল্লাহ পাক তিনি কখনো তাদের এ ধর্মব্যবসায় বরকত দিবেন না।’

মূলত: এদের ক্বলবে মহান আল্লাহ পাক উনার যিকির জারি না থাকার কারণেই ইবলিস তাদেরকে ধোঁকা দিয়ে হারাম কাজে মশগুল করে দিয়েছে এবং এদের মাধ্যম দিয়ে হারামকে হালাল ফতওয়া দেয়ায়ে এদেরকে কুফরীতে নিমজ্জিত করে গুমরাহ করে দিচ্ছে। কেননা মহান আল্লাহ পাক ‘সূরা কাহফ-এর’ মধ্যে ইরশাদ করেন, “তোমরা ঐ ব্যক্তিকে অনুসরণ কর না যার ক্বলব আমার যিকির থেকে গাফিল সে নফসের পায়রবী করে এবং তার কাজগুলো শরীয়তের খিলাফ।” আর হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, “ইবলিশ মানুষের ক্বলবে বসে যখন সে যিকির করে তখন পালিয়ে যায় আর যখন যিকির থেকে গাফিল থাকে তখনই শয়তান ওয়াসওয়াসা দিয়ে পাপ কাজে লিপ্ত করে দেয়।” নাউযুবিল্লাহ!
গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি, উনার উক্ত ওয়াকিয়া থেকে ইবরত-নছীহত হাছিল করা। অর্থাৎ সকলের ক্বলবে যিকির জারি করা। আর তা তখনই সম্ভব যখন একজন হক্কানী রব্বানী ওলীআল্লাহ উনার নিকট বাইয়াত হয়ে ছবক নিয়ে ত্বরীকা মুতাবিক যিকির করা হবে। নচেৎ কস্মিনকালেও ক্বলবে যিকির জারি করা সম্ভব নয়।
মূল কথা হলো- গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত বড়পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ক্বলব মুবারকে যিকির জারি থাকার কারণেই তিনি আজীবন শরীয়তের উপর ইস্তিকামত ছিলেন। আর উলামায়ে ‘ছূ’দের ক্বলবে যিকির না থাকার কারণে তারা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে হারাম কাজে লিপ্ত হয়।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+