গিরিশচন্দ্র কর্তৃক পবিত্র কুরআন শরীফ উনার অনুবাদের প্রকৃত ইতিহাস


গিরিশচন্দ্রের অনুবাদ দেখে যদি কেউ মনে করে, মৌলবাদী হিন্দুরা মহাজ্ঞানী (!) ছিলো, কিংবা গিরিশচন্দ্র আরবী ভাষায় পারদর্শী ছিলো, তাহলে সেটা হবে তার ইতিহাসজ্ঞানের অভাব।
তৎকালীন সময়ে ফারসী ও উর্দুতে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার তরজমা প্রচলিত ছিলো। মুসলমানগণ ফারসী-উর্দু পড়তে পারতেন, বিপরীতে হিন্দুরা ফারসী ও উর্দুতে অজ্ঞ হওয়ার কারণেই তাদের জন্য আলাদাভাবে বাংলা ভাষায় তরজমা প্রকাশের দরকার হয়েছিলো।
প্রায়ই দেখা যায়, হিন্দুরা গিরিশচন্দ্রের দ্বারা পবিত্র কুরআন শরীফ অনুবাদ নিয়ে খুব গর্ব করে। তারা এমন ভাব দেখায়, যেন বাংলাভাষী মুসলমানগণ কর্তৃক পবিত্র কুরআন শরীফ বাংলায় অনুবাদ করার যোগ্যতা ছিলো না। মুসলমানরা হিন্দুদের এই মূর্খতাসূচক ঔদ্ধত্যের কোনো জবাব দিতে পারে না, কারণ বর্তমান মুসলমানরা তাদের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণই অজ্ঞ।

আমরা জানি যে, আমাদের দেশের ভার্সিটিগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার মূল বাহনই হলো ইংরেজি ভাষা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন বহু ইংরেজি বই পড়ানো হয়, যেগুলোর কোন বাংলা অনুবাদও প্রকাশিত হয়নি। ইংরেজি না জানা ব্যক্তিরা সেসব বই পড়তে অক্ষম।
এখন ধরা যাক, কোন অল্পশিক্ষিত ব্যক্তি ভার্সিটির ইংরেজি জানা শিক্ষকের নিকট কিছু তালিম নিয়ে একটি ইংরেজি বই বাংলায় অনুবাদ করলো। সেই অনুবাদকের একটি মূর্খ ভক্তশ্রেণীও জুটে গেল। তারা ঐ অনুবাদকের প্রশংসা করে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলা শুরু করলো যে, ঐ অনুবাদক বইটির বাংলা অনুবাদ না করলে বাংলা ভাষাভাষী কেউই বইটির অর্থ বুঝতে সক্ষম হতো না, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাভাষী ছাত্র ও অধ্যাপকেরাও না!
উপরের গল্পটি শিক্ষিত ব্যক্তিদের নিকট যতোই আজগুবি ও হাস্যকর মনে হোক না কেন, গিরিশচন্দ্রের অনুবাদের ক্ষেত্রেও কিন্তু একই কথা খাটে। উপরের গল্পে উল্লেখিত অধ্যাপক ও ছাত্ররা হলো মুসলমান, মূর্খ ভক্তশ্রেণী হলো হিন্দু সম্প্রদায় আর অল্পশিক্ষিত অনুবাদকটি হলো গিরিশচন্দ্র।
মুসলিম শাসনামলে ফারসী ভাষা ছিলো গোটা ভারতবর্ষের প্রশাসন ও বিচারকার্য পরিচালনার ভাষা। সে কারণে উপমহাদেশের শিক্ষিত শ্রেণীর সবাই এই ভাষা বুঝতো। কিন্তু যালিম ব্রিটিশ সরকার ১৮৩৫ থেকে ১৮৪৬ সাল পর্যন্ত জবরদস্তি করে ভারতবর্ষের প্রশাসন থেকে ফারসী ভাষা তুলে দেয়। সুবিধাবাদী যেই হিন্দু সম্প্রদায় বংশানুক্রমে ফারসী ভাষা শিখে শত শত বছর ধরে মুসলমানদের গোলামি করতো, তারা রাতারাতি ফারসী ত্যাগ করে ইংরেজি শিখতে লেগে যায়। কিন্তু মুসলমানরা তা করেনি, কারণ ফারসী ভাষা ভারতবর্ষের মুসলমানদের ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের অন্যতম অঙ্গ ছিলো।
যে কারণে ব্রিটিশআমলে ফারসী ভাষা রদের পর এমন একটি সময় আসলো, যখন মুসলমানরা ফারসী ভাষা জানতো, কিন্তু হিন্দুরা প্রায় কেউই ফারসী ভাষা জানতো না। সে সময়ে ব্রাহ্মসমাজ সিদ্ধান্ত নেয়, তারা সমস্ত ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে সর্বধর্ম সমন্বয় করবে। তখন বাজারে ফারসী ও উর্দু ভাষায় পবিত্র কুরআন শরীফ উনার অনুবাদ প্রচলিত ছিলো, যে ভাষাগুলো মুসলমানরা পড়তে জানলেও হিন্দুরা পড়তে জানতো না। ফলে ব্রাহ্মসমাজের নেতা কেশবচন্দ্র সেন গিরিশচন্দ্রকে দায়িত্ব দেয় পবিত্র কুরআন শরীফ উনার বাংলা অনুবাদ করার। এ প্রসঙ্গে ‘দৈনিক কালের কণ্ঠ’-তে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে-
“প্রশ্ন উঠতে পারে, ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী গিরিশচন্দ্র সেন কেন পবিত্র কুরআন শরীফ বঙ্গানুবাদে হাত দিয়েছিল? এর পেছনে আছে কেশবচন্দ্র সেনের সব ধর্মের সমন্বয়সাধনের চেষ্টা। কিন্তু সমন্বয় করতে হলে তো আগে সেই ধর্মগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। তাই সারকথা জানার জন্য প্রধান চারটি ধর্ম ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টধর্মের মূলগ্রন্থগুলো বাংলায় অনুবাদের জন্য চারজন ব্রাহ্মপ-িতকে দায়িত্ব দেয় ব্রাহ্মধর্মের নববিধানম-লীর প্রতিষ্ঠাতা কেশবচন্দ্র সেন। আগে থেকেই ফারসি জানতো বলে পবিত্র কুরআন শরীফ অনুবাদের দায়িত্ব পেলো গিরিশচন্দ্র সেন।
বড় কঠিন কাজ। পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ পড়ে বঙ্গানুবাদ করার জন্য প্রয়োজন গভীর আরবী জ্ঞান। সত্য বটে, সে ফারসি জানে। ফারসি চর্চা তার পুরুষানুক্রমিক ধারা। কিন্তু ‘গভীর’ দূরে থাকুক, আরবি ভাষা একেবারেই জানতো না সে। আর যেটুকু দ্বীন ইসলাম ও ফারসি ভাষা গিরিশচন্দ্র জানে তা তার নিজের বিচারে ‘পল্লবগ্রাহিনী’ বিদ্যা; কোনো শাস্ত্র ও ভাষায় গভীর জ্ঞান তার নেই। তখন তার বয়স ৪২ বছর। এ বয়সে কি আরবির মতো দুরূহ ও অপরিচিত ভাষা শিক্ষা করে তাতে গভীর জ্ঞান অর্জন করে পবিত্র কুরআন শরীফ বাংলায় অনুবাদ করা তার পক্ষে সম্ভব? কিন্তু কেশবচন্দ্রের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় সেই দুরূহ কাজেই নেমে পড়লো সে।
“মোসলমান জাতির মূলধর্মশাস্ত্র কোরান পাঠ করিয়া ইসলাম ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব অবগত হইবার জন্য… আরব্য ভাষার চর্চা করিতে” ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে লখনৌ শহরে পাড়ি দিলো গিরিশচন্দ্র। আরবি ভাষা শিক্ষা করতে শহরের ব্রাহ্মসমাজের যথোচিত সহায়তা পেয়েছিলো সে। মৌলবি সাহেবের বেতন এবং তার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা সমাজ থেকেই করা হয়েছিল। তার শিক্ষক ছিলেন ‘সুবিজ্ঞ বৃদ্ধ’ মৌলবি এহসান আলী।
এরপর কলকাতায় একজন মৌলবির কাছে কিছুদিন আরবি ভাষা শিখে ঢাকায় চলে আসে গিরিশচন্দ্র। নলগোলার মৌলবি আলীমুদ্দীনের কাছে আরবি ইতিহাস ও সাহিত্য চর্চা শুরু করে। এ সময়েই তার পবিত্র কুরআন শরীফ পাঠের আকাঙ্খা হয়। জানতো কোনো মুসলমান কুরআন শরীফ বিক্রেতা তার কাছে পবিত্র এই ধর্মপুস্তক বিক্রি করবে না। তাই ‘ঢাকা নগরস্থ সমবিশ্বাসী বন্ধু’ মিঞা জামালউদ্দিনের মাধ্যমে একখানা পবিত্র কুরআন শরীফ কেনে। গিরিশচন্দ্র লেখে, ‘আমি তফসির ও অনুবাদের সাহায্যে পড়িতে আরম্ভ করি। যখন তফসিরাদির সাহায্যে আয়াত সকলের প্রকৃত অর্থ কিছু বুঝিতে পারিলাম, তখন তাহা অনুবাদ করিতে প্রবৃত্ত হইলাম।’ উর্দু ভাষায় পারদর্শী ছিলো বলে সে হযরত শাহ আব্দুল কাদের মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও শাহ রফিউদ্দীন মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের উর্দু তরজমা থেকে সাহায্য নিতে সক্ষম হয়। অনুবাদকালে গিরিশচন্দ্র যশোরের মৌলবি আলতাফউদ্দীনের কাছ থেকেও পরামর্শ নিয়েছিলো।” (তথ্যসূত্র: দৈনিক কালের কণ্ঠ এর গত ১৩ই আগস্ট ২০১০ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রকাশিত ‘ভাই গিরিশচন্দ্র সেন’ নামক প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃত)
অর্থাৎ এটুকু পড়ে পাঠকেরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, গিরিশচন্দ্রের পবিত্র কুরআন শরীফ অনুবাদ করাটা আসলে তৎকালীন মুসলমানদের শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞানগরিমারই প্রমাণ। কারণ পবিত্র কুরআন শরীফ অনুবাদ করতে গিয়ে গিরিশচন্দ্র যেসব শিক্ষকের শরণাপন্ন হয়েছিলো, তাদের সবাই ছিলেন মুসলমান। তার উপর অধিকাংশ শিক্ষকই আবার বাংলাদেশের। কেউ ছিলেন ঢাকার, কেউ কলকাতার, কেউ যশোরের। বাংলাভাষী মুসলমানদের কাছ থেকেই গিরিশচন্দ্র আরবী ভাষা শিক্ষা করে পবিত্র কুরআন শরীফ পড়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিলো।
অনেকের ধারণা, গিরিশচন্দ্র বোধহয় সরাসরি আরবী থেকে পবিত্র কুরআন শরীফ বাংলায় অনুবাদ করেছে। কিন্তু গিরিশচন্দ্রের নিজের আত্মজীবনী থেকেই প্রমাণিত হয় যে, এ ধারণাটিও অতিরঞ্জিত। ‘কালের কণ্ঠ’ তে প্রকাশিত উপরোক্ত প্রবন্ধ অনুযায়ী, গিরিশচন্দ্র শুরুর দিকে আরবী ভাষার কিছুই জানতো না। মুসলিম শাসনামলে যেসব হিন্দু পরিবারে অল্পসল্প ফারসী ভাষার চর্চা হতো মুসলমান শাসিত প্রশাসনে কেরানীগিরি করার জন্য, সেরকম একটি পরিবারেরই সদস্য ছিলো গিরিশচন্দ্র। পারিবারিকভাবে সে অল্পসল্প ফারসি ও উর্দু ভাষা জানতো, তবে আরবী ভাষার কোন জ্ঞান তার ছিলো না।
গিরিশচন্দ্র মূলত পবিত্র কুরআন শরীফ উনার অনুবাদ করে হযরত শাহ রফীউদ্দীন মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত শাহ আবদুল কাদের মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের উর্দু তরজমার সাহায্যে। আমরা জানি, ভাষাগত দিক দিয়ে উর্দু ও বাংলা প্রায় কাছাকাছি। উর্দু থেকে বাংলায় অনুবাদ করাটা কোন কঠিন কাজ নয়।
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার উপরোক্ত দুজন উর্দু অনুবাদক হযরত শাহ রফীউদ্দীন মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত শাহ আবদুল কাদের মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি, উনারা দুজনেই ছিলেন পাক ভারত উপমহাদেশের প্রথম পবিত্র কুরআন শরীফ অনুবাদকারী হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার আওলাদ। আমরা শুরুতে আলোচনা করেছি, তৎকালীন সময়ে বাংলা ও পাক ভারত উপমহাদেশের সমস্ত শিক্ষিত মুসলমানগণই ফারসী ভাষা জানতেন। সে কারণেই হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সর্বপ্রথম ফারসী ভাষায় পবিত্র কুরআন শরীফ উনার তরজমা প্রকাশ করেছিলেন, যেন ভারতবর্ষের সর্বস্তরের মুসলমানগণ পবিত্র কুরআন শরীফ উনার অর্থ বুঝতে পারেন। উনার ফারসী তরজমা অনুসরণ করেই উনার উপরোক্ত দুজন সুযোগ্য আওলাদ পরবর্তীতে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার উর্দু ভাষার তরজমা প্রকাশ করেছিলেন।
তবে শুধু ফারসী-উর্দু নয়, বাংলা ভাষায় পবিত্র কুরআন শরীফ উনার সর্বপ্রথম অনুবাদটির কৃতিত্বও মুসলমানদেরই। রংপুর নিবাসী মৌলভী আমীরউদ্দীন বসুনিয়া সর্বপ্রথম পবিত্র আমপারা শরীফ উনার বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন। তাঁর সম্পর্কে বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি আবদুল কাদির লিখেছেন-
“রংপুর জেলার মটুকপুরের আমীরউদ্দিন বসুনিয়া বাংলা ভাষায় আমপারা শরীফের প্রথম অনুবাদ করেন। তাঁহার বইখানি সম্বন্ধে ১৩১৫ সালে রংপুর সাহিত্য পরিষদ পত্রিকার তৃতীয় ভাগ ১২০ পৃষ্ঠায় বলা হয়, এই বইখানি সেকালের কোনো লিথো প্রেসে মুদ্রিত। আকার ডিমাই ১২ পেজি- ১৬৮ পৃষ্ঠা। ইহা এখন দুষ্প্রাপ্য। ‘বাসনা’ সম্পাদক কাকিনা নিবাসী ফজলল করিম (১৮৮০-১৯৩৮) সাহেব একখ- অনেক চেষ্টায় সংগ্রহ করিয়াছেন। অনেকের ধারণা যে গিরিশচন্দ্র সেনের অনেক আগে আমীর উদ্দীন বসুনিয়ার অনুবাদ প্রকাশিত হয়ে ছিল। উহা সংগ্রহ করা অত্যাবশ্যক; তাহা হইলে উহার প্রকাশকাল সঠিকভাবে নির্ধারণ সম্ভব হইবে।”
প্রকৃতপক্ষে, বাংলাভাষী মুসলমানগণ গিরিশচন্দ্রের বহু আগে থেকেই পবিত্র কুরআন শরীফ উনার অনুবাদ ও অর্থের সাথে পরিচিত ছিলেন। এখনকার দিনের মুসলমানদের হয়তো তৎকালীন পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুধাবন করতে কষ্ট হবে। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের মুসলমানদের দৈনন্দিন কথাবার্তার ভাষা ছিলো বাংলা, কিন্তু পড়াশোনা ও বিদ্যালয়ে পাঠদানের ভাষা ছিলো আরবী, ফারসী এবং উর্দু। বাংলা ছিলো মাতৃভাষা, ফারসী ছিলো মানভাষা।
এধরনের নিয়ম বাংলাদেশে এখন আর চালু নেই, কারণ বাংলাদেশ আজ আলাদা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। তবে পার্শ্ববর্তী ভারতে এই নিয়ম এখনো চালু রয়েছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত, কিন্তু তাদের মানভাষা হলো হিন্দি। ভারতে যার মাতৃভাষা তামিল বা তেলেগু, সেও হিন্দি ভাষা জানে।
আমাদের অধিকাংশের ধারণা, পাকিস্তানের জনগণের মাতৃভাষা হলো উর্দু। কিন্তু এই ধারণাটি সম্পূর্ণই ভুল। বাস্তবতা হলো, পাকিস্তানের মাত্র ৮ শতাংশ জনগণের মাতৃভাষা হলো উর্দু, যারা ভারত থেকে মুহাজির হিসেবে পাকিস্তানে গিয়েছে। পাকিস্তানের মূল স্থানীয় জনগণের মধ্যে পাঞ্জাবীদের জনগণের মাতৃভাষা হলো পাঞ্জাবী, পাঠানদের পশতু, বেলুচিদের বেলুচ ভাষা। কিন্তু তারা সবাই উর্দু ভাষা জানে, উর্দু তাদের নিকট কোন বিদেশী ভাষা নয়।
ঠিক সেভাবেই যখন মুসলিম শাসনামলে গোটা ভারতবর্ষ এক ছিলো, তখন বাংলাভাষী মুসলমানদের নিকট ফারসী ও উর্দু কোনো বিদেশী ভাষা ছিলো না। ব্রিটিশ আমলেও পরিস্থিতি একইরূপ ছিলো। বিপরীতে ফারসী-উর্দু ভাষায় অজ্ঞ হিন্দুসমাজে বাংলা তরজমার চাহিদা ছিলো, তাই গিরিশচন্দ্র তা অনুবাদ করার সাথে সাথেই তাকে ‘সর্বপ্রথম পবিত্র কুরআন শরীফ অনুবাদক’ বলে মিডিয়াতে মিথ্যা প্রচার করা হয়েছে। সাথে সাথে আরও মিথ্যা প্রচার করা হয়েছে, বাংলাভাষী মুসলমানরা নাকি অশিক্ষিত ছিলো। নাউযুবিল্লাহ! বাংলাভাষী মুসলমানরা নাকি আরবী জানতো না বিধায় তারা পবিত্র কুরআন শরীফ উনার অনুবাদ করতে পারেনি। নাউযুবিল্লাহ!
অথচ বাস্তবতা হলো, বাজারে প্রচলিত ফারসী ও উর্দু ভাষার তরজমাসমূহ আলাদা করে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করার কোনো দরকারই তখন এদেশের মুসলমানদের ছিলো না। যেভাবে এই লেখার শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে, এদেশের ভার্সিটিগুলোতে পড়ানো হয় এমন অনেক ইংরেজি বই যার কোনো বাংলা অনুবাদ নেই। কিন্তু তা বলে ভার্সিটির বাংলাভাষী ছাত্র ও অধ্যাপকেরা মূর্খ হয়ে বসে নেই।
উর্দু-ফারসী ভাষার জ্ঞান ছিলো না হিন্দুদের। তারা ভাষাজ্ঞানহীন ছিলো বলেই যখন মুসলমানরা ব্যাপকভাবে ফারসী-উর্দু জানতো, তখন হিন্দুরা সেসব ভাষা জানতো না বিধায় তাদের জন্য আলাদা করে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করার প্রয়োজন হয়েছিলো।

Views All Time
2
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+