চাঁদ দেখতে আধুনিক যন্ত্র কিনবে সরকার, এটি একটি লোক দেখানো বাগাড়ম্বরপূর্ণ সিদ্ধান্ত!


এবার ঈদুল ফিতরের আগে অর্থাৎ শাওওয়াল মাসের চাঁদ দেখা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় নাকি এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

বিগত বহু বছর ধরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাঁদ দেখা কমিটি যে চাঁদের সিদ্ধান্ত দিয়ে আসছে তার অধিকাংশই সঠিক ছিল । বিচ্ছিন্ন যে কয়টি রিপোর্টে অসঙ্গতি ছিল তা পর্যবেক্ষক বা ওয়াচারের দুর্বলতার কারণে । তাহলে হঠাত করেই এখন কেন সমস্যা দেখা দিচ্ছে? এর কারণ কি আসলেই উন্নত প্রযুক্তির অভাব নাকি অন্য কিছু? একটু তলিয়ে দেখা যাক।

প্রথমত একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলতে হয় সম্মানিত শরীয়তে চাঁদ দেখার জন্য খালি চোখই যথেস্ট। উন্নত প্রযুক্তির বিষয়টি আপেক্ষিক। আপনি এখন যে টেলিস্কোপ দিয়ে দেখবেন আগে এত উন্নত মানের ছিল না আবার এখন যা পাওয়া যাচ্ছে তারচেয়েও আধুনিক যন্ত্র ও প্রযুক্তি সামনে আসবে। তাহলে কোন যন্ত্র দিয়ে কতটা ম্যাগনিফাই করে দেখলে তা গ্রহনযোগ্য হবে সে বিষয়গুলোতে বিতর্ক এসে যাবে। যেমন গবেষণার জন্য মুন সাইটিং এস্ট্রোনমারগন সিসিডি ইমেজিং সিস্টেম পদ্ধতি ব্যবহার করে অমাবস্যার চাঁদকে ফোটন পদ্ধতিতে ধারণ করে কিন্তু এই দেখা কখনোই আরবী মাস শুরুর জন্য গ্রহনযোগ্য নয়। কেননা খালি চোখে চাঁদ দেখে আরবী মাস শুরু করা শর্ত এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনও এই নীতির উপর অবিচল থেকেই কাজ করে যাচ্ছেন।

সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আধুনিক থিওডোলাইড টেলিস্কোপ ব্যবহার করবে অথচ বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের এই যন্ত্র আছে অনেক আগে থেকেই এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাঁদ দেখা কমিটিতে আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রতিনিধি উপস্থিত থেকে তারা নিবিড়ভাবে সাহায্য করে থাকেন । তাহলে টেলিস্কোপের অভাবেই যদি চাঁদের তারিখের সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হয় সেক্ষেত্রেতো আবহাওয়া অফিসই রয়েছে।

পবিত্র শাবান মাসে শবে বরাতের তারিখ ঘোষণার ক্ষেত্রে এবং শাওওয়াল মাসে ঈদুল ফিতরের তারিখ ঘোষনার ক্ষেত্রে যে সমস্যা হয়েছে তার মুল কারণ একই জায়গাতেই সীমাবদ্ধ। ১) চাঁদ খোঁজার ব্যাপারে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষকগণের ধারণা নেই কত সময় পর্যন্ত চাঁদ আকাশে থাকে এবং কোন এলাকার জন্য তা কত সময়ব্যাপী চাঁদ খুঁজতে হয় ২) আর যারা চাঁদ দেখেছেন (যেমন মাজলিসু রুইয়াতিল হিলালের সদস্যগণ অভিজ্ঞ হওয়াতে শাবান ও শাওওয়াল মাস উভয় সময়ই চাঁদ দেখেছেন) তাদের চাঁদ দেখার রিপোর্টকে “বিচ্ছিন্নভাবে ভাবে পাওয়া” “ ডিসির অফিস বা ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রাপ্ত নয়” ইত্যাদি বলে আমলে নিতে গড়িমসি করা। কেবল শাওওয়াল মাসের চাঁদ দেখারই উদাহরণ দিচ্ছি। যখন জানা গেলো দেশের অধিকাংশ এলাকাই মেঘাচ্ছন্ন এবং কোথাও কোথাও বৃষ্টিপাতও হচ্ছে কেবল উত্তরবঙ্গ ছাড়া। তখন সেই এলাকার মাজলিসু রুইয়াতিল হিলালের প্রতিনিধিদের সতর্ক করে দেয়া হয় ভালভাবে চাঁদ খোঁজার জন্য। আর এক্ষেত্রে ঊত্তরবঙ্গে চাঁদ যেহেতু ঢাকার সময়ের চেয়ে আরও একটু দেরীতে চাঁদ অস্ত যাওয়ার কথা ছিল তাই সেখানে কত সময় ধরে চাঁদ দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে তা বলে দেয়া হয়। সেদিন অর্থাৎ ৪ ঠা জুন চাঁদ আকাশে ছিল সূর্য অস্ত যাবার পর প্রায় ৫৮ মিনিট অর্থাৎ প্রায় ১ ঘণ্টা । এখন যাদের ধারণা মাগরিবের পর কেবল চাঁদ দেখা যায় তারা ৩০ মিনিট অপেক্ষা করলেই মনে করেন অনেকসময় ধরে অপেক্ষা করেছি এবং চাঁদ না দেখেই চাঁদ দেখার স্থান ত্যাগ করেন। এ কারনে অনেক অনভিজ্ঞ প্রতিনিধিগণ চাঁদ দেখতে পান না । ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কোন পর্যবেক্ষক এমনকি নীতি নির্ধারকদেরও এই বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা নেই, ট্রেনিং নেই। যেমন বারবার একটি বিষয় বলা হচ্ছে “চাঁদ দেখার বিষয়টি যেহেতু শরীয়তের বিষয় তাই ৪০-৪৫ জন অলেমের পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছে”। চাঁদ দেখার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ৪০-৪৫ জন্য আলেমের কখনোই প্রয়োজন নেই আর তাদের প্রয়োজনের বিষয়টি বারবার উল্লেখের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট লোকজনের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। সাধারনভাবে চাঁদ দেখার জন্য দুজন মুসলমান পুরুষের সাক্ষ্যই যথেস্ট আর সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য কমিটিই রয়েছে। নাকি যারা চাঁদের খবর পরিবেশন করেন তাদের ম্যাডিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে চান যে তারা আদৌ সুন্নতি খতনার মাধ্যমে মুসলমান হয়েছে কিনা।? নতুবা পূর্বে যেখানে পত্রিকায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফোন নাম্বার দিয়ে জনগণকে চাঁদ দেখার সংবাদ পরিবেশন করার সুযোগ করে দেয়া হত এখন সেক্ষেত্রে নানারূপ শর্ত প্রয়োগ করা হচ্ছে। যেমন ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধির মাধ্যমে আসতে হবে বা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে আসতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক জেলায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বী জেলা প্রশাসক রয়েছেন তাদের পাঠানো সংবাদ কি তবে গ্রহন করা হবে??? উল্লেখ্য এখনও সউদি আরবের চাঁদ দেখা বিষয়ক মন্ত্রানালয় থেকে চাঁদের খবর পরিবেশন করার জন্য সউদী প্রেস এজেন্সীর মাধ্যমে জনগণের উদ্দেশ্যে প্রেস রিলিজ দেয়া হয়। তাহলে মাজলিসু রুইয়াতিল হিলাল একটি আন্তর্জাতিক চাঁদ দেখা কমিটি যেখানে বিভিন্ন দেশের মুন সাইটিং এস্ট্রোনমার ও প্রতিনিধি রয়েছে, যাদের পর্যবেক্ষকগণের বিশেষ প্রশিক্ষণও আছে এবং তারা ধর্মপরায়ণ মুসলমান তাদের রিপোর্ট সময়মত আমলে নিলেই এই বিড়ম্বনা থেকে বাঁচা যেত। শাওওয়াল মাসের চাঁদের রিপোর্ট কুড়িগ্রাম জেলার প্রশাসককে জানানো হয় চাঁদ দেখার পরপরই এবং চাঁদ প্রথম দৃশ্যমান হয় ৭টা ১৮ মিনিটে এবং ইফাতে ইমেইল করে পাঠানো হয় রাত ৮ টার আগেই। তারপরেও কেন রাত ১১ টায় জাতিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সিদ্ধান্ত দিতে হয় এটি সত্যি অবাক হবার মত একটি বিষয়।

#আল্লামা_আবুল_বাশার_মুহম্মদ_রুহুল_হাসান
(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

বিশিষ্ট চাঁদ গবেষক ও সভাপতি
(আন্তর্জাতিক মাজলিসু রুইয়াতিল হিলাল)

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে