চাঁদ দেখা ও আরবী মাসের তারিখ ঘোষণা নিয়ে ষড়যন্ত্রের নেপথ্য কথা!


পবিত্র হাদীছ শরীফ মুতাবিক প্রতি মাসেই ২৯তম দিন শেষে আকাশে খালি চোখে চাঁদ দেখে মাস শুরু করতে হয়। কিন্তু অনেক নামধারী মুসলিম দেশ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার অনুসরণ না করে মনগড়াভাবে চাঁদের তারিখ ঘোষণা করছে।
গভীরভাবে তলিয়ে দেখার পর জানা গেল- এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্য হোতা হচ্ছে সউদী ওহাবী ইহুদী সরকার। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার অনুসরণ বাদ দিয়ে গুমরাহ সরকারগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে আরবী মাস উনার তারিখ ঘোষণা করছে। নাঊযুবিল্লাহ! ধারাবাহিকভাবে সেই ষড়যন্ত্রের ইতিহাস পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে ইনশাআল্লাহ।
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার অনুসরণ না করে অর্থাৎ খালি চোখে চাঁদ দেখার চেষ্টা না করে সউদী ওহাবী ইহুদী সরকার এ পর্যন্ত ৪টি মনগড়া পদ্ধতি অবলম্বন করেছে-
১) প্রথম মনগড়া পদ্ধতি (১৯৫০-১৯৭২ ঈসায়ী): সূর্যাস্তের সময় চাঁদ দিগন্তরেখার ৯ডিগ্রী উপরে অবস্থান করলে মাস শুরু করতো। নাঊযুবিল্লাহ! অথচ সূর্যাস্তের সময় চাঁদ দিগন্তরেখার ৯ডিগ্রী উপরে অবস্থান করলেই আরবী মাস শুরু করা যায় না। চাঁদ শুধু ৯ডিগ্রী নয়; তারচেয়ে বেশি উচ্চতায় থাকলেও দৃশ্যমান নাও হতে পারে। সম্মানিত শরীয়ত অনুযায়ী চাঁদ তালাশ করতে হবে এবং মাস শুরু করার জন্য খালি চোখে চাঁদ দেখতে হবে।
২) দ্বিতীয় মনগড়া পদ্ধতি (১৯৭৩-১৯৯৮ ঈসায়ী): মধ্য রাতের পূর্বে অমাবস্যা সংঘটিত হলে পরের দিন থেকে নতুন মাস শুরু করতো। আবার সূর্যাস্তের সময় চাঁদের বয়স ১২ ঘণ্টার বেশি হলে নতুন মাস শুরু করতো। নাঊযুবিল্লাহ! অথচ মহাকাশ বিজ্ঞানের তথ্যানুযায়ী ২৯তম দিন শেষে চাঁদ দেখতে পাওয়ার সর্বনিম্ন বয়স হলো ১৭ ঘন্টা থেকে ২৩ ঘণ্টা, এর পূর্বে চাঁদ খালি চোখে দেখা যাওয়ার আকৃতিতে আসে না।
৩) তৃতীয় মনগড়া পদ্ধতি (১৯৯৮/৯৯-২০০১ ঈসায়ী): সূর্যাস্তের ১ মিনিট পরেও চন্দ্র অস্ত গেলে নতুন মাস শুরু করতো। নাঊযুবিল্লাহ! অথচ সূর্যাস্তের পরে অমাবস্যার চাঁদও অস্ত যেতে পারে, তখন কোনভাবেই নতুন মাস শুরু হতে পারে না। আর যদি নতুন চাঁদও অস্ত যায়, সে সময় উক্ত চাঁদ খালি চোখে দেখা যাওয়ার আকৃতিতে আসতে পারে না, ফলে নতুন মাস কোনভাবেই গণনা সম্ভব নয়।
৪) চতুর্থ মনগড়া পদ্ধতি (২০০৩ ঈসায়ী-বর্তমান সময় পর্যন্ত): যদি সূর্যাস্তের পর চন্দ্র অস্ত যায় এবং সূর্যাস্তের পূর্বে অমাবস্যা সংঘটিত হয়, তবে পরের দিন থেকে নতুন মাস শুরু করে। নাঊযুবিল্লাহ!
চাঁদ যদি সূর্যাস্তের পর অস্ত যায় এবং অমাবস্যা যদি সূর্যাস্তের পূর্বেই সংঘটিত হয়, তারপরও চাঁদ খালি চোখে দেখা যাওয়ার আকৃতিতে আসতে পারে না। কেননা উপরের কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করেই আরবী মাস শুরু করা সম্মানিত শরীয়ত উনার নির্দেশ নয় বরং সম্মানিত শরীয়ত অনুযায়ী চাঁদ খালি চোখে দেখে মাস শুরু করতে হবে।
সমাজে তিন শ্রেণীর লোক দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। এক শ্রেণীর লোক স্বাভাবিকভাবেই উপরোক্ত আলোচনা বিশ্বাস করবেন, যাদের পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার জ্ঞান আছে এবং যারা সউদী ওহাবী ইহুদীদের অন্যান্য অপকর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত আছেন। অন্য এক শ্রেণীর লোক আছে, যারা উপরোক্ত আলোচনা বিশ্বাস করার জন্য দলীল খুঁজবে। অর্থাৎ উপরোক্ত আলোচনার সত্যতার প্রমাণ খুঁজবে। আরেক গ-মূর্খ শ্রেণী রয়েছে, যারা বলবে সউদী আরব কি কম বুঝে? সেখানে কি আলিম-উলামা নেই, মহাকাশ বিজ্ঞানী নেই? এই শ্রেণী সউদী ওহাবী ইহুদী সরকারের অপকর্মগুলোকে নানা ভ্রান্ত যুক্তি দাঁড় করিয়ে হলেও বিশ্বাস করতে চায়।
দ্বিতীয় মনগড়া পদ্ধতিতে মাস গণনার প্রমাণ: অনেকেই মনে করে থাকে যে, সউদী ওহাবী ইহুদী সরকার হয়তো চাঁদ দেখে আরবী মাস শুরু করে, আসলে তা নয়। বিগত বছরগুলোতে মহাকাশ বিজ্ঞানীসহ সাধারণ মানুষের কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, যদি খালি চোখে চাঁদ দেখে আরবী মাস শুরু করাকে বিবেচনায় আনা হয়, তাহলে সউদী সরকার সঠিক তারিখে আরবী মাস শুরু করেনি।

তৃতীয় মনগড়া পদ্ধতিতে মাস গণনার প্রমাণ: সাধারণত অমাবস্যার পর নতুন চাঁদের জন্ম হয়। সেই নতুন চাঁদ যখন পশ্চিমাকাশে খালি চোখে দেখা যায়, তখন নতুন আরবী মাস গণনা শুরু হয় আর চাঁদ দেখা না গেলে পুরানো মাস ত্রিশ দিনে গণনা করা হয়।
সউদী ওহাবী ইহুদী সরকার ১৯৯৯ সাল থেকে আরবী মাস গণনার ক্ষেত্রে তৃতীয় মনগড়া নিয়ম চালু করে, যা ২০০১ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল। এই মনগড়া নিয়মে বলা হয়- মাসের ২৯তম দিনে যদি পবিত্র মক্কা শরীফ উনার আকাশে সূর্যাস্তের পরে চাঁদ অস্ত যায়, তবেই নতুন মাস শুরু হবে। এই নতুন মনগড়া নিয়মেও খালি চোখে চাঁদ দেখে মাস শুরু করাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। আর মহাকাশ বিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদ অমাবস্যাতে পৌঁছানোর পূর্বেও এমন হতে পারে যে সূর্যাস্তের পরেই চাঁদ অস্ত যাবে। অর্থাৎ শুধু সূর্যাস্তের পরে চাঁদ অস্ত যাওয়ার বিষয় বিবেচনা করে মাস শুরু করা অর্থহীন।
সউদী ওহাবী ইহুদী সরকার কর্তৃক দ্বিতীয় মনগড়া পদ্ধতি রহিত করে তৃতীয় মনগড়া পদ্ধতি চালু করার কারণে তাদের নিজেদের ক্যালেন্ডারেই দুই রকম তারিখ পরিলক্ষিত হয়। ১৯৯৯ সালে যখন তৃতীয় মনগড়া পদ্ধতি চালু করে, তখন তাদের পূর্ববর্তী অর্থাৎ দ্বিতীয় মনগড়া পদ্ধতিতে রচিত (যা ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত অনুসরণ করা হয়েছে) ক্যালেন্ডারে ১৪২ডিগ্রী হিজরী সনের পবিত্র রমাদ্বান শরীফ মাস উনার পহেলা তারিখ উল্লেখ আছে ৮ ডিসেম্বর। আর নতুন নিয়মে বা তৃতীয় মনগড়া পদ্ধতিতে রচিত (যা ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত অনুসরণ করা হয়েছে) ক্যালেন্ডারে ১৪২ডিগ্রী হিজরী সনের পবিত্র রমাদ্বান শরীফ মাস উনার পহেলা তারিখ উল্লেখ আছে ৯ ডিসেম্বর।
চতুর্থ মনগড়া পদ্ধতিতে মাস গণনার প্রমাণ: ২০০৩ ঈসায়ী (১৪২৩ হিজরী) থেকে সউদী ওহাবী ইহুদী সরকার নতুন বানানো একটি নিয়মে অর্থাৎ চতুর্থ মনগড়া পদ্ধতিতে আরবী মাস গণনা করে যাচ্ছে।
তাদের উম্মুল কুরার প্রশাসনিক ওয়েব সাইটে পদ্ধতিটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে যে-
১. যদি সূর্যাস্তের পূর্বে জিওসেন্ট্রিক অমাবস্যা সংঘটিত হয়,
২. আর সূর্যাস্তের পর চন্দ্রাস্ত হয়,
তাহলে পরের দিন থেকে নতুন মাসের প্রথম দিন শুরু হবে।
লক্ষ্যণীয় যে, এ পদ্ধতিতেও খালি চোখে চাঁদ দেখাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, সউদী ওহাবী ইহুদী সরকারের চাঁদ নিয়ে ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সমাজে তিন শ্রেণীর লোক পরিলক্ষিত হয়। এক শ্রেণীর লোক যাদের চাঁদ বিষয়ক পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার জ্ঞান রয়েছে এবং সউদী ওহাবী ইহুদীদের অন্যান্য অপকর্ম সম্পর্কে উনারা জ্ঞাত আছেন। দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করায় স্বাভাবিকভাবেই উনাদের বিশ্বাস আরো দৃঢ় হবে আশা করা যায়।
দ্বিতীয় শ্রেণীর যারা দলীল-প্রমাণ তলব করে থাকে তাদের জন্য যথেষ্ট দলীল-প্রমাণ ইতোমধ্যে উপস্থাপিত হয়েছে এবং সামনে আরো হবে।
তৃতীয় শ্রেণী যারা চিন্তা-ভাবনা করে থাকে যে, সউদী সরকার কি কম বুঝে? সেখানে কি আলিম-উলামা নেই, মহাকাশ বিজ্ঞানী নেই? তাদের জ্ঞাতার্থে বলতে হয়- উপরোক্ত তথ্যগুলো সউদী ওহাবী ইহুদী সরকারের মহাকাশ বিজ্ঞানীদের পক্ষ থেকেই এসেছে। আর পবিত্র কুরআন শরীফ-পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের খিলাফ করে কোনো নামধারী আলিম-উলামার মনগড়া ফতওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার নাম দিয়ে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোন কাজ করলেই তা ইসলামী কাজ বা সম্মানিত শরীয়ত সমর্থিত কাজ হয়না। সম্মানিত শরীয়ত উনার জায়িয কাজগুলোর পেছনে থাকে পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের সমর্থন। আর যখন কোন ব্যক্তি বা কোন কর্তৃপক্ষের কাজ সম্মানিত শরীয়ত উনার সমর্থন হারায় অর্থাৎ সম্মানিত শরীয়ত উনার আলোকে জায়িয প্রমাণিত হয় না, তখন অবশ্যই বলতে হবে যে, তার বা তাদের কাজগুলো নফস্ বা কুপ্রবৃত্তি দ্বারা প্ররোচিত এবং কোন উদ্দেশ্য নিয়ে সংঘটিত। সেখানে মহান আল্লাহ পাক উনার এবং মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টি মুবারক নেই বরং রয়েছে ইবলীস ও তার সহযোগি ইহুদী-নাছারাদের মনতুষ্টি।
সুতরাং সম্মানিত শরীয়ত অনুযায়ী খালি চোখে চাঁদ দেখে আরবী মাস শুরু করা শর্তকে উপেক্ষা করে গুমরাহ সরকার যত পদ্ধতিই তৈরি করুক না কেন, সে অনুযায়ী আরবী মাস শুরু করলে মুসলমানদের পবিত্র হজ্জ, রোযাসহ সম্মানিত শরীয়ত উনার অনেক আমল বরবাদ হয়ে যাবে এবং যাচ্ছে। আর উক্ত মনগড়া নিয়মে আরবী মাস গণনা করায় সে দেশসহ অনুসারী সবার সমস্ত আমল নষ্টের দায়-দায়িত্ব গুমরাহ সরকারকেই নিতে হবে।

প্রত্যেক মাসে চাঁদ তালাশ করা ওয়াজিবে ক্বিফায়া

মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-
يَسْئَلُوْنَكَ عَنِ الْاَهِلَّـةِ ۖ قُلْ هِـىَ مَوَاقِيْتُ لِلنَّاسِ وَالْـحَـجِ ۗ
অর্থ : “ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার নিকট মানুষেরা চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে, আপনি জানিয়ে দিন, এটা হচ্ছে মানুষের জন্য ইবাদত উনার সময় নির্ধারক এবং সম্মানিত হজ্জ উনার সময় ঠিক করার মাধ্যম।” (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১৮৯)
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে স্পষ্টভাবে বাঁকা চাঁদকে সময় নির্ধারণ করার মাধ্যম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অমাবস্যার চাঁদ, জোছনার চাঁদ, অর্ধ চন্দ্র, সূর্যাস্তের কিছু পূর্বে ডুবে যাওয়া চাঁদ, নির্দিষ্ট বয়সের চাঁদ এসবের উল্লেখ করা হয়নি। অথচ পবিত্র কুরআন শরীফ উনার এই পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মনগড়া ব্যাখ্যা করে আজকাল ইহুদীদের মদদপুষ্ট খারিজী, রাফিজী, সালাফী, ওহাবী গং তাদের বানানো নিয়মে মাস গণনা করে যাচ্ছে। নাঊযুবিল্লাহ!
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ اِبْـنِ عُـمَرَ رَضِىَ اللهُ تَعَالـٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّـمَ اِنَّا اُمَّةٌ اُمِيَّةٌ لَا نَـكْـتُبُ وَلَا نَـحْسِبُ اَلشَّهْرُ هٰكَذَا وَهٰكَذَا وَهٰكَذَا وَعَقَدَ الْاِبْـهَامَ فِى الثَّالِثَةِ ثُـمَّ قَالَ اَلشَّهْرُ هٰكَذَا وَهٰكَذَا وَهٰكَذَا يَعْنِىْ تَـمَامَ الثَّلٰثِـيْـنَ يَعْنِىْ مَرَّةً تِسْعًا وَّعِشْرِيْـنَ وَمَرَّةً ثَلٰثِـيْـنَ.
অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, আমার উম্মত সহজ সরল। উনাদের জন্য মাসের হিসাব রাখা কষ্টকর হবে। তাই মাস হয় এই, এই, এইতে (এই বলে তিনি দুই হাত মুবারক তিনবার দেখালেন) এবং তৃতীয় বারে (এক হাত মুবারকের) বৃদ্ধা আঙ্গুল মুবারক বন্ধ রাখলেন (অর্থাৎ ঊনত্রিশ দিনে)। অতঃপর ইরশাদ মুবারক করলেন, মাস হয় এই, এই ও এইতে অর্থাৎ পূর্ণ ত্রিশ দিনে। অর্থাৎ একবার ঊনত্রিশ দিন আরেকবার ত্রিশ দিন দেখালেন।” (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ)
সুতরাং চন্দ্রমাস বা আরবী মাস ২৯ দিন অথবা ৩০ দিনে হয়ে থাকে। কোন মাসে যদি কোন কারণবশতঃ ২৯তম দিন শেষে সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা না যায় তবে উক্ত মাস ৩০ দিন পূর্ণ করার পর পরবর্তী মাস শুরু হবে।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ اَبِـىْ هُرَيْـرَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالـٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّـمَ صُوْمُوْا لِرُؤْيَتِه وَاَفْطِرُوْا لِرُؤْيَتِه فَاِنْ غُـمَّ عَلْيْكُـمْ فَاَكْـمِلُوْا عِدَّةَ شَعْبَانَ ثَلَاثِـيْـنَ.
অর্থ : “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, তোমরা রোযা রাখ (রমাদ্বান শরীফ উনার) চাঁদ দেখে এবং রোযা ভঙ্গ কর (শাওওয়াল শরীফ উনার) চাঁদ দেখে। যদি (২৯ তারিখ) মেঘ অথবা অন্য কোন কারণে তোমাদের প্রতি চাঁদ দেখা না যায় তবে শা’বান মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করবে।” (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, মিশকাত শরীফ)
প্রতি মাসেই চাঁদ তালাশ করা ওয়াজিবে কিফায়া। প্রতি মাসেই মুসলমান উনাদের জন্য রয়েছে বিশেষ বিশেষ কিছু দিন এবং রাত। আর সে কারণে চাঁদ না দেখে মনগড়া তারিখে আরবী মাস শুরু করা কবীরা গুনাহ। এখানে একটি বিষয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, প্রতি মাসেই চাঁদ তালাশ করা ওয়াজিবে কিফায়া। কিন্তু সঠিক তারিখে মাস শুরু করা ফরয। কেননা সঠিক তারিখে মাস শুরু না হলে অনেক ফরয-ওয়াজিব ইবাদত পালনে ত্রুটি হবে। যেমন পবিত্র রোযা, পবিত্র হজ্জ, পবিত্র ছলাতুল ঈদাইন ইত্যাদি। কাজেই প্রতি মাসে নতুন চাঁদ তালাশ করা সম্মানিত শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে ওয়াজিবে কিফায়া। আর চাঁদ না দেখে মনগড়া তারিখে পবিত্র রোযা শুরু করা ও পবিত্র ঈদ পালন করা কঠিন কবীরা গুনাহ।

“আন্তর্জাতিক রু’ইয়াতে হিলাল মজলিস” গঠনের কারণ এবং গৃহীত কার্যক্রম

চাঁদ দেখে আরবী মাস শুরু করা নিয়ে সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার মধ্যে বেশ কিছু মাসয়ালা-মাসায়িল আলোচনা হয়েছে। তবে সকল আলোচনাই হচ্ছে চাঁদ দেখে আরবী মাস শুরু করা এবং কোন মাসে কতজন দেখলে তা গ্রহণযোগ্য হবে সেসব প্রসঙ্গে। চাঁদের আলোচনায় কোন জটিলতা স্থান পায়নি। এর কারণ চাঁদ দেখে আরবী মাস শুরু করা নিয়ে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে বা কেউ তা পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করতে পারে তা পূর্ববর্তী মানুষের অনুভূতিতেও জন্ম নেয়নি।
কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেলো চাঁদের তারিখ একদিন হের-ফের করলেই মুসলমানদের অনেক আমল যেমন পবিত্র হজ্জ, পবিত্র ঈদ, বিশেষ দিন এবং রাতসমূহ যেমন পবিত্র শবে বরাত শরীফ, পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর শরীফ, পবিত্র লাইলাতুর রগায়িব শরীফ, পবিত্র আখিরী চাহার শোম্বাহ শরীফ, পবিত্র ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ ইত্যাদি মহান দিন এবং রাত্রিগুলোর ফযীলত থেকে বিরত রাখা যায়। সে কারণেই কাফির-মুশরিকরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে কিছু নামধারী মুসলমান মুনাফিক শাসকগোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে সেই বিভ্রান্তি সারা পৃথিবীর মুসলমান দেশসমূহে ছড়িয়ে দিচ্ছে। নাঊযুবিল্লাহ!
পনের শতকের মুজাদ্দিদ, মুজাদ্দিদে আ’যম মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি তাদের ষড়যন্ত্রের এই মুখোশ উন্মোচন এবং সারা বিশ্বের মুসলমান উনাদেরকে সচেতন করার লক্ষ্যে চাঁদ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা, লেখা-লেখি, ওয়াজ-নছীহত এমনকি আন্তর্জাতিক চাঁদ দেখা কমিটি গঠন করেছেন।
পূর্বে মুসলমানদের মধ্যে আরবী মাস গণনার প্রচলন ছিল। ফলে মাস শেষে অর্থাৎ ২৯তম দিনে সচেতনভাবেই চাঁদ দেখে আরবী মাস গণনা করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে যখন হিজরী তারিখ গণনার পরিবর্তে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রচলন হলো তখন চাঁদ দেখার সচেতনতা জনসাধারণ থেকে কমে গেলো। তখন মুসলিম দেশগুলোতে সরকারি তরফ থেকে চাঁদ দেখার কমিটি গঠন করা হলো আরবী তারিখের হিসাব রাখার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ১৯৪৮ সালের পর থেকে এই চাঁদ দেখা কমিটির চাঁদের তারিখ হিসাব রাখার পদ্ধতি এবং কমিটির সদস্যদের মানসিকতার মধ্যে একটি ব্যাপক পরিবর্তন আসলো। এই পরিবর্তনের নেপথ্য নায়ক ইহুদী মদদপুষ্ট সউদী ওহাবী ইহুদী সরকার।
সম্মানিত শরীয়ত উনার মধ্যে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে মাসের ২৯তম তারিখে চাঁদ তালাশ করতে হবে। চাঁদ দেখা না গেলে মাস ৩০ দিনে পূর্ণ করতে হবে। কিন্তু এই সহজ পদ্ধতি বাদ দিয়ে বিভিন্ন মুসলিম দেশে আরবী মাস গণনা শুরু হতে লাগলো বিভিন্ন মনগড়া পদ্ধতি অনুযায়ী।
বিভিন্ন অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ক্রাইটেরিয়া ব্যবহার হতে লাগলো মাস শুরুর ব্যাপারে। সউদী আরব, যে দেশের দিকে তাকিয়ে থাকে সমস্ত মুসলিম বিশ্ব তাদের ক্যালেন্ডার রচনা করার কর্তৃপক্ষ হচ্ছে ‘উম্মুল কুরা’। এই উম্মুল কুরা চাঁদ দেখে আরবী মাস গণনা না করে একটি নিজস্ব পদ্ধতি তৈরি করে নিয়ে সে অনুযায়ী মাস গণনা করে যাচ্ছে। অনেকের পক্ষেই বিষয়টি গ্রহণ করা কঠিন হলেও এটা সত্য সউদী ওহাবী ইহুদী সরকার দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে সঠিক তারিখে মাস গণনা না করার কারণে পবিত্র হজ্জসহ মুসলমানদের অনেক আমল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ প্রতিবাদ করার কেউ নেই।
মুসলিম দেশগুলোতে চাঁদ দেখার সুন্নতী পদ্ধতি বাদ দিয়ে মনগড়া নিয়মে মাস গণনা হচ্ছে। আমাদের দেশেও আরবী মাস শুরু নিয়ে বিভ্রান্তি করার চেষ্টা করে যাচ্ছে বিশেষ একটি গোষ্ঠী। সামগ্রিকভাবে সকল বিষয়গুলো লক্ষ্য রেখে দেশের মুসলমানদের আমলের সুবিধার্থে আরবী মাসের সঠিক তারিখ জানাবার উদ্দেশ্যে এই আন্তর্জাতিক চাঁদ দেখা কমিটি ‘মাজলিসু রুইয়াতিল হিলাল’ গঠন করা হয়েছে। ১৪২৭ হিজরী সনের পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ মাস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রু’ইয়াতে হিলাল মজলিসের কার্যক্রম শুরু হয়। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই মজলিসের কার্যক্রম বিস্তৃত রয়েছে।

রু’ইয়াতে হিলাল মজলিস কৃর্তক গৃহীত কার্যক্রম এখানে তুলে ধরা হলো-
১। রু’ইয়াতে হিলাল মজলিস শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে চাঁদ দেখার প্রতিবেদন সংগ্রহ করে। বাইনোকুলার এবং টেলিস্কোপে চাঁদ দেখার প্রতিবেদন গ্রহণ করা হয় না।
২। দেশের ৬৪টি জেলায় রু’ইয়াতে হিলাল মজলিসের প্রতিনিধি রয়েছেন যারা সম্মানিত শরীয়ত উনার পাবন্দ।
৩। রু’ইয়াতে হিলাল মজলিস বিভিন্নভাবে লেখা এবং ই-মেইলের মাধ্যমে সউদী ওহাবী ইহুদী সরকারকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছে ও করছে।
৪। আন্তর্জাতিক কমিটি হওয়াতে বিদেশী সদস্যদের প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয় এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হয়।
৫। পবিত্র রমাদ্বান শরীফ-এ আলাদা সময় সূচি প্রকাশ করতে সার্বিক সহায়তা প্রদান করে থাকে।
৬। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার দিন-তারিখ বিশ্লেষণ কার্যক্রম নিয়ে থাকে।
৭। মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে চাঁদের উপর বিভিন্ন প্রকাশনা প্রকাশ করা হয়েছে।
৮। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে চাঁদ বিষয়ে পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে।
৯। প্রামাণ্য চিত্রসহ চাঁদ বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে এবং হতে থাকবে।
১৪। বিভিন্ন দেশের সরকারের মাস গণনার পদ্ধতির ত্রুটির উপর প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হয়েছে।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে