চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান!


নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যমীনে অবস্থানের সময় হতে মুসলমানগণ বিশ্বাস করতেন, সকল রোগসমূহের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ পাক তিনি এবং সকল রোগের চিকিৎসাও মহান আল্লাহ পাক তিনি সৃষ্টি করেছেন। যেমন যাদুল মা’আদ কিতাবে এসেছে, “হযরত আবূ হুরাইরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র মদীনা শরীফ উনার মধ্যে অবস্থানরত দুই চিকিৎসককে ডেকে এক রোগীর চিকিৎসা করার জন্য নির্দেশ মুবারক দিলেন। চিকিৎসকদ্বয় আরজ করলেন, হে আল্লাহ পাক উনার রাসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! ইসলাম গ্রহণের পূর্বে জাহেলিয়াতের যুগে আমরা বিভিন্ন রকমের চিকিৎসা করতাম তবে ইসলাম গ্রহণের পর থেকে একমাত্র মহান আল্লাহ পাক উনার উপরই তাওয়াক্কুলই করে এসেছি। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, তোমরা তার চিকিৎসা কর। যিনি খ্বলিক মালিক রব মহান আল্লাহ পাক, যিনি রোগসমূহের সৃষ্টিকারী, তিনি সে সকল রোগের ঔষধও প্রেরণ করেছেন এবং তার মধ্যে নিরাময়ও রেখেছেন”। তখন হতে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন রকমের রোগের চিকিৎসার জন্য ও প্রতিকার ব্যবস্থার উন্নতির জন্য মুসলিমগণ চিকিৎসাবিজ্ঞানের চর্চা শুরু করেন।
চিকিৎসা ব্যবস্থার নীতিশাস্ত্র:
ইসলামী চিকিৎসা বিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অবদান যারা রেখেছেন তাদের মধ্যে বিজ্ঞানী আর-রাজী (হিজরী ২৫১-৩১৩, ঈসায়ী ৮৬৫ -৯২৫) অন্যতম। তিনি মানুষের চিকিৎসাবিধানকে শারীরিক ও আধ্যাতিক দুই ভাগে ভাগ করেছেন। বিজ্ঞানী আর-রাজী সর্বপ্রথম চিকিৎসাবিজ্ঞানের নীতিশাস্ত্রের মডেল প্রনয়ণ করেন। তিনি তাঁর লিখিত কিতাব “আহলাক আল তাবীব” এ চিকিৎসাশাস্ত্রে নৈতিকতার প্রয়োজনীয়তার কথা ব্যাখ্যা করেন। এছাড়াও আলী ইবনে আব্বাস (৩১২-৩৮৪ হিজরী, ৯২৪-৯৯৪ ঈসায়ী) তাঁর “কিতাব আল মালিকি” তে রোগী ও ডাক্তারের সম্পর্ক ও চিকিৎসাব্যবস্থার নীতিগুলো বিস্তারিত আলোচনা করেন।
বসন্ত ও হাম:
বিজ্ঞানী আর-রাজী উনার কিতাব “আল জুদারী ওয়াল হাসবাহ” এ তিনি সর্বপ্রথম বসন্ত ও হাম এ রোগ দুটিকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেন এবং এই রোগগুলোর চিকিৎসা বিধান প্রনয়ণ করেন।
প্রচলিত বাকের সিস্ট:
বিজ্ঞানী আর-রাজী সর্বপ্রথম প্রচলিত বাকের সিস্টের বর্ণনা ও প্রতিবিধান দেন। বাকের সিস্ট হচ্ছে হাটুর নিচের পায়ে হাটু হতে কাফ মাসলের মধ্য গভীর উৎপন্ন সিস্ট, যা উইলিয়াম বাকের হিজরী ১২৯৪ সালে (হিজরী ১৮৭৭) নিজের নামে বিশ্বে পরিচিত করতে চায়।
প্রচলিত ব্রুক মেথড:
বিজ্ঞানী আর-রাজী সর্বপ্রথম প্রচলিত ব্রুক মেথডের বর্ণনা দেন। হাটুর প্যাটেলা যদি কয়েক খন্ডে বিভক্ত হয়ে যায় তবে এই প্যাটেলা অপসারণের প্রয়োজনীতা ও পদ্ধতি বিজ্ঞানী আর রাজী প্রনয়ণ করেছিলেন যা হিজরী ১৩৫৫ সালে (১৯৩৬ ঈসায়ীতে) ব্রুক তার পদ্ধতি হিসেবে পাশ্চাত্যের তথাকথিত চিকিৎসক সমাজে পরিচিত করে।
স্কন্ধের স্থানচ্যুতির প্রতিবিধান:
বিজ্ঞানী আর রাজী সর্বপ্রথম পুনঃপুনঃ স্কন্ধের স্থানচ্যুতির ব্যাখ্যা দেন ও এর প্রতিবিধান করেন।
রোগ প্রতিকারে খাদ্যনিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা:
বিজ্ঞানী আল রাজী তাঁর লিখিত “কিতাব আল তিব্ব আল মুলুকী” তে খাদ্যনিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকারের রোগের প্রতিকারের পদ্ধতি বর্ণনা করেন যা আজও আমাদের চিকিৎসকরা অনুসরণ করে থাকেন।
ইবনে সিনার বিভিন্ন অবদান:
বিজ্ঞানী ইবনে সিনা (হিজরী ৩৬৯ – ৪২৮, ঈসায়ী ৯৮০-১০৩৭) চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যাপক অবদান রেখেছেন। তিনি মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন ধরণ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি সন্তনপ্রসব কালে জটিল অবস্থায় ঋড়ৎপবঢ়ং ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় ও পার্শ্ব প্যারলাইসিস রোগসমূহকে পৃথক ভাবে নির্ণয় ও প্রতিকার করতেন।

চিত্র : ইবনে সিনার লিখিত “কিতাব আল কানুন ফিত তিব্ব”-এর একাংশ

তিনি Dracunculiasis রোগের প্রতিবিধান প্রনয়ণ করেন এবং Trigeminal neuralgia নামক স্নায়ুবিষয়ক রোগ সম্পর্কেও বর্ণনা দেন। তাঁর বিখ্যাত কিতাব সমূহের মধ্যে “কিতাব আল কানুন ফিত তিব্ব” ও “কিতাব আল শিফা (ঞযব নড়ড়শ ড়ভ যবধষরহম)” বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
রক্ত সংবহন পদ্ধতি ও হৃদপিন্ডের গঠন:
বিজ্ঞানী ইবনে নাফিস (হিজরী ৬০৯ – ৬৮৭, ঈসায়ী ১২১৩-১২৮৮) সর্বপ্রথম গ্যালেনের হৃদপিন্ড বিষয়ক ধারণা ভুল প্রমান করেন। তিনি সবিস্তারে রক্ত সংবহন পদ্ধতি বর্ণনা করেন এবং হৃদপিন্ডের গঠন সঠিকভাবে বর্ণনা করেন। তাঁর প্রায় ৩০০ বছর পর ইউরোপে উইলিয়াম হার্ভে নামক এক তথাকথিত বিজ্ঞানী ইবনে নাফিস এর এই আবিস্কার নিজের বলে প্রচার করে।
চোখের গঠন, দর্শন ও ক্যামেরা:
হিজরী ৪র্থ শতকে বিজ্ঞানী ইবনুল হাইছাম (৩৫৪ – ৪৩১ হিজরী, ৯৬৫-১০৪০ ঈসায়ী) সবিস্তারে চোখের গঠন ও কার্যপদ্ধতি ব্যাখ্যা করেন। তিনি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ দেখান বস্তু হতে আলো চোখে পড়ে দর্শনের অনুভূতি জন্মে। তিনি চোখের অনুকরণে আলোকচিত্র যন্ত্র ক্যামেরা তৈরী করেন।
পাকস্থলীর গঠন:
আহমদ ইবন আবি আল আশ’আথ (হিজরী ৩৪৮, ঈসায়ী ৯৫৯) পাকস্থলীর গঠনের উপর ব্যপক কাজ করেন।
মানুষের নিম্ন চোয়ালের গঠন:
চিকিৎসক আবদুল লতিফ আল বাগদাদী (হিজরী ৫৫৭ – ৬২৮, ঈসায়ী ১১৬২-১২৩১) মানুষের নিম্ন চোয়াল একটি অস্থি দ্বারাই তৈরী তা ব্যাখ্যা করেন এবং গ্যালেনের দুই অস্হির বর্ণনা ভূল প্রমান করেন।
বিলম্বিত স্প্লিন্টেজ:
বিজ্ঞানী ইবনে সিনা বিলম্বিত স্প্লিন্টেজের প্রবক্তা। (স্প্লিন্ট হচ্ছে এমন এক সহায়ক যন্ত্র বা বস্তু, যার সাহায্যে হাড়ের খন্ডাংশের স্থানচ্যুতি রোধ করা হয়।) তিনি যেকোন হাড়ভাঙ্গা ঘটনার সাথে সাথে স্প্লিন্টিং এর না করারা প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন এবং পঞ্চম দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন। তাঁর এই থিউরী বর্তমান বিশ্বে জর্জ পারকিনের থিউরী বলে পরিচিত।
প্রচলিত বেনেট ফ্র্যাক্চার:
বিজ্ঞানী ইবনে সিনা, এডওয়ার্ড বেনেট (১২৫২-১৩২৪ হিজরী, ঈসায়ী ১৮৩৭-১৯০৭) এর প্রায় ৯০০ বছর পূর্বে এই ফ্র্যাক্চারের বর্ণনা ও প্রতিবিধান দেন। এই ধরনের আবিষ্কার বা অবদানগুলো প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে পাশ্চাত্য ও ইউরোপীয় তথাকথিত গবেষকদের নির্লজ্জ তস্করবৃত্তিতা প্রকাশিত হচ্ছে।
প্রচলিত ট্যান্ডেলেনবার্গ পজিশন:
সার্জন আল জাহরাওয়ী (৩২৪-৪০৩ হিজরী, ৯৩৬-১০১৩ ঈসায়ী) জার্মান ফ্রেডরিক ট্যান্ডেলেনবার্গের (১২৬০-১৩৪২ হিজরী, ১৮৪৪-১৯২৪ ঈসায়ী) প্রায় ৯০০ বছর পূর্বে এই পজিশনের বর্ণনা ও ব্যবহার করেছেন অ্যাবডোমিনাল ও গাইনোকোলজিক্যাল সার্জারীতে।
লাইগেশণ পদ্ধতিতে রক্তক্ষরণ বন্ধকরন:
সার্জন আল জাহরাওয়ী (৩২৪ – ৪০৩ হিজরী, ৯৩৬-১০১৩ ঈসায়ী) রক্তক্ষরণ বন্ধের জন্য তিন ধরনের পদ্ধতির বর্ণনা করেছেন। যথা: লাইগেশন পদ্ধতি, কটারাইজেশন পদ্ধতি ও ধমনী সংকোশনকরণ পদ্ধতি। কিন্তু তথাকথিত ফ্রেঞ্চ সার্জন এমব্রোস পেরী ৯৬০ হিজরী (১৫৫৩ ঈসায়ী) সনে লাইগেশন পদ্ধতিতে রক্তক্ষরণ বন্ধকরণকে তার উদ্ভাবিত পন্থা হিসেবে প্রচার চালায়।
প্লেগের প্রতিকার:
মুর চিকিৎসক ইবনে কাতিনা (ইন্তেকাল ৭৭০ হিজরী, ১৩৬৯ ঈসায়ী) সর্বপ্রথম প্লেগ রোগের প্রতিকারের ব্যবস্থাপত্র দেন। তিনি ৭৫০ হিজরী (১৩৪৯ ঈসায়ী) সনে আলমেরিয়ায় (দক্ষিণ স্পেনের একটি অঞ্চল) যখন প্লেগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় তখন তিনি প্লেগের প্রতিকারের উপর একটি নিবন্ধ লিখেন যা মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি অন্যতম মৌলিক অবদান। তাঁর এই নিবন্ধ নবম হিজরী (১৫দশ ঈসায়ী শতকে) সনে ইউরোপে ল্যাটিনে অনুবাদ করা হয় এবং এর ব্যাপক চর্চা হতে থাকে।
চোখের রোগ:
আলী ইবনে ঈসা (৪০০ হিজরী, ঈসায়ী ১০১০) বাগদাদের একজন প্রসিদ্ধ চক্ষুচিকিৎসক আল কাহহাল। তিনি চোখের রোগের উপর একটি কিতাব ÒNote book of the OculistÓ রচনা করেন যা ১১দশ হিজরী শতক (সপ্তদশ ঈসায়ী) পর্যন্ত চোখের চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কিতাব হিসেবে বিবেচিত হত। এখানে ট্রাকোমা, ওপথালমিয়া সহ প্রায় ১৩০ রকমের চোখের বিবরণ দেয়া রয়েছে।
চোখের পিউপিলের প্রতিক্রিয়া:
চোখের পিউপিলের প্রতিক্রিয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানী আর রাযী সর্বপ্রথম ব্যাখ্যা করেন।
মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র ও মেরুদন্ড:
আলী ইবনে আব্বাস (হিজরী ৩১২-৩৮৪, ঈসায়ী ৯২৪-৯৮৪) উনার “কিতাব আল মালিকি”তে মস্তিষ্ক ও মাথার বিভিন্ন রোগ বা অবস্থার প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করেন। যেমন: মাথা ব্যাথা, মাথায় রক্তক্ষরণ, স্ক্যাল ফ্র্যাক্চার, কোমা, সিজোফ্রেনিয়া, ডেমেনটিয়া, ইপিল্যাপসি। এছাড়া তিনি নিউরোএনাটমি, নিউরোবায়োলজি, নিউরোফিজিওলজি নিয়ে আলোচনা করেন। এছাড়া মস্তিষ্ক যে সকল স্নায়ুতন্ত্রের মূল এবং স্পাইন্যাল কর্ড ও এর স্নায়ুতন্ত্রের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। এর সাথে বিভিন্ন রকমের প্যারলাইসিস অবস্থারও চিকিৎসাপত্র দেন। এছাড়াও ঘুমকাতরতা, স্মৃতিভ্রংশ ইত্যাদি নিয়েও আলোচনা করেন।
ক্যান্সার চিকিৎসা:
মুসলিম চিকিৎসকগণ ক্যান্সারেরও চিকিৎসা করতেন। আল জাহরায়ী (৩২৪-৪০৩ হিজরী, ৯৩৬-১০১৩ ঈসায়ী), ক্যান্সার বা আল সারাতান এর পর্যায়গুলো ব্যাখ্যা করেন এবং সীমিত অবস্থায় ক্যান্সার এর টিউমারগুলো টিস্যুর গভীর হতে বের করে ফেলে চিকিৎসা করতেন। বিজ্ঞানী ইবনে সিনা বক্ষ ক্যান্সারে এই পদ্ধতির বদলে লেড বা কপার অক্সাইড ব্যবহার করে একে সীমিত রাখার চিকিৎসা দিতেন।
চোখে অস্ত্রপ্রচার চযধপড় বসঁষংরভরপধঃরড়হ ও সিরিঞ্জ:
আম্মার বিন আলী আল মাউসিলী, তাঁর কিতাব আল মুনতাহাব (হিজরী ৩৮৫-৪১১ (ঈসায়ী ৯৯৫-১০০৮) এর মধ্যে লিখিত) এ চোখের অস্ত্রপ্রচার বিশেষ করে Cataract surgery (Phaco emulsification) সহ প্রায় ৪৮ ধরনের চোখের রোগ ও তার প্রতিকার বর্ণনা করেন। তিনি নিজ হতে এই Cataract Surgery সিরিঞ্জের সাহায্যে করেন। এই তথ্যের মাধ্যমে মানব ইতিহাসে সিরিঞ্জের ব্যবহার এই প্রথম পরিলক্ষিত হল। কিন্তু বর্তমান ইহুদিতান্ত্রিক রাস্ট্রব্যবস্থা প্রচলিত করে যে ১০৬০ হিজরী (১৬৫০ ঈসায়ী) তে ব্লেজ প্যাসকেল যে Pascal Lwa নামে যা রটিয়েছে তা ব্যবহার করে ১২৭০ হিজরী (ঈসায়ী ১৮৫৩) সালে ডাক্তার আলেকজান্ডার উড মেডিক্যাল সিরিঞ্জ ব্যবহার করে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে হিজরী ৪র্থ শতকের (দশম ইসায়ী শতকে) আল কাযিনীর তত্ত্বের গানিতিক প্রকাশ এই প্যাসকল ল’ এবং সিরিঞ্জ আম্মার বিন আলী আল মাউসিলী থেকে শুরু করে তাঁর পরবর্তী সব মুসলিম চক্ষুবিশেষজ্ঞ ব্যবহার করেছেন।
চোখের লক্ষণে রোগ নির্ণয়:
আল যুরযানী (হিজরী ৪৮০, ঈসায়ী ১০৮৭), তাঁর কিতাব The light of the eye তে চোখ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় যেমন: ৩য় নার্ভ প্যারলাইসিস, রক্তের দূষণ ও বিষাক্ততা ইত্যাদি ব্যাখ্যা করেন।
বিমারিস্তান বা হাসপাতাল:
পৃথিবীর বুকে আজকের যে হসপিটালগুলো দেখা যায়, তার এই ব্যবস্থাপনা সমৃদ্ধ সর্বপ্রথম হসপিটালটি হচ্ছে আহমদ ইবনে তুলুন বিমারিস্তান, যা কায়রো তে ২৫৮ থেকে ২৬০ হিজরী (ঈসায়ী ৮৭২-৮৭৪) সালের মধ্যে স্থাপিত হয়েছিল। এই হাসপাতালে সকলকে বিনামূল্যে ঔষধ দেয়া হত। এখানে ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা ইউনিট ও গোছলখানা ছিল। এখানে রোগীদেরকে হাসপাতাল হতে আলাদা পোষাক সরবরাহ করা হতো এবং রোগীদের ব্যবহৃত পোষাক, মূল্যবান অলংকারাদি রোগী হাসপাতাল ত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত হাসপাতালের সংরক্ষিত স্থানে সংরক্ষণ করা হত।
মুসলিম বিশ্বে এরচেয়ে বড় হাসপাতাল তৈরী হয় বাগদাদে ৩৭১ হিজরী (৯৮১ ঈসায়ী) সনে। এখানে প্রায় ২৪ জন চিকিৎসক নিয়মিত চিকিৎসা প্রদান করতেন। এটা সেই সিরিয়াতে ৬ষ্ঠ হিজরী (দ্বাদশ ঈসায়ী) শতকে বাগদাদের চেয়েও বড় ‘নূরী হাসপাতাল’ তৈরী করা হয়। কায়রোতে ৬৮২ হিজরী (ঈসায়ী ১২৮৩) সনে আল মানসুর কালাউন ‘মানসুরী হাসপাতাল’ তৈরী করেন। এই হাসপাতালে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা ইউনিট ও ছেলেদের ইউনিটে ছেলে ও মেয়েদের ইউনিটে মেয়ে স্টাফ দেখাশোনা, চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রুষা করতেন। এই হাসপাতালের কেন্দ্রে বড় ঝরণা ছিল এবং সবগুলো ইউনিটে পানির সরবরাহ ছিল। এখানে হাসপাতালের ঔষধালয় রোগীদের ঔষধ সরবরাহ করত। হাসাপাতালের একপার্শ্বে হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক, শিক্ষানবীশ চিকিৎসকদেরকে পাঠদান করতেন।
হিজরী ৩য় শতকের (৯ম ঈসায়ী শতকে) তিউনিস বিমারিস্তান আল কায়রাওয়ান ছিল সেযুগে মুসলিম চিকিৎসাশাস্ত্রের অগ্রগামীতার অনন্য নিদর্শন। এই হাসপাতালে দর্শনার্থীদের জন্য অভ্যর্থনা কক্ষ, মেয়েদের জন্য মেয়ে নার্স, রোগীদের নামায আদায়ের জন্য মসজিদ, নিয়মিত চিকিৎসক এবং ফুকাহা আল বদন নামে একটি ইমামদের মজলিশ ছিল। এখানে কুষ্ঠরোগীদের জন্য বিশেষ ইউনিট ছিল যার নাম দার-আল-যুধামা। এই হাসাপাতালের বাইরেও অনেক ছোট ছোট চিকিৎসালয় গড়ে উঠেছিল এমনকি সেসময় কিছু প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসকদের চেষ্টায় বেসরকারী চিকিৎসালয়ও গড়ে উঠেছিল। মুসলিম খলিফা, সুলতান ও চিকিৎসকদের এই প্রচেষ্টাগুলোর সুফল সব জাতি-ধর্মের লোকজন ভোগ করত। শুধু তাই নয় ইতালিতে খ্রিস্টান ইউরোপের প্রথম হাসপাতালও মুসলিম চিকিৎসকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়।
সকল বড় বড় হাসপাতালগুলোতে শিক্ষানবীশ চিকিৎসকদের পাঠদানের ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রচুর বই-পত্র ও গবেষনাপত্র রক্ষিত থাকত যাতে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসকগণ বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা-জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতি সাধন করতে পারেন। যেমন দেখা যায় বিজ্ঞানী ইবনে নাফিস সিরিয়ার দামেস্কের আল নূরী হাসপাতালে গবেষণা করতেন এবং তিনি মানবদেহের ফিজিওলজি তে নতুন পদক্ষেপ যোগ করেন, তিনি মানুষের হৃদপিন্ডের গঠন, কার্যপ্রনালী ও রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়া নির্ভূল ভাবে ব্যাখ্যা করেন।
চিকিৎসা যন্ত্রপাতি:
মুসলিম সার্জনগণ রোগীর চিকিৎসা করার জন্য, চিকিৎসাকালে রোগীর কম পেরেশানীর জন্য এবং সেই সাথে চিকিৎসা সফল করার জন্য বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতেন। মুসলিম যে সকল সার্জন ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছেন তাদের মধ্যে আবুল কাশিম খালাফ ইবনে আল আব্বাস আল জাহরায়ী চিকিৎসাকালে প্রায় দুই শতাধিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতেন। এর মধ্যে কিছু ছিল দাঁতের চিকিৎসার জন্য, কিছু ছিল ঔষধ ব্যবহারের জন্য এবং কিছু ছিল শল্য চিকিৎসার জন্য। তিনি এইসব যন্ত্রপাতির অনেকগুলো নিজেই নকশা করে তৈরী করেন এবং চিকিৎসায় ব্যবহার করেন। তাঁর “আত তাশরিফ” কিতাবে এইসব যন্ত্রপাতির বিস্তারিত গঠন ও ব্যবহার লিপিবদ্ধ রয়েছে। এদের মধ্যে scraper tool আল মাজরাদ, the drill Avj wgkAve, saws আল মিনশার সহ অসংখ্য ধরনের যন্ত্র রয়েছে। আজও শল্য চিকিৎসায় এইসব যন্ত্রের অনেকগুলো অবিকৃতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি শল্য চিকিৎসায় অভ্যন্তরীন সেলাই এর জন্য catgut (প্রানীর মধ্যচ্ছেদার তৈরী শক্ত সুতা), animal gut ইত্যাদি যা মানুষের রক্তে সহজে দ্রবীভূত হয় ও কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হয় না এমন বস্তু ব্যবহার করতেন। এছাড়া দন্ত চিকিৎসায় তিনি দাতেঁর জায়গায় নকল দাঁত, দাঁত বাধাঁয়ের জন্য সোনা বা রূপার তার ব্যবহার করতেন। তিনি সর্বপ্রথম রক্তক্ষরণ বন্ধের জন্য তুলার ব্যবহার করেন। তিনি হাড়ভাঙ্গার চিকিৎসায় নিয়মিত প্লাস্টার ব্যবহার করতেন। তিনি মুত্রথলীতে পাথর অপসারণ, নাকের পলিপ ও মৃত সন্তানকে রেহেম হতে বের করার জন্য স্ব-উদ্ভাবিত বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করতেন। আল জাহরায়ীর পর ইবনে যুহর সহ আরও কিছু মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানী আরও কিছু যন্ত্রপাতির সমাবেশ ঘটান।

চিত্র : আল জাহরায়ী ও অন্যান্য মুসলিম শল্য চিকিৎসকদের আবিষ্কৃত বিভিন্ন শল্য চিকিৎসা যন্ত্রপাতি

অ্যানেস্থাশিয়া:
ইসলামি আল আন্দালুসিয়ায় সর্বপ্রথম অ্যানেস্থাশিয়ার প্রয়োগ দেখা যায়। প্রথমে আল জাহরায়ী এবং পরে ইবনে যুহর (হিজরী ৪৮৭-৫৫৭, ঈসায়ী ১০৯৪-১১৬২) এক্ষেত্র অবদান রাখেন। ইবনে যুহর মুখে ও শ্বাসের সাথে ব্যবহারযোগ্য অ্যানেস্থাশিয়া ব্যবহার করতেন। তিনি ঘধৎপড়ঃরপং ংড়পশ অ্যানেস্থাশিয়া হিসেবে ব্যবহার করতেন। তিনি এই অ্যানেস্থাশিয়ার ঘনমাত্রা নির্ধারণের মাধ্যমে অ্যানেস্থাশিয়ার নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করেন।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে