চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উৎপাদিত বাবু সম্প্রদায়


বাংলায় ইংরেজরা প্রথমে বনিকের ছদ্মবেশে আগমন করার পর তারা যখন রাজশক্তি নিজের হাতে কুক্ষিগত করে ৷ তারপর তারা মীর জাফরের বংশধরদের নাম মাত্র নবাব হিসেবে সিংহাসনে বসালেও প্রকৃত রাজ ক্ষমতা তথা দেশ পরিচালনা করার ক্ষমতা ইংরেজদের অধিনে থাকতো ৷
1765 সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাংলা বিহার উড়িষ্যার দেওয়ানী লাভ করার পর ইংরেজরা নিজেদের অথনৈতিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য নানা ধরনের নীতি গ্রহন করে ৷ এই সময় ইংরেজরা ভূমি রাজস্ব আদায়ের জন্য বিশেষ ভাবে মনোযোগী হয় ৷ ভূমি কর আদায়ের জন্য তৈরি করা হয় সূর্যাস্ত আইন ৷ এর প্রথম ধাপে কোম্পানী প্রশাসন একসনা বন্দোবস্ত চালু করে ৷ দ্বিতীয় ধাপে তারা পাঁচসনা বন্দোবস্ত চালু করে ৷ তৃতীয় ধাপে দশসনা বন্দোবস্ত চালু করে ৷ সব শেষে ধাপে 1793 সালে দশসনা বন্দোবস্তকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে রুপান্তরিত করা হয় ৷ কোম্পানির প্রশাসক জর্ন শোর সর্বপ্রথম চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রস্তাব উত্থাপন করে ৷ 1793 সালে লর্ড কর্নওয়ালিস কোম্পানীর গর্ভনর হয়ে আসলে সে সময় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হয় ৷ কোম্পানী প্রশাসন মুলত বহুমুখী উদ্দেশ্যে এই ভূমি ব্যবস্থা প্রনয়ন করে ৷ এই ব্যবস্থার প্রবর্তক লর্ড কর্নওয়ালিস বলে যে ” আমাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই (এ দেশের ) ভূস্বামীগনকে আমাদের সহযোগী করিয়া লইতে হইবে ৷ যে ভূস্বামী একটি লাভজনক ভূসম্পত্তি নিশ্চিত মনে ও সুখে শান্তিতে ভোগ করিতে পারে তাহার মনে উহার কোনরুপ পরিবর্তনের ইচ্ছা জাগিতেই পারে না ” ( ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন লেখক বদরুদ্দীন উমর পৃষ্টা 14)
রাজ্য বিস্তার ও আগ্রাসনঃ
আপরদিকে ইংরেজরা বাংলা বিহার উড়িষ্যার থেকেই ভূরাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে তাদের রাজ্য বিস্তারের যে পরিকল্পনা করছিল ৷ তখন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভূমিকা ছিল অধিকতর গুরত্বপূর্ণ ৷ এই সময় কোম্পানীর বিপুল ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আগ্রাসন চালাতে যে পরিমান অর্থ ব্যয় তা মুলত বাংলা বিহার উড়িষ্যর রাজস্ব থেকেই নির্বাহ করা হয়েছিল ৷ এমনকি 1858 সালে মহাবিদ্রোহের পর রানী ভিক্টোরিয়া যে কোম্পানী শাসন অবসান করেছিল তখন সে কোম্পানীকে যেটি ক্ষতিপুরণ দিয়েছিল সেটি তিনি ভারতের রাজস্ব হতেই দিয়েছিল ৷
দেশিয় শিল্প ধ্বংসঃ
দেশীয় কুটির শিল্প গুলো ধ্বংস হবার ক্ষেত্রে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত একটি যে কারন ছিল 6 মার্চ 1793 তারিখে লর্ড কর্নওয়ালিসের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ডিরেক্টরদের কাছে লেখা একটি পত্র থেকে বোঝা যাই এতে সে লিখে যে ” ভূমিস্বত্বকে নিরাপদ ঘোষনা করার সঙ্গে সঙ্গেই এদেশীয় হাতে যে বিরাট পূঁজি আছে সেটাকে তারা অন্য কোনভাবে নিয়োগ করার উপায় না দেখে ভূসম্পত্তি ক্রয়ের উদ্দেশ্যে ব্যয় করবে ৷ ” ( ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন লেখক বদরুদ্দীন উমর পৃষ্টা 15) কর্নওয়ালিসের এই উক্তিটি থেকে বোঝা যায় ইংরেজরা বাংলায় সে সময় উৎপাদনশীল বানিজ্য বা কুটির বা বৃহত্তর শিল্পগুলো বা দেশীয় মালিকানাধীন মৌলিক বানিজ্য গুলোতে এদেশীয় পূঁজিপতিদের এর প্রকার বিরত রাখার জন্য প্রকাশই নীতি গ্রহন করেছিল ৷ ইংরেজরা চাইতো বাংলার পূঁজিবাদের বিকাশ হোক তাদের ছত্রছায়ায় এর ফলে গড়ে উঠুক একটি শ্রেনীর যারা যুগ যুগ ধরে তাদের উপনিবেশ গুলোতে তাদের শাসন টিকিয়ে রাখবে ৷ আর এই ক্ষেত্রে ইংরেজরা পুরোপুরি সফল হয়েছিল ৷ এই বাবু সম্প্রদায়ের সহায়তায় তারা ভারতে দুইশো বছর টিকতে পেরেছিল ৷
এই সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর উৎপাদিত এই বাবুরা তাদের ইংরেজ প্রভুদের কি রুপ সেবা করেছিল সে সম্পর্কে উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক বলে ” আমি এটা বলতো বাধ্য যে ব্যপক গনবিক্ষোভ অথবা গনবিপ্লব থেকে আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিশেষভাবে ফলপ্রসূ হয়েছে ৷ অন্যান্য অনেক দিক দিয়ে এমনকি সব থেকে গুরুত্বপূর্ন মৌলিক বিষয়ে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যর্থ হলেও এর ফলে এমন এক বিপুল সংখ্যক ধনী ভূস্বামী সৃষ্টি হয়েছে যারা বৃটিশ শাসনকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষভাবে আগ্রহশীল এবং জনগনের ওপর যাদের অখন্ড প্রভুত্ব বজায় আছে ” ৷ ( ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন লেখক বদরুদ্দীন উমর পৃষ্টা 15)
জমিদারি হাতবদলঃ
ইংরেজ সরকারের ভূমি ব্যবস্থাপনায় সূর্যাস্ত আইন নামে একটি আইন ছিল সে আইনে কোন জমিদার যদি তার নির্ধারিত ভূমি কর দিতে ব্যর্থ হতো তখন কর প্রদানের নির্ধারিত দিনের সূর্য আস্ত যাবার পূর্বে ভূমি কর না পরিশোধ না করলে সে জমিদারের জমি নিলামে উঠত ৷ এবং তা অন্যকারও কাছে বিক্রি করে দেওয়া হত ৷ সূর্যাস্ত আইন এর প্রভাবে মোট জমিদারির 50 % ভাগ মাত্র পঁচিশ বছরের মধ্যেই হাত বদল বা মালিকানা বদল হয়ে ছিল ৷
কৃত্তিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিঃ
ইয়ং হাস্ ব্যান্ড নামক ইংরেজ ঐতিহাসিক এই দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে বলে ” তাহাদের মুনাফা শিকারের পরবর্তী উপায় হইল চাউল কিনিয়া গুদামজাত করিয়া রাখা ৷ তাহারা নিশ্চিত ছিল যে জীবনধারনের পক্ষে অপরিহার্য এই দ্রব্যদির জন্য তাহারা যে মুল্যই চাইবে তাহাই পাইবে ৷ চাষীরা তাহাদের প্রানপাত করা পরিশ্রমের ফসল অপরের গুদামে মজুত হইতে দেখিয়া চাষবাস সম্বন্ধে উদাসীন হইয়া পড়িল ইহার ফলে দেখা দিল খাদ্যাভাব ৷ দেশে যাহা কিছু খাদ্য ছিল তাহা একচেটিয়া (ইংরেজ বনিকদের) দখলে চলিয়া গেল ৷ খাদ্যর পরিমান যত কমিতে লাগিল ততই দাম বাড়িতে লাগিল ৷ শ্রমজীবী দরিদ্র জনগনের চিরদুঃখময় জীবনের উপর পতিত হইল এই পুঞ্জীভূত দুর্যোগের প্রথম আঘাত ৷ ইহা এক অশ্রুতপূর্ব দুর্যোগের আরম্ভ মাত্র ৷ “( ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন লেখক বদরুদ্দীন উমর পৃষ্টা 12)
জমিদার সংঘ সৃষ্টিঃ
1870 সালে তৎকালিন বৃহত্তর পাবনাতে কৃষকরা জমিদারদের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর বিদ্রোহ সংগঠিত করে ৷ এটি দমন করতে জমিদার ও ইংরেজ সরকারকে চরম বেগ পেতে হয়ে ছিল ৷ এই সময় জমিদার বাবুরা একে অপর সাথে যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ৷ এর প্রেক্ষিতে জমিদার সংঘের সৃষ্টি করে ৷

ফরিয়া – দালাল – ফটকাবাজ আমিন থেকে জমিদারঃ
এই ব্যবস্থার প্রভাবে তাঁতি , তেলি , আমিন, ফটকাবাজ দের হটাৎ জমিদার হয়ে যাওয়ার সুযোগ মিলে ৷ যাদের ইতি পূর্বে মান সম্মানের ছিটে ফোটাও ছিল না ৷ যেমন গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ, মানিক চাঁদ, কান্ত বাবু, দর্পনারায়ন ঠাকুর, এরা মুলত ছিল ইংরেজদের বেনিয়া হতে জমিদার হয়েছিল ৷ কলকাতার ঠাকুর পরিবারের জয়রাম ঠাকুর ছিল চব্বিশ পারগনার আমিন ৷ মুর্শিদাবাদের জমিদার দানেশানন্দ নিত্যানন্দ ছিলে প্রথম জীবনে তাঁতী ৷ ( চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাঙালী সমাজ , ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র পৃষ্ঠা 93 )

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সমর্থক বুদ্ধিজীবীঃ
সে কালে এই ব্যবস্থার সমর্থক একদল বুদ্ধিজীবী ও তৈরি হয়েছিল ৷ ডঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেনঃ ” জন সাধারনের স্বার্থে বিরোধী কাজের অভিযোগে অভিযুক্তের কাঠগড়ায় যদি কাউকে দাঁড়াতে তবে সে তালিকা থেকে আমাদের প্রাতঃস্মরনীয় ঔপন্যাসিকের নাম বাদ পরার কথা নয় ” ( চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাঙালী সমাজ , ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র পৃষ্ঠা 8 ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়ের এই সম্পর্কে বলে ” 1793 সালে যে ভ্রম ঘটিয়াছিল, এক্ষনে তাহার সংশোধন সম্ভবে না ৷ সেই ভ্রন্তির উপরে আধুনিক বঙ্গ সমাজ নির্মিত হইয়াছে ৷ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ধ্বংস বঙ্গ সমাজের ঘোরতর বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হইবার সম্ভাবনা ৷ আমরা সামাজিক বিপ্লবের অনুমোদক নই ৷ বিশেষ যে বন্দোবস্ত ইংরেজরা সত্য প্রতিঞ্জা করিয়া চিরস্থায়ী করিয়াছেন তাহার ধ্বংস করিয়া তাঁহারা এই ভারতমন্ডলে মিথ্যাবাদী বলিয়া পরিচিত হয়েন প্রজাবর্গের চিরকালের অবিশ্বাস ভাজন হয়েন এমন কুপরামর্শ আমরা ইংরেজদিগকে দিই না ৷ যে দিন ইংরেজ অমঙ্গলাকাঙ্ক্ষী হইব সমাজের অনঙ্গলাকাঙ্ক্ষী হইব সেই দিন সে পরামর্শ দিব ৷ “( ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন লেখক বদরুদ্দীন উমর পৃষ্টা 21 )
মামলার জটঃ
1862 সালে কলকাতা হাইকোট প্রতিষ্ঠা হবার পর সারা ভারতে বছরে 14 লক্ষ মামলা হয় তার মধ্য শুধু বাংলার মামলা ছিল 5 লক্ষ ৷ ( চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাঙালী সমাজ , ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র পৃষ্ঠা 87)

Views All Time
1
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে