চীনে মুসলমানদের রোজা পালনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ (নাউযুবিল্লাহ)


চীনের মুসলমানরা পবিত্র রমযান মাসে সিয়াম বা উপবাস পালনে নতুন করে দুঃসহ প্রতিবন্ধকের সম্মুখীন হয়েছেন। উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াংয়ে রমযান মাসে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মুসলিম কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের রোজা পালনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। জিনজিয়াংয়ের কাশগড় জিলায় জংল্যাং শহর এলাকায় জারী করা এক বিবৃতিতে বলা হয়, রমযান মাসে সামাজিক স্থিতিশীলতা অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে স্থানীয় কমিটি একটি সামগ্রিক নীতিমালা প্রচার করেছে এবং এতে কমিউনিস্ট পার্টি ক্যাডার, অবসর ভোগীসহ সমস্ত বেসামরিক কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের রমযান সংশ্লিষ্ট যাবতীয় ধর্মীয় কর্মকান্ডে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা লাগানো হয়েছে। এএফপি ১ আগস্ট বুধবার এই খবর পরিবেশন করে।

জিনজিয়াং সরকারি ওয়েবসাইটে পোস্ট করা বিবৃতি যে স্থানীয় গ্রামীণ নেতাদের হাতে ভোজন সামগ্রী উপঢৌকন স্বরূপ তুলে দিতে দলীয় নেতাদের আহবান করা হয়-যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, নেতারা রমযানে ভোজন অব্যাহত রেখেছেন। অন্যান্য স্থানীয় সরকারের ওয়েবসাইটেও রমযান সংশ্লিষ্ট কর্মকান্ডে মুসলিমদের অংশগ্রহণে অনুরূপ নিয়ন্ত্রণ আরোপমূলক নির্দেশ পোস্ট হতে দেখা যায়।

ওয়েন্সু কাউন্টির শিক্ষা সংস্থান ব্যুরোর ওয়েবসাইটে পোস্ট করা বিবৃতিতে স্কুলগুলোকে আহবান জানানো হয়েছে। তারা যেন নিশ্চিত করে যে শিক্ষার্থীরা রমযান মাসে মসজিদে প্রবেশ না করে। ইসলামী বর্ষপঞ্জীর পবিত্রতম মাস রমযান জিনজিয়াংয়ে শুরু হয় ২০ জুলাই।

অঞ্চল জুড়ে মুসলিমদের ধর্মীয় কার্যকলাপে নিয়ন্ত্রণ আরোপসূচক আদেশগুলোর কোনোটি রমযান শুরুর আগে এবং কোনো কোনোটি রমযান শুরুর পরে জারি করা হয়।

রমযানে প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম মাত্রই সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ থেকে নিজেদের নিরস্ত রাখেন। শারীরিক ঝুঁকি বিবেচনায় অসুস্থ ও মুসাফিরদের উপবাস পালন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

নামাজ, আত্মসংযম ও কল্যাণ কর্মের মধ্যদিয়ে আল্লাহর আরো নিকটস্থ হওয়ার লক্ষ্যে পবিত্র রমযানে মুসলমানরা তাদের সময় বিনিয়োগ করে থাকেন। রমযান মাসে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতে সময় অতিবাহিত করা মুসলিম সমাজে প্রথায় পরিণত হয়ে এসেছে। বহু রোজাদার ইতিকাফ পালন উপলক্ষে রমযান মাসের শেষ ১০টি দিন নিরবচ্ছিন্নভাবে মসজিদে অতিবাহিত করে থাকেন।

ভাষ্যকাররা মনে করেন, রমযান পালনে সবকার আরোপিত নতুন নিষেধাজ্ঞা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠপ্রদেশটিতে নতুনভাবে অশান্তি সৃষ্টির ঝুঁকি জন্ম দিয়েছে। ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেসের মুখপাত্র দিলশাদ রেজিদ এক বিৃবতিতে বলেন, রমযানে রোজা পালন বন্ধ করে দিতে এবং রোজা ভেঙে ভোজন গ্রহণে উইঘুরদের বাধ্য করার লক্ষ্যে চীন প্রশাসনিক শক্তি প্রয়োগে নেমেছে। কিন্তু, দিলশাদ বলেন, প্রতিবন্ধকের পরিনামে উইঘুর জনগণের চীনা শাসন প্রতিরোধী মনোভাব আরো তীব্র হবে।

জুলাই ২০০৯ য়ে সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে ভয়াবহ জাতিগত সহিংসতা জিনজিয়াংয়ে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। সে সময় উরুমার্চ শহরে দেশের বৃহত্তম সংখ্যক হান জাতির লোকেদের উইঘুরদের হামলার শিকারে পরিণত হতে হয়। কুদ্ধ হান জাতির সদস্যরা পরবর্তী দিনগুলোর ঘটনার প্রতিশোধ নিতে সড়কে নামলে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গায় চীনকে গ্রস্ত হতে হয়।

সরকারি খবরে প্রায় ২শ’ ব্যক্তি মারা যাওয়ার ও ১৭শ’ ব্যক্তি আহত হওয়ার কথা বলা হয। কিন্তু তুর্কী ভাষাভাষী এক কোটি সংখ্যক উইঘুর মুসলিমরা দাবি করেন হতাহতের সংখ্যা এরচেয়ে অনেক বেশি হবে এবং মুসলমানরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চীনা কর্তৃপক্ষ প্রায় ২শ’ ব্যক্তিকে দাঙ্গার জন্য দায়ী সাব্যস্ত করে। এদের আধিকাংশ ছিলেন উইঘুর মুসলিম। ২৬ জনকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। ১৯৫৫ সাল থেকে স্বায়ত্ত্বশাসিত হওয়ার মর্যাদা ভোগ করলেও উইঘুরদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তার নামে চীনা কর্তৃপক্ষের দমন অভিযান লাগাতার জারি রযেছে।

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ হচ্ছে, চীনা কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাস প্রতিরোধের নামে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী উইঘুর মুসলমানদের ওপর দমনপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে।

মুসলমানরা অভিযোগ করছেন তাদের স্বকীয়তা ও সংস্কৃতি পুরোটাই মুছে ফেলার লক্ষ্যে তাদের নিজস্ব ভূভাগে হানদের ডেকে আনা হচ্ছে এবং তাদের বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে। ভাষ্যকাররা বলছেন, চীনা কর্তৃপক্ষের গৃহীত পদক্ষেপের পরিণামে ১৯৪০ দশকে সিনজিয়াংয়ের ৫ শতাংশ হান জনসংখ্যা বর্তমানে বেড়ে ৪০ শতাংশের বেশিতে এসে পৌঁছেছে।

মধ্য এশিয়ার কাছাকাছি এর গুরুত্বপূর্ণ রণ কৌশলগত অবস্থানের কারণে এবং এর বিশালায়তন গ্যাস  ও তেল মজুদের কারণে জিনজিয়াংকে চীন অতন্ত মূল্যবান ও অতি প্রয়োজনীয় অঞ্চল বিবেচনা করে থাকে।

সূত্র : অনইসলাম ও বার্তা সংস্থাসমূহ

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+