ছাহিবে কা’বা কাওসাইনে আও আদনা, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত আযিমুশ শান মি’রাজ শরীফ উনার বর্ণনা


বোরাক মুবারকে আরোহন ও পথিমধ্যে যা ঘটলো:
খালিক্ব, মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, আখিরী নবী, নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আয়াত শরীফ তিলাওয়াত করলেন এবং ইরশাদ করলেন। (রজব মাসের ২৭ তারিখ) ইশার নামাযের পর আমার কাছে আগমন করেন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম। তখন আমি মক্কা (কা’বা) শরীফ-এ অবস্থান করছিলাম। কা’বা শরীফ থেকে বের হয়ে দেখতে পেলাম একটি বিস্ময়কর, খুবই সুন্দর, দীর্ঘ কান বিশিষ্ট বাহন দাঁড়িয়ে রয়েছে; যা সাদা রঙ বিশিষ্ট গাধার চেয়ে একটু বড়, খচ্চরের চেয়ে একটু ছোট। যার নাম ছিলো বোরাক।
খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, অতঃপর উহাতে আরোহণ করি। আমি যখন বোরাকের উপর সাওয়ার হয়ে চলছিলাম এমন সময় আমার ডান দিক থেকে একজন লোক ডাক দিয়ে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার দিকে একটু তাকান এবং আমার কিছু সুওয়াল রয়েছে। কিন্তু এখানে আমি দাঁড়াইনি এবং জাওয়াবও দেইনি। এরপর কিছুদূর গেলে আবার বামদিক থেকেও কে যেন আহবান করলেন কিন্তু এখানেও আমি থামিনি ও জাওয়াবও দেইনি। আবার কিছুদূর গিয়ে দেখতে পাই একটি স্ত্রীলোক তার সৌন্দর্য জাহির করে দাঁড়িয়ে আছে। সেও আমাকে লক্ষ্য করে বললো, আমার কিছু সুওয়াল রয়েছে কিন্তু আমি তার দিকে লক্ষ্য করিনি ও থামিওনি। খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, যখন আমরা বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছলাম এবং আমি আমার বাহনকে সেই হালকার সাথে বাঁধলাম; যাতে অন্যান্য হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা উনাদের বাহন বেঁধে রাখতেন। অতঃপর হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি আমার নিকট দুটি পেয়ালা আনলেন। একটি ছিল শরাব অপরটিতে দুধ। আমি দুধের পেয়ালা পান করলাম। কিন্তু শরাব পান করিনি। তখন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, আপনি ফিৎরাত তথা সুন্নতকে গ্রহণ করেছেন। তখন আমি খুশি হয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ তাকবীর দিলাম এবং হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি দু’বার তাকবীর পাঠ করেন।
খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে তা’যীম-তাকরীম-এর সাথে অভ্যর্থনা করে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি উনার সাথে বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে পথের ঘটনার কথা বলছিলেন। তখন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, পথিমধ্যে প্রথম যে ব্যক্তি আপনাকে ডান দিক থেকে ডেকেছিল সে হলো একটা ইহুদী লোক। যদি আপনি তার কথার উত্তর দিতেন এবং সেখানে দাঁড়াতেন তাহলে আপনার উম্মত ইহুদী হয়ে যেতো। আর দ্বিতীয়বার বাম দিক থেকে যে ব্যক্তি আপনাকে আহবান করেছিল সে হচ্ছে একজন খ্রিস্টান। যদি আপনি সেখানে দাঁড়াতেন তবে আপনার উম্মত খ্রিস্টান হয়ে যেতো। আর ওই স্ত্রী লোকটি ছিলো দুনিয়া। যদি আপনি সেখানে থেকে তার সাথে কথা বলতেন তবে আপনার উম্মত আখিরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যেতো।
মুসনাদে বাযযার, তাবারানী ও দালায়িলুন নবুওয়াহ লিল বাইহাক্বীতে বর্ণিত আছে, “খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, যখন আমরা কা’বা শরীফ থেকে বুরাকে করে যাচ্ছিলাম তখন আমরা খেজুর গাছওয়ালা একটি যমীনে পৌঁছলাম। হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি দয়া করে এখানে তাশরীফ নিন। আমি নামলাম এবং সেখানে নামায আদায় করলাম। তারপর আবার বুরাকে উঠলাম। অতঃপর হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন: আপনি কি জানেন অর্থাৎ আপনি তো জানেন, কোথায় আপনি নামায পড়েছেন? আমি বললাম, খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন। তখন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, আপনি নামায পড়েছেন মদীনা শরীফ-এ (মসজিদুন নববী শরীফ-এ)। নাসায়ী শরীফ-এও বর্ণিত রয়েছে, এটাই আপনার হিজরতের স্থান হবে ইনশাআল্লাহ। (মূলত নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি অবশ্যই তা জানতেন। কেননা তিনি সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত বিষয়ের ইলমের অধিকারী। এখানে উম্মতকে শিক্ষা দেয়ার জন্যই এরূপ বলা হয়েছে।) অতঃপর বুরাক চলতে লাগলো এবং আমরা এক স্থানে পৌঁছলাম। হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি আমাকে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি দয়া করে এখানে তাশরীফ রাখুন। অতঃপর খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বুরাক থেকে নামলেন এবং নামায আদায় করলেন। হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, আপনি কি জানেন, অর্থাৎ আপনি তো জানেন কোথায় নামায আদায় করলেন? আমি বললাম, মহান আল্লাহ পাক তিনিই ভালো জানেন। তিনি বললেন, আপনি মাদায়েন শহরে নামায পড়েছেন, হযরত মূসা কালিমুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার গাছের নিচে। অন্য বর্ণনায় আছে, এটা সিনা বা তুর পর্বতের উপত্যকা, যেখানে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত মূসা কালিমুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার সাথে কথা বলেছেন।
অতঃপর বুরাক খুব দ্রুত গতিতে তার দৃষ্টি পর্যন্ত পা ফেলে চলতে লাগলো। তারপর আমরা এক জায়গায় পৌঁছলাম যার সৌধগুলো আমাদের সামনে প্রকাশিত হলো। তখন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এখানে তাশরীফ নেন। তারপর আমি নামলাম এবং নামায আদায় করলাম। অতঃপর হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন: আপনি কি জানেন কোথায় নামায পড়েছেন? অর্থাৎ আপনি তো জানেন। তিনি সবকিছুই জানার পরও বললেন: মহান আল্লাহ পাক তিনিই ভালো জানেন। তখন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, এটা বাইতুল লাহাম। যেখানে হযরত ঈসা রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি বিলাদত শরীফ লাভ করেছেন।
পরিশেষে আমরা ইয়ামনী দরজা মুবারক দিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস শরীফ-এ প্রবেশ করি এবং সেখানে গিয়ে দেখতে পেলাম অসংখ্য অগণিত হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা সেখানে আমার আগমনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। হযরত জিবরীল আলাইহিমুস সালাম তিনি খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশে আমাকে জামায়াতের ইমামতি করতে হবে তা জানালে আমি সমস্ত হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের ইমাম হিসেবে নামায আদায় করি।
‘বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ-এ’ রয়েছে অতঃপর হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি আমার হাত মুবারক ধরে বুরাকে করে আকাশের দিকে নিয়ে গেলেন। অন্যত্র রয়েছে, আমাদের সামনে মি’রাজ শরীফ (আরোহণের সিঁড়ি) হাজির করা হলো আমরা বুরাকে করে সিঁড়ি পথ দিয়ে আসমানে উঠে গেলাম। হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম নামক ফেরেশতা উনার সাথে সাক্ষাৎ হলো। যিনি দুনিয়ার আকাশের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। তার অধীনে সত্তর হাজার হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা রয়েছেন। উনাদের মধ্যে প্রত্যেক হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের সঙ্গীয় বাহিনী হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের সংখ্যা হলো এক লাখ। মহান খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন, ‘খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনিই শুধুমাত্র উনার বাহিনীদের সংখ্যা জানেন।’

দীদার মুবারক পেয়ে ধন্য হলেন হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা:
বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ-এও বর্ণিত রয়েছে, ‘যখন আমরা নিকটবর্তী তথা প্রথম আসমানে উপস্থিত হলাম। তখন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি আসমানের দরজা খুলতে বললেন। অতঃপর আসমানের দ্বাররক্ষী বললেন, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম। দ্বাররক্ষী বললেন, আপনার সঙ্গে আর কেউ আছেন কি? আমি বললাম, আমার সাথে নবী আলাইহিস সালাম উনাদের নবী, রসূল আলাইহিস সালাম উনাদের রসূল, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি রয়েছেন; উনাকে খালিক্ব, মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মুবারক দীদার দানের লক্ষ্যে দাওয়াত দিয়েছেন। তারপর যখন দরজা খুলল, তখন আমি প্রথম নবী ও রসূল হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে দেখতে পেলাম সেই আকৃতিতে যেই আকৃতিতে উনাকে প্রথমে সৃষ্টি করা হয়েছিল। তিনি আমাকে দেখে বলেন, হে শ্রেষ্ঠ নবী! আমার পবিত্রতম আওলাদ, আপনার প্রতি মারহাবা, মুবারকবাদ। এরপর সাইয়্যিদুনা হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার ডান পার্শ্বে অসংখ্য রূহ এবং বাম পার্শ্বেও অনেক রূহ। তিনি ডান দিকে তাকালে হাসেন আর বাম দিকে তাকালে কাঁদেন। হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, ডানদিকের রূহগুলো বেহেশতী ও বাম দিকের রূহগুলো দোযখী। যারা হলো সাইয়্যিদুনা হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার সন্তান। অন্য বর্ণনায় রয়েছে সাইয়্যিদুনা হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার সমস্ত সন্তানের রূহসমূহ উনার সামনে পেশ করা হয়। নেককারদের রূহগুলো দেখে বলেন, “এই সমস্ত রূহ ও দেহ পবিত্র; এদের ইল্লীনে নিয়ে যাও। আর বদকারদের রূহগুলো দেখে বলেন, এদের রূহ অপবিত্র, দেহও অপবিত্র; এদের সিজ্জীনে নিয়ে যাও।”
কিছুদূর গিয়ে দেখতে পেলাম একটি খাঞ্চা রাখা আছে এবং তাতে উত্তম ভাজা গোশত রয়েছে। আর একদিকে রয়েছে অন্য একটি খাঞ্চা। তাতে আছে পঁচা দুর্গন্ধময় ভাজা গোশত। এমন কতকগুলো লোকদের দেখলাম যারা উত্তম ভালো গোশতের কাছে না যেয়ে ওই পচা দুর্গন্ধময় ভাজা গোশত খাচ্ছে। আমি হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম উনাকে বললাম, এ লোকগুলো কারা? উত্তরে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, এরা হলো আপনার উম্মতের ওই সব লোক যারা হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করতো এবং হারামের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করতো।
আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখি যে, কতগুলো লোকের ঠোঁট উটের মতো। হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালামগণ উনারা তাদের মুখ ফেঁড়ে ফেঁড়ে ওই গোশত তাদের মুখের মধ্যে ভরে দিচ্ছেন; যা তাদের নি¤œ পথ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তারা ভীষণ চিৎকার করছে এবং খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সামনে মিনতি করছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? জবাবে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, এরা আপনার উম্মতের ওইসব লোক যারা ইয়াতিমদের মাল অন্যায়ভাবে গ্রাস করে; তারা নিজেদের পেটের মধ্যে আগুন ভরে দিচ্ছে এবং অবশ্যই অবশ্যই তারা জাহান্নামের জ্বলন্ত অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করবে।
আরো কিছুদূর গিয়ে আমি দেখতে পাই যে, কতগুলো স্ত্রীলোক নিজেদের বুকের দ্বারা লটকানো রয়েছে এবং হায়! হায়! করছে। আমি জিজ্ঞাস করলাম, এরা কারা? হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, এরা হচ্ছে উম্মতের মধ্যে যারা ব্যভিচারিনী স্ত্রীলোক।
আর একটু অগ্রসর হয়ে দেখি যে, কতকগুলো লোকের পেট বড় বড় ঘরের মতো। যখন উঠতে চাচ্ছে তখন পড়ে যাচ্ছে এবং বার বার বলতেছে, ‘হে আল্লাহ পাক! কিয়ামত যেন সংঘটিত না হয়।’ কতগুলি জন্তু দ্বারা তারা পদদলিত হচ্ছে। আর তারা খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র দরবারে হা-হুতাশ করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, এরা হচ্ছে আপনার উম্মতের ওইসব লোক যারা সুদ খেতো। খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি কুরআন শরীফ-এ ইরশাদ করেন, “যারা সুদ খায় কিয়ামতের দিন তারা ঠিক সেই ব্যক্তির ন্যায় উঠবে, যাদেরকে শয়তান পাগল করে রেখেছে।”
আরো কিছুদূর গিয়ে দেখি যে, কতকগুলি লোকের পার্শ্বদেশের গোশত কেটে কেটে হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালামগণ উনারা তাদের খাওয়াচ্ছেন। আর তাদেরকে তারা বলছেন, ‘যেমন তোমরা তোমাদের জীবদ্দশায় তোমাদের ভাইদের গোশত খেতে; তেমনই এখনো খেতে থাকো।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরীল আলাইহিস সালাম! এরা কারা।’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘এরা হচ্ছে আপনার উম্মতের ওইসব লোক যারা অপরের গীবত করতো অর্থাৎ দোষ অন্বেষণ করে বেড়াতো।’
খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, অতঃপর আমরা দ্বিতীয় আসমানে আরোহণ করলাম। সেখানে দেখতে পেলাম হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম ও হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম উনাদেরকে। উনারা দু’জন পরস্পর খালাতো ভাই। খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, আমি উনাদের সালাম দিলাম। উনারা আমার সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন: ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার প্রতি মুবারকবাদ।
তারপর তৃতীয় আসমানে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম উনাকে দেখতে পেলাম। আমি উনাকে সালাম দিলাম। তিনি আমার সালামের জবাব দিয়ে বললেন: ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার প্রতি মুবারকবাদ।
অতঃপর হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি আমাকে নিয়ে চতুর্থ আসমানে আরোহণ করলেন। সেখানে হযরত ইদরিস আলাইহিস সালাম তিনি অবস্থান করছিলেন। আমি উনাকে সালাম দিলাম। তিনি আমার সালামের জবাব দিয়ে বললেন: ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার প্রতি মুবারকবাদ।
অতঃপর আমরা পঞ্চম আসমানে আরোহণ করলাম। সেখানে হযরত হারূন আলাইহিস সালাম উনাকে দেখতে পেলাম এবং উনাকে সালাম দিলাম। তিনি আমার সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন: ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার প্রতি মুবারকবাদ।
অতঃপর আমরা ষষ্ঠ আসমানে আরোহণ করলাম, সেখানে হযরত মূসা কালিমুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে দেখতে পেলাম। আমি উনাকে সালাম দিলাম। তিনি আমার সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন: আপনার প্রতি মুবারকবাদ।
হযরত মূসা কালিমুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, লোকেরা বলে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে আমার বড় মর্যাদা রয়েছে। অথচ আমার সামনে যিনি তাশরীফ এনেছেন উনার মর্যাদা-মর্তবা, ফাযায়িল-ফযীলত, খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে সর্বাধিক প্রিয়, পছন্দনীয়। তিনি হচ্ছেন হাবীবুল্লাহ। উনার মর্যাদা-মর্তবা, ফাযায়িল-ফযীলত ও মাক্বাম খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার পরেই। অর্থাৎ তিনি শুধু খালিক্ব, মালিক রব মহান আল্লাহ পাক নন; এছাড়া সবই। সুবহানাল্লাহ!
এরপর আমরা সপ্তম আসমানে আরোহণ করলাম। সেখানে হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে দেখলাম। তিনি স্বীয় পিঠ মুবারক বাইতুল মা’মুরে লাগিয়ে বসে রয়েছেন। আমি বললাম, হে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম! ইনি কে? তিনি বললেন: ইনি হচ্ছেন, আপনার পিতা সাইয়্যিদাতুনা হযরত ইবরাহীম খলীলুর রহমান আলাইহিস সালাম। উনার সাথে উনার ক্বওমের কিছু লোক ছিলেন। আমি উনাদের সালাম দিলাম অতঃপর উনারা সালামের জবাব দিলেন।
খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, আমি আমার উম্মতকে দু’ভাগে বিভক্ত দেখলাম। অর্ধেকের কাপড় ছিলো বকের মতো সাদা এবং বাকি অর্ধেকের কাপড় ছিলো অত্যন্ত কালো। তিনি বলেন, আমি বাইতুল মা’মুরে গেলাম। সাদা পোশাকযুক্ত লোক সবাই আমার পিছনে পিছনে গেল এবং কালো পোশাকধারী লোকদেরকে আমার সাথে যেতে দেয়া হলো না। আর আমি ছিলাম সবার থেকে অনেক অনেক উত্তম (শ্রেষ্ঠ) মর্যাদার অধিকারী। অতঃপর বাইতুল মা’মুর শরীফ-এ নামায আদায় করলাম। অতঃপর আমি সেখান থেকে বের হলে আমার পিছনে সবাই বের হয়ে আসেন। খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, “এই বাইতুল মা’মুর শরীফ-এ প্রত্যেক দিন ৭০ হাজার হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা নামায পড়ে থাকেন। কিন্তু যাঁরা একদিন নামায পড়েছেন উনারা ক্বিয়ামত পর্যন্ত এখানে আর আসবেন না।”

জান্নাত, জাহান্নাম ও অন্যান্য বিষয় পরিদর্শন:
নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের নবী, রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, “অতঃপর আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় উঠিয়ে নেয়া হয়। যার প্রত্যেকটি পাতা এতো বড় যে, আমার সমস্ত উম্মতকে ঢেকে ফেলবে। তাতে একটি নহর প্রবাহিত ছিলো যার নাম সালসাবীল। এর থেকে দুটি প্রস্রবণ বের হয়েছে। একটি হচ্ছে কাওছার।” এই কাওছার সম্পর্কে খালিক্ব, মালিক রব মহান আল্লাহ পাক সূরা কাওছারের মধ্যে বলেছেন, “হে খালিক্ব, মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! নিশ্চয়ই আমি আপনাকে ‘কাওছার’ হাদিয়া করেছি।”
কাওছারের লক্ষ কোটি অর্থ রয়েছে তার মধ্যে দুটি অর্থ প্রধান একটা হচ্ছে, ‘হাউজে কাওছার’ যা বর্ণনা করা হলো আর দ্বিতীয় হচ্ছে ‘খাইরে কাছীর’। অর্থাৎ খালিক্ব, মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সমস্ত ভালাই হাদিয়া করেছেন। সুবহানাল্লাহ!
আর একটি হচ্ছে ‘নহরে রহমত।’ আমি সেই ঝর্ণায় গোসল মুবারক করলাম অর্থাৎ সেই রহমত আমাকে আবৃত করলো। আর আমার উম্মতের পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে যদি তারা এই পবিত্র নহর পেতে পারে।
অতঃপর আমাকে জান্নাতের দিকে তা’যীমের সাথে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আমি একটি হুর দেখলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কার? উত্তরে সে বলল, আমি হলাম হযরত যায়িদ ইবনে হারিছা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার। আমি সেখানে বিশুদ্ধ নষ্ট না হওয়া পানি, স্বাদ পরিবর্তন না হওয়া দুধ, নেশাহীন সুস্বাদু শরাব এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মধুর নহর দেখতে পেলাম। জান্নাতের ডালিম ফল ছিলো বড় বড় বালতির সমান। পাখিগুলো তোমাদের এই তক্তা ও কাঠের ফালির মত। নিশ্চয়ই খালিক্ব, মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার নেককার বান্দাদের জন্যেই ওইসব নিয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছেন যা কোন চক্ষু দর্শন করেনি, কোন কর্ণ শ্রবণ করেনি এবং কোন অন্তরে কল্পনাও জাগেনি। সুবহানাল্লাহ!
আসমানে সফরের সময়ই নবী আলাইহিস সালাম উনাদের নবী, রসূল আলাইহিস সালাম উনাদের রসূল, ছাহিবে মিরাজ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বেহেশত, দোযখ প্রত্যক্ষ করেন এবং বিভিন্ন পাপের কি রকম শাস্তি পরকালে হবে তা তিনি প্রত্যক্ষ করেন। সুদ, ঘুষ, অত্যাচার, নামায বর্জন, ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ, প্রতিবেশীদের উপর জুলুম স্বামীর অবাধ্যতা, বেপর্দা ও অন্য পুরুষকে নিজের রূপ প্রদর্শন, জিনা-ব্যভিচার ইত্যাদির শাস্তি খালিক্ব, মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বচক্ষে দেখেন। বেহেশতে উম্মুল মু’মিনীন আল উলা কুবারা আলাইহাস সালাম উনার মাক্বাম, হযরত ফারূক্বে আযম আলাইহিস সালাম উনার মাক্বাম, হযরত বিলাল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার নালাইন মুবারকের শব্দ এসব দেখেন এবং শুনেন।
এরপর হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি খালিক্ব, মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সিদরাতুল মুনতাহা বা সীমান্তের কুলবৃক্ষের নিকট নিয়ে যান।
হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, “এই বৃক্ষের পাতাগুলো হাতির কানের ন্যায় বড় এবং ফলগুলো উহুদ পাহাড়ের মত। শহীদগণের রূহ মুবারক সবুজ পাখির ছূরতে উক্ত বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করছেন।”

হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম উনার সীমানা:
সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছে নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের নবী, রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের রসূল, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট থেকে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বিদায় নিলেন এবং বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি যদি ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ থেকে এক আঙুল সম্মুখে অগ্রসর হই তাহলে আমার ছয়শত থেকে ছয় হাজার পাখা নূরের তাজাল্লীতে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।” সুবহানাল্লাহ!
স্মরণীয় যে, খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মতো কেউই নেই, ছিল না ও হবেও না। কারণ তিনি হচ্ছেন খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব। নিছবত, তায়াল্লুক, সম্পর্ক, অবস্থান সবকিছুই দায়িমীভাবে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সঙ্গে।
এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে, “খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন,
لى مع الله وقت لايسعن فيه ملك مقرب و لانبى مرسل

“খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে আমার প্রতিটি মুহূর্ত বা সময় এমনভাবে অতিবাহিত হয়, যেখানে কোনো হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম ও কোনো নৈকট্যশীল হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদেরও স্থান নেই।” সুবহানাল্লাহ!
মূলত খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার বিষয়গুলো যেমন কুদরতের অন্তর্ভুক্ত; একইভাবে হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের নবী, রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিষয়গুলোও কুদরতের অধীন। উনার সৃষ্টি, অবস্থান, ইসরা, মি’রাজ শরীফ ইত্যাদি সবকিছুই কুদরতের অন্তর্ভুক্ত। এক কথায় উনার পরিচয়- উনি শুধু খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক নন, এছাড়া সবদিক থেকে তিনি খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার গুণে গুণান্বিত। যা মিরাজ শরীফ-এর মাধ্যমে উনার বেমেছাল শান মুবারক-এর যৎকিঞ্চিৎ প্রকাশ করা হয়েছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, যেখানে হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের সাইয়্যিদ হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি জ্বলে-পুড়ে যান, উনার সীমানা শেষ; সেখান থেকে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ভ্রমণ শুরু। সুবহানাল্লাহ!

রফরফে আরোহন মুবারক:
হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বিদায়ের পর ‘রফরফ’ নামক একটি বাহন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খিদমতে হাযির হলো। তিনি বাহনে তাশরীফ নিলেন। এরপর ‘রফরফ’ খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে নিয়ে সত্তর হাজার নূরের পর্দা মুবারক পাড়ি দিলেন। এক একটি পর্দা মুবারকের ঘনত্ব ছিল পাঁচশত বৎসরের রাস্তা।

ধন্য হলো আরশে আযীম:
এরপর খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ‘আরশে মুয়াল্লায়’ পৌঁছলেন।
‘আরশে আ’যীমে’ পৌঁছে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি দেখতে পেলেন ‘লাওহে মাহফুজ’। সেখানে লেখা রয়েছে- হাদীছে কুদসী শরীফ-এ খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, “আমার রহমত গযবের উপর প্রাধান্য পেয়েছে।”
এরপর হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের নবী, হযরত রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের রসূল, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ‘আরশে মুয়াল্লা উনাকে’ লক্ষ্য করে বললেন, ‘আমি গোটা আলমের জন্য রহমতস্বরূপ।’ তোমাদের জন্য কিরূপ রহমত? ‘আরশে মুয়াল্লা’ তিনি তখন বিনয় ও আদবের সাথে জবাব দিলেন, “খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে সৃষ্টি করার পর আমার মধ্যে কালিমা শরীফ-এর প্রথম অংশ
لا اله الا الله
)‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’( লিখে দিলেন তখন খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার কুদরতী শান মুবারকের কারণে আমার মধ্যে কম্পন শুরু হয়ে গেলো। মনে হচ্ছে যেন আমি ‘আরশে মুয়াল্লা’ ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যাবো। তারপর যখন আপনার নূরময় নাম মুবারক
محمد رسول الله صلى الله عليه و سلم
‘মুহম্মদুর রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ লিখে দিলেন, তখন আমার কম্পন বন্ধ হয়ে গেলো। সুতরাং আমার জন্য আপনি সবচেয়ে বড় রহমত।” সুবহানাল্লাহ!
খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন ‘আরশে মুয়াল্লায়’ উনার না’লাইন শরীফ খুলে তাশরীফ নিবেন। এমতাবস্থায় ‘আরশ পাক’ তিনি আর্জি জানালেন, হে বারে ইলাহী! আমি ‘আরশে মুয়াল্লা’ আপনার নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ক্বদম মুবারকের ধুলি পেয়ে ধন্য হওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ। আপনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যেন উনার না’লাইন (স্যান্ডেল) মুবারক পরেই ‘আরশে মুয়াল্লায়’ (তাশরীফ নেন) ক্বদম মুবারক রাখেন। তাহলে ‘আরশে মুয়াল্লা’ সম্মানিত হয়ে যাবে, মর্যাদাবান হয়ে যাবে। সুবহানাল্লাহ!
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ‘আরশে মুয়াল্লায়’ না’লাইন শরীফ পরেই তাশরীফ নিলেন। ‘আরশে মুয়াল্লা’ ধন্য হয়ে গেলেন। সুবহানাল্লাহ!

মহান আল্লাহপাক উনার আনুষ্ঠানিক দীদার মুবারকে:
এবার খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি লা-মাকামের দিকে অর্থাৎ অজানার দিকে রওনা হলেন। যেখানে স্থান কাল বলতে কিছুই নেই। গোটা আলম, এখন খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ক্বদম মুবারকের নিচে। আসমান, যমীন, চন্দ্র, সূর্য, আরশ-কুরসী এমনকি ‘আলমে খালক্ব’ ‘আলমে আমর’ সবকিছুই নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র ক্বদম মুবারকের তলে। তিনি সবকিছু অতিক্রম করে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার নিকটবর্তী হলেন।
এ কারণে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি হাদীছে কুদসী শরীফ-এ ইরশাদ করেন,
يا حبيبى صلى الله عليه و سلم! انا و انت و ما سواك خلقت لاجلك، و (قال حبيب الله صلى الله عليه وسلم يا ربى) ما انا و ما سواك تركت لاجلك-
“হে হাবীব আমার! আমি এবং আপনি, আর কেউ না। আর আপনার মুহব্বতেই আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি।” তখন খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব তিনি জবাব দিলেন, “হে বারে ইলাহী! আমিও না, শুধুমাত্র আপনিই; আর আপনার মুহব্বতে আমি সমস্ত কিছুই তরক করেছি।” সুবহানাল্লাহ!
মি’রাজ শরীফ-এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, ঊর্ধ্বারোহণ। শরীয়তের পরিভাষায় খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার যে মুবারক সাক্ষাৎ বা মুবারক দীদার হয়েছে সেটাই মি’রাজ শরীফ।
আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা হচ্ছে, যমীনে কেউ সরাসরি স্বচক্ষে হাক্বীক্বীভাবে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনাকে কখনো দেখবে না। কিন্তু খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের নবী, রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে যেহেতু বেমেছাল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, সেজন্য তিনি খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার মুবারক সাক্ষাতে গিয়েছেন, খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার মুবারক দীদার ও ছোহবত লাভ করেছেন।
এ সম্পর্কে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি সূরা বনী ইসরাইল-এর ১ নম্বর আয়াত শরীফ-এ বর্ণনা করেন।
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ
অর্থ: “পূতঃপবিত্র ও মহিমাময় খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক, তিনি স্বীয় হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে রাত্রে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ছফর করিয়েছেন; যার চারদিকে আমি বরকতময় করেছি যাতে আমি উনাকে দেখিয়ে দেই আমার নিদর্শনগুলো। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও সর্বদ্রষ্টা।”
অর্থাৎ উক্ত আয়াত শরীফ-এ উল্লেখ্য পবিত্র রাত্রিতে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার রসূল, আখিরী নবী, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুসরালীন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আরশে মুয়াল্লায় উনার মুবারক দীদার দান করেন।
অত্র আয়াত শরীফ-এ
لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا
‘লিনুরিয়াহু মিন আয়াতিনা’ এর তাফসীরে বিশ্ব সমাদৃত তাফসীর গ্রন্থ ‘তাফসীরে মাযহারী’তে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘ওই রাত্রিতে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার হাবীব, আখিরী নবী, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার কুদরতের বিস্ময়কর নিদর্শনগুলো দেখিয়েছেন। নিদর্শনসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় মহান নিদর্শন হচ্ছে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার মুবারক দীদার বা মুবারক সাক্ষাৎ এবং খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে একান্তভাবে নিরিবিলি আরশে মুয়াল্লায় আলাপ-আলোচনা করেছেন। আর খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সঙ্গে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একান্তভাবে মুবারক দীদার মুবারক বা দর্শন মুবারক ও কথাবার্তা হয়েছে এবং আরো অনেক নিদর্শন দেখানো হয়েছে।’ সুবহানাল্লাহ!
এজন্য আয়াত শরীফ-এ বলেছেন, ‘উনাকে দেখিয়ে দেই আমার নিদর্শনগুলো’। অর্থাৎ খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব তিনি খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সবচেয়ে প্রিয়তম হাবীব বা আশিক ও মাশুক; যার কারণে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি সমস্ত কায়িনাতকে বুঝিয়ে দিলেন যে, খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কতটুকু নিগূঢ় সম্পর্ক, নিছবত ও তায়াল্লুক। উনাদের মাঝে কত গভীর মুহব্বত। এই মুহব্বতের প্রকাশ ঘটানো হলো আনুষ্ঠানিকভাবে মি’রাজ শরীফ-এর মাধ্যমে। সুবহানাল্লাহ!
খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন ‘ছিদরাতুল মুনতাহা’ পাড়ি দিয়ে ‘আরশে মুয়াল্লায়’ তাশরীফ নিলেন; তখন খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সঙ্গে নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের নবী, রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক দীদার ও মুবারক সাক্ষাৎ হলো এ রকম- যেন দু’ধনুকের মাথা একত্র করলে যত কাছাকাছি হয় তদ্রƒপ অথবা দু’ধনুকের মাথা মিলালে যতটুকু কাছাকাছি হয় তার চেয়েও নিকটবর্তী। সুবহানাল্লাহ! অতঃপর খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একান্ত কথাবার্তা আলাপ-আলোচনা হলো। (তাফসীরে মাযহারী/৪০০)

বরকতময় কিছু কথোপকথন মুবারক:
স্মরণীয় যে, খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সঙ্গে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দীর্ঘক্ষণ ধরে অনেক অনেক আলাপ-আলোচনা হয়। উম্মতের প্রয়োজন অনুযায়ী তা কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে বর্ণনা করা হয়েছে। আর খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি হচ্ছেন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একান্ত হাবীব ও মাহবুব। এ জন্য হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অবস্থান, তায়াল্লুক, মুবারক দীদার ও ছোহবত সব কিছুই দায়িমীভাবে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে। যার মধ্যে বিন্দুমাত্র ফাঁক নেই।
খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার দরবার শরীফ-এ তাশরীফ আনলেন; তখন খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি বললেন: “হে আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি আমার জন্য কি নিয়ে এসেছেন?” তখন খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন:
التحيات لله والصلوات والطيبات.
“আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াছ ছলাওয়াতু ওয়াত্ব ত্বয়্যিবাত”
অর্থ: নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক আপনার জন্য আমার মৌখিক, শারীরিক, আর্থিক বা জবানী, জিসমানী ও মালী সর্বপ্রকার ইবাদত-বন্দেগী ও প্রশংসা হাদিয়াস্বরূপ পেশ করছি।”
জাওয়াবে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি সালাম দিয়ে বললেন,
السلام عليك ايها النبى ورحمة الله وبركاته.
“আস সালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রহমতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ”
অর্থাৎ “হে আমার প্রিয় হাবীব! আপনার উপর সালাম, রহমত ও বরকত।”
উক্ত সালামের জাওয়াবে নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের নবী, রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন,
السلام علينا وعلى عباد الله الصالحين.
“আস সালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিছ ছলিহীন”
অর্থাৎ “হে বারে ইলাহী! আপনার সালাম আমাদের উপর এবং সমস্ত ছলিহীন (নেককার) বান্দাদের উপরও সালাম।” অর্থাৎ এখানে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের নবী, রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার উম্মতদের ভুললেন না। সমস্ত উম্মতকে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সালাম; রহমত, বরকত ও নিছবতে সংযুক্ত করে নিলেন। সুবহানাল্লাহ!
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সমস্ত উম্মত তথা একলক্ষ চব্বিশ হাজার মতান্তরে দুইলক্ষ চব্বিশ হাজার নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম, সমস্ত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, সমস্ত ওলীআল্লাহ, গাউছ, কুতুব, আবিদ, আবদাল, নকীব, নুকাবা রহমতুল্লাহি আলাইহিম তথা খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সমস্ত নেককার বান্দা উনাদের উপরও সালাম। সুবহানাল্লাহ!
যখন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি ও আরশের মুকাররাবীন হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার সঙ্গে নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের নবী, রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিগূঢ় মুবারক দীদার-এ খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার দর্শন, সালাম বিনিময়, মুবারক কথোপকথন শুনে বলে উঠলেন,
اشهد ان لا اله الا الله واشهد ان محمدا عبده ورسوله
.“আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ও রসূলুহু”
অর্থাৎ “আমি তথা আমরা প্রত্যেকেই সাক্ষ্য দিচ্ছি, খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার প্রিয়তম হাবীব ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।”

ছাহিবে কা’বা ক্বাওসাইনে আও আদনা:
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনাকে অবশ্যই অবশ্যই দেখেছেন; যা কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস উনাদের দ্বারা প্রমাণিত। কুরআন শরীফ উনার মধ্যে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন,
ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى – فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى
অর্থ: “অতঃপর তিনি নিকটবর্তী হলেন এবং আরো ঝুঁকে গেলেন। ব্যবধান ছিল দু’ধনুক বা তার চেয়েও কম।” (সূরা নজম: আয়াত শরীফ ৮, ৯)

উপরোক্ত আয়াত শরীফ উনার তাফসীরে হযরত ইমাম বাগবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত শারিক ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণনা করেন যে, “খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মহান আল্লাহ রব্বুল ইজ্জত উনার নিকটবর্তী হলেন এবং আরো ঝুঁকে গেলেন। খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার ও নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মাঝে ব্যবধান ছিলো দু’ধনুক বরং তার চেয়েও কম।” (তাফসীরে মাযহারী : জিলদ ৯, পৃষ্ঠা ১০৫)
পবিত্র সূরা নজম শরীফ উনার ১৭ নম্বর আয়াত শরীফ উনার মধ্যে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ করেন,
مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى
অর্থ: “উনার দৃষ্টি মুবারক ভ্রষ্ট হয়নি, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি।”
অর্থাৎ খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার মুবারক দীদার বা দর্শন মুবারক লাভে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দৃষ্টি মুবারক ভ্রম ঘটেনি, ডানদিকেও না বাম দিকেও না। আর খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার দর্শন মুবারক-এ নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিন্দুমাত্র ভুলও হয়নি। বরং নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের নবী, রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হাক্বীক্বীভাবে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার দর্শন লাভ করেছেন। (তাফসীরে মাযহারী : ৯ জিলদ, পৃষ্ঠা ১১৩)
এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ উনার ইরশাদ হয়েছে,
عن حضرت ابن عباس رضى الله تعالى عنهما قال قال حضرت رسول الله صلى الله عليه وسلم رايت ربى عز وجل فى احسن صورة-
অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, আমি আমার মহান রব উনাকে উত্তম ছূরত মুবারকে দেখেছি।” (মুসতাদরিকে হাকিম)

পাঁচ ওয়াক্ত নামায হাদিয়া মুবারক:
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, হে আমার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আসমান ও যমীন সৃষ্টির দিন থেকে আমি আপনার ও আপনার উম্মতের উপর পঞ্চাশ রাকাত নামায ফরয করেছি। সুতারাং আপনি ও আপনার উম্মতদেরকে এ আদেশ মুবারকের অনুবর্তী করুন। ……. হযরত জিবরীল আমীন আলাইহিস সালাম তিনি আমার হাত মুবারক ধরলেন এবং আমি দ্রুতগতিতে সেখান থেকে ফিরে এলাম। সাইয়্যিদুনা হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার নিকট আমি ফিরে এলাম কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না। এরপর আমি সাইয়্যিদুনা হযরত মুসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার কাছে এলাম। তিনি বললেন, আপনাকে কি বলা হলো ইয়া রসূলাল্লাহ! ইয়া হাবীবাল্লাহ! ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি বললাম, আমার রব মহান আল্লাহ পাক তিনি আমার ও আমার উম্মতের উপর পঞ্চাশ রাকআত নামায ফরয করেছেন। সাইয়্যিদুনা হযরত মূসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আপনার উম্মত এই পঞ্চাশ রাকআত নামায আদায় করার শক্তি রাখে না। তাই মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট পুনরায় ফিরে গিয়ে হালকা করার আবেদন করুন। আমি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট পৌঁছলাম এবং খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট আরয করলাম, হে আমাদের খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক! আমাদের নামায আরো হালকা করে দিন। খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করলেন, আমি ১০ রাকআত নামাযকে হ্রাস করে দিলাম। পুনরায় সাইয়্যিদুনা হযরত মূসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার নিকট ফিরে এলাম এবং বললাম, দশ রাকআত হ্রাস করা হয়েছে।
হযরত মুসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি দয়া করে আবার ফিরে যান আরো হালকা করার আবেদন করুন। এরপর রাবী শেষ পর্যন্ত পবিত্র হাদীছ শরীফখানা বর্ণনা করেছেন। অবেশেষে খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি বললেন,
هن خمس بخمسين
অর্থাৎ “এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায দিলাম যা পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাযের সমান।”

জমীনে অবতরন মুবারক:
অতঃপর নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যমীনে এসে পৌঁছলেন। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম উনাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আসমানে আমি যার কাছ দিয়ে এসেছি, সেই আমাকে সালাম বা মারহাবা দিয়েছেন এবং আমাকে দেখে হেসেছেন কিন্তু এক ব্যক্তিকে আমি সালাম দিলে সে আমার সালামের জবাব দিয়েছেন এবং আমাকে মারহাবা দিয়েছেন কিন্তু আমাকে দেখে তিনি হাসেননি। ওই ব্যক্তি কে? হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, উনি হচ্ছেন দোযখের পাহারাদার বা রক্ষক হযরত মালেক আলাইহিস সালাম। দোযখ সৃষ্টির পর থেকে তিনি কখনও হাসেননি। কাউকে দেখে তিনি হাসলে আপনাকে দেখে অবশ্যই হাসতেন।
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, এরপর আমি ফিরে আসার জন্যে বোরাকে সাওয়ার হলাম। পথিমধ্যে কুরাইশদের একটি উটের কাফেলার কাছ দিয়ে আসা হলো। কাফেলাটি খাদ্যশস্য বহন করছিলো। একটি উটের পিঠে দুটি বস্তা ছিলো, একটি কালো রঙের অপরটি সাদা রঙের। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কাফেলার মুখোমুখি হলেন সেই উটটি উত্তেজিত হয়ে পলায়ন করলো। কিছুদূর ছুটে যেতেই হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলো। ফলে উটের হাত পা ভেঙ্গে গেলো।
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সেখান থেকে চলে এলেন। তিনি সকাল বেলা পবিত্র মি’রাজ শরীফ উনার উক্ত ঘটনা প্রকাশ করলেন।
মূলত পবিত্র মি’রাজ শরীফ বেমেছাল মর্যাদা-মর্তবা প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আর পবিত্র মি’রাজ শরীফ সম্পর্কে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের ছহীহ আক্বীদা পোষণ করতে হলে, যামানার সুমহান মুজাদ্দিদ, মুজাদ্দিদে আ’যম, খলীফাতুল্লাহ, খলীফাতু রসূলিল্লাহ, ইমামুল আইম্মাহ, মুহইস সুন্নাহ, কুতুবুল আলম, হুজ্জাতুল ইসলাম, আওলাদে রসূল, সাইয়্যিদুনা হযরত মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার ছোহবত তথা সংস্পর্শে আসতে হবে, যা সমস্ত মুসলমান উনাদের জন্য ফরয-ওয়াজিব। খালিক্ব, মালিক, রব মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদের সকলকে কবুল করুন। আমীন।

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে