জানুন ধর্ম ব্যবসায়িদের সম্পর্কে ।


কুরআন শরীফের সূরা আ’লা-এর ১৪-১৫ নম্বর আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, যারা (লোভ, কাম, ক্রোধ, মদ, মোহ, মাৎসর্য, মিথ্যা, ধোঁকা ইত্যাদি রিপু থেকে এবং অন্যান্য অপবিত্র জিনিসসমূহ হতে) পবিত্রতা হাছিল করে আল্লাহ পাক-এর নাম মুবারক স্মরণ করবে এবং নামায আদায় করবে তারাই মুক্তি লাভ করবে।”
যারা লোভ, কাম, ক্রোধ, মদ, মোহ, মাৎসর্য, মিথ্যা, ধোঁকা ইত্যাদি রিপু বা আত্মিক রোগ হতে পবিত্রতা বা তাযকিয়া হাছিল করে না তারা অসৎ আলিম বা অসৎ পীর। এই ধরনের অসৎ আলিম ও ভণ্ড পীরের নিকট থেকে দূরে সরে আত্মরক্ষার জন্য আওলিয়ায়ে কিরামগণ সর্বদা সতর্ক করেছেন। যেমন, সাইয়্যিদুশ্ শোয়ারা, সুলতানুল আওলিয়া, হযরত মাওলানা জালাল উদ্দিন রূমী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, অনেক শয়তান, মানুষের অর্থাৎ আলিমের বা পীরের ছূরত ধরে দুনিয়াতে বিদ্যমান আছে। অতএব, হে মু’মিনগণ! সতর্ক থাকো, হক্বের অর্থাৎ শরীয়ত ও সুন্নতের মাপকাঠির দ্বারা যাচাই করে নিও। সবাইকে পীর বলে, আলিম বলে স্বীকার করে তার হাতে হাত মিলাবে না। অর্থাৎ তাকে সমর্থন করা বা তার নিকট বাইয়াত হওয়া যাবে না।

সূরা নাস-এর ১-৩ নম্বর আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ পাক সকল প্রকার কুমন্ত্রণাকারীদের থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করার জন্য ইরশাদ করেন, “বলো, আশ্রয় নিচ্ছি মানুষের পালনকর্তার, অধিপতির এবং ইলাহ বা মা’বুদের।” অর্থাৎ জ্বিন শয়তান এবং মানুষ শয়তান হতে তথা বৃহত্তর স্বার্থের দোহাই দানকারী, মনুষ্যরূপী শয়তান হতে এবং যারা সরাসরি অন্তরে কুমন্ত্রণা ঢালে তাদের থেকে সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য আল্লাহ পাক-এর আশ্রয় প্রার্থনা করতে শিক্ষা দেয়া হয়েছে। যেহেতু আত্মাই হলো মানুষের আসল বা মূল। আর দেহ হলো ফারা বা শাখা। তাই নীতি বাক্যে বলা হয়, ‘ছূফী হও- ছূফী সেজো না।’

উলামায়ে ‘ছূ’ অর্থাৎ ধোঁকাবাজ, ধর্মব্যবসায়ী আলিম ও ভণ্ড পীরের সম্পর্কে সাইয়্যিদুনা হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাবে বলেছেন, ‘উলামায়ে ‘ছূ’ যারা, কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফের ইলম তাদের পক্ষে সাংঘাতিক ক্ষতিজনক বলে প্রমাণিত হয়েছে।’

হাদীছ শরীফে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশি (সাংঘাতিক) আযাব হবে সেই আলিমের, যে তার ইল্ম দ্বারা উপকার লাভ করতে পারেনি।’

ইল্ম আল্লাহ পাক-এর নিকট সবচেয়ে প্রিয় বা পছন্দনীয়। আর দুনিয়া হচ্ছে আল্লাহ পাক-এর নিকট নিকৃষ্ট, ঘৃণিত ও অপছন্দনীয়। অথচ দুনিয়ার আলিমরা আল্লাহ পাক-এর পছন্দনীয় বিষয়কে অপছন্দনীয় মনে করে এবং আল্লাহ পাক-এর নিকট যা অপছন্দনীয় তারা সেটাকে ইজ্জত বা সম্মানের বিষয় বলে মনে করে। হাক্বীক্বত এর চেয়ে নিকৃষ্ট আর কি হতে পারে যে, তারা আল্লাহ পাক-এর মত ও পছন্দের খিলাফ মত পেশ ও পছন্দ করে থাকে।’

অনেকে প্রশ্ন করে থাকে, একদিকে বড় বড় জঘন্য ঘৃণিত পাপ করা সত্ত্বেও অন্যদিকে তারা মুদাররিসি করছে, হাদীছ শরীফ পড়াচ্ছে, তাফসীর পড়াচ্ছে, মুফতীগিরি করছে, ওয়াজ-নছীহত করে তাবলীগের কাজ করছে, পীর-মুরীদি করে ইরশাদ ও তালক্বীনের কাজ করছে। এগুলোর দ্বারা দ্বীনের খেদমত হচ্ছে, লোকদের উপকার হচ্ছে, এর দ্বারা হয়ত লোকেরা উপকৃত হবে? সাইয়্যিদুনা হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এই প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন, ওয়াজ-নছীহত করা এবং পীর-মুরীদি ইত্যাদি উপকারে আসবে যদি এই সব কাজ খাঁটিভাবে শুধু আল্লাহ পাক-এর সন্তুষ্টির জন্য হয় এবং তার মধ্যে বিন্দুমাত্র হুব্বে মাল অর্থাৎ টাকা-পয়সা, জমি-জমা, বাড়ি-গাড়ি, দালান-কোঠা, ফার্নিচার-পোশাক হাছিল হওয়া নেতৃত্ব বা শান-শওকত, জাঁকজমক হাছিলের আকাঙ্খা না থাকে। কিন্তু উলামায়ে ‘ছূ’রা দুনিয়ার মোহে পড়ে দুনিয়াদার পদমর্যাদা ও গদি লাভের জন্য সর্বদা মশগুল থেকে বাহ্যত কিছু দ্বীনী তা’লীমের কাজ করলেও হাক্বীক্বতে তা করে লোক ভুলানোর জন্য।

বস্তুতঃ আলিমরা দু’ভাগে বিভক্ত। প্রথমতঃ দুনিয়ার অসৎ আলিম, দ্বিতীয়তঃ দ্বীনদার হক্কানী সৎ আলিম। উলামায়ে ‘ছূ’দের নিকৃষ্ট ধারণা সম্পর্কে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, ‘তারা মনে করে যে, তারা কিছু একটা হয়েছে। বড় কিছু একটা সম্পদ অর্জন করেছে, কিন্তু প্রকৃত কথা এই যে, এই ধারণা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ মিথ্যা। তারা শয়তানের প্রভাবে পড়েছে। শয়তান তাদেরকে আল্লাহ পাক-এর যিকির ও কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। ফলে তারা শয়তানের দলভুক্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই জেনে রাখ, যারা শয়তানের দলভুক্ত-শয়তানের দোসর, উলামায়ে ‘ছূ’- তাদের জীবন ব্যর্থ, ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

সাইয়্যিদুনা হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, আমার একজন দোস্ত (মুরীদ) দেখতে পেয়েছিলেন যে, শয়তান মানুষকে গুমরাহ ও পাপ পথে চলবার জন্য কুমন্ত্রণা দেয়া থেকে বিরত হয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে আছে। এর কারণ জিজ্ঞাসা করায় শয়তান উত্তরে বলেছে, এই যামানার উলামায়ে ‘ছূ’রা এই কাজে আমাকে খুব বেশি সাহায্য করেছে। কাজেই আমি নিশ্চিন্তে বসে আছি।

‘সত্য বলতে কি, এই যামানায় যত খারাবী পয়দা হয়েছে, শরীয়ত জারীর কাজে ত্রুটি হচ্ছে, শরীয়তকে পরিবর্তন করা হচ্ছে, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তরীক্বা জারী হচ্ছে না বরং তাকে অচল অথর্ব বলে বাদ দেয়া হচ্ছে- এসবই হচ্ছে উলামায়ে ‘ছূ’ যারা তাদেরই কারণে, তাদের নিয়ত ও দিল খারাপ হয়ে যাওয়ার কারণে।

যেসব আলিমের মধ্য হতে সম্পদের লোভ ক্ষমতার লোভ এখনও দূর হয়নি তারা হক্ব মতে ও পথে আসতে পারে না। ফিক্বাহ্র কিতাবের মধ্যে বিভিন্ন ফুক্বাহার বিভিন্ন মত লিপিবদ্ধ আছে। তারা নিজের মতলব হাছিল করার উদ্দেশ্যে ঐ মত গ্রহণ করে যে মতের দ্বারা ক্ষমতাসীনদের নৈকট্য এবং সন্তুষ্টি হাছিল করতে পারবে। আল্লাহ পাক-এর দ্বীন জারী করা তাদের উদ্দেশ্য নয়।

সকলকে সতর্ক থাকতে হবে যে, ইলমের দ্বারা আল্লাহ পাক-এর দ্বীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তরীক্বা জারী করা ছাড়া নিজের স্বার্থ উদ্ধার, মতলব হাছিল ইত্যাদি অন্য কিছু যেন উদ্দেশ্য না হয়। যাদের এরূপ উদ্দেশ্য তারা উলামায়ে ‘ছূ’। তারা শরীয়ত ও চরিত্র ধ্বংসের তথা গুমরাহী বিস্তারের মূল হোতা। তাদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা অবশ্য কর্তব্য।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

  1. চরম বাস্তবসম্মত এবং শিক্ষামূলক পোস্ট লিখার জন্য আপনাকে মুবারকবাদ। অনেক কিছু জানতে পারলাম। আশা করি আরো লিখবেন।

  2. mahiun says:

    রাসুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- পৃথিবীতে এমন কোন গৃহ ও তাবু থাকবে না যেখানে এই ইসলাম প্রবেশ না করবে। [হাদীসঃ মেকদাদ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে আহম্মেদ ও মেশকাত]অর্থাৎ সমস্ত পৃথিবী ইসলামের শান্তির ছায়াতলে যতদিন না আসবে ততদিন কোনকিছুতেই শান্তি আমবে না। কেননা রাসুলাল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন তাতো সত্যি হবেই।
    আল্লাহ বলেছেন- যারা আমার আয়াত গোপন করে ও তা বিক্রি করে তারা আগুন ছাড়া আর কিছূই খায়না। কিন্তু বর্তমানে এটা একটা স্বাভাবিক অবস্থা হয়ে গেছে।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে