জালিম, সন্ত্রাসী জাতি ইহুদীদের করুণ পরিণতি


জালিম, সন্ত্রাসী জাতি ইহুদীদের করুণ পরিণতি

তৃতীয় সহস্রাব্দির প্রথম দশক এমন সময় শেষ হতে চলেছে, যখন কথিত এই সভ্য জগতে যুদ্ধ ও সহিংসতার কারণে প্রতিনিয়ত শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। অতীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে মানুষের আরাম-আয়েশ ও সুখ-সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পেতো, সমাজ আরো সামনের দিকে এগিয়ে যেত। কিন্তু বিশ্বের কিছু আধিপত্যকামী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আত্মম্ভরিতা ও লোভ-লালসার কারণে মানুষ তীব্র কষ্টের মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ব সমাজকে সারাক্ষণ তীব্র উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। যে প্রযুক্তি মানুষকে আরাম-আয়েশ দিতে পারতো, তা এখন মানুষ হত্যার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন সরকার সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে ইরাক ও আফগানিস্তানে লাখ লাখ মানুষকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তাদের এ গণহত্যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে বিংশ শতাব্দির যে দুঃখজনক ও লোমহর্ষক ঘটনা নতুন সহস্রাব্দেও মধ্যপ্রাচ্যসহ সারাবিশ্বের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো বিশ্ব ইহুদীবাদী চক্র ও তাদের পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষকদের মাধ্যমে ফিলিস্তিন জবরদখল। ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিন জবরদখল করেছে ৬০ বছর হলো। কিন্তু এখনো ফিলিস্তিনী জনগনের ওপর চলছে গণহত্যা, জুলুম ও নির্যাতন। কথায় কথায় ফিলিস্তিনী জনগণকে পাখির মত গুলি করে মারা হচ্ছে, যখন তখন দল বেধে নিরপরাধ ফিলিস্তিনী জনগণকে ধরে নিয়ে জেলখানায় নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এমনকি ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনী জনগণের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে ভেঙ্গে দিচ্ছে এবং তাদের বিস্তৃর্ণ কৃষিজমির ফসলও নষ্ট করে ফেলছে। ফিলিস্তিন জবরদখলের দীর্ঘ ৬ দশক পর এখনো ফিলস্তিন সংকট মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সমস্যা হয়ে রয়েছে।

ফিলিস্তিনী ভূখন্ড জবরদখল করে ইসরাইল নামক একটি অবৈধ রাষ্ট্রকে মুসলিম বিশ্বের মধ্যখানে চাপিয়ে দেয়ার মাধ্যমে পাশ্চাত্য মুসলমানদের প্রতি চরম অবিচার করেছে। তারা ফিলিস্তিন তথা মুসলমানদের ঘরের মধ্যে সংঘর্ষ চাপিয়ে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে একটি চাপা আগ্নেয়গিরিতে রূপান্তরিত করেছে। ইহুদীবাদীদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পশ্চিমাদের যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা তারা ফিলিস্তিনী জনগণের কাজ থেকে উসুল করে নিচ্ছে। আর তারা যে অশুভ ইহুদীবাদী দাবানল মধ্যপ্রাচ্যের বুকে জ্বালিয়ে দিয়েছে, তার লেলিহান শিখা এখন সারাবিশ্বকে গ্রাস করতে চাইছে। আধিপত্যকামীদের আগ্রাসন থেকে জাতিগুলোকে রক্ষা করার নামে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মানুষ আশা করেছিল, এবার বুঝি ঐ বিশ্ব সংস্থার ছায়াতলে সবাই প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। কিন্তু জাতিসংঘের ওপর পরাশক্তিগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য সে আশার গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছে।

জাতিগুলোর অধিকার রক্ষার পরিবর্তে বিংশ শতাব্দি জুড়ে জাতিসংঘকে ব্যবহার করে বৃহৎ শক্তিগুলো জাতিসমূহের অধিকার পদদলিত করে চলেছে। এ পরিস্থিতিকে ফিলিস্তিন জবরদখলের মত আরেকটি বিপর্যয় বলা যেতে পারে। ফিলিস্তিনী জনগণের নিজেদের মাতৃভূমিতে বসবাস করার অলংঘনীয় অধিকার পদদলিত করে ফিলিস্তিনকে দ্বিখন্ডিত করার প্রস্তাব পাশের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ তার কার্যক্রম শুরু করে। পাশ্চাত্য ও ইহুদীবাদীদের সম্মিলিত চক্র ফিলিস্তিনী জনগণের ঐতিহাসিক ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার উপেক্ষা করে ফিলিস্তিন জবরদখল ও ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে স্বীকৃতি দেয়। ইউরোপীয়রা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাদের মাধ্যমে ইহুদীদের যে ক্ষতি হয়েছিল, ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তা পুষিয়ে দিয়েছে। সে ঘটনার ৬০তম বার্ষিকী এমন সময় আমাদের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, যখন নিরপরাধ ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর ইসরাইলীদের গণহত্যা ও অপরাধ চরমে পৌঁছেছে।

এ বছর বিশ্বের একমাত্র অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ৬০তম বার্ষিকীতে ইহুদীবাদীদের মার্কিন ও ইউরোপীয় পৃষ্ঠপোষকরা ফিলিস্তিন জবরদখলের বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করেছে। দুই বছর আগে ফিলিস্তিনের পার্লামেন্ট নির্বাচনে সেখানকার জনগণ স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসকে নির্বাচিত করে। গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতার ধ্বজাধারী মার্কিন ও ইউরোপীয় সরকারগুলো ফিলিস্তিনের নির্বাচনের ঐ ফলাফল মেনে নিতে পারে নি। হামাসকে নির্বাচিত করার অপরাধে তারা গাজা উপত্যকার ওপর অবরোধ আরোপ করে সেখানে খাদ্য ও জ্বালানী সরবরাহসহ সব ধরনের মানবীয় সাহায্য প্রেরণ বন্ধ করে দেয়। সেই সাথে মজলুম ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর চলে ইহুদীবাদীদের দমন অভিযান। আকাশ ও ভূমিপথে তাদের পাশবিক হামলায় শহীদ হন হাজার হাজার ফিলিস্তিনী।

গত ৬ দশকের ফিলিস্তিন জবরদখলের ঘটনা থেকে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে গেছে, আর তা হলো, ইহুদীবাদী ইসরাইল কোনদিনও ফিলিস্তিনী জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকার মেনে নেবে না। এছাড়া ইহুদীবাদীদের সমর্থক পশ্চিমা বিশ্বও ফিলিস্তিনী জনগণকে তাদের মাতৃভূমি ফিরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে কোন ব্যবস্থা নেবে, সে আশাও এখন সুদূর পরাহত। কাজেই কূটনৈতিক উপায়ে নিজেদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবার ব্যাপারে হতাশ হয়ে এখন ফিলিস্তিনীরা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের পাওনা আদায় করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফিলিস্তিনী জনগণের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে গঠিত সংগ্রামী সংগঠনগুলোর প্রতিরোধ আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইল সরকারের নাওয়া-খাওয়া ও ঘুম কেড়ে নিয়েছে। সেই সাথে ফিলিস্তিনী জনগণের সম্পদ ও ভূখন্ড অবৈধভাবে দখল করে ইহুদীবাদীরা যে তাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে, প্রতিরোধ সংগ্রামের ফলে বিশ্ববাসী সে কথা জানতে পারছে। এদিকে ৬০ বছর ধরে অকথ্য নির্যাতন সহ্য করেও ফিলিস্তিনী জাতি তাদের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পরিচিতি অক্ষুন্ন রেখেছে। ফিলিস্তিনী জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রাম সাম্প্রতিককালে ইসরাইলের পতনের ঘন্টাধ্বনি শোনাচ্ছে।
২য় পর্ব

ওসমানিয়ো সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমে মুসলিম জগতের গৌরব অস্তমিত হচ্ছিল, পাশ্চাত্য তখন মধ্যযুগীয় বর্বর যুগকে পেছনে ফেলে উন্নতির সোপানগুলো অতিক্রম করা শুরু করেছে মাত্র। মধ্যযুগের বর্বরতা থেকে ছাড়া পাওয়া পশ্চিমা পাগলা ঘোড়ার লক্ষ্য বিশ্বে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ছিল না, বরং বিশ্বে নিজের আধিপত্য বিস্তার করা ছিল পশ্চিমাদের আসল উদ্দেশ্য। পতনোন্মুখ ওসমানিয়ো সাম্রাজ্যের দুর্বল অবকাঠামোর কারণে আগ্রাসী পশ্চিমা শক্তিগুলো মুসলিম সাম্রাজ্যে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পায় এবং মুসলমানদের সম্পদ লুটপাটে মেতে ওঠে। তবে এশিয়া থেকে ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ওসমানিয়া সাম্রাজ্যকে পুরোপুরি ধ্বংসের জন্য দুটি কাজ করার প্রয়োজন ছিল। ওসমানিয়ো সাম্রাজ্যকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দেয়া এবং এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশে পশ্চিমাদের তাঁবেদার সরকারকে ক্ষমতায় বসানো। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশের মিলনস্থলে অবস্থিত কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফিলিস্তিনের ওপর তৎকালীন পশ্চিমা শাসকদের দৃষ্টি পড়ে। একই সাথে ১৮৯৭ খ্রীস্টাব্দে সুইজারল্যান্ডের ব্যাল শহরে থিওডর হার্যেলের নেতৃত্বে এবং বৃটিশ পূঁজিপতিদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথম ইহুদীবাদী মতাদর্শের জন্ম হয়। ফিলিস্তিনে ষড়যন্ত্রের বীজবপন করে ঐ ভূখন্ড দখল করে সেখানে ইহুদীদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই ছিল ইহুদীবাদী গোষ্ঠীর মূল উদ্দেশ্য।

ইহুদীবাদী মতাদর্শের প্রতিষ্ঠাতা ও জনক বলে পরিচিত থিওডর হায্যেল ব্যাল সম্মেলন শেষ হওয়ার পর তার ‘ইহুদী সরকার’ শীর্ষক বইয়ে লিখেছে, “সুইজারল্যান্ডের ব্যাল সম্মেলনের ফলাফলকে এক কথায় বর্ণনা করতে বলা হলে আমি বলবো, আমি ব্যালে ইহুদী রাষ্ট্রের বীজ বপন করেছি। তবে আমি তা প্রকাশ্যে বলবো না, কারণ, এই মুহুর্তে একথা শুনলে বিশ্বের মানুষ হাসবে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে না হলেও আগামী ৫০ বছরের মধ্যে বিশ্বে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবেই।”

এভাবে ঊনবিংশ শতাব্দির শেষভাগে এসে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ঊদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইহুদীবাদ নামক মতবাদ আত্মপ্রকাশ করে। রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মতে, ইউরোপে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের সুযোগে ইহুদীবাদ নাম নিয়ে একটি গোষ্ঠী বেড়ে উঠতে থাকে। হার্যেল তার বর্ণবাদী দর্শনের প্রতি মানুষের সহানুভূতি আদায়ের জন্য সুকৌশলে ইহুদী ধর্মের সাথে তার মতবাদকে জুড়ে দেয়। ফিলিস্তিনের বাইতুল মোকাদ্দাসে ইহুদীদের একটি পবিত্র পাহাড়ের কথা উল্লেখ করে সে দাবি করে, বিশ্বের সকল ইহুদীকে ঐ পবিত্র ভূমিতে ফিরে আসতে হবে। এরপর সে আরো একধাপ এগিয়ে বলতে থাকে, ইহুদীদের জন্য ফিলিস্তিনে একটি রাষ্ট্র গঠন করা হলেই কেবল ইহুদীদেরকে তাদের পবিত্র ভূমিতে একত্রিত করার উপযুক্ত সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে।

এখানে মজার ব্যাপার হচ্ছে, ধর্মের কথা বলে থিওডর হার্যেল ইহুদীদের জন্য আবাসভূমি নির্মাণের কথা বললেও তার বা তার সহযোগী ইহুদীবাদী নেতাদের একক স্রস্টার প্রতি কোন বিশ্বাস ছিল না। ইহুদী ধর্মসহ সকল ঐশী ধর্মের মূল প্রতিপাদ্য তথা এক সৃষ্টিকর্তার ব্যাপারে তারা প্রকাশ্যে সন্দেহ পোষণ করতো। অর্থাৎ এক কথায় ধর্মের প্রতি তাদের কোন বিশ্বাস ছিল না। এমনকি ইহুদীবাদী নেতারা ইহুদী ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠী হিসেবে না দেখে একটি সাধারণ জাতিগোষ্ঠী বলে মনে করতো। ইহুদীবাদী মতবাদের প্রবক্তারা নিজেরা ধর্মে বিশ্বাসী না হলেও ফিলিস্তিন ভূখন্ডের ওপর ইহুদীদের ঐতিহাসিক অধিকার রয়েছে বলে দাবি করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, ফিলিস্তিনে ইহুদীদের জড়ো করে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে সেই রাষ্ট্রের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া। আর এরকম একটি অভিনব রাষ্ট্রের সর্বেসর্বার মালিক হলে বিশ্বব্যাপী নিজেদের নাম-ডাক ছড়িয়ে পড়ার লোভও তাদের মধ্যে কাজ করে। তবে এরই মধ্যে ইহুদীবাদী মতবাদের প্রবক্তাদের মধ্যে ‘ইসরাইল যাঙ্গুইলের’ মত নেতারা বাইতুল মোকাদ্দাসে অবস্থিত ইহুদীদের পবিত্র পাহাড় ‘সাহইউন’কে বাদ দিয়েও ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা উত্থাপন করে। এসব নেতাদের উদ্দেশ্য ছিল এটা বলা যে, ইহুদীবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাইতুল মোকাদ্দাস তথা ফিলিস্তিনকেই বেছে নিতে হবে এমন কোন কারণ নেই, বরং পৃথিবীর যে কোন জায়গায় এ ধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারীরা ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমে আর্জেন্টিনা, ইরাক, গ্রীস, মিশর, উগান্ডা, কঙ্গো, মোযাম্বিক, লিবিয়া ও এ্যাঙ্গোলাকে বাছাই করে। এসব দেশের কোন একটিতে ইহুদীবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তারা ব্যাপক জরীপ ও অনুসন্ধান চালায়।

১৮৯৭ সাল অর্থাৎ ইহুদীবাদী মতবাদ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯০৪ সালে থিওডর হার্যেলের মৃত্যু পর্যন্ত ইহুদীবাদী নেতারা ওসমানিয়ো সাম্রাজ্য এবং ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী দেশগুলোর সরকারের সাথে এ ব্যাপারে ব্যাপক আলাপ আলোচনা চালিয়ে যায়। মূলত মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ফিলিস্তিনকে ইহুদীবাদীদের কাছে হস্তান্তর করতে ওসমানিয়ো খলিফার অস্বীকৃতির কারণে ইহুদীবাদীরা বিশ্বের অন্যান্য স্থানকেও তাদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে বাধ্য হয়। কিন্তু অন্য সব দেশের ব্যাপারে একই ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হওয়ার পর ইহুদীবাদী নেতৃবৃন্দ ও তাদের পৃষ্ঠপোষক বৃটিশ সরকার যে কোন মূল্যে ফিলিস্তিন ভূখন্ডেই ইহুদীবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। ইহুদীবাদী মতবাদের বিরোধী ইহুদী লেখক ও গবেষক নাহুম সাকুলু এ সম্পর্কে বলেছে, “একটি রাজনৈতিক ও পূঁজিবাদি মতবাদ হিসেবে ইহুদীবাদের জন্ম হয়েছিল এবং অর্থ ও ক্ষমতালিপ্সা ছিল এই মতবাদের প্রবক্তাদের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু এই অশুভ লক্ষ্য চরিতার্থ করার জন্য তারা মুখে ধর্মের দোহাই দেয় এবং ইহুদী ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচার চালায়।” #

৩য় পর্ব

পাঠক! গত আসরে আমরা বলেছি, ১৮৯৭ সালে ইহুদীবাদী মতবাদের জনক থিওডর হার্যেলের নেতৃত্বে এক বৈঠকে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বীজ বপন করা হয়। প্রথমে ফিলিস্তিনে অবস্থিত ইহুদীদের পবিত্র একটি পাহাড়কে কেন্দ্র করে ঐ ধর্মাবলম্বীদের জন্য সেখানে একটি আবাসভূমি গড়ে তোলার কথা বলা হয়। তবে ওসমানিয়ো সাম্রাজ্যের প্রবল বিরোধিতার কারণে ইহুদীবাদী নেতারা ফিলিস্তিনকে বাদ দিয়ে বিশ্বের যে কোন স্থানে ইহুদীদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু সে প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তারা পুনরায় ফিলিস্তিনের দিকে দৃষ্টি দেয়। এরই মধ্যে শুরু হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনী যখন দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে, তখন ইহুদীবাদীদের কূটনীতি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। ইহুদীবাদী আন্দোলন নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করার পর জার্মানীর মত তৎকালীন কিছু পশ্চিমা পরাশক্তির শুভদৃষ্টি হাসিল করার চেষ্টা করলেও একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে নি। এ কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইহুদীবাদীরা তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন এনে সে সময়কার সর্ববৃহৎ উপনিবেশবাদী দেশ বৃটেনের সাহায্য প্রার্থনা করে।

বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ওসমানিয়ো সাম্রাজ্য এবং তার মিত্র শক্তি জার্মানী, বৃটিশ বাহিনীর সামনে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে ইহুদীবাদী আন্দোলন বৃটিশ পৃষ্ঠপোষকতায় তার প্রথম তীরটি মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু ফিলিস্তিনের বুকে নিক্ষেপ করে। এভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইহুদীবাদীদের উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং তাদেরকে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুপ্ত বাসনা বাস্তবায়নের দুর্লভ সুযোগ এনে দেয়। আন্তর্জাতিক সমাজ ইহুদীবাদী আন্দোলনকে স্বীকৃতি দেয়।

এদিকে মিত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ওসমানিয়ো সাম্রাজ্যকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলার জন্য পশ্চিমা শক্তিগুলো সংকল্পবদ্ধ হয়। সে সময় আরব-মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং ইউরোপের কিছু অংশ জুড়ে ওসমানিয়া সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। সে সময় উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো তাদের আধিপত্য বিস্তারের পথে এ সাম্রাজ্যকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করতো। এ প্রতিবন্ধকতা চিরতরে সরিয়ে ফেলার লক্ষ্যে বৃটিশ সামরিক শক্তির সাথে ইহুদীবাদীদের কূটচাল যুক্ত হয়। ফলে প্রথম মহাযুদ্ধে ওসমানিয়ো সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং প্রথমবারের মত ফিলিস্তিন ভূখন্ডে ইহুদীবাদীদের আনাগোনা শুরু হয়।

আসলে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ মহাদেশের মিলনস্থল বলে পরিচিত কৌশলগত অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্যে একটি ঘাঁটি স্থাপন করার স্বপ্ন বৃটেন দীর্ঘদিন ধরে লালন করছিল। ঐ ঘাঁটিতে বসে বৃটিশ উপনিবেশগুলোর ওপর নজর রাখা বা খবরদারি করা ছিল এ কাজে লন্ডনের প্রধান উদ্দেশ্য। এদিকে বৃটিশ সরকারে ঘাপটি মেরে বসে থাকা ইহুদীবাদীরা ভাবছিল, ফিলিস্তিনকে জবরদখল করে সেখানে কীভাবে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চুড়ান্ত মূহুর্তে আরব দেশগুলো ওসমানিয়ো সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীন হয়ে যাওয়ার সংকল্প নিয়ে তুর্কী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। খুব স্বাভাবিক কারণে বৃটিশরা ওসমানিয়ো সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে তুর্কী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরবদের সহায়তা করে। এরই ফাঁকে বৃটিশ সরকার আরব ভূখন্ডকে বৃটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে দিয়ে আরবদের বুকে প্রথম আঘাত হানে।

১৯১৭ সালের দোসরা নভেম্বর তৎকালীন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বালফোর ইহুদীবাদীদেরকে লেখা এক পত্রে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। এভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়ে বৃটিশ সরকার মধ্যপ্রাচ্যের তেল ভান্ডারগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ইহুদীদের অর্থনৈতিক সমর্থন লাভের কাজে ইহুদীবাদীদের ব্যবহার করে। অন্যদিকে ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে উপনিবেশবাদী শক্তি বৃটেনের সাহায্য নেয়। তৎকালীন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালফোর বৃটিশ ইহুদী ধনকুবের লর্ড রোচিল্ডকে লেখা ঐতিহাসিক পত্রে বলেছিলেন, ” আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, ইহুদীবাদীদের লালিত বাসনা চরিতার্থ করার লক্ষ্যে বৃটিশ সরকারের মন্ত্রীসভায় একটি বিল পাশ করা হয়েছে। বৃটিশ সাম্রাজ্য ফিলিস্তিনে ইহুদীদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইচ্ছে পোষণ করছে এবং ইহুদীবাদীদের এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য লন্ডন সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। …. বৃটিশ সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা ইহুদীবাদী ইউনিয়নকে জানালে লন্ডন আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে।”

বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালফোরের ঐ চিঠি প্রকাশিত হওয়ার পর বৃটিশ বিমান বাহিনী রাশিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের যেসব দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইহুদী বসবাস করতো, সেসব দেশে ঐ চিঠির হাজার হাজার কপি বিমান থেকে বিলি করে। তবে নি:সন্দেহে বালফোরের ঐ ঘোষণা ছিল সকল আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লংঘন। এদিকে ফিলিস্তিনের অধিকাংশ জনগণ আরব হওয়ার কারণে তাদেরকে বাদ দিয়ে সেখানে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ছিল না। ফিলিস্তিনী ভূখন্ড, এর কৃষিজমি থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত ও দোকানপাটসহ পুরো অবকাঠামো ছিল ফিলিস্তিনী জনগণের এবং এ বিষয়টি উপেক্ষা করা সহজ ছিল না।

কাজেই ফিলিস্তিনে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই সেখানকার মুসলিম জনগণের সংখ্যা হ্রাস করে ইহুদী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির আশু প্রয়োজন দেখা দেয়। এ কারণে, ইহুদীবাদী আন্দোলনের সহযোগিতায় বৃটিশ সেনারা ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর গণহত্যা ও তাদের অবকাঠামো ধ্বংসের কাজে হাত দেয়। ফিলিস্তিনের মত একটি জাতিকে ধ্বংস করে দিয়ে তাদের ভূখন্ডে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চরম বর্বরোচিত ও পাশবিক প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগে অর্থাৎ ১৯১৮ সাল থেকে শুরু করে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ইহুদীবাদী ও বৃটিশ সেনাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ফিলিস্তিনী জনগণকে হত্যা ও তাদের ভূমি অবৈধভাবে দখল করার কাজ চলে। পাশাপাশি সারাবিশ্ব থেকে লাখ লাখ ইহুদী অভিবাসীকে এনে ফিলিস্তিনী জনগণের তৈরি করা বসতবাড়িতে উঠিয়ে দেয়া হয়। যে সব ফিলিস্তিনীকে হত্যা করা সম্ভব হয় নি, তাদেরকে ফিলিস্তিন থেকে পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে তাড়িয়ে দেয়া হয়। এভাবে ফিলিস্তিনের জনসংখ্যার বিন্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এনে সেখানে একটি ইহুদী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী তৈরি করা হয় এবং বিশ্বের বুকে প্রথম ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়।
৪র্থ পর্ব

পাঠক! ফিলিস্তিন জবরদখলের ৬০ বছর শীর্ষ ধারাবাহিকের গত আসরে আমরা বলেছিলাম, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের সুযোগে ইহুদীবাদীরা বৃটিশ সরকারের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনী জনগণকে তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ শুরু করে। যে সব ফিলিস্তিনী তাদের বাড়িঘর স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিতে চায় নি, তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ ইহুদীকে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে জড়ো করা হয়। এভাবে মুসলিম ভূখন্ড ফিলিস্তিনের জনসংখ্যার বিন্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। আজকের আসরে আমরা অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরবর্তী অংশ নিয়ে আলোচনা করবো।

১৯২০ সালে ইতালির সানরেমো শহরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ফিলিস্তিনের ওপর বৃটেনের মালিকানা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় এবং সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ ১৯২২ সালে ঐ ঘোষণাকে স্বীকৃতি দেয়। তবে কার্যত ফিলিস্তিনের ওপর বৃটেনের কর্তৃত্ব ১৯১৮ সালে ফিলিস্তিন ভূখন্ডে বৃটিশ সেনাদের অনুপ্রবেশের মাধ্যমেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। ফিলিস্তিনের ওপর বৃটিশদের এই উপনিবেশ তিন দশক স্থায়ী হয়েছিল। ঐ তিন দশক ছিল ফিলিস্তিনের ইতিহাসের সবচেয়ে কালো অধ্যায়। ১৯১৮ সাল থেকে শুরু করে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত সময়ে ফিলিস্তিনের সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়া হয়।

ইহুদীবাদী আন্দোলন এ সময়ে বৃটিশ বাহিনীর সহায়তায় ফিলিস্তিনে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে থাকে। তারা সারাবিশ্ব থেকে বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো থেকে ইহুদীদেরকে উন্নত জীবনযাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিলিস্তিনে নিয়ে আসতে থাকে। সেই সাথে অত্যন্ত নির্মম কায়দায় ফিলিস্তিনী জনগণকে তাদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়নের প্রক্রিয়া চলে। ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনী জনগণকে তাদের বাড়িঘর থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। তারা ফিলিস্তিনীদেরকে নিজেদের সাজানো সংসার থেকে একটি সুতো পর্যন্ত নিয়ে যেতে দেয় নি। যে সব ফিলিস্তিনী বাড়িঘর ও সহায় সম্বল চিরদিনের জন্য ইহুদীদের কাছে রেখে দিয়ে চলে যেতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদেরকে নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়।

তৎকালীন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালফোর ইহুদীবাদীদেরকে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী লেভিড জর্জ বলে, “যে কোন উপায়ে ফিলিস্তিনে ইহুদীদেরকে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীতে পরিণত করতে হবে, যাতে সেখানে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়।” বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর ঐ ঘোষণা দেশটির সরকারের দীর্ঘমেয়াদী নীতিতে পরিণত হয়। এরপর ত্রিশ বছর ধরে লন্ডনের ক্ষমতায় পরিবর্তন আসলেও ফিলিস্তিনে ইহুদী অভিবাসীদের আসার সুযোগ করে দেয়ার বৃটিশ নীতি অপরিবর্তিত থাকে। সারাবিশ্ব থেকে লাখ লাখ ছিন্নমূল ইহুদীকে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে এনে জড়ো করা হয়।
১৯০৫ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনে ইহুদীদের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। কিন্তু ১৯১৪ সাল থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত বৃটিশদের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনে ইহুদীদের সংখ্যা ২০ হাজারে উন্নীত হয়। এরপর প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনে ইহুদী অভিবাসীদের ধরে এনে জড়ো করা শুরু হলে ১৯১৯ থেকে ১৯২৩ সাল নাগাদ ফিলিস্তিনে ইহুদীদের সংখ্যা ৩৫ হাজারে পৌঁছে যায়। ১৯৩১ সালে ইহুদীদের এই সংখ্যা প্রায় ৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৮০ হাজারে পৌঁছায়। এভাবে ফিলিস্তিনে ইহুদী অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে থাকে এবং ১৯৪৮ সালে সেখানে ইহুদীদের সংখ্যা ৬ লাখে উন্নীত হয়।

বৃটিশ উপনিবেশবাদী সরকার ফিলিস্তিনীদের জমি বাজেয়াপ্ত করে সেখানে ইহুদী বসতি নির্মাণের জন্য ইহুদীবাদী এজেন্সিগুলোকে দায়িত্ব দেয়। ফিলিস্তিনের ওপর বৃটিশ উপনিবেশবাদের প্রথম দশকে বৃটিশদের সহযোগিতায় ইহুদীবাদীরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো গড়ে তোলে। এমনকি তারা গোপনে গোপনে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াও চালিয়ে যেতে থাকে। ফিলিস্তিনী জনগণের শিল্প, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো বৃটিশ ও ইহুদীবাদী পূঁজিপতিতের সহায়তায় ধ্বংস করে দেয়া হয়। এ সময়ে ফিলিস্তিনী জনগণের অনেক স্থানীয় শিল্প ও পেশা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। পাশাপাশি ইহুদীবাদীদের পছন্দসই পেশা ও শিল্প সেখানে চালু করা হয় এবং দ্রুত এগুলোর প্রসার ঘটতে থাকে।

ইহুদীবাদীরা পশ্চিমা ইহুদী পূঁজিপতিদেরকে ফিলিস্তিনে এসে পূঁজি বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানায় এবং তাদেরকে নানা রকম সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়। ফিলিস্তিনে বৃটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন নতুন প্রযুক্তি আমদানির ফলে কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে ইহুদীবাদীরা ব্যাপক উন্নতি করতে থাকে। পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলো থেকে আগত ইহুদী পূঁজিপতিদের সহায়তায় ব্যাপক অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। ১৯৩২ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত পশ্চিমা দেশগুলোর প্রায় ২৫ হাজার পূঁজিপতি তাদের সকল পূঁজি নিয়ে ফিলিস্তিনে পাড়ি জমায়। ১৯৩৬ ও ১৯৩৭ সাল, অর্থাৎ এই দুই বছরে ফিলিস্তিনে ইহুদীবাদীরা ৫ হাজার ৫০০ কলকারখানা স্থাপন করে।

এদিকে বৃটিশ সরকার ফিলিস্তিনে উপনিবেশ স্থাপনের পর সেখানকার গুরুত্বপূর্ণ সরকারী পদগুলোতে বৃটিশ ইহুদীবাদীদেরকে নিয়োগ দেয়। ফলে এসব কর্মকর্তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনে শত শত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কোরে ফিলিস্তিনের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে নিজেদের করায়ত্বে নিয়ে আসে। তবে বৃটিশ সরকার ফিলিস্তিনের ওপর তার ত্রিশ বছরের উপনিবেশবাদের সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করে তা হলো, তারা বৃটিশ সেনাঘাঁটিগুলোতে ইহুদীবাদী মিলিশিয়াদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়।

১৯১৮ সালে বৃটেনের সহযোগিতায় গুপ্ত ইহুদী বাহিনী “হাগানাহ” গঠিত হয়। এ বাহিনী ইহুদীবাদীদের অবৈধ রাষ্ট্র তৈরির কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রথমে ফিলিস্তিনী জনগণের বিরুদ্ধে ইহুদীবাদীদের সহায়তা করা হাগানাহ বাহিনীর দায়িত্ব হলেও পরবর্তীতে তারা সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী বাহিনীতে পরিণত হয়। ফিলিস্তিনী জনগণের বাড়িঘর ও ক্ষেতখামার দখল করে তাদেরকে ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত করা এবং বাজার ও রাস্তাঘাটসহ জনসমাবেশ স্থলে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফিলিস্তিনীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাদের বিতাড়নের কাজ ত্বরান্বিত করা ছিল হাগানাহ বাহিনীর কাজ।

৫ম পর্ব

পাঠক! এ আসরের গত পর্বে আমরা বলেছিলাম, ১৯২০ সালে ইতালির সানরেমো শহরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ফিলিস্তিনের ওপর বৃটেনের মালিকানা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় এবং সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ ১৯২২ সালে ঐ ঘোষণাকে স্বীকৃতি দেয়। এদিকে বৃটিশ সরকারের ওপর ইহুদীবাদীদের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো থেকে হাজার হাজার ইহুদিকে ফিলিস্তিনে জড়ো করতে থাকে। এরই মধ্যে তৎকালীন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালফোর ইহুদীবাদীদেরকে যে কোন উপায়ে ফিলিস্তিনে একটি পৃথক আবাসভূমি গড়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর গণহত্যা শুরু করে।

বৃটিশ উপনিবেশের শেষ দশকে ফিলিস্তিনে এমন সব নৃশংস ঘটনা ঘটে, যা স্মরণ করে মানবতা শিউরে উঠবে চিরকাল। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত, এই দশ বছর সময়ে ইহুদীবাদী গোষ্ঠীগুলো ফিলিস্তিনী জনগণের বিরুদ্ধে শুরু করে এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। নানা ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে ফিলিস্তিনী জনগণের জীবনকে দুর্বিসহ করে তোলা হয়। ফিলিস্তিনী জনগণের পক্ষে তাদের জন্মভূমিতে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনে সারাবিশ্ব থেকে লাখ লাখ ইহুদীর ঢল নামে। এছাড়া ইহুদীবাদী পূঁজিবাদিরা সেখানে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কলকারখানা ও হাসপাতাল নির্মাণ করতে থাকে। এর চেয়েও নির্মম পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে প্রশাসনিক দপ্তর নির্মাণ শুরু করে। ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ট্রেন ও বাজারসহ লোক সমাগমের স্থানগুলোতে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ব্যাপক ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে ফিলিস্তিনী জনগণকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বৃটেনের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ায় ফিলিস্তিনের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে লন্ডনের হাত থেকে ছুটে যেতে থাকে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনে ইহুদীবাদীদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় বৃটিশ সেনারা বরং ইহুদীবাদীদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এ সময় ইহুদীবাদী আন্দোলনের বিপক্ষে বৃটিশ সরকার কোন অবস্থান নিতে গেলে তার অশুভ পরিণতি লন্ডনকেই ভোগ করতে হতো। ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মোনাচিম বেগিনের নেতৃত্বাধীন ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইরগুন ১৪ জন বৃটিশ সেনা কর্মকর্তাকে অপহরণ করে এবং বাইতুল মোকাদ্দাসের কিং ডেভিড হোটেলে এক বোমা হামলা চালিয়ে ৮০ জন বৃটিশ নাগরিককে হত্যা করে। বৃটিশ সরকার শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিন পরিচালনার দায়ভার থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বিষয়টিকে জাতিসংঘে উত্থাপন করতে বাধ্য হয়। ১৯৪৭ সালের দোসরা এপ্রিল তৎকালীন বৃটিশ সরকার ফিলিস্তিনের ভবিষ্যত নির্ধারণের ব্যাপারে সাধারণ পরিষদের জরুরী বৈঠক আহবানের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবকে অনুরোধ করে।

ঐ অনুরোধে সাড়া দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ জরুরী বৈঠকে বসে ফিলিস্তিনের ব্যাপারে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। ঐ কমিটিকে ফিলিস্তিনের ভাগ্য নির্ধারণের ব্যাপারে ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয়। ব্যাপকভাবে ইহুদীবাদ প্রভাবিত ফিলিস্তিন বিষয়ক ঐ কমিটি ৭ মাসের গবেষণা ও অনুসন্ধানের পর ১৯৪৭ সালের ২৯শে নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডকে দ্বিখন্ডিত করার প্রস্তাব করা হয়। ঐ প্রস্তাবের ব্যাপারে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভোটাভুটি হয় এবং এতে ৩৩টি সদস্য দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ও ১৩টি দেশ এর বিপক্ষে ভোট দেয়। ভোটাভুটির সময় একটি দেশ অনুপস্থিত ছিল এবং অপর ১০টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ঐ ভোটাভুটির মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে দ্বিখন্ডিত করা সংক্রান্ত ১৮১ নম্বর প্রস্তাব গৃহিত হয়।

মজার ব্যাপার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অধিকাংশ বিষয়ে তীব্র মতপার্থক্য থাকলেও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে এসে তারা এক হয়ে যায়। দুটি দেশই ফিলিস্তিনী জনগণের বিপক্ষে এবং ইহুদীবাদীদের পক্ষে ভোট প্রদান করে। জাতিসংঘের এই চরম অন্যায় ও অবিচারমূলক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আরব দেশগুলোর প্রতিনিধিরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। তারা সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ত্যাগ করেন। জাতিসংঘে নিযুক্ত সিরিয়ার রাষ্ট্রদূত অধিবেশন ত্যাগ করার সময় চিৎকার করে বলতে থাকে, ” জাতিসংঘ মরে গেছে, জাতিসংঘকে হত্যা করা হয়েছে।”

জাতিসংঘের ঐ অবিচারমুলক সিদ্ধান্তের ফলে মুসলিম ভূখন্ড ফিলিস্তিনকে দুইভাগে ভাগ করা হয়। ফিলিস্তিনী জনগণের নিজেদের ভূখন্ড হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে ফিলিস্তিনের মাত্র ৪৫ শতাংশ ভূভাগ দেয়া হয় এবং বাকি ৫৫ ভাগ ইহুদীবাদীদের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৮১ নম্বর প্রস্তাব পাশ হওয়ার পর ১৯৪৭ সালের ২৯শে নভেম্বর রাতে ইহুদীবাদীরা তেলআবিব ও বাইতুল মোকাদ্দাসে ব্যাপক আনন্দ-ফুর্তি ও নাচ গানে মেতে ওঠে। সেই সাথে পশ্চিমাদের দেয়া ৩০ লাখ ডলার অর্থ দিয়ে ইহুদীবাদী গুপ্ত বাহিনীর জন্য বন্দুক, ট্যাংক, গোলাবারুদ ও জঙ্গীবিমান কেনা হয়। এ সময় গোপনে ইহুদীবাদীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলিতে অস্ত্র নির্মাণ কারখানা স্থাপন করা হয়। এসব কারখানায় তৈরি অস্ত্র ফিলিস্তিনী জনগণকে হত্যার কাজে ব্যবহৃত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ইহুদীবাদীরা এসব অস্ত্র কারখানার কাঁচামাল সংগ্রহ করে অধিকৃত ফিলিস্তিনে পাঠাতে থাকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির মাধ্যমে বিশ্বে অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি বৃহৎ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অন্যদিকে বৃটিশ সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেকখানি দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণে ফিলিস্তিন জবরদখলের সময় ইহুদীবাদীরা বৃটিশদের ব্যাপক সহযোগিতা পেলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তারা নব্য পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বৃটিশ সরকার ঘোষণা করে, ১৯৪৮ সালের ১৫ই মে ফিলিস্তিনকে উপনিবেশের নিগঢ় থেকে মুক্ত করা হবে। এই ঘোষণার সাথে সাথে ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনে একটি ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্র সৃষ্টি করার কাজ শুরু করে দেয়। ফলে ১৯৪৮ সালের শীতকালটা ফিলিস্তিনী জনগণ অত্যন্ত কষ্ট আর উদ্বেগের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করে।

ফিলিস্তিনী জনগণের বিরুদ্ধে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়। ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর এ হামলার ফলে ফিলিস্তিনী জনগণ মৃত্যু অথবা মাতৃভূমি ছেড়ে পলায়ন, এ দুটি পথের একটি বেছে নিতে বাধ্য হয়। এ সময় ইহুদীবাদী গুপ্ত সন্ত্রাসী বাহিনী হাগানার সদস্যরা রাত্রিবেলায় নি:শব্দে ফিলিস্তিনী গ্রামগুলোতে প্রবেশ করতো। তারা ফিলিস্তিনীদের বাড়িঘরের আশেপাশে ডিনামাইট পেতে রাখতো। এরপর কাঠের তৈরি দরজা জানালায় দাহ্য পদার্থ ঢেলে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিত যাতে আগুনে পুড়ে এবং ডিনামাইট বিস্ফোরণের ফলে নিহত ফিলিস্তিনীদের আর কোন অস্তিত্ব পৃথিবীর বুকে না থাকে। ফিলিস্তিনীরা কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজেদের বাড়িঘরের মধ্যে জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হয়ে যেত।

১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ইহুদীবাদী নেতা ডেভিড বেন গোরিওন ফিলিস্তিনে কুখ্যাত সন্ত্রাসী পরিকল্পনা ডল্ট এর বাস্তবায়ন শুরু করে। ঐ পরিকল্পনার অধীনে হাগানা বাহিনী সারা ফিলিস্তিনে স্থানীয় অধিবাসীদের ওপর হামলা চালায়। কিছু ফিলিস্তিনীকে হত্যা করে বাকিদেরকে সেখান থেকে বিতাড়িত করা ছিল ঐসব হামলার লক্ষ্য। ফিলিস্তিনের দির ইয়াসিন গ্রামের কূখ্যাত গণহত্যা ডল্ট পরিকল্পনার আওতায় বাস্তবায়ন করা হয়। এভাবে ইহুদীবাদীরা হত্যা ও ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে লাখ লাখ ফিলিস্তিনীকে তাদের মাতৃভূমি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে।

৬ষ্ঠ পর্ব

পাঠক! গত পর্বে আমরা বলেছিলাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিনে ইহুদীবাদীদের প্রভাব এত বেশী বাড়তে থাকে যে, সেখানকার ঔপনিবেশিক শক্তি বৃটিশ সরকারের পক্ষে ইহুদীবাদীদের সাথে পেরে ওঠা সম্ভব হয় নি। ফলে লন্ডন ফিলিস্তিনের ভাগ্য নির্ধারণের বিষয়টিকে জাতিসংঘের হাতে ছেড়ে দেয়। জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে দ্বিখন্ডিত করার প্রস্তাব পাশ করে নিজেদের মাতৃভূমির মাত্র ৪৫ শতাংশ ফিলিস্তিনীদের এবং বাকি ৫৫ শতাংশ ভূমি ইহুদীবাদীদের হাতে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলো ফিলিস্তিনী জনগণকে হত্যার কাজ চালিয়ে যায় এবং ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে তাদেরকে নিজেদের আবাসভূমি থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। আজকের আসরে আমরা ফিলিস্তিন জবরদখলের পরবর্তী ঘটনাবলী নিয়ে আলোচনা করবো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি নব্য শক্তি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি এবং অন্যদিকে সেদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ইহুদীবাদীদের প্রভাব, এ দুইয়ে মিলে ইহুদীবাদীরা ব্যাপক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইহুদীবাদী আন্দোলন তাদের এতদিনের জবরদখলের সঙ্গী বৃটিশ সরকারের নতুন নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং মার্কিন সরকারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মার্কিন সরকারও মধ্যপ্রাচ্যে তার সাম্রাজ্যবাদী নীতি বাস্তবায়নের কাজে ইহুদীবাদী আন্দোলনকে ব্যবহারের মোক্ষম সুযোগটি লুফে নেয়। বিশেষ করে সে সময় সাবেক উপনিবেশবাদী শক্তি বৃটেন ও ফ্রান্স সামরিক দিক দিয়ে ভীষণভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উপনিবেশ ধরে রাখা বা এই অঞ্চলের ওপর সামরিক দিক দিয়ে প্রভাব বিস্তার করার মত অন্য কোন শক্তি ছিল না।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্প, বিশেষ করে অস্ত্র কারখানাগুলোর মালিকরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অস্ত্র যোগান দিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গিয়েছিল। ঐ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এসব অস্ত্র কারখানার মালিকরা তাদের পণ্য বিক্রির জন্য নতুন কোন বাজারের সন্ধানে ছিল। তারা তাদের অস্ত্র বিক্রির জন্য আরো কোন বড় বা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ চাইছিল। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠিগুলোর মধ্যে তিনটি বড় প্রতিষ্ঠান ছিল তেল কোম্পানী। এ কোম্পানীগুলো যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে পূঁজি বিনিয়োগ করেছিল। এসব কোম্পানীর মালিকদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদে কর্মরত ছিল। এসব কর্মকর্তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে এ অঞ্চলের ওপর মার্কিন সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ খুঁজছিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ বৃটিশদের দখলে ছিল। মার্কিন কোম্পানীগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তেল ভান্ডারের কেবলমাত্র শতকরা দশভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। প্রধানত সৌদি আরবের তেল সম্পদের ওপর মার্কিনীদের আধিপত্য ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময়টিতে সৌদি আরবে নতুন নতুন তেল খনি আবিস্কৃত হয়। মার্কিন কোম্পানীগুলিও সাথে সাথে আরবদের সাথে এসব তেল উত্তোলন ও তা বিক্রির ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করে ফেলে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ভান্ডারের কর্তৃত্ব নিয়ে মার্কিন ও বৃটিশ সরকারের মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে বৃটিশ সরকারের চরম আর্থিক ক্ষতি এবং তা পুষিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ার কারণে লন্ডনের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতায় ওয়াশিংটনের সাথে পেরে ওঠা সম্ভব হয় নি।

ঐতিহাসিকরা মনে করেন, বৃটিশ সরকার যুদ্ধের ব্যয় মেটানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে নিজের উপনিবেশগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়টিকে উপেক্ষা করতে বাধ্য হয়। মার্কিন সরকার এই সুযোগে বৃটিশ উপনিবেশগুলোতে অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের মাত্র দশ ভাগ তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল, সেখানে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের শতকরা ৪২ ভাগ তেলের খনি মার্কিনীদের দখলে চলে যায়।

১৯৪৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ও তার উপদেষ্টারা একটি কমিটি গঠন করে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে ব্যাপক গবেষণা ও অনুসদ্ধান শুরু করে। বৃটিশদের নিয়ন্ত্রণ থেকে কীভাবে ফিলিস্তিনকে নিজেদের দখলে নিয়ে আসা যায়, সে উপায় বের করা ছিল ঐ কমিটি গঠনের প্রধান লক্ষ্য। এছাড়া ফিলিস্তিনে একটি ইহুদী রাষ্ট্র গঠন করে ইহুদীবাদীদের হাতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার ভার ছেড়ে দেয়া ছিল মার্কিন সরকারের অন্যতম উদ্দেশ্য। ইহুদীবাদীরা সঙ্গত কারণেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তার উপদেষ্টাদের এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানায়। মার্কিন সরকার যখন যুক্তরাষ্ট্রে বসে এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়, তখন ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলো ফিলিস্তিন থেকে বৃটিশ সেনাদের বিতাড়িত করার লক্ষ্যে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা শুরু করে। তারা ফিলিস্তিনে বৃটিশদের সরকারী অফিস আদালতে বোমা হামলা চালায়।

ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলো বৃটিশ সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করার পাশাপাশি বৃটিশ সেনাদের চলাচলের সড়ক ও ব্রিজগুলো ডিনামাইট দিয়ে গুড়িয়ে দেয়। এভাবে তারা ফিলিস্তিনে বৃটিশ উপনিবেশবাদের শেষ দিকে লন্ডনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েক লক্ষ ইহুদীর ফিলিস্তিন ভূখন্ডে আসার বিষয়টিকে সমর্থন না করার কারণে ইহুদীবাদীরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে এসব সন্ত্রাসী হামলা চালায়। ফিলিস্তিনে অবাধে ইহুদীদের আসার সুযোগ করে দিলে সেখানকার নিয়ন্ত্রণ বৃটিশদের হাত থেকে ইহুদীবাদীদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় লন্ডন ফিলিস্তিনে লাখ লাখ ইহুদীকে আসতে দেয়ার বিরোধিতা করেছিল। এক্ষেত্রে ফিলিস্তিনী জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার কোন উদ্দেশ্য বৃটিশ সরকারের একেবারেই ছিল না। এরকম পরিস্থিতিতে মার্কিন সরকার নিউইয়র্কের বিল্ট মুর হোটেলে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলন থেকে ফিলিস্তিনকে একটি ইহুদী রাষ্ট্রে পরিণত করার ব্যাপারে ইহুদীবাদী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়।

বৃটিশ সরকার উপায়ন্তর না দেখে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গকে জাতিসংঘে উত্থাপনের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ও তার উপদেষ্টাদের ব্যাপক প্রচেষ্টার ফল হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডকে দ্বিখন্ডিত করার প্রস্তাব পাশ হয়। ঐ প্রস্তাব পাশের পর ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলো নতুন উদ্যোমে ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর হত্যা ও নিধন অভিযান শুরু করে। ফলে ফিলিস্তিনী জনগণ নিজেদের জন্মভূমিতে পরবাসী হয়ে পড়ে এবং প্রতি মুহুর্তে মৃত্যুর আতঙ্কে দিন কাটাতে থাকে। বৃটিশ সেনারা ফিলিস্তিন থেকে চলে যাওয়ার পর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সশস্ত্র ইহুদীবাদীরা নিরস্ত্র ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কয়েক মাসের মধ্যে ইহুদীবাদীদের হাতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনী নিহত হয়। এ সময় ফিলিস্তিনের দির ইয়াসিন গ্রামে ইহুদীবাদীরা যে ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছিল, ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে তা বিশ্বের মানুষ স্মরণ করবে চিরকাল।

আনুষ্ঠানিকভাবে ইহুদীবাদী সরকার গঠনের একমাস আগে ১৯৪৮ সালের ৯ই এপ্রিল বাইতুল মোকাদ্দাস শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত দিরইয়াসিন গ্রামে ঐ গণহত্যা চালানো হয়। ঐ ঘটনায় মোনাচিম বেগিনের নেতৃত্বাধীন ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠি ‘ইরগুন’ নারী ও শিশুসহ ২৫৪ জন ফিলিস্তিনীকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের প্রতিনিধি জ্যাক ডুরিনিয়া সেই সময় ইরগুনের ঐ পাশবিক হত্যাকান্ড সম্পর্কে এক প্রতিবেদনে বলেছিলেন : ” দির ইয়াসিন গ্রামের জনগণের ওপর চালানো গণহত্যায় ফিলিস্তিনী নারীদের পেট বিদীর্ণ করা হয় এবং শিশুদের গলা কেটে তাদের মস্তক আলাদা করে ফেলা হয়। এছাড়া ফিলিস্তিনী জনগণের বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। রেডক্রস কর্মীরা ধ্বংসস্তুপের মধ্যে মানুষের শরীরের টুকরো টুকরো অংশ এবং বিভিন্ন কুপের মধ্যে থেতলে যাওয়া মানবদেহ খুঁজে পেয়েছে। গোটা গ্রাম ভয়াবহ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। ফিলিস্তিনী নারী, পুরুষ ও শিশুদের পাশবিক কায়দায় হত্যা করার পর বোমা মেরে তাদের শরীর খন্ডবিখন্ড করে ফেলা হয়েছিল।”

৭ম পর্ব

পাঠক! গত পর্বে আমরা বলেছিলাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ সরকারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার পর সেই সুযোগে মার্কিন সরকার মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার শুরু করে। এ অঞ্চলের তেল সম্পদের একটা বিশাল অংশ যুক্তরাষ্ট্র বৃটিশদের হাত থেকে কব্জা করে নেয়। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ইহুদীবাদীদের রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টায় সর্বাত্মক সমর্থন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এদিকে ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনে নতুন করে গণহত্যা শুরু করে। বাইতুল মোকাদ্দাসের কাছে অবস্থিত দির ইয়াসিন গ্রামে চালানো গণহত্যায় নারী ও শিশুসহ শত শত ফিলিস্তিনী নিহত হন। আজকের আসরে আমরা ফিলিস্তিন জবর দখল করে সেখানে ইহুদীবাদী রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ার পরবর্তী ঘটনাবলী নিয়ে আলোচনা করবো।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৮১ নম্বর প্রস্তাব পাশের মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে দ্বিখন্ডিত করে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে অনুমোদন করার আগেই ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনী ভূখন্ড জবরদখল করার ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছিল। এরই মধ্যে ফিলিস্তিনে ইহুদীবাদী আন্দোলনের নেতা ডেভিড বেন গোরিওনের নির্দেশে ইহুদীবাদী সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। মার্কিন ও ইউরোপীয় মিত্রদের পাঠানো অস্ত্র ও জঙ্গীবিমানের সাহায্যে সশস্ত্র ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনী গ্রাম ও শহরগুলোতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বেন গোরিওন এ সম্পর্কে পরবর্তীতে স্বীকার করেছিল, জাতিসংঘ অন্যায়ভাবে যে পরিমাণ ভূমি ইহুদীবাদীদেরকে দিয়েছিল, তার চেয়েও বেশী ভূমি দখল করার উদ্দেশ্যে ঐ হামলা চালানো হয়েছিল। ফিলিস্তিনী ভূখন্ড দ্বিখন্ডিত করার ব্যাপারে জাতিসংঘের প্রস্তাব পাশ হওয়ার এক মাস আগে অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে বৃটিশ সরকার ইহুদীবাদীদের জানায়, ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে তারা ফিলিস্তিন থেকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করে নেবে।

বৃটিশ সেনা অপসারণের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের ওপর ৩০ বছরের বৃটিশ উপনিবেশবাদের অবসান ঘটে এবং সেখানে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। এভাবে ফিলিস্তিন থেকে বৃটিশ সেনা অপসারণের কয়েক মাস আগে থেকে ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর তাদের হামলা জোরদার করে। ফিলিস্তিনী জনগনকে বিতাড়নের মাধ্যমে স্থানীয় অধিবাসীমুক্ত একটি ভূমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা ছিল তাদের এ বর্বরোচিত কাজের মূল উদ্দেশ্য। ১৯৪৮ সালের ২৪শে এপ্রিল ডেভিড বেন গোরিওন বাইতুল মোকাদ্দাসের এক বিজয় উৎসবে ঘোষণা করে : “আমরা একটি ইহুদী সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছি।” গোরিওনের ঐ ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল, জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করার বিষয় নিয়ে যে দীর্ঘ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকে এটা বোঝানোর চেষ্টা করা যে, ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তাদের পক্ষে এই অবৈধ রাষ্ট্র সৃষ্টি করার ব্যাপারে আর অপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছিল না। ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে ইহুদীবাদী আন্দোলনের নেতারা তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের সাথে যোগাযোগ করে। তারা প্রথম ইহুদী রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য মার্কিন সরকারের প্রতি আহবান জানায়। অবশেষে ১৯৪৮ সালের ১৪ই এপ্রিল ফিলিস্তিন থেকে সর্বশেষ বৃটিশ সেনার চলে যাওয়ার মুহুর্তে ডেভিড বেন গোরিওন আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইল নামক একটি অবৈধ রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেয়। তার ঐ ঘোষণার মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে গোরিওনের কাছে বার্তা পাঠান। এর পরপরই সমাজবাদী সোভিয়েত ইউনিয়নও বিশ্বের সর্বপ্রথম ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৪৮ সালের ১৪ই মে’র মধ্যে বৃটিশ সরকার ও ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনীদের সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো ধ্বংস করে ফেলেছিল। এসব অবকাঠামো পুনর্গঠন করার মত কোন ফিলিস্তিনী সংস্থারও অস্তিত্ব ছিল না। এ সময় জাতিসংঘ ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যতখানি ভূখন্ড নির্ধারণ করেছিল, তার ওপর ইহুদীবাদীরা পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। ৩৮ সদস্য বিশিষ্ট একটি অস্থায়ী সরকারী পরিষদ জবরদখলকৃত এলাকা পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ঐ পরিষদ ডেভিড বেন গোরিওনের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি মন্ত্রীসভা গঠন করে এবং গোরিওনকে ইহুদীবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গোরিওন তার প্রথম বক্তৃতায় ফিলিস্তিনকে ইহুদী জাতির দেশ হিসেবে উল্লেখ করে ঘোষণা দেয়, বিশ্বের সকল প্রান্তের ইহুদীদের জন্য ইসরাইল দরজা উন্মুক্ত করে দেয়া হলো। এভাবে সে ইহুদীদেরকে ইসরাইলে এসে বসতি স্থাপনের আহবান জানায়।

এরপর ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নির্যাতনমূলক “প্রত্যাবর্তন” আইন পাশ করে। ঐ আইনে ফিলিস্তিনে অভিবাসনকারী প্রত্যেক ইহুদীকে পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর গণহত্যার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া প্রায় দশ লাখ ফিলিস্তিনীকে তাদের আবাসভূমি থেকে বিতাড়িত করা হয়। ফিলিস্তিনীরা শরণার্থী হয়ে পার্শ্ববর্তী আরব রাষ্ট্রগুলোতে আশ্রয় নেয়ার পর ইহুদীবাদী সরকার ফিলিস্তিনীদের পতিত বাড়িঘর ও জায়গা অধিগ্রহণ করে তা অভিবাসন গ্রহণকারী ইহুদীদের মধ্যে বন্টন করে দিতে থাকে। অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠার তিন বছরের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১০ লাখ ইহুদী, অর্থাৎ যে পরিমাণ ফিলিস্তিনীকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, সেই পরিমাণ ইহুদী ফিলিস্তিনে এসে বসতি গড়ে তোলে। এ সম্পর্কে ১৯৬০ এর দশকের ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী গোল্ডমেয়ার একাধিকবার যে উক্তি করেছিল, তা হচ্ছে : “সে সময় ফিলিস্তিনে কোন মানুষই ছিল না, যাদেরকে বিতাড়িত করে আমরা তাদের দেশ দখল করবো। কারণ, আমরা এই ভূখন্ডে আসার আগেই ফিলিস্তিনীদেরকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।”

কাজেই সন্ত্রাস, গণহত্যা, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টির যে ষড়যন্ত্র ইহুদীবাদীরা ১৮৯৭ সালে করেছিল, অবশেষে তার বাস্তবায়ন ঘটে এবং ফিলিস্তিনের প্রকৃত অধিবাসীদের বিতাড়িত করে তাদের মাতৃভূমিতে ইহুদীবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল গঠিত হয়। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ ইসরাইল প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যে ফিলিস্তিনের ৪৩২টি গ্রাম ধ্বংস করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। কারণ, তখন পর্যন্ত যেসব ফিলিস্তিনী মাতৃভূমির মায়ায় মাটি কামড়ে পড়েছিলেন, তাদেরকে বিতাড়নের এ ছাড়া কোন উপায় ছিল না। ফিলিস্তিন জবরদখল করে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর গঠিত সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী ঈগল এ্যালেন এ সম্পর্কে বলেছিল : “ফিলিস্তিনে থেকে যাওয়া হাজার হাজার মুসলমানকে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে একটি উপায় বের করা জরুরী হয়ে পড়েছিল। স্থানীয় পরিষদগুলোর ইহুদী প্রধানদেরকে এই গুজব ছড়িয়ে দিতে বলা হয় যে, হুলেহ অঞ্চলের সকল গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হবে। এ গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর হাজার হাজার ফিলিস্তিনী তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। এভাবে আমাদের পরিকল্পনা সহজেই বাস্তবায়িত হয়।”

ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়ার পর মিশর, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও জর্দান থেকে আরব সেনারা ফিলিস্তিনের দিকে মার্চ করে। ফলে প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সূচনা হয়। আরব সেনাবাহিনী প্রথমে ফিলিস্তিনের বিস্তীর্ণ ভূমি ইহুদীবাদীদের কাছ থেকে দখল করে নেয়। এক পর্যায়ে তারা ইসরাইলকে নিশ্চিহ্ণ করে দেয়ার মত অবস্থায় চলে যায়। কিন্তু ইহুদীবাদীদের প্রতি মার্কিন সরকারের সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে ১৯৪৮ সালের ২ জুন আরব ও ইসরাইলী সেনাদের মধ্যে এক যুদ্ধবিরতি হয়।

৮ম পর্ব

বৃটিশদের হাতে ফিলিস্তিন জবরদখলের মাধ্যমে বিংশ শতাব্দির প্রথমদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে যে সংকটের গোড়াপত্তন ঘটেছিল, পরবর্তীতে মার্কিন সমর্থন নিয়ে ফিলিস্তিনে অবৈধ ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সে সংকট ব্যাপক ঘনিভূত হয়। ইহুদীবাদী ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন যুদ্ধ ও সংঘর্ষের নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর পক্ষে ফিলিস্তিনের মুসলিম ভূখন্ডে একটি ইহুদীবাদী রাষ্ট্রকে মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। এ কারণে মিশর, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও জর্দানের সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে একটি সম্মিলিত আরব বাহিনী গঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ১৫ই মে এই বাহিনী ফিলিস্তিনের দিকে মার্চ করে এবং বাইতুল মোকাদ্দাস ও ফিলিস্তিনী ভূখন্ড মুক্ত করার লক্ষ্যে ইসরাইলের সাথে আরব বাহিনীর সর্বপ্রথম যুদ্ধের সূচনা হয়।

আরব-ইসরাইল প্রথম যুদ্ধের সময় মিশরের জঙ্গীবিমান তেলআবিব ও এর আশেপাশে বোমাবর্ষণ করে। ঐ বিমান হামলায় সিরিয়া ও ইরাকের জঙ্গীবিমান মিশরীয় বিমান বাহিনীকে সহায়তা করে। আরব বাহিনী ইসরাইলের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়লে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে মার্কিন সরকার ইহুদীবাদীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ব্যাপকভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ওয়াশিংটন আরব-ইসরাইল যুদ্ধ থামানোর জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক চাপের মুখে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৪৮ সালের ২রা জুন আরব বাহিনীকে ইসরাইলের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে বাধ্য করে। ঐ যুদ্ধবিরতি মাত্র এক সপ্তা স্থায়ী ছিল। যুদ্ধবিরতির অবকাশে ইহুদীবাদীদের প্রতি মার্কিন ও বৃটিশ সমর্থনের কারণে আরব বাহিনী সমরাস্ত্র সংগ্রহসহ নতুন উদ্যোমে যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসরাইলের প্রতি পশ্চিমা অর্থনৈতিক ও সমরাস্ত্র সাহায্যের ঢল নামে। ফলে পুনরায় আরব-ইসরাইল রণ দামামা বেজে ওঠে।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ছয় দিনের মাথায় ইসরাইলী বাহিনী পশ্চিমা সহায়তা নিয়ে যুদ্ধবিরতি লংঘন করে আরব বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে হামলা চালায়। এ সময় যুদ্ধবিরতির কারণে আরব বাহিনী সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিল। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ইসরাইলের বিজয়ের মাধ্যমে ঐ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। এ যুদ্ধে ইসরাইল জাতিসংঘের মাধ্যমে যে ভূমি পেয়েছিল, তার চেয়েও অনেক বেশী ভূখন্ডের ওপর জবরদখল প্রতিষ্ঠা করে। ইহুদীবাদী সেনারা নতুন করে দখলীকৃত ফিলিস্তিনী ভূখন্ডের অধিকাংশ গ্রামকে এবার মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। এ সময় ফিলিস্তিনী জনগণসহ আরবরা ইসরাইলের সাথে অসম যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অবশেষে কয়েকমাসের যুদ্ধ ও সহিংসতার পর ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি মাসে পুনরায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ আরবদেরকে দ্বিতীয় দফা যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করে। ঐ যুদ্ধবিরতির ফলে ফিলিস্তিন বাহ্যত শান্ত হয়। কিন্তু এর ভেতরে থেকে যায় ছাইচাপা আগুন।

আরব-ইসরাইল প্রথম যুদ্ধে মুসলমানদের প্রথম ক্বেবলাসমৃদ্ধ শহর বাইতুল মোকাদ্দাস দ্বিখন্ডিত হয়ে যায়। এর পশ্চিম অংশ ইসরাইলীরা দখল করে নেয়। শহরের পূর্ব অংশের পাশাপাশি জর্দান নদীর পশ্চিম তীর জর্দানের বাদশাহ’র নিয়ন্ত্রনে সোপর্দ করা হয়। ঐ যুদ্ধে মিশর তার ফিলিস্তিন সীমান্তবর্তী এলাকা অর্থাৎ গাজা উপত্যকাকে নিজের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসে। ফিলিস্তিনের ঐ অংশকে পরিচালনার জন্য মিশর সকরার ১১ সদস্যবিশিস্ট একটি প্রশাসনিক পরিষদ গঠন করে।

১৯৫৬ সালে মিশর ও ইহুদীবাদী সেনাদের মধ্যে দ্বিতীয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধ বাঁধে। ১৯৬০ এর দশকের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ১৯৫৬ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধ ছিল সবচেয়ে জটিল ঘটনা। মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুন নাসের সুয়েজ খালকে তার দেশের জাতীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করেন। তখন পর্যন্ত সুয়েজ খাল বৃটিশ ও ফরাসী কোম্পানীগুলোর কাছে ইজারা দেয়া ছিল। মিশর সরকারের ঐ ঘোষণার ফলে কায়রোর সাথে ইউরোপের সম্পর্কে তীব্র টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। বৃটিশ ও ফ্রান্স সরকার জামাল আব্দুন নাসের সরকারের পতন ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ঐ দুটি দেশ মিশরে হামলা চালানোর জন্য ইসরাইলকে উস্কে দেয়। ইহুদীবাদী ইসরাইল তার জাহাজকে সুয়েজ খালে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না, এই অজুহাতে মিশরে সামরিক অভিযান চালায়। ফ্রান্স এবং বৃটিশ বাহিনীও যথারীতি ঐ যুদ্ধে অংশগ্রহন করে। তিন দেশের সম্মিলিত বাহিনী মিশরের সিনাই দ্বীপ এবং সুয়েজ খাল দখল করে নেয়। তবে এ ঘটনার বিরুদ্ধ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বিশ্বের বহু দেশ সুয়েজ খাল ও সিনাই দ্বীপ দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। মার্কিন সরকারও মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় বৃটিশ ও ফ্রান্স সরকারকে প্রভাব বিস্তার করতে দেখে ঐ ঘটনার ব্যাপারে উস্মা প্রকাশ করে। ফ্রান্স ও বৃটিশ সরকার মিশরীয় ভূখন্ড দখলের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সমর্থন না পেয়ে দখলীকৃত এলাকা ত্যাগ করে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইহুদীবাদী ইসরাইলও ৪ মাস প্রতিরোধ করার পর আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতী স্বীকার করে, বিশেষ করে মার্কিন আহবানে সাড়া দিয়ে সিনাই মরুভূমি থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়।

ফ্রান্স ও বৃটিশ সরকারের সমর্থন নিয়ে মিশরের বিরুদ্ধে ১৯৫৬ সালের যুদ্ধ শুরু করার পেছনে ইসরাইলের ৪টি প্রধান লক্ষ্য ছিল। ১৯৪৯ সালে আরব-ইসরাইল প্রথম যুদ্ধবিরতির চুক্তি অনুযায়ী ইসরাইলী জাহাজগুলোর জন্য সুয়েজ খাল ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করার জন্য ইসরাইলের ঐ খাল ব্যবহার জরুরী হয়ে পড়ে। কাজেই তেলআবিব সুয়েজ খাল নিজের জন্য অবমুক্ত করার লক্ষ্যে মিশরে হামলা চালায়। মিশরের সেনাবাহিনীকে পর্যদুস্ত করা ছিল ইসরাইলের মিশর আক্রমনের দ্বিতীয় লক্ষ্য। সে সময় মিশর আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি ছিল। কাজেই আরবদের পরাভূত করে মধ্যপ্রাচ্যে একক সামরিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হলে মিশরের সামরিক শক্তি খর্ব করার কোন বিকল্প ছিল না। এদিকে মিশর নিয়ন্ত্রিত গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনীরা তাদের মাতৃভূমি মুক্ত করার লক্ষ্যে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। সে আন্দোলন দমন করা ছিল ইসরাইলী বাহিনীর মিশর আক্রমনের তৃতীয় উদ্দেশ্য। সিনাই মরুভূমি দখল করে ইসরাইলের সীমানা বিস্তৃত করা ছিল ইহুদীবাদী ইসরাইলের মিশর আক্রমনের চতুর্থ ও শেষ লক্ষ্য।

১৯৫৬ সালের দ্বিতীয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ইহুদীবাদীদের এসব লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয় নি। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে সিনাই মরুভূমির পাশাপাশি সিরিয়ার গোলান মালভূমি, জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা এবং বাইতুল মোকাদ্দাসের পূর্ব অংশ, অর্থাৎ অবশিষ্ট সকল ফিলিস্তিনী ভূখন্ড ইহুদীবাদীরা দখল করে নেয়।

৯ম পর্ব

১৯৬৭ সালের ৬ দিন ব্যাপী আরব-ইসরাইল যুদ্ধকে উভয়পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ও ব্যাপকভিত্তিক যুদ্ধ বলে মনে করা হয়। ঐ যুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রথম ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গোরিওন বহু বছর আগে বলেছিল : ” ইসরাইল যে যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা সবার জানা উচিত। এছাড়া ইসরাইলের জন্য যে সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে তেলআবিব কোনদিনও সন্তুষ্ট থাকবে না, বরং মিশরের নীলনদ থেকে ইরাকের ফোরাত পর্যন্ত এ রাষ্ট্র বিস্তৃত হবে।”

বেন গোরিওন মনে করতো, ইহুদীবাদী সেনারা যতখানি ভূখন্ড দখল করতে পারবে, সে পর্যন্ত ইসরাইলের সীমানা বিস্তৃত হবে। কাজেই ইসরাইলের সীমান্ত চারিদিকে বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ১৯৬৭ সালের ৫ই জুন ইসরাইল- মিশর, সিরিয়া, জর্দান ও ইরাকের বিমানবন্দরগুলোতে একযোগে হামলা চালায় এবং ঐ অকস্মাৎ হামলায় সামরিক দিক দিয়ে ঐ চার আরব দেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। আরব দেশগুলো ইসরাইলী হামলা প্রতিরোধ করলে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায় এবং যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিন বিমান হামলা করে ইসরাইল আরব দেশগুলোর ব্যাপক ক্ষতি করে। স্থলযুদ্ধেও ইসরাইল মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মিশরের সিনাই মরুভূমি, সিরিয়ার গোলান মালভূমি, জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, বাইতুল মোকাদ্দাসের পূর্ব অংশ এবং গাজা উপত্যকা দখল করে নেয়।

১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পশ্চিম তীর ও পূর্ব বাইতুল মোকাদ্দাস জর্দানের নিয়ন্ত্রণে এবং গাজা উপত্যকা মিশরের অধীনে ছিল। ইহুদীবাদী সরকার এসব ফিলিস্তিনী ভূখন্ড দখলের মাধ্যমে নিজের জবরদখলকৃত এলাকাকে তিনগুণে উন্নীত করে। মিশর ও সিরিয়ার কিছু অংশ ছাড়াও গোটা ফিলিস্তিন ইসরাইলের দখলে চলে যায়। ফলে জাতিসংঘের প্রস্তাবে মাত্র ৪৫ শতাংশ ফিলিস্তিনী ভূখন্ড নিয়ে যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার কথা ছিল, সে সম্ভাবনাটুকুও বিলীন হয়ে যায়। ১৯৬৭ সালের জুন মাসের যুদ্ধে ইসরাইলের ভৌগোলিক মানচিত্রের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পুরোপুরি পাল্টে যায়।

ইহুদীবাদীদের মতে, জাতিসংঘ গোটা ফিলিস্তিন তাদেরকে না দিয়ে ঐ ভূখন্ড দ্বিখন্ডিত করে যে ভুল করেছিল, ৬৭ সালের যুদ্ধের মাধ্যমে সে ভুল সংশোধন করা হয়েছে। ঐ যুদ্ধের আগে ইসরাইলের আয়তন ছিল ২০ হাজার ৬৯৯ বর্গকিলোমিটার এবং শহরগুলো একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে ইসরাইলের মানচিত্রও ছিল অনেকটা এব্রোথেব্রো। এ কারণে ইসরাইলী কর্মকর্তারা জবরদখলের মাধ্যমে তাদের মানচিত্রের এই অসামঞ্জস্য দূর করার চেষ্টা করছিল। সে সময় ইসরাইলের শতকরা ৮০ ভাগ নাগরিক তেলআবিব ও এর আশেপাশে ভূমধ্যসাগরের তীরে বসতি গড়ে তুলেছিল। তবে তাদের বসতিগুলো ছিল পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ও খাপছাড়া। এ ধরনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইসরাইলীরা নিজেদেরকে ভূমধ্যসাগর ও জর্দানের মধ্যবর্তী সরু একটি এলাকার মধ্যে অবরুদ্ধ বলে মনে করতো এবং এজন্য তারা উদ্বিগ্নও ছিল।

অন্যদিকে বাইতুল মোকাদ্দাসের দুই অংশকে একত্র করা ছিল ইসরাইলের আরেকটি মনবাসনা। ১৯৪৮ সালে ইহুদীবাদী সরকার বাইতুল মোকাদ্দাসের পশ্চিম অংশ দখল করে নেয় এবং এর ১৯ বছর পর ঐ ঐতিহাসিক নগরীর পূর্ব অংশ দখলের জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। মুসলমানদের প্রথম ক্বেবলা মসজিদুল আকসা করায়ত্ব করার জন্য পূর্ব বাইতুল মোকাদ্দাস দখল করার প্রয়োজন ছিল। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইহুদীবাদীদের সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়। এ সময়েও সারাবিশ্ব থেকে ইহুদীদেরকে ইসরাইলে এসে স্থায়ী বসতি গড়ার জন্য উৎসাহিত করার কাজ অব্যাহত থাকে।

এদিকে ইসরাইলীরা সে সময় অন্য যে সমস্যা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে, তা হলো সিরিয়ার গোলান মালভূমি। গোলান মালভূমির কৌশলগত অবস্থান, বিশেষ করে বৈরুত ও দামেস্কের সাথে এর সংযোগ থাকায় ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিন জবরদখলের শুরু থেকে ঐ মালভূমি জবরদখলের সুযোগ খুঁজতে থাকে। ইসরাইলের সীমানা বৃদ্ধির পাশাপাশি গোলান মালভূমি বা পার্বত্য এলাকার সুমিষ্ট পানির উৎস দখল করাও ছিল ইহুদীবাদীদের অন্যতম লক্ষ্য। কাজেই দেখা যাচ্ছে, ১৯৬৭ সালের জুন মাসের যুদ্ধে ইসরাইল এক ঢিলে বহু পাখি শিকার করে।

এদিকে ১৯৬৭ সালের ২৪শে নভেম্বর আরব-ইসরাইল যুদ্ধের ৪ মাস পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২৪২ নম্বর প্রস্তাব পাশ করে। জাতিসংঘ ঐ প্রস্তাবে গোলান মালভূমি, সিনাই মরুভূমি, পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা ও পূর্ব বাইতুল মোকাদ্দাসকে অধিকৃত ভূখন্ড বলে উল্লেখ করে এবং এসব এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করার জন্য ইসরাইলের প্রতি আহবান জানায়। অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জাতিসংঘ একবার ১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিনী ভূখন্ড দ্বিখন্ডিত করে সেখানকার মুসলিম জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে চরম অবিচার করেছিল। এরপর সংস্থাটি ১৯৬৭ সালে ২৪২ নম্বর প্রস্তাব পাশের মাধ্যমে ফিলিস্তিনী জনগণের অধিকার হরণের দ্বিতীয় ঐতিহাসিক ভুল ও অন্যায় করে।

১৯৪৭ সালের ১৮১ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী ফিলিস্তিনকে দুই ভাগে বিভক্ত করে এর ৫৫ ভাগ ইহুদীবাদীদেরকে দেয়া হয়েছিল। আর ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল বাকি ৪৫ ভাগ এলাকাও দখল করে নিয়েছিল। মোট ফিলিস্তিনী ভূখন্ডের মাত্র ২০ শতাংশ এলাকা জুড়ে ছিল গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব বাইতুল মোকাদ্দাস। ফলে দেখা যাচ্ছে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৬৭ সালে ২৪২ নম্বর প্রস্তাব পাশ করে গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব বাইতুল মোকাদ্দাস থেকে ইসরাইলী সেনা প্রত্যাহারের আহবান জানিয়ে কার্যত শতকরা ৮০ ভাগ ফিলিস্তিনী ভূখন্ডকে বৈধভাবে ইসরাইলকে দিয়ে দেয়, যার পরিমাণ ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘের প্রস্তাবেই ছিল মাত্র ৫৫ ভাগ।

১৯৬৭ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধে পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা ও পূর্ব বাইতুল মোকাদ্দাসের আরো ৩ লাখ ৭০ হাজার ফিলিস্তিনী শরণার্থীতে পরিণত হয়। সিরিয়ার গোলান মালভূমি থেকে এক লাখ সিরিয়ো নাগরিক এবং মিশরের সিনাই মরুভূমি থেকে আরো হাজার হাজার মিশরীয় নাগরিকও তাদের বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত হন। ইহুদীবাদী ইসরাইল নব্য দখলীকৃত এলাকাগুলিতে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করার জন্য নতুন নতুন বসতি গড়ে তুলে সারাবিশ্ব থেকে আরো হাজার হাজার ইহুদীকে ধরে এনে এসব বসতিতে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। এরপর ইসরাইলের সাথে আরবদের বড় ধরনের কোন যুদ্ধ না হলেও ইহুদীবাদী সরকার এখনো মধ্যপ্রাচ্যের সকল সংকটের কেন্দ্রবিন্দু রয়ে গেছে।

১০ম পর্ব

ফিলিস্তিনী ভূখন্ড জবরদখল করে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোন আইনগত বৈধতা না থাকলেও ইহুদীবাদীরা পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রভাব কাজে লাগিয়ে এবং অস্ত্রের জোরে একটি অবৈধ রাষ্ট্র গঠন করে। এরপর তারা ঐ রাষ্ট্রের অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি ফিলিস্তিনের পাশ্ববর্তী দেশগুলোতেও আগ্রাসন চালায়। প্রকৃতপক্ষে একটি রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি বা জনসংখ্যা, এর কোনটিই ইহুদীবাদীদের ছিল না। ভূমির চাহিদা মেটানোর জন্য তারা ফিলিস্তিনী ভূখন্ড জবরদখল করে। এছাড়া প্রয়োজনীয় জনসংখ্যার চাহিদা মেটানোর জন্য তারা বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যার মধ্যে বিভিন্ন দেশের ইহুদীদের ইসরাইলে এনে বসতি গড়ার পরিকল্পনা হচ্ছে অন্যতম।

ইসরাইলে জনসংখ্যার ঘাটতির বিষয়টি এতখানি প্রকট যে, ২০০২ সালে ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের তৎকালীন প্রধান ইউযি ডায়ান ইসরাইলের জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সারাবিশ্ব থেকে ইহুদীদেরকে ধরে এনে ইসরাইলে বসতি স্থাপনের জন্য উৎসাহিত করা ইসরাইলী নেতাদের জন্য যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তা তাদের কথায় একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে। ইসরাইলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গোরিওন একবার ইসরাইলের পার্লামেন্টে বলেছিল, ফিলিস্তিনে ইহুদীদের অভিভাসনের ফলে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা এবং একে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া অপর সাবেক ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী গোল্ডমেয়ার একবার বলেছিল : ” ইহুদীরা অভিভাসিত না হলে আমরা রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখবো কাদের নিয়ে!”

ইসরাইলে ইহুদীদের নিয়ে আসার দায়িত্বপ্রাপ্ত এজেন্সির কর্মকর্তারা দাবি করেছে, যদি ইসরাইলে ইহুদীদের স্থায়ীভাবে আসা বন্ধ হয়ে যায়, কিংবা এতে কোন ছেদ পড়ে, তবে ইসরাইলের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
ইহুদীবাদীরা ইসরাইলে ইহুদীদের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি ফিলিস্তিনীদের সংখ্যা হ্রাসের লক্ষ্যেও ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। গণহত্যা ও সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে যেসব ফিলিস্তিনীকে তাদের মাতৃভূমি থেকে বের করতে পারে নি, তাদের ওপর অবরোধ আরোপ করে তাদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছে। এভাবে ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনের জনসংখ্যার কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়।

আমরা এর আগেও যেমনটি বলেছি, ইহুদীবাদীরা অধিকৃত ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে ইহুদী অভিভাসিদের ধরে আনার পাশাপাশি সেখানকার প্রকৃত অধিবাসী অর্থাৎ ফিলিস্তিনীদেরকে তাদের জন্মভূমি থেকে বিতাড়নের লক্ষ্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ইসরাইলের ঐ নৃশংস অপরাধের কারণে আজো ৪৫ লাখ ফিলিস্তিনী, শরণার্থী হিসেবে পার্শ্ববর্তী আরব দেশগুলোতে বসবাস করছে। যেসব আরব দেশে অধিকাংশ ফিলিস্তিনী শরণার্থী বসবাস করছে তাদের মধ্যে সিরিয়া, লেবানন ও জর্দানের নাম উল্লেখ করা যায়। এছাড়া গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরে নিজেদের জন্মভূমিতে নির্মিত বহু শরণার্থী শিবিরেও হাজার হাজার ফিলিস্তিনী মানবেতর জীবন যাপন করছে। শরণার্থী শিবিরগুলোতে বসবাসরত ফিলিস্তিনীদের জীবন এতটাই দুর্বিসহ যে, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশন এ ব্যাপারে বহুবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৪, ৩০২ ও ৫১২ নম্বর প্রস্তাব পাশ করে ফিলিস্তিনী শরণার্থীদেরকে তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে আসার সুযোগ দেয়ার যে আহবান জানিয়েছে, ইহুদীবাদী ইসরাইল তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এমনকি মার্কিন সমর্থন নিয়ে তেলআবিব এমন ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে, যাতে ফিলিস্তিনী শরণার্থীরা আর কোনদিনও তাদের পূর্বপুরুষদের আবাসভূমিতে ফিরে আসার কথা কল্পনাও করতে না পারে। ইহুদীবাদী ইসরাইল কথিত ‘জনসংখ্যা’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে অধিকৃত ফিলিস্তিনের জনসংখ্যার বিন্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। এ কাজে তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনকে এর প্রকৃত অধিবাসীমুক্ত করে শুধুমাত্র ইহুদী অধ্যূষিত একটি রাষ্ট্রে পরিণত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলে নতুন বসতি স্থাপনকারীর আগমনের পরিবর্তে সেখান থেকে ইহুদীরা পালিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। ফলে তেলআবিব মহা ফাঁপরে পড়ে গেছে। এরকম বহু ইহুদী যারা ইসরাইলীদের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে পাড়ি জমিয়েছিল, তারা এখানে এসে ইহুদীবাদীদের প্রকৃত চরিত্র এবং বাস্তবতা দেখে ইসরাইলে থাকতে রাজী হয় নি। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে ইসরাইলে অভিবাসনের হার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। ইসরাইলের গত ৬০ বছরের ইতিহাসে এটি নজীরবিহীন ঘটনা। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইল থেকে কয়েক লাখ ইহুদী তাদের নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছে।

ইসরাইলী দৈনিক ‘ইয়াদিউত আহারনোত’ -এ প্রকাশিত সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ইসরাইলের যুব সমাজের শতকরা ৬৮ ভাগ, জীবন যাপনের জন্য ইসরাইলকে উপযুক্ত স্থান বলে মনে করে না। এ কারণে তারা উপযুক্ত সুযোগ আসলে ইসরাইল ত্যাগ করবে বলে জানিয়েছে। ইসরাইলের একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত জরীপের ভিত্তিতে দৈনিকটি ঐ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে। ইসরাইলী কর্মকর্তাদের ধোঁকাবাজি এবং অভিবাসন গ্রহনকারী ইহুদীদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে মূলত নতুন করে আসা ইহুদীরা ইসরাইল ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে। এছাড়া ফিলিস্তিনের নিরীহ জনগণের ওপর ইসরাইলী সেনাদের অকথ্য নির্যাতন ও গণহত্যার বিষয়টি সুস্থ মস্তিস্ক সম্পন্ন ইহুদীদের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয়। আর তারা যখন দেখতে পায় যে, ইসরাইল সরকার মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে অভিবাসী ইহুদীদের ব্যবহার করছে, তখন তারা স্ব স্ব দেশে ফিরে যায়।

কাজেই দেখা যাচ্ছে, ইহুদীবাদীরা শত চেষ্টা করেও ফিলিস্তিনকে সেখানকার প্রকৃত অধিবাসীদের কাছ থেকে পুরোপুরি গ্রাস করে সেখানে ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণভাবে সফল হয় নি। এছাড়া ইসরাইল সরকার ফিলিস্তিন ও লেবাননের প্রতিরোধ সংগ্রামীদের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে নিজের সীমানা নীলনদ থেকে ফোরাত পর্যন্ত বিস্তৃত করার পরিবর্তে আগের দখলীকৃত ভূমিতেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সবদিক থেকেই ইসরাইল মারাত্মক সমস্যার মধ্যে রয়েছে এবং এই অবৈধ ও দখলদার সরকার পতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। #

১১তম পর্ব

পাঠক ! গত পর্বে আমরা সারাবিশ্ব থেকে ইসরাইলে ইহুদী অভিবাসন সম্পর্কে কথা বলেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, ৬০ বছর আগ পর্যন্ত বিশ্ব মানচিত্রে ইসরাইল নামক কোন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল না। সারাবিশ্ব থেকে ইহুদীদের ধরে এনে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে তাদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা কোরে ইসরাইল রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে। কাজেই ইহুদী অভিবাসনের এ ধারা অব্যাহত রাখা ইহুদীবাদী নেতাদের জন্য একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে শান্তিকামী ইহুদীরা ইসরাইলে এসে ইহুদীবাদীদের আগ্রাসী তৎপরতা ও ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর চালানো দমন অভিযানের দৃশ্য দেখে হতাশ হয়ে যার যার দেশে ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও ইহুদীদেরকে ইসরাইলে নিয়ে আসার জন্য ইহুদীবাদীদের প্রচেষ্টা বন্ধ হয় নি। তারা সারাবিশ্বের ইহুদীদের ইসরাইলে আসতে উৎসাহিত করার জন্য একের পর এক উপশহর নির্মাণ করে যাচ্ছে। আজকের আসরে আমরা অধিকৃত ফিলিস্তিনে ইহুদী উপশহর নির্মাণ সম্পর্কে কথা বলবো।

ঊনবিংশ শতাব্দিতে ইহুদীবাদী মতবাদের জন্ম হওয়ার পর থেকে এ মতবাদের ধারক ও বাহকরা আরব দেশগুলোর সম্পদ জবরদখলের চেষ্টা শুরু করে। আরব দেশগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তারের ইহুদীবাদী প্রচেষ্টা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। বর্তমানে অধিকৃত ফিলিস্তিনে নতুন নতুন ইহুদী উপশহর ও কথিত নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণের যে আগ্রাসী পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা ইহুদীবাদী মতবাদের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শুরু হয়েছিল। ১৯৬৭ সালে সম্মিলিত আরব বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের একই সময়ে ইহুদীবাদীরা দখলীকৃত আরব ভূখন্ডে তাদের আগ্রাসী পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করতে থাকে। এসময়টাকে তারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়ে আসা ইহুদীদের বাড়িঘর নির্মাণের মোক্ষম সুযোগ বলে ধরে নেয় এবং ব্যাপকভাবে ইহুদী উপশহর নির্মাণ করতে থাকে।

ইহুদীবাদীরা একদিকে পূর্ব ইউরোপসহ সারাবিশ্ব থেকে ইহুদীদেরকে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে নিয়ে আসতে থাকে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনী জনগণের ভূমি জোর করে জবরদখল এবং তাদেরকে তাদের বাড়িঘর থেকে তাড়িয়ে দিতে থাকে। ইহুদীবাদীরা নিজেদের আধিপত্যকামী নীতি এবং আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এসব অমানবিক কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। এ সময় ইহুদীবাদী নেতারা বুঝতে পারে, শুধুমাত্র ফিলিস্তিনীদের তৈরি করা ও ফেলে যাওয়া বাড়িঘর, সেখানে অবৈধভাবে নিয়ে আসা ইহুদীদের আবাসনের জন্য যথেষ্ট নয়। কাজেই এসব অভিবাসী ইহুদীর জন্য পরিকল্পিত আবাসন প্রয়োজন। এ কারণে সর্বপ্রথম মূলতঃ ইসরাইলের লেবার পার্টির নেতারা ইহুদীদের জন্য উপশহর নির্মাণের পরিকল্পনা উত্থাপন করে।

ইহুদীবাদী নেতাদের কাছে উপশহর নির্মাণের বিষয়টি যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৭০ এর দশকের শেষ ভাগে তৎকালীন ইসরাইলী যুদ্ধমন্ত্রী জেনারেল মুশে দাইয়ানের কথায়। ঐ জেনারেল বলেছিল, ইসরাইল সরকার যে সব উপশহর নির্মাণ করছে, তা সংরক্ষণ করতে হবে এবং এসব উপশহর হবে ইসরাইলের প্রান্তসীমা। ইহুদীবাদী নেতারা এভাবে তাদের আধিপত্যকামী নীতি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে উপশহর নির্মাণের বিষয়টিকে কাজে লাগাতে থাকে। তারা যে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করে তা হলো, জোর করে আরব ভূমিতে ইহুদী উপশহর নির্মাণ করতে হবে এবং যতখানি যায়গায় উপশহর নির্মাণ করা হলো, ততখানি যায়গা ইসরাইলের ভূখন্ডে পরিণত হবে। এ কারণে ইহুদীবাদী ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা থেকে আজ পর্যন্ত ঐ অবৈধ রাষ্ট্রের সবগুলো সরকার উপশহর নির্মাণকে ইসরাইলের অস্তিত্ব রক্ষা এবং এর বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে এবং এখনো করছে।
এ সম্পর্কে ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বিন গোরিওন ১৯৪৮ সালে বলেছিল, সবাইকে এটা মনে রাখতে হবে যে, ‘যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এ রাষ্ট্র কখনো তার বর্তমান আয়তন ও সীমান্ত নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে না। নীল নদ থেকে ফোরাত উপকূল পর্যন্ত ইসরাইলের সীমানা বিস্তৃত হবে।’ ডেভিড বিন গোরিওনের ঐ ঘোষণার ৬ দশক পর এসে দেখা যাচ্ছে, ইসরাইল, ইহুদী উপশহরবেষ্টিত একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে এবং সত্যি সত্যি এসব উপশহর ইসরাইলের সীমান্ত রেখা হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া অধিকৃত ভূখন্ডে গুপ্তচরবৃত্তি করার কাজে এসব ইহুদী উপশহর ব্যবহৃত হচ্ছে। এর পাশাপাশি ইহুদী উপশহরগুলো অধিকৃত ফিলিস্তিনী ভূমিকে খণ্ড খণ্ড করে দিয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন ফিলিস্তিনী ভূখন্ডের ওপর ইহুদীবাদীদের আধিপত্য বিস্তারে সুবিধা হয়েছে, তেমনি একটি একক ভূখণ্ডের স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করার সম্ভাবনাও চিরতরে মুছে দেয়া হয়েছে।

ইহুদী উপশহর নির্মাণের পেছনে ইহুদীবাদীদের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো, ইসরাইল নামে তারা যে অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে, সেখানে যে কোনদিন আরব বসতি ছিল, তার নাম নিশানা মুছে ফেলা। ইহুদীবাদীরা এখন পর্যন্ত জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, বিশেষ করে বাইতুল মোকাদ্দাসে ১৭০টিরও বেশী উপশহর নির্মাণ করেছে। এছাড়া ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে সিরিয়ার কাছ থেকে দখল করা গোলান মালভূমিতে তারা নির্মাণ করেছে ৪০টিরও বেশী উপশহর। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিরস্থায়ী স্বর্গ উপহার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে সব ইহুদীকে নিয়ে আসা হয়েছে, তাদেরকে এসব উপশহরে থাকতে দেয়া হয়েছে।

ইসরাইল সরকার ইহুদী উপশহরকে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার বলে মনে করে। ফলে গত ৬০ বছরে এক মুহুর্তের জন্যও উপশহর নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখে নি। এদিকে কিছু চিহ্ণিত ফিলিস্তিনী নেতা ইসরাইলের সাথে যে আপোষ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে, তার ফলে ইহুদী উপশহর নির্মাণের কাজ তো বন্ধ হয়ই নি, উল্টো ইহুদীবাদীরা আরো বেশী ধৃষ্ঠতার সাথে ঐ নির্মাণ কাজ অব্যাহত রেখেছে। ঐসব ফিলিস্তিনী নেতা ভেবেছিলেন, ইসরাইলের সাথে আপোষ করে বুঝি ইহুদী উপশহর নির্মাণ ও তেলআবিবের আগ্রাসী নীতি বন্ধ করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে ফল হয়েছে তার উল্টো। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের আনাপোলিসে অনুষ্ঠিত কথিত শান্তি আলোচনার পর ইসরাইল সরকার বাইতুল মোকাদ্দাসে নতুন ইহুদী উপশহর নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে।

এদিকে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডের গঠন, আকৃতি ও এর পরিচিতিকে মুছে দেয়ার এতসব ইহুদীবাদী প্রচেষ্টার পরও ফিলিস্তিনী জনগণ ইসরাইলের সকল আগ্রাসন ও দমন অভিযানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। তারা যে কোন কিছুর বিনিময়ে তাদের পূর্বপুরুষের আবাসভূমির পরিচিতি রক্ষা ও পুনরুদ্ধারে বদ্ধ পরিকর। ফিলিস্তিনী জনগণের তীব্র প্রতিরোধের মুখে ইসরাইল সরকার গাজা উপত্যকা থেকে সৈন্য ফিরিয়ে নিতে এবং সেখানে নির্মিত সকল উপশহর ফেলে রেখে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। ফিলিস্তিনের নির্যাতিত জাতি তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের এ সংগ্রাম চালিয়ে গেলে ইহুদীবাদীরা আরো বেশী পিছু হঠতে এবং আরো অনেক ইহুদী উপশহর ফিলিস্তিনী জনগণকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। আর এভাবেই মধ্যপ্রাচ্যের বুকে বিষফোঁড়ার মতো গজিয়ে ওঠা অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের পতন ত্বরান্বিত হবে। #

১২ তম পর্ব

পাঠক! আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে, গত আসরে আমরা অধিকৃত ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে ইহুদী উপশহর নির্মাণের বিষয়ে কথা বলেছিলাম। উপশহর নির্মাণ ইহুদীবাদীদের কাছে যে কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তা আমরা ইসরাইলী কর্মকর্তাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তুলে ধরেছিলাম। অধিকৃত ফিলিস্তিনের জনসংখ্যার গঠনকাঠামোয় পরিবর্তন এবং অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ইহুদীবাদীরা ঐসব উপশহর নির্মাণ করে যাচ্ছে। ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার বাসনা চরিতার্থ করার জন্য ইহুদীবাদীরা আরো যে সব অবৈধ কাজ করছে, বাইতুল মোকাদ্দাসে আগ্রাসী তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া তার অন্যতম। আজকের আসরে আমরা বাইতুল মোকাদ্দাসে ইহুদীবাদীদের অপতৎরতা সম্পর্কে আলোচনা করবো।

বাইতুল মোকাদ্দাস হচ্ছে ইসলাম, খ্রিস্টান ও ইহুদী- এই তিন ধর্মের লালনভূমি। কাজেই এই তিন ধর্মের মানুষের কাছেই বাইতুল মোকাদ্দাসের গুরুত্ব অপরিসীম। এছাড়া ঐতিহাসিক দিক দিয়েও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর, কারণ, এর বয়স অন্তত কয়েক হাজার বছর। অথচ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দিক থেকে এত গুরুত্বপূর্ণ শহরটির ওপর দৃষ্টি পড়েছে ইহুদীবাদীদের। তারা অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠার প্রথম থেকেই এই শহরটিকে ইসরাইলের রাজধানীতে পরিণত করার চেষ্টা করেছে। ইসরাইলীরা ১৯৪৮ সালে বাইতুল মোকাদ্দাসের পশ্চিম অংশ এবং ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে এর পূর্ব অংশ দখল করে নেয়। ১৯৮০ সালে ইহুদীবাদীরা একটি বিল পাশের মাধ্যমে বাইতুল মোকাদ্দাসকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেয়, যদিও তারা এখন পর্যন্ত তাদের সে ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে পারে নি। তবে তখন থেকে ইহুদীবাদীরা বাইতুল মোকাদ্দাসের জনসংখ্যার কাঠামোর পাশাপাশি এর অবকাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনার কাজ শুরু করে। তারা বাইতুল মোকাদ্দাসে ইহুদীদের জড়ো করতে থাকে এবং সেখানকার আদিবাসী ফিলিস্তিনীদের তাড়িয়ে দেয়। ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনী মুসলমানের পাশাপাশি সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়েরও শত শত মানুষ তাদের বাপদাদার ভিটেমাটি ছেড়ে নিরুদ্দেশের পথে যাত্রা করতে বাধ্য হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইহুদীবাদীদের এ কাজের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়। বাইতুল মোকাদ্দাসে ইহুদীবাদীদের এ আগ্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর পাশাপাশি খ্রিস্টান সম্প্রদায় এবং পোপের পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ জানানো হয়। বাইতুল মোকাদ্দাস তিনটি ধর্মের কাছে পবিত্রভূমি বলে ইহুদীবাদীদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

ইহুদীবাদী ইসরাইল বাইতুল মোকাদ্দাসের অবকাঠামোতে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে সেখানকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের কাজে হাত দেয়। বহু মসজিদ ধ্বংসের পাশাপাশি মসজিদুল আকসারও ক্ষতিসাধন করা হয়। এমনকি খ্রিস্টানদের প্রার্থনার স্থান গীর্যাও ইহুদীবাদীদের ধ্বংসলীলার হাত থেকে রক্ষা পায় নি। ইহুদীবাদীরা বাইতুল মোকাদ্দাসে এসব আগ্রাসী তৎপরতা চালিয়ে ঐ শহরকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চায়। এছাড়া বাইতুল মোকাদ্দাসের ইসলামী পরিচিতি মুছে ফেলাও তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। এ কারণে তারা মুসলমানদের প্রথম ক্বেবলা মসজিদুল আকসাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলতে চায়। গত ৬০ বছরে ইহুদীবাদী ইসরাইল কয়েকবার বাইতুল মোকাদ্দাস ধ্বংসের কাজে হাত দিয়েছে।

১৯৬৯ সালের ২১শে আগস্ট একদল উগ্র ইহুদীবাদী বাইতুল মোকাদ্দাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। মাইকেল রোহান নামে এক উগ্র ইহুদীবাদীর নেতৃত্বে একদল উগ্র লোক সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে এবং ইসরাইল সরকারের সবুজ সংকেত নিয়ে মসজিদুল আকসায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এর ফলে মুসলমানদের প্রথম ক্বেবলার একাংশের মারাত্মক ক্ষতি হয়। ১৯৮২ সালের ১১ই এপ্রিল এল্যান জুদমান নামে এক ইসরাইলী সেনা মসজিদুল আকসায় নামাজরত হাজার হাজার মুসল্লির ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায়। তার ব্রাশ ফায়ারে অন্তত ২০ জন ফিলিস্তিনী মুসল্লি শহীদ ও অপর ৬০ জনেরও বেশী মুসলমান আহত হন। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হয়েছে আল আকসা মসজিদের তলদেশে ইহুদীবাদীদের খনন প্রক্রিয়া। মসজিদটিকে পুরোপুরি বিধ্বস্ত করার লক্ষ্যে ইসরাইল সরকার ঐ খনন কাজ চালাচ্ছে এবং এর ফলে আল আকসা মসজিদের অস্তিত্ব এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

এদিকে বাইতুল মোকাদ্দাস শহরকে ইসরাইলের রাজধানীতে পরিণত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টায়ও ক্ষান্ত দেয় নি ইহুদীবাদীরা। সম্প্রতি তারা তেলআবিবে নিযুক্ত বিদেশী কূটনৈতিক মিশনগুলোকে বাইতুল মোকাদ্দাসে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইহুদীবাদীদের আগ্রাসী তৎপরতার কাছে আত্মসমর্পনে বাধ্য করা হচ্ছে এ কাজে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু বিশ্ব সম্প্রদায় ইসরাইলের এ আহবানের তীব্র বিরোধিতা করেছে। এমনকি ইহুদীবাদী ইসরাইলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলিও বিশ্ব জনমতের চাপের কারণে বাইতুল মোকাদ্দাসে দূতাবাস স্থানান্তর করা থেকে বিরত রয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্বের মুসলিম দেশগুলো বাইতুল মোকাদ্দাস তথা মসজিদুল আকসাকে ইহুদীবাদীদের আগ্রাসন থেকে রক্ষার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ইসলামী সম্মেলন সংস্থা বা ওআইসি বাইতুল মোকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কুদস কমিটি গঠন করেছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের স্থপতি মরহুম ইমাম খোমেনি (রহ:) প্রতি বছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবারকে পবিত্র কুদস দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ইমামের ঐ ঘোষণার ফলে প্রতি বছর মুসলমানরা কুদস দিবসে মিছিল ও শোভাযাত্রা করে বিশ্ববাসীকে জানান দেয় যে, বাইতুল মোকাদ্দাস মুসলমানদের ভূমি এবং তা বর্তমানে ইহুদীবাদীরা দখল করে রেখেছে। বাইতুল মোকাদ্দাস উদ্ধারের এ তৎপরতার ফলে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে।

২০০০ সালে তৎকালীন ইসরাইলী কর্মকর্তা, যে পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিল, সে মুসলমানদের প্রথম ক্বেবলা মসজিদুল আকসায় প্রবেশের ধৃষ্ঠতা দেখায়। ফিলিস্তিনসহ গোটা মুসলিম বিশ্ব শ্যারনের ঐ ধৃষ্ঠতাকে আল আকসা মসজিদের অবমাননা বলে মনে করে এবং এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ফিলিস্তিনের মুসলমানরা ঐ ঘটনার প্রতিবাদে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা গণ-আন্দোলন শুরু করেন। সার্বিকভাবে দেখা যায়, বিশ্বের মুসলমানরা ইহুদীবাদী ইসরাইল কর্তৃক বাইতুল মোকাদ্দাস দখলের ঘটনাকে ভালো চোখে দেখে নি। কাজেই আল আকসা মসজিদ ধ্বংসসহ ইহুদীবাদীরা বাইতুল মোকাদ্দাস শহরে যে সব আগ্রাসী কাজ করে যাচ্ছে, তার পরিণতি যে কখনোই শুভ হবে না, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

কুদস শরীফে ইহুদীবাদীদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমাজের প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করার মত। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০৫ সালের গোড়ার দিকে সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাব পাশ করে। ঐ প্রস্তাবে বাইতুল মোকাদ্দাসকে ইসরাইলের রাজধানী করার ঘোষণাকে অকার্যকর ও বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়। জাতিসংঘের ঐ প্রস্তাবে সীমিত সংখ্যক যেসব দেশ বাইতুল মোকাদ্দাসে কূটনৈতিক মিশন প্রতিষ্ঠা করেছিল, তাদেরকে ঐ সব মিশন গুটিয়ে ফেলার আহবান জানানো হয়। এছাড়া ঐ প্রস্তাবে বাইতুল মোকাদ্দাসে প্রশাসনিক বিভিন্ন দফতর স্থাপনের ইসরাইলী পরিকল্পনাকেও অবৈধ ঘোষণা করা হয়। ইসরাইলী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমাজের এ প্রতিক্রিয়ার ফলে বোঝা যায়, ইহুদীবাদীরা বাইতুল মোকাদ্দাসসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনে তাদের আগ্রাসী তৎপরতাগুলোকে এখনো পুরোপুরিভাবে বিশ্ব সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে নি।

১৩ তম পর্ব

পাঠক ! আপনাদের হয়তো মনে আছে, গত আসরে আমরা অধিকৃত ফিলিস্তিনের বাইতুল মোকাদ্দাসের ওপর ইহুদীবাদীদের দখলদারিত্ব ও সেখানে তাদের ধ্বংসাত্মক তৎপরতা সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আমরা বলেছি, ৬০ বছর আগে পশ্চিমা দেশগুলোর সহযোগিতা ও চক্রান্তের ফসল হিসেবে ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ইহুদীবাদীরা তিনটি ধর্মের পবিত্র স্থান- বাইতুল মোকাদ্দাস দখলের পাঁয়তারা শুরু করে। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ইহুদীবাদীরা ঐ শহরের একাংশ দখল করে নেয়। এরপর থেকে শুরু হয় তেলআবিব থেকে ইসরাইলের রাজধানীকে বাইতুল মোকাদ্দাসে স্থানান্তরের প্রচেষ্টা। কিন্তু আন্তর্জাতিক সমাজ বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের প্রতিবাদের কারণে ইহুদীবাদীদের সে প্রচেষ্টা আজও সফল হয় নি। তবে তারা মুসলমানদের প্রথম ক্বেবলা মসজিদুল আকসা ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তো আজ আমরা মধ্যপ্রাচ্যের পানি সম্পদের উৎস দখলের ইহুদীবাদী অপতৎপরতা সম্পর্কে আলোচনা করবো।

ইহুদীবাদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই ইহুদীবাদী নেতারা আরব দেশগুলোর পানি সম্পদ দখল ও তা প্রত্যাহার করে ইসরাইলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করে। এ কারণে আরব দেশগুলো বিশেষ করে ফিলিস্তিনী জনগণ ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনের স্বশাসন কর্তৃপক্ষের পানি সম্পদ বিভাগের প্রধান ফজল কাউশ এ সম্পর্কে বলেছে, ইসরাইলীরা জর্দান নদীর শতকরা ৪৫ ভাগ পানি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। ফজল কাউশ আরো বলেছে, জর্দান নদীর ৮৫ কোটি কিউসেক পানির মধ্যে ফিলিস্তিনীরা মাত্র ৮ কোটি ৫০ লাখ কিউসেক পানি ব্যবহার করতে পারছে। ইহুদীবাদী ইসরাইল ঐ নদীর বাকি পানি বাঁধ দিয়ে প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে। এর আগে গাজা উপত্যকার ওপর ইসরাইলী দখলদারিত্বের সময় তেলআবিব গাজা থেকেও বেশীর ভাগ পানি চুরি করে নিয়ে যেত। গাজার পানি সম্পদের পরিমাণ বছরে ২০ কোটি কিউসেক বলে ধরা হয়। তবে গাজা থেকে ইসরাইলী সেনা প্রত্যাহার করার পর ইহুদীবাদীরা ঐ উপত্যকার পানিসম্পদ আর চুরি করতে পারছে না। কিন্তু ইহুদীবাদী ইসরাইল কর্তৃক জর্দান নদীর পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রয়েছে।

সিরিয়া ও জর্দানের ভেতর দিয়ে বয়ে আসা নদী ইয়ারমুক থেকেও ইসরাইল বছরে ১০ কোটি কিউসেক পানি সরিয়ে নিচ্ছে। দক্ষিণ লেবানন যখন ইসরাইলের দখলে ছিল, তখন সেখানকার তিনটি নদীর পানি ইহুদীবাদীরা চুরি করতো এবং এর পরিমাণ ছিল ৭০ কোটি কিউসেক। কিন্তু হিযবুল্লাহর তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলনের মুখে ২০০০ সালে ইহুদীবাদী সরকার দক্ষিণ লেবানন থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। কিন্তু তারপরও তারা লেবাননের পানি চুরি করা বন্ধ রাখে নি। তারা খাল খনন ও পাইপ লাইন স্থাপনের মাধ্যমে লেবাননের পানি ইসরাইলে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। গোলান মালভূমি দখল করে ইহুদীবাদীরা সিরিয়ার ৬০ কোটি কিউসেক পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।

এদিকে ইসরাইলের বার্ষিক পানির চাহিদা ২০০০ সালে ছিল ২৩০ কোটি কিউসেক, যা ২০২০ সালে ৩১০ কোটি কিউসেকে গিয়ে দাঁড়াবে। কাজেই ইসরাইলের পানি চাহিদার এ হিসাব থেকে বোঝা যায়, অবৈধ ঐ রাষ্ট্রটি তার ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা মেটানোর জন্য আগামী দিনগুলোতে আরব দেশগুলোর আরো বেশী পানির উৎস দখলের চেষ্টা করবে। তার তা করতে গেলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়বে। বর্তমানে ইসরাইল তুরস্কের বিভিন্ন নদী এবং মিশরের নীল নদ থেকে পানি আনার পরিকল্পনা মাথায় রেখেছে। সার্বিকভাবে বলা যায়, ইহুদীবাদী ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে তার আগ্রাসী নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আরব দেশগুলোর পানিসম্পদ কূক্ষিগত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

সিরিয়া, লেবানন ও জর্দানের পানি সম্পদের ওপর তেলআবিবের লোলুপ দৃষ্টি সব সময়ই ছিল। কথিত শান্তি আলোচনার মাধ্যমে যদি এসব পানির উৎসের নাগাল পাওয়া যায় তো ভালো, তা না হলে যুদ্ধ ও আগ্রাসনের মাধ্যমে এগুলো দখল করা ছিল ইসরাইলের অন্যতম নীতি। নীল নদ থেকে ফোরাত পর্যন্ত ইসরাইলের সীমানা বিস্তৃত করার যে ধৃষ্ঠতাপূর্ণ ঘোষণা ইহুদীবাদী নেতারা দিয়েছিল, তার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আরব দেশগুলোর পানি সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ, শুধুমাত্র ভৌগোলিক সীমানা বৃদ্ধি করার জন্য নয়, সেই সাথে আরব দেশগুলোর পানি সম্পদের ওপরও জবর দখল প্রতিষ্ঠা করা ছিল নীল নদ থেকে ফোরাত পর্যন্ত ইসরাইলের সীমানা বৃদ্ধি করা সংক্রান্ত ঘোষণার অন্যতম উদ্দেশ্য।

ওয়ার্ল্ড ওয়াটার রিসার্স সেন্টারের অন্যতম গবেষক রোস্টভা এ সম্পর্কে বলেছে, ইসরাইল তার পতাকায় সাদা ভূমির ওপর যে নীল রংয়ের তারকা চিহ্ণ এঁকেছে, তার মধ্যেও আরবদের পানি সম্পদ কূক্ষিগত করার বাসনা লুকিয়ে আছে। ঐ নীল রংয়ের দাগগুলো হচ্ছে নীল ও ফোরাত নদীর কাল্পনিক প্রতীক। ইহুদীবাদী নেতাদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে ওয়ার্ল্ড ওয়াটার রিসার্স সেন্টারের ঐ গবেষকের কথার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়। ইহুদীবাদী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা থিওডর হার্তযেল যখন মধ্যপ্রাচ্যের বুকে একটি বৃহৎ ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল, তখন অন্য সব কিছুর আগে সে কল্পিত ঐ রাষ্ট্রের পানি চাহিদা কীভাবে মেটানো হবে, সে বিষয়টি মাথায় রেখেছিল। হার্তযেল ১৮৮৬ সালে নীল নদ থেকে ফোরাত পর্যন্ত বিস্তৃত ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছিল, ভবিষ্যতে যারা ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করবে তাদের নেতৃত্বে থাকবে পানি বিষয়ক কিছু বিশেষজ্ঞ। ঐ ইহুদীবাদী নেতা ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাল শহরের বিখ্যাত সম্মেলনে বলেছিল, ইসরাইলের সীমান্ত আগামী ৫০ বছর নাগাদ উত্তর লিথুনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বিন গোরিওন ১৯৫৫ সালে ইসরাইলের পানির উৎস সম্পর্কে বলেছিল, বর্তমানে ইসরাইল- পানি সম্পদের উৎস দখল করার জন্য আরবদের সাথে যুদ্ধ করছে। কাজেই এ যুদ্ধের ফলাফলের ওপর ইসরাইলের ভবিষ্যত অস্তিত্ব সরাসরি নির্ভরশীল। বিন গোরিওন আরো বলেছিল, আরবদের সাথে ঐ যুদ্ধে পরাজিত হলে ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে ইসরাইলের আর কোন অস্তিত্ব থাকবে না। ইসরাইলের একজন বিখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওয়েবেন এ সম্পর্কে বলেছে, ইহুদীবাদী ইসরাইলের দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যে সেদিনই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, যেদিন আরব দেশগুলোর সকল পানি সম্পদের ওপর তেলআবিবের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।

১৪তম পর্ব

পাঠক! ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলী জবরদখল সংক্রান্ত আলোচনার গত পর্বে আমরা মধ্যপ্রাচ্যের পানি সম্পদের উৎসগুলো দখলের ইহুদীবাদী অপতৎপরতা সম্পর্কে কথা বলেছি। আমরা বলেছি, ইসরাইলী কর্তৃপক্ষ কীভাবে আরব নদ নদীগুলোতে বাঁধ দিয়ে মুসলিম দেশগুলোর পানি সম্পদ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ইহুদীবাদী মতবাদের প্রবর্তক থেকে শুরু করে পরবর্তীতে ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সকল ইহুদীবাদী নেতার প্রধান মাথাব্যথা ছিল অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত এ রাষ্ট্রের পানির চাহিদা পূরনের বিষয়টি। কাজেই তারা শুরু থেকেই আরব দেশগুলোর পানি সম্পদ কুক্ষিগত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এদিকে ১৯৪৮ সালে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ইসরাইলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং সুযোগ পেলে অন্য দেশের ওপর আগ্রাসন চালানোর হাতিয়ার হিসেবে তেলআবিব সব সময় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গণবিধ্বংসী অস্ত্রের সন্ধান করতে থাকে। ইহুদীবাদী ইসরাইল যে মানবতাবিরোধী কাজ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে না, গণবিধ্বংসী অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা থেকে তা খুব ভালোভাবে প্রমাণিত হয়। আগ্রাসী আচরণের দিক থেকে ইসরাইলের সাথে পশ্চিমা দুনিয়ার মোড়ল বলে দাবিদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ মিল রয়েছে। এ কারণে মার্কিন সরকার ইসরাইলের গণবিধ্বংসী অস্ত্রের চাহিদা মেটাতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপন করে নি। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যে তেলআবিব পরমাণু অস্ত্রে সজ্জিত হয়। ইহুদীবাদী সরকারের পরমাণু বোমা অর্জনের প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন হয়, আজকের আসরে আমরা আপনাদের সেই সত্য কাহিনী শোনাবো।

১৯৫৩ সালে ইহুদীবাদী ইসরাইল পরমাণু অস্ত্র পাওয়ার জন্য ব্যাপক তোড়জোড় শুরু করে। পশ্চিমা দেশগুলোর সহযোগিতায় ইসরাইলের যুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঐ বছরই ইসরাইলী পরমাণু শক্তি কমিটি গঠিত হয়। ১৯৫৪ সালে একটি মার্কিন কোম্পানী হেভি ওয়াটার ও ইউরেনিয়াম দ্বারা পরিচালিত ইসরাইলের প্রথম পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের কাজ শুরু করে। অধিকৃত অঞ্চলের ‘রেইহুত লিযিওন’ এলাকায় ১৯৫৬ সালে ঐ চুল্লি স্থাপনের কাজ শেষ হয়। ১৯৫৫ সালে ইসরাইলে দ্বিতীয় পরমাণু কেন্দ্র নির্মাণের ব্যাপারে ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ঐ চুক্তির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইজেন আওয়ার ইসরাইলে দ্বিতীয় পরমাণু চুল্লি স্থাপনের নির্দেশ দেন এবং ১৯৬০ এর দশকের শেষভাবে ইসরাইলের ‘নাহাল সুরিক’ এলাকায় ঐ স্থাপনা নির্মাণের কাজ শেষ হয়। ইসরাইলের রাজধানী তেলআবিবের দক্ষিণে ‘সুরিক’ নদীর তীরে ‘নাহাল সুরিক’ পরমাণু কেন্দ্র অবস্থিত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে ২টি পরমাণু চুল্লি স্থাপন করে দিয়েই ক্ষান্ত হয় নি, সেই সাথে তেলআবিবকে পরমাণু বোমা তৈরির কাজে সুবিধা করে দেয়ার জন্য ২০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামও উপহার দেয়। ১৯৬৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জনসন ইসরাইলকে আরেকটি পরমাণু চুল্লি স্থাপন করে দেন, যার নাম ‘আননাবি রবিন’। ঐ পরমাণু চুল্লিটি ইউরেনিয়াম ও শীতল কমপ্রেসড বায়ুর সাহায্যে পরিচারিত হয়। এছাড়া নেকাব মরুভূমিতে ‘দিমুনা’ পরমাণু কেন্দ্রটি ১৯৫০ এর দশকের শেষ ভাগে ফ্রান্সের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স ও ইহুদীবাদী ইসরাইল ‘দিমুনা’ পরমাণু কেন্দ্র স্থাপনের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ইসরাইল ১৯৬৭ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে পাওয়া ১৪ কেজি প্লুটোনিয়াম এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়া ১০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে অন্তত ২০টি পরমাণু বোমা তৈরি করতে সক্ষম হয়। সেই থেকে আগ্রাসী ইহুদীবাদী সরকার পরমাণু অস্ত্র তৈরি করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং বর্তমানে তেলআবিবের হাতে রয়েছে প্রায় ৩০০টি পরমাণু বোমা। ইহুদীবাদী ইসরাইল এমন সময় পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচী চালিয়ে যাচ্ছে, যখন তেলআবিব এখন পর্যন্ত পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটিতে স্বাক্ষর করে নি। এছাড়া ইসরাইল আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আই.এ.ই.এ’র পরিদর্শকদেরকেও তার পরমাণু স্থাপনাগুলোতে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না। ইহুদীবাদী ইসরাইলের সম্প্রসারণকামী নীতির প্রতি মার্কিন সরকারের নির্লজ্জ সমর্থনের কারণে তেলআবিব আন্তর্জাতিক আইন কানুনকে এভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সাহস পাচ্ছে।

১৯৬৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ইসরাইলকে এই প্রতিশ্রুতি দেন যে, এনপিটি চুক্তিতে স্বাক্ষরের জন্য জাতিসংঘসহ কোন আন্তর্জাতিক সংস্থা তেলআবিবের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না, কারণ এসব বিশ্ব সংস্থায় ওয়াশিংটনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এরপর অন্যান্য পশ্চিমা দেশ ইসরাইলের পরমাণু কর্মসূচীর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে। ফলে তেলআবিবের মাধ্যমে আরো বেশী করে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি লংঘনের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়।

ইহুদীবাদী ইসরাইল প্রায় ৩০০ পরমাণু বোমার ভাণ্ডার গড়ে তুলে অধিকৃত ভূখন্ডকে পরমাণু অস্ত্রের একটি গুদাম বানিয়ে ফেলেছে। যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। ইসরাইলের পরমাণু অস্ত্রই যে কেবল বিশ্ব নিরাপত্তাকে বিপদগ্রস্ত করে তুলেছে তাই নয়, সেই সাথে ইহুদীবাদী পরমাণু কেন্দ্রগুলো থেকে রেডিও এ্যাকটিভ পদার্থ নিঃসরণের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।
আগ্রাসী ইসরাইল সরকার নিজের জন্য একটি নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য পরমাণু অস্ত্রে সজ্জিত হলেও ঐ অস্ত্র তেলআবিবকে নিরাপত্তা দিতে পারে নি। পরমাণু অস্ত্রসহ অন্যান্য উচ্চ ধ্বংস ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র ইসরাইলকে লেবানন ও ফিলিস্তিনী সংগ্রামীদের প্রতিরোধের কাছে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে নি। সর্বশেষ ২০০৬ সালের ৩৩ দিনের যুদ্ধে ইসরাইল লেবাননের হিযবুল্লাহর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।

ইসরাইলের এ ব্যর্থতা প্রমাণ করে, ইহুদীবাদীরা ধীরে ধীরে তার চুড়ান্ত পরিণতি অর্থাৎ, নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইহুদীবাদী কর্মকর্তারা এ বছর তাদের অবৈধ রাষ্ট্রের ৬০তম বর্ষর্পূর্তি পালন করেছে এবং ঐ অনুষ্ঠানে পশ্চিমা দেশগুলোর নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেছেন। যে রাষ্ট্রটি অবৈধভাবে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডের ওপর চেপে বসে গণহত্যা, দমন অভিযানসহ অন্যান্য অপরাধী কর্মকান্ড ছাড়া আর কিছু উপহার দিতে পারে নি, তার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ উপস্থিত হয়েছিলেন মূলত তেলআবিবের এসব অপরাধকে ঢাকা দেয়ার জন্য। #

১৫ তম পর্ব

পাঠক! গত আসরে আমরা ইহুদীবাদী ইসরাইলের পরমাণু অস্ত্র ভাণ্ডার সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আজ আমরা ফিলিস্তিনী ও লেবাননী জনগণের ওপর ইসরাইলের গণহত্যা ও সন্ত্রাস সম্পর্কে কথা বলবো।

ফিলিস্তিনের বিখ্যাত লেখক এডওয়ার্ড সাঈদ বলেছে, “বিশ্বের বুকে প্রথম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ শুরু করেছিল ইসরাইল এবং এখনো লেবানন ও অধিকৃত ফিলিস্তিনে ঐ সন্ত্রাসবাদ ব্যাপক মাত্রায় অব্যাহত রয়েছে।” ইহুদীবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস যে বাস্তবতাটি তুলে ধরছে, তা হলো, ফিলিস্তিনের মাটিতে ইহুদীবাদী সরকার এখন পর্যন্ত টিকে আছে সন্ত্রাস ও গণহত্যার মাধ্যমে। ইহুদী অর্থনীতিবিদ যোসেফ উইটস ১৯৪০ সালে অর্থাৎ ইসরাইলের অস্তিত্ব সৃষ্টির ৮ বছর আগে বলেছিল, “ফিলিস্তিনে দুটি জাতি বসবাস করতে পারে না। আরবরা ঐ ভূখণ্ড ত্যাগ করলে আমাদের বসবাসের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কিন্তু যদি আরবরা থেকে যায়, তবে আমরা একটি ছোট ও অগোছালো দেশ পাবো। এ কারণে, সবার আগে ফিলিস্তিনী ভূখণ্ড থেকে আরবদের বহিস্কার করতে হবে। ফিলিস্তিনে একটি আরব গোত্রকেও থাকতে দেয়া হবে না।”

১৮৯৭ সালে ইহুদীবাদীদের প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনের অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ভ্লাদিমির যাবোতিনেস্কির নেতৃত্বে প্রথম ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠি গঠিত হয়। পরবর্তীতে ফিলিস্তিনের ওপর বৃটিশ সরকারের ৩০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনামলে যতগুলো ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠি গঠিত হয়েছিল, তার সবগুলোর গোড়াপত্তন হয়েছিল যাবোতিনেস্কির সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে । হাগানা, ইরগুন ও বাতারের মত ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলোর নেতারা পরবর্তীতে ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিল। ডেভিড বিন গোরিওন, আইগল এ্যালন, মুশে দায়ান, ইহুদ বারাক, আইজ্যাক রবিন, আইজ্যাক শামির, মোনাচেম বেগিন এবং এরিয়েল শ্যারনের মত কূখ্যাত সন্ত্রাসী নেতারা পরবর্তীতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী, যুদ্ধমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের পদ লাভ করেছিল। এসব সন্ত্রাসী নেতা ১৯৩০ ও ১৯৪০ এর দশকে ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর ভয়াবহ গণহত্যার নেতৃত্ব দিয়েছিল।

ইসরাইলী এসব সন্ত্রাসী নেতা তাদের আত্মজীবনীতে স্বগর্বে ভয়াবহ ঐ গণহত্যাগুলির বর্ণনা তুলে ধরেছিল। কিন্তু ইসরাইলের ভাবমুর্তি উদ্ধারের লক্ষ্যে আত্মজীবনীগুলো থেকে এসব সন্ত্রাসী ঘটনা বাদ দেয়ার জন্য ১৯৭৯ সালে তেলআবিব একটি সেন্সর বোর্ড গঠন করে। ঐ বোর্ড আইজ্যাক রবিনকে তার আত্মজীবনী থেকে ফিলিস্তিনের দুটি গ্রামে চালানো গণহত্যার ঘটনা বাদ দিতে বাধ্য করে। বইয়ের যে অংশ বাদ দেয়া হয়, তাতে আইজ্যাক রবিন লিখেছিল, “ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বিন গোরিওন ও উপপ্রধানমন্ত্রী আইগল এ্যালনের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ফিলিস্তিনী জনগণকে তাদের বাড়িঘর থেকে বহিস্কার করতে হবে। কিন্তু তারা যেহেতু ভদ্র ভাষায় কথা শুনবে না, তাই তাদের ওপর নির্যাতন এবং গণহত্যা চালাতে হবে, যাতে তারা তাদের বাড়িঘর ও আবাসভূমি ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। ডেভিড বিন গোরিওনের নির্দেশে ফিলিস্তিনের রামলেহ ও লেদ্দা গ্রামের ৫০ হাজার ফিলিস্তিনীর ওপর গণহত্যা শুরু করা হয়। ঐ দুই গ্রামের যে সব ফিলিস্তিনী প্রাণে বেঁচে যায়, তারা পাশ্ববর্তী আরব দেশগুলোতে পালিয়ে যায়। পাশাপাশি ফিলিস্তিনের অন্যান্য এলাকার মানুষও ঐ দুই গ্রামের ভয়াবহতা দেখে মাতৃভূমি ছেড়ে পালিয়ে যেতে থাকে।”

ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য ইহুদীবাদী গোষ্ঠিগুলো যে সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তার মধ্যে রয়েছে, ফিলিস্তিনী হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বাজার ও যাত্রীবাহী বাসে বোমা হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ ফিলিস্তিনী নেতাদের অপহরণ করা। ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলো রাতের অন্ধকারে ফিলিস্তিনীদের বাড়িতে ডিনামাইটের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ঘুমন্ত মানুষদের হত্যা করতে থাকে। ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলো ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর যে শত শত গণহত্যা চালিয়েছিল, তার মধ্যে উদাহরণ হিসেবে ‘দির ইয়াসিন’ গ্রামের মানুষের ওপর চালানো গণহত্যার কথা উল্লেখ করা যায়। ঐ গ্রামের হাজার হাজার মানুষকে একঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে হত্যা করা হয় এবং যারা পালিয়ে বেঁচেছিল, তাদেরকেও ধরে এনে নৃশংসভাবে মেরে ফেলা হয়। এভাবে ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডকে এর প্রকৃত অধিবাসীমুক্ত করা হয়।

ফিলিস্তিনীরা নিহত হলে বা নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেলে ইহুদীবাদীরা ঐসব বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিয়ে অভিবাসী ইহুদীদের জন্য নতুন করে বাড়িঘর নির্মান করে দিত। এছাড়া পরিত্যক্ত যায়গাগুলিতে ইউক্লিপ্টাস গাছ লাগানো হতো। এসব গাছ খুব দ্রুত বাড়ে বলে খুব দ্রুত অধিকৃত এলাকাগুলির চেহারা পাল্টে যেত। ফলে বিতাড়িত ফিলিস্তিনীদেরকে যদি মাত্র কয়েকমাস পরও তাদের এলাকায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হতো, তবে তারা তাদের এলাকা এমনকি নিজেদের বাড়িঘরের স্থানও সনাক্ত করতে পারতো না।

এভাবে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই শত শত ফিলিস্তিনী গ্রাম ও শহর ধ্বংস করে দেয়া হয় এবং ৭ লাখ ফিলিস্তিনীকে তাদের বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত করা হয়। কাজেই দেখা যাচ্ছে, সম্পূর্ণ সন্ত্রাসী কায়দায় ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে এবং এসব সন্ত্রাসের নেতৃত্ব দানকারীরা পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পদকও লাভ করেছে। দির ইয়াসিন গ্রামের গণহত্যার নায়ক মোনাচেম বেগিন এবং ১৯৬৭ সালে আরবদের বিরুদ্ধে ৬ দিনের ইসরাইলী যুদ্ধের সময় ইহুদীবাদী বাহিনীর প্রধান জেনারেল আইজ্যাক রবিনকে পরবর্তীতে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক সমাজের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে ফিলিস্তিনীদের সাথে ইতিহাসের চরম অন্যায় আচরণ করা হয়েছে।

ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলোকে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর এর সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এরপর ইসরাইলী গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ ইসরাইলের বাইরে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানোর দায়িত্ব গ্রহন করে। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পরবর্তী ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী হামলাগুলির মধ্যে কুফারকাসেম গ্রামের মানুষের ওপর ভয়াবহ গণহত্যার কথা উল্লেখ করা যায়। ১৯৫৬ সালের ২৯শে অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টায় একজন ইসরাইলী সেনা কমাণ্ডার কুফার কাসেম গ্রামের প্রধান ব্যক্তিকে ডেকে ঘোষণা করে, বিকেল ৫টায় অর্থাৎ তখন থেকে মাত্র আধাঘন্টা পর ঐ গ্রামে কার্ফিউ জারি করা হবে। এভাবে মাত্র ৩০ মিনিট সময় দিয়ে ঐ গ্রামের অধিবাসীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও কেড়ে নেয়া হয়। গ্রাম্য প্রধান বারবার ইহুদীবাদী সেনা কর্মকর্তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, গ্রামের অন্তত ৪০০ অধিবাসী মাঠে কাজ করতে গেছে এবং তারা রাতে বাড়ি ফিরে আসবে। কিন্তু ইসরাইলী সেনা কর্মকর্তা কোন কথায়ই কান দেয় নি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে গ্রামের আশেপাশে গুলির শব্দ শুরু হয়। যে সব ফিলিস্তিনী মাঠে বা অন্য কোথাও কাজে গিয়েছিল এবং সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসছিল, তাদেরকে কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ না দিয়েই গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর ইসরাইলী সেনারা গ্রামের অধিবাসীদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। কোন কোন বাড়ি ডিনামাইটের সাহায্যে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফিলিস্তিনী অধিবাসীদেরকে তাদের ঘরের নীচে চাপা দিয়ে মেরে ফেলা হয়। বাকি বাড়িগুলোতে ব্রাশ ফায়ার করে বন্ধ দরজা ভেঙ্গে ফেলে এর বাসিন্দাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পরদিন সকালে কুফার কাসেম গ্রামে গিয়ে আর কোন জীবিত মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় নি।

১৯৫০ এর দশকে ইসরাইলী সেনারা কাবিয়া গ্রামে গণহত্যা চালায় এবং ঐ হামলার নেতৃত্ব দেয় এরিয়েল শ্যারন। শ্যারন পরবর্তীতে ১৯৮০র দশকে লেবাননে অবস্থিত ফিলিস্তিনীদের শরনার্থী শিবির সাবরা ও শাতিলার লোমহর্ষক গণহত্যার নায়কও ছিল এরিয়েল শ্যারন। ঐ দুটি শরনার্থী শিবিরের ২০০০ ফিলিস্তিনীকে হত্যা করে তাদের মৃতদেহগুলিকে কেটে টুকরো টুকরো করা হয় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ১৯৭০ এর দশক থেকে ইহুদীবাদীদের সন্ত্রাসী হামলার ধরণ পাল্টে যায়। তখন থেকে ইহুদীবাদী গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ ইসরাইলের বাইরে তার সন্ত্রাসী হামলার পরিধি বিস্তার করে। লেবাননে ১৯৭২ সালে ফিলিস্তিনী লেখক, কবি ও সাংবাদিক গাসান কানফানি, ১৯৮৭ সালে লেবাননে ফিলিস্তিনী কার্টুনিস্ট ও খানজালা চরিত্রের উদ্ভাবক নাজিউল আলী, ১৯৮৮ সালে পিএলও’র দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা আবুজিহাদকে তিউনিসিয়ায়, ১৯৯৪ সালে ফিলিস্তিনের ইসলামী জিহাদ আন্দোলনের নেতা ড. ফাতহি শাকাকিকে মাল্টায়, ১৯৯২ সালে লেবাননের হিযবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়েদ আব্বাস মুসাভিকে তার স্ত্রী ও তিন বছরের শিশুকন্যাসহ .., ২০০৪ সালে ফিলিস্তিনের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন বা হামাস নেতা শেখ আহমাদ ইয়াসিন ও আব্দুল আজিজ রানতিসিকে গাজায় হত্যা করা হয়। মোসাদের সন্ত্রাসী হামলায় ফিলিস্তিনী ও লেবাননী নেতাদের মৃত্যুর ঘটনার দীর্ঘ তালিকার এ হচ্ছে সংক্ষিপ্ত একটি অংশ। সম্প্রতি ইসরাইলী গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের অংশ হিসেবে লেবাননের হিযবুল্লাহর দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ইমাদ মুগনিয়াকে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে তার গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হত্যা করে। কাজেই একবিংশ শতাব্দিতে ইহুদীবাদীদের চালানো এসব গণহত্যা প্রমাণ করে সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে যে ইসরাইলের জন্ম হয়েছে, তেমনি সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ১৯৯০ সালে দক্ষিণ দক্ষিণ লেবাননের কানা গ্রামে জাতিসংঘের দপ্তরে ঢুকে ১০০ জন লেবাননী নারী ও শিশুকে হত্যা করে বর্বর ইসরাইলী বাহিনী। ২০০৬ সালে হিযবুল্লাহর সাথে ৩৩ দিনের যুদ্ধের সময় ইহুদীবাদী সেনারা দক্ষিণ লেবাননের কানা গ্রামসহ অন্যান্য বেসামরিক এলাকায় হামলা চালিয়ে হাজার হাজার নিরস্ত্র লেবাননীকে হত্যা করে। বর্তমানে গাজা উপত্যকায় চলছে ইসরাইলী সন্ত্রাসবাদের অন্যরকম নমুনা। তারা ঐ উপত্যকার ওপর অবরোধ আরোপ করে সেখানে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধ যেতে বাধা দিচ্ছে। সেই সাথে প্রতি মুহুর্তে আকাশ ও ভূমিপথে গাজায় চালানো হচ্ছে পাশবিক হামলা। আর যে কোন সময় গাজার বিভিন্ন স্থানে হানা দিয়ে ফিলিস্তিনী যুবকদের ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যতো ঐ উপত্যকার নিত্যনৈমিত্যিক ব্যাপার।

১৬ তম পর্ব
ইহুদীবাদী ইসরাইলের গত ৬০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সহিংসা, হত্যাকাণ্ড আর অপরাধী কার্যক্রমের মাধ্যমে ঐ অবৈধ রাষ্ট্রটিকে ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার প্রায় ৬০ বছর পর এখনো ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর ইহুদীবাদীদের নির্যাতনের মাত্রা কোন অংশে কমে নি। বিশ্ববাসী অতীতে কুফার কাসেম, দির ইয়াসিন, সাবরা ও শাতিলা’র মত ভয়াবহ গণহত্যা দেখেছে। আর সাম্প্রতিক কালে ইহুদীবাদীরা জেনিন, বেথেলহাম, গাজা ও কানায় হামলা চালিয়ে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের রক্ত ঝরিয়েছে। গত কয়েক বছরে ইসরাইলী সেনাদের হামলায় নিহত ফিলিস্তিনীর সংখ্যা থেকে ইহুদীবাদীদের গণহত্যার ভয়াবহতার প্রমাণ পাওয়া যায়। জাতিসংঘ থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলী সেনাদের হামলায় গত ৭ বছরে ৬ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনী শহীদ হয়েছেন। এদের মধ্যে ৯৫০ জন হচ্ছে ফিলিস্তিনী শিশু ও কিশোর। একই সময়ে ইহুদীবাদীদের বর্বরোচিত হামলায় আহত হয়েছেন ৫৫ হাজারেরও বেশী ফিলিস্তিনী। এছাড়া গত সাত বছরে ইসরাইলী সেনারা প্রায় ৬০ হাজার ফিলিস্তিনীকে বন্দী করেছে। এদের মধ্যে ৬ হাজার ৫০০ জন শিশু এবং ৭০০ জন নারী। ফিলিস্তিনী এলাকাগুলো থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া ৬০ হাজার ফিলিস্তিনীর মধ্যে এখনো প্রায় ১১ হাজার জন ইসরাইলী বন্দী শিবিরগুলোতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। এখনো ইসরাইলী কারাগারে আটক ফিলিস্তিনী বন্দীর মধ্যে ১১০ জন নারী এবং ৪০০ জন শিশু।
বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইসরাইলী কারাগারগুলোতে গত ২০ বছরেরও বেশী সময় ধরে বন্দী ফিলিস্তিনীর সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৫০০ জন। এদের সাথে গত ৭ বছরে গ্রেফতারকৃত ফিলিস্তিনীর সংখ্যা যোগ করলে ইহুদীবাদী বন্দী শিবিরগুলোতে চরম দুর্ভোগের মধ্যে থাকা ফিলিস্তিনী বন্দীর সংখ্যা দাঁড়াবে ১২ হাজার ৫০০ জন। ইসরাইলী কারাগারগুলোতে ফিলিস্তিনী বন্দীদের সাথে চরম অমানবিক আচরণ ও নির্দয় অত্যাচার করা হয়। গত প্রায় ৪ দশকে ইসরাইলী কারাগারগুলোতে ১৯৭ জন বন্দী ইহুদীবাদীদের অকথ্য নির্যাতনের কারণে শহীদ হয়েছেন। এছাড়া এসব নির্যাতনের শিকার শত শত ফিলিস্তিনী পঙ্গু হয়ে গেছেন এবং অনেকে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছেন। গত ৪ দশকে প্রায় ৮ লাখ ফিলিস্তিনীকে ইসরাইলী সেনারা ধরে নিয়ে তাদের বন্দী শিবিরগুলোতে নিপে করেছে। ফলে এসব ফিলিস্তিনীকে তাদের জীবনের একটি সময়কে ইহুদীবাদী নির্যাতন ক্যাম্পে অতিবাহিত করার দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ইসরাইলী কারাগারগুলোতে এমন সময় ফিলিস্তিনী বন্দীদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে, যখন, আন্তর্জাতিক সকল আইনে বন্দীদের ওপর নির্যাতন ও ধর্ষণসহ এ ধরনের অন্যান্য অমানবিক আচরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতিসংঘ সনদের দ্বিতীয় অধ্যায়ে যুদ্ধ বা যুদ্ধের হুমকি, কোন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা অন্য যে কোন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বন্দীদের ওপর নির্যাতনকে নিষিদ্ধ ও ব্যাখ্যার অযোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
ইসরাইলী কারাগারগুলোতে বন্দীদের ওপর অকথ্য নির্যাতনের বিষয়টি যাতে ফাঁস না হয়, সেজন্য বিগত বহু বছর ধরে অধিকাংশ ফিলিস্তিনী বন্দীর সাথে তাদের পরিবারের সদস্যদের দেখা করতে দেয়া হচ্ছে না। এছাড়া আন্তর্জাতিক রেডক্রস এক বিবৃতিতে বলেছে, তেলআবিব ইসরাইলী বন্দীশিবিরগুলোর পরিস্থিতি পর্যবেণ করার জন্য ঐ সংস্থার কর্মীদের ইসরাইল সফরের অনুমতি দিচ্ছে না। কূখ্যাত গুয়ান্টানামো বন্দী শিবিরের ভয়াবহ নির্যাতনের কথা বিশ্বের কোন মানুষের অজানা নয়। কিন্তু ইসরাইলী বন্দী শিবিরগুলোর পরিস্থিতি গুয়ান্টানামোর চেয়ে ভয়াবহ।
ইহুদীবাদী সরকার যে ফিলিস্তিনীদের ধরে এনে কারাগারে নিপে করছে তাই নয়, সেই সাথে প্রায় সব সময়ই ফিলিস্তিনী এলাকাগুলো অবরোধ করে সেখানকার বাসিন্দাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। তাদেরকে খাদ্য, পানীয় ও চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখছে। ফলে অধিকৃত এলাকাগুলো ফিলিস্তিনীদের জন্য একটি বৃহৎ বন্দীশালায় পরিণত হয়েছে। গাজা উপত্যকায় গত কয়েক মাসের ইসরাইলী অবরোধের কারণে বিনা চিকিৎসায় ১৪৫ জন ফিলিস্তিনীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশেষজ্ঞরা গাজার বর্তমান দুরবস্থার কথা বিবেচনা করে ঐ উপত্যকাকে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জেলখানা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনী শরণার্থী বিষয়ক জরুরী সাহায্য প্রদানকারী সংস্থার পরিচালক জন জিং এ সম্পর্কে বলেছে, ইসরাইলী অবরোধের কারণে গাজা এখনো একটি বৃহৎ জেলখানা হয়ে রয়েছে এবং এখানকার অধিবাসীরা অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
ইসরাইলী সেনারা গত এক দশকে ফিলিস্তিনীদের দশ হাজারেরও বেশী বাড়িঘর ধ্বংস করেছে। এ সময়ে তারা ফিলিস্তিনীদের হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট করেছে। ইহুদীবাদীদের এই ভয়াবহ অমানবিক কর্মকান্ডের ব্যাপারে আরব দেশগুলো সম্পূর্ণ নীরব রয়েছে। এমনকি কয়েকটি আরব দেশ ইসরাইলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছে। আরবদের এই ঘৃন্য আচরণের কারণে ইহুদীবাদী সরকার আরো বেশী ধৃষ্ঠতার সাথে ফিলিস্তিনীদের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন চালাচ্ছে। ফিলিস্তিনের আরব জনগোষ্ঠির ওপর ইসরাইলীদের অমানবিক আচরণের ব্যাপারে পশ্চিমাদের পদলেহী আরব সরকারগুলোর নীরবতার ব্যাপারে এসব দেশের জনগণ ুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ১৯৫১ সালে আরব লীগ ইসরাইলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে একটি দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেছিল। কথা ছিল সকল আরব দেশ এই দপ্তরের সাথে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রেখে ইসরাইলের সাথে সব ধরনের সম্পর্ক এড়িয়ে চলবে। কিন্তু বর্তমানে বহু আরব দেশ ঐ দপ্তরকে সহযোগিতা না করে বরং তেলআবিব ও তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক মার্কিন সরকারের সাথে দহরম মহরম চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইলী অপরাধযজ্ঞের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সমাজ বিশেষ করে আরব দেশগুলোর নীরবতা এবং সেই সাথে ফিলিস্তিনী জনগণের প্রতি তাদের সাহায্য সহযোগিতা না করার কারণে নির্যাতিত ফিলিস্তিনী জাতির প্রাণ এখন প্রায় ওষ্ঠাগত।
ইহুদীবাদী ইসরাইল নাম অবৈধ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর গণহত্যা ও শরনার্থী জীবন চাপিয়ে দেয়া হয়। ইসরাইল সৃষ্টিতে যেমন পশ্চিমা দেশগুলোর সক্রিয় ভূমিকা ছিল, তেমনি এ সরকারের সকল অবৈধ কর্মকাণ্ড, আগ্রাসন ও মানবতা বিরোধী তৎপরতাকে তারা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ইহুদীবাদী সরকার যখন গাজার ওপর অবরোধ আরোপ করে সেখানে দমন অভিযান চালাচ্ছে, তখন মানবাধিকারের রক বলে কথিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও গাজায় সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতা প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর ইসরাইলী সেনাদের বর্বরোচিত হামলাসহ অন্যান্য অপরাধযজ্ঞের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সমাজের নীরবতার কারণে এই অবৈধ রাষ্ট্র ৬ দশক ধরে টিকে আছে এবং ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করতে পেরেছে। কিন্তু ঐ অনুষ্ঠানের আগে বিশ্বব্যাপী তেলআবিবের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বিােভ হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, এত অপরাধ ও গণহত্যার পরও ইহুদীবাদী ইসরাইল তার অশুভ ল্য বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, তেলআবিব বহু দেশের রাষ্ট্র নেতাদের আমন্ত্রন জানিয়ে ঘটা করে ৬০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন করে ফিলিস্তিনীদের ওপর তার অপরাধী তৎপরতা ঢাকা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ প্রমাণ করেছে, বিশ্ব জনমত ইহুদীবাদীদের অপরাধের কথা ভুলে যায় নি।#

১৭ তম পর্ব
পাঠক! এ অনুষ্ঠানের গত দুই আসরে আমরা ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর ইহুদীবাদীদের গণহত্যা ও দমন অভিযানসহ ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা বলেছি, কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনীদের হত্যা ও বিতাড়নের মাধ্যমে ফিলিস্তিনী ভূমিতে একটি ইহুদীবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইহুদীবাদীদের সন্ত্রাসবাদ থেমে থাকে নি, বরং তারা প্রতি মুহুর্তে ফিলিস্তিনী জনগণের রক্ত ঝরাচ্ছে। এছাড়া ইসরাইলীরা নিরপরাধ ফিলিস্তিনীদের ধরে নিয়ে তাদের ওপর চালাচ্ছে অকথ্য নির্যাতন। অমানবিক নির্যাতনের কারণে ইসরাইলী কারাগারে বহু ফিলিস্তিনীর মৃত্যু হয়েছে। আজকের আসরে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থার ওপর ইহুদীবাদীদের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করবো।

মার্কিন সরকার ও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহনকারী সংস্থাগুলোতে ইহুদীবাদী লবির প্রভাব সব সময় বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মার্কিনীরা যেমন ইহুদীবাদীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তেমনি মার্কিন সরকারও কোন কথা বললে তা ইহুদীবাদীরা রাখার চেষ্টা করে, আর এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়ে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর। বহু বছর ধরে ইহুদীবাদী ইসরাইল মার্কিন সরকারের সহযোগিতায় মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা চালিয়েছে। ইহুদীবাদীরা যে কেবল মার্কিন সরকারের সমর্থন নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, তাই নয়, সেই সাথে এ অঞ্চলে ওয়াশিংটনের আগ্রাসী নীতি বাস্তবায়নের কাজেও ইহুদীবাদীরা সহায়তা করেছে। উদাহরণ হিসেবে ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন হামলার কথা উল্লেখ করা যায়। ইহুদীবাদী লবি ও মার্কিন কর্মকর্তারা পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে ঐ দুটি দেশ দখল করে নেয়ার পরিকল্পনা করেছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদীবাদী লবির প্রভাব কতখানি তা বোঝার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদী ইউনিয়নের উপপ্রধান ডেভিড লুচিনের একটি উক্তির কথা স্মরণ করা যেতে পারে। তার ভাষায়, “ইহুদীরা যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যালঘু নয়, বরং কার্যত তারাই সংখ্যাগুরু এবং তারা যা চায় তাই ঘটে থাকে।” এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, যুক্তরাষ্ট্রে বহু ইহুদী সংস্থা তৎপর রয়েছে এবং মার্কিন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিভাগগুলির ওপর তাদের বেশিরভাগেরই প্রভাব রয়েছে। এসব লবির মধ্যে ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদী কংগ্রেসের কথা উল্লেখ করা যায়। তবে আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইহুদী সংস্থার নাম আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক এফেয়ার্স কমিটি (America Israel Public Affears Commity), যা আইপ্যাক (AIPAC) নামে সমধিক পরিচিত। মার্কিন কংগ্রেস এই কমিটির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রনে রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রে একে ‘কংগ্রেসের রাজা’ বলে অভিহিত করা হয়। প্রকৃতপক্ষে আইপ্যাক ইসরাইলের সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্থা।

যুক্তরাষ্ট্রে হোয়াইট হাউজের পর আইপ্যাককে দেশটির দ্বিতীয় সরকার বলেও অভিহিত করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবসর গ্রহনকারী ব্যক্তি ও বৃদ্ধদের নিয়ে গঠিত সংস্থার পর দ্বিতীয় বৃহত্তম ও প্রভাবশালী সংস্থা হিসেবে আইপ্যাক খ্যাতি লাভ করেছে। তবে সম্পূর্ণভাবে একটি দেশের পক্ষ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আইপ্যাক ছাড়া অন্য কোন সংস্থা তৎপরতা চালায় না। ১৯৫১ সালে কানাডার সাংবাদিক আই এল কেনানের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল পাবলিক এ্যাফেয়ার্স কমিটি বা আইপ্যাক গঠিত হয়। ইসরাইলের সমর্থনে আইন প্রণয়নে মার্কিন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে কেনান এটি গঠন করেন। কেনান ১৯৪০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদী কনফারেন্সের সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৯৪৭ সালে নিউইয়র্কে ইহুদী গণমাধ্যমগুলোর সংস্থার প্রতিনিধি নিযুক্ত হন। ১৯৪৮ সালে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হলে কেনান প্রথম ইসরাইলী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইয়া আবানের মুখপাত্র নিযুক্ত হন। তাকে জাতিসংঘে ইসরাইলের কূটনৈতিক মিশনের সদস্য করা হয়। ১৯৫১ সালে কেনান যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদীবাদী পরিষদের সদস্য হওয়ার মাধ্যমে মার্কিন কংগ্রেস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে ইহুদীবাদী লবিস্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

আইপ্যাকের বর্তমান সদস্য সংখ্যা এক লাখেরও বেশী। এই কমিটি বছরে মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের সাথে কমপক্ষে দুই হাজার বার বৈঠকে বসে এবং ইসরাইলের সমর্থনে অন্তত ১০০টি আইন পাশ করিয়ে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন কংগ্রেস ভবনের সাথেই আইপ্যাকের সদর দফতর অবস্থিত। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি অঙ্গরাজ্যের পাশাপাশি ইসরাইলেও ঐ কমিটির শাখা অফিস রয়েছে। আইপ্যাকের একটি মুখপত্র দৈনিক রয়েছে, যার নাম নিয়ার ইস্ট নিউজ (Near East News)। দৈনিকটির প্রচার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ এবং ইহুদী সংস্থাগুলো এর প্রধান ক্রেতা। এছাড়া মার্কিন কংগ্রেস, সিনেট, হোয়াইট হাউজসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সংস্থা ও ব্যক্তিত্বদেরকে দৈনিক ‘নিয়ার ইস্ট নিউজ’ এর কপি বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল পাবলিক এ্যাফেয়ার্স কমিটি বা আইপ্যাক কোন রাখঢাক না রেখে প্রকাশ্যে ইসরাইলের সমর্থনে তৎপরতা চালিয়ে থাকে। এ কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইসরাইল ও মার্কিন সরকারের কথা ও কাজে হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মার্কিন পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের সকল সদস্যের সাথে আইপ্যাকের সদস্যদের টেলিফোনে যোগাযোগ হয় এবং তারা যে কোন সময় মার্কিন কংগ্রেসম্যানদের সাথে সরাসরি দেখা করতে পারে। আইপ্যাক প্রতিটি মার্কিন পার্লামেন্টারিয়ানের নামে একটি করে ফাইল তৈরি করে এবং তাদের গতিবিধি ও কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে। মার্কিন কংগ্রেস ও সিনেট নির্বাচনে আইপ্যাক প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করে। মজার ব্যাপার হলো, মার্কিন কংগ্রেসের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটি যখনই ইসরাইলকে সাহায্য দেয়ার কোন বিল নিয়ে আলোচনায় বসে, তখন ঐ অধিবেশনে অবশ্যই আইপ্যাকের একটি প্রতিনিধি দলকে উপস্থিত থাকতে দিতে হয়। ইসরাইলকে আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দেয়ার ক্ষেত্রে একজন মার্কিন কংগ্রেসম্যানও যেন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে, সেই লক্ষ্যে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
এদিকে আইপ্যাকের নিয়ন্ত্রনে রয়েছে ৫৪টি রাজনৈতিক সংগঠন। এ সংগঠনগুলো প্যাক (PACK) নামে পরিচিত। মার্কিন সিনেট ও কংগ্রেস নির্বাচনে ইসরাইলের সমর্থক প্রার্থীরা যাতে বিজয়ী হতে পারে, প্যাক সে লক্ষ্যে তৎপরতা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের যে সব অঙ্গরাজ্যে ইহুদীদের সংখ্যা বেশী এবং যে সব অঙ্গরাজ্য অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত সে সব প্রদেশে প্যাক তাদের সমর্থক প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে। এরপর তাদের পক্ষে ব্যাপক নির্বাচনী প্রচার অভিযান চালায় এবং বিপুল অংকের অর্থ খরচ করে ভোটারদের কিনে নেয়।

আইপ্যাকের প্রভাব বলয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক অঙ্গন পর্যন্ত বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং নায়ক নায়িকার ওপর আইপ্যাকের হুমকি সারাক্ষণ কাজ করে। কেউ যদি ইসরাইলের সমালোচনা কোরে কোন কাজ করে বা কথা বলে, তবে তার পেশাগত জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। আইপ্যাক যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচনের প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় তাদের দফতরে আমন্ত্রণ জানায়। প্রার্থীদের সাথে কথা বলে ইসরাইল সম্পর্কে তাদের ধারনা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার লক্ষ্যে তারা এ কাজ করে। মধ্যযুগে ইউরোপে বাক স্বাধীনতা হরণ করার জন্য যে সব বিশেষ আদালত কাজ করতো, যুক্তরাষ্ট্রে আইপ্যাকের তৎপরতাকে তার সাথে তুলনা করা যায়।

আসলে ইহুদীবাদী লবিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে ভয়ংকর এক শাসনব্যবস্থা চালু করেছে। এ সম্পর্কে মার্কিন লেখক পল ফ্যান্ডালি মুল্ফ তার এক বইয়ে আইপ্যাক কমিটি সম্পর্কে লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক নীতি নির্ধারকদের কারো সামনে আইপ্যাকের নাম উচ্চারণ করা হলে তার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও ইহুদীবাদী লবির হস্তক্ষেপের বিষয়টিও কারো অজানা নয়। প্রতিটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এর প্রার্থীরা তাদের প্রচারাভিযানের সময় ইসরাইলের সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই প্রার্থী বারাক ওবামা এবং জন ম্যাক কেইন ইহুদীবাদী ইসরাইলের ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন এবং এরপর তারা দুজনেই অন্তত একবার ইসরাইল সফর করেছেন। এসব সফরে তারা ইহুদীবাদী সরকারের প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের যে কোন নির্বাচনী বৈতরনী পার হওয়ার জন্য ইহুদীবাদী লবির সমর্থন যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা এ ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ তার দলের প্রার্থী জন ম্যাক কেইনের প্রতি ইহুদীবাদীদের সমর্থন আদায় এবং তার শাসনামলের বাকি দিনগুলি নির্বিঘ্নে পার করার লক্ষ্যে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তাবিদ, লেখক ও বুদ্ধিজীবিরা সেদেশের শাসনযন্ত্রে ইহুদীবাদীদের ক্রমবর্ধমান চাপ ও প্রভাবের বিরোধিতা করেছেন। তারা ইহুদীবাদীদের এ প্রভাব থেকে মার্কিন সরকারকে বের করে আনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

১৮ তম পর্ব

পাঠক! এ অনুষ্ঠানের গত আসরে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থায় ইহুদীবাদী লবির প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম। আমরা বলেছিলাম ইহুদীবাদীরা মার্কিন সরকার, কংগ্রেস ও সিনেটকে নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য আইপ্যাক নামে একটি সংস্থা গঠন করে। ইসরাইলকে সব ধরণের সাহায্য সহযোগিতা করতে ওয়াশিংটনকে বাধ্য করা এবং ইসরাইল বিরোধী কোন কাজ করা থেকে মার্কিন সরকারকে বিরত রাখা আইপ্যাকের কাজ। আজকের আসরে আমরা জাতিসংঘে ইহুদীবাদী ইসরাইলের নিন্দা জানিয়ে যে সব প্রস্তাব পাশ হয়েছে, সে সম্পর্কে আলোচনা করবো।

১৯৪৮ সালে দখলদার ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রতি বছর জাতিসংঘের সাধারণ বা নিরাপত্তা পরিষদে গড়ে এক বা দুইটি প্রস্তাব অথবা বিবৃতি অনুমোদিত হয়েছে। এমন সময় জাতিসংঘ তেলআবিবের বিরুদ্ধে এসব প্রস্তাব পাশ করেছে যখন ইসরাইল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সমর্থন নিয়ে গত ৬০ বছরে জাতিসংঘের অন্তত ১০০টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এভাবে ইহুদীবাদীরা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের আহবান ধৃষ্ঠতার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছে। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের মত নব্য উপনিবেশবাদী শক্তিগুলোর আধিপত্য এবং ৫টি দেশকে অন্যায়ভাবে ভেটো ক্ষমতা প্রদান করার ফলে ইসরাইল বিরোধী প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নি। জাতিসংঘের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্য আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকার কারণে বহু বছর ধরে এসব প্রস্তাব লোক দেখানো বিষয়ে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজের প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রস্তাব গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করেছে। আর ওয়াশিংটন যে সব ক্ষেত্রে ইসরাইল বিরোধী প্রস্তাব ঠেকাতে পারে নি, সে সব ক্ষেত্রে পাশকৃত প্রস্তাবকে ফাইলবন্দী করে রেখে দিয়েছে।

১৯৫৩ সালে ফিলিস্তিনের কাবিয়াহ গ্রামের ওপর ইহুদীবাদীদের গণহত্যার ব্যাপারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১০১ নম্বর প্রস্তাব পাশ করে। কুখ্যাত এরিয়েল শ্যারনের নেতৃত্বে পরিচালিত ঐ গণহত্যায় ১০০-রও বেশী ফিলিস্তিনী নারী ও শিশু হতাহত হয়। ১৯৬৭ সালের জুন মাসে এক সপ্তার যুদ্ধে ইসরাইলী বাহিনী জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা, পূর্ব বাইতুল মোকাদ্দাস, মিশরের সিনাই মরুভূমি এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২৪২ নম্বর প্রস্তাব অনুমোদন করে ইসরাইলকে দখলীকৃত এসব আরব ভূখণ্ড থেকে সরে যাওয়ার আহবান জানায়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের সমর্থনে এগিয়ে আসে এবং নিরাপত্তা পরিষদের ঐ প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ইহুদীবাদী ইসরাইল ১৯৬৮ সালে পূর্ব বাইতুল মোকাদ্দাসের ফিলিস্তিনী বাড়িঘর ও কৃষিজমি থেকে ফিলিস্তিনী জনগণকে বিতাড়িত করে এসব যায়গার দখল নেয়। এরপর সেখানে শত শত উপশহর নির্মাণ কোরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়ে আসা হাজার হাজার ইহুদীকে এসব উপশহরে থাকতে দেয়া হয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৬৮ সালের শেষদিকে আরেকটি প্রস্তাব অনুমোদন কোরে ইসরাইলী জবরদখলের নিন্দা জানায়। ১৯৭৩ সালে নিরাপত্তা পরিষদ আরব ভূখণ্ড দখলের জন্য ইহুদীবাদী সরকারের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি এসব ভূখণ্ড থেকে সেনা প্রত্যাহার করার জন্য তেলআবিবের প্রতি আহবান জানায়।

১৯৭৮ সালে ইসরাইলী সেনারা দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালায় এবং দেশটির শত শত বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে লিতানি নদী পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ঐ অবস্থায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ঐতিহাসিক ৪২৫ নম্বর প্রস্তাব পাশ করে। ঐ প্রস্তাবে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলী বাহিনীকে নি:শর্ত প্রত্যাহার করার আহবান জানানো হয়। ১৯৭০ এর দশকে ইহুদীবাদী ইসরাইল অধিকৃত এলাকাগুলিতে জনসংখ্যার কাঠামো পরিবর্তনের ব্যাপক তৎপরতা চালায়। ইসরাইল ১৯৬৭ সালে দখলীকৃত ফিলস্তিনী এলাকাগুলিতে ব্যাপকভাবে ইহুদীদের আবাসন সুবিধা দিয়ে ফিলিস্তিনী জনগণকে কোনঠাসা অবস্থায় ফেলে দেয়। ফিলিস্তিনীদেরকে তাদের মাতৃভূমিতে সংখ্যালঘু জাতিতে পরিণত করার উদ্দেশ্যে ইহুদীবাদীরা এই নীতি গ্রহণ করে।

১৯৭৯ সালে নিরাপত্তা পরিষদ এক প্রস্তাব পাশ করে আরব ভূমিতে ইসরাইলী উপশহর নির্মাণ কার্যক্রমের নিন্দা জানায়। ঐ প্রস্তাবে জেনেভা চুক্তির চার নম্বর ধারা মেনে চলতে তেলআবিবের প্রতি আহবান জানানো হয়। জেনেভা চুক্তিতে যে কোন দখলদার শক্তিকে দখলীকৃত ভূখণ্ডের অধিবাসীদের অধিকার রক্ষা করতে বলা হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব অনুযায়ী জেনেভা চুক্তি না মানার কারণে ১৯৭৯ সালেই ঐ পরিষদ আরেকবার ইসরাইলের নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব পাশ করে।

১৯৮০ সালে ইসরাইল ইরাকের স্বার্বভৌমত্ব লংঘন করে দেশটির পরমাণু কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে সেটি ধ্বংস করে দেয়। নিরাপত্তা পরিষদ ঐ বছরই ৪৮৭ নম্বর প্রস্তাব পাশ করে ইরাকে ইসরাইলী আগ্রাসনের নিন্দা জানায়। ইহুদীবাদী ইসরাইল ১৯৫৬ সালে পরমাণু কর্মসূচী গ্রহণ করে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সহযোগিতায় খুব দ্রুত পরমাণু অস্ত্র তৈরি করে। এছাড়া তেলআবিব তার পরমাণু কেন্দ্রগুলিতে কখনো জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের প্রবেশের অনুমতি দেয় নি। এদিকে ইসরাইল যখন নিজে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করেছে, তখন ইরাকের বিরুদ্ধে কাল্পনিক পরমাণু বোমা তৈরির অভিযোগ তুলে সেদেশের পারমাণবিক কেন্দ্রের ওপর হামলা চালিয়েছে।

ইরাক পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে বলে তেলআবিব ও পশ্চিমা দেশগুলি যে অভিযোগ করেছিল, তা কোনদিনই প্রমাণ করা যায় নি। যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের পরমাণু কেন্দ্রে ইসরাইলী জঙ্গীবিমানের বোমাবর্ষণকে সমর্থন জানায়। আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে এতবড় একটি অপরাধ করেও যখন ইসরাইল কোন ধরণের শাস্তির সম্মুখীন হওয়া থেকে বেঁচে যায়, তখন সে ঐ বছরই আরেকটি অপরাধী কাজে হাত দেয়। ১৯৮০ সালে ইসরাইল ১৯৬৭ সালে দখলীকৃত সিরিয়ার গোলান মালভূমিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলী ভূখণ্ডের অন্তর্ভূক্ত করে নেয়।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালে পরপর তিনটি প্রস্তাব পাশ করে ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন, দমন অভিযান ও গণহত্যা চালানোর জন্য তেলআবিবের নিন্দা জানায়। এতো গেলো নিরাপত্তা পরিষদে ইসরাইল বিরোধী যে সব প্রস্তাব গৃহিত হয়েছে, সেগুলোর হিসেব। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার কারণে ইসরাইল বিরোধী যে সব প্রস্তাব অনুমোদিত হয় নি, তার সংখ্যা অগণিত। শুধুমাত্র ২০০০ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল বিরোধী কয়েকশ প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ঐ সংস্থা ইসরাইলী অপরাধযজ্ঞের মৌখিক যে নিন্দাটুকু জানাতো, সে পথও বন্ধ হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে ২০০২ সালে কথিত ইসরাইলী নিরাপত্তা প্রাচীরের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে আনীত প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করা যায়। তৎকালীন ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন জর্দান নদীর পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনী জনগণের আবাসভূমি ও কৃষিজমি দখল করার উদ্দেশ্যে ঐ বর্ণবাদী প্রাচীর নির্মানের উদ্যোগ নেয়। ইসরাইল ৬ মিটার উঁচু ঐ প্রাচীর নির্মাণ করে ১৯৬৭ সালে দখলীকৃত এলাকার অনেক যায়গাকে ১৯৪৮ সালে দখলীকৃত ভূখণ্ডের ভেতরে নিয়ে নেয়।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আরব দেশগুলোর আহবানে সাড়া দিয়ে এ ব্যাপারে এক বৈঠকে বসে। এতে কথিত নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মানের জন্য ইসরাইলের নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে ঐ প্রস্তাব পাশ হতে পারে নি। তবে আরব দেশগুলো প্রস্তাবটিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নিয়ে যায় এবং সেখানে ইসরাইলের নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব পাশ করে। এছাড়া আরব দেশগুলো আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরাইলের প্রাচীর নির্মানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। হেগের আন্তর্জাতিক আদালত প্রয়োজনীয় তদন্ত ও শুনানী শেষে পশ্চিম তীরে তথাকথিত নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণের ইসরাইল পদক্ষেপকে অবৈধ ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক আদালত ঐ প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলার এবং প্রাচীর নির্মানের ফলে ফিলিস্তিনীদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে দেয়ার জন্য তেলআবিবকে নির্দেশ দেয়। ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নির্লজ্জ সমর্থনের ফলে হেগের আন্তর্জাতিক আদালতের ঐতিহাসিকে ঐ রায়টিও কার্যকর করা যায় নি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে ইসরাইলীরা গাজা উপত্যকায় একের পর এক হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনী জনগণকে গাজা নামক বৃহৎ কারাগারে বন্দী করে আকাশ ও ভূমিপথে তাদের ওপর চালাচ্ছে ভয়াবহ নির্যাতন। তাদের হামলায় আহতদের চিকিৎসার জন্য গাজায় চিকিৎসা সামগ্রী ও ওষুধপত্রের চালান যেতে দেয়া হচ্ছে না। গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনীরা প্রয়োজনীয় খাদ্য ও জ্বালানী থেকেও বঞ্চিত রয়েছে। কিন্তু গত প্রায় এক বছর ধরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এ কাজের জন্য ইসরাইলের নিন্দা জানিয়ে কোন প্রস্তাব পাশ তো দূরের কথা, একটি বিবৃতি পর্যন্ত প্রকাশ করে নি। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে গাজার ওপর ইসরাইলী বর্বরতার নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাবের খসড়া তৈরি হলেও ঐ যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে তা পাশ হতে পারে নি। তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মার্কিন ভেটো ক্ষমতার কোন প্রভাব না থাকায় ঐ পরিষদ এ পর্যন্ত বহুবার ইসরাইলের নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব পাশ করেছে। এর মধ্যে ১৯৭৫ সালে পাশ হওয়া ঐতিহাসিক ৩৩৭৯ নম্বর প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করা যায়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অনুমোদিত ঐ প্রস্তাবে ইসরাইলকে বর্ণবাদী সরকার বলে অভিহিত করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯০ এর দশকের শেষভাগে সেই যুক্তরাষ্ট্রের কারসাজিতে সাধারণ পরিষদের রেকর্ড থেকে ঐতিহাসিক প্রস্তাবটি মুছে ফেলা হয়েছে। তবে সার্বিকভাবে ইসরাইলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সাধারণ ও নিরাপত্তা পরিষদের অসংখ্য প্রস্তাব একথা দিবালোকের মত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, জবরদখলের মাধ্যমে যে ইসরাইলের জন্ম হয়েছিল- হত্যা, মানবাধিকার লংঘন ও যুদ্ধ অপরাধের মাধ্যমে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা হয়েছে।#

১৯ তম পর্ব
পাঠক! গত আসরে আমরা জাতিসংঘে ইহুদীবাদী ইসরাইলের নিন্দা জানিয়ে যে সব প্রস্তাব পাশ হয়েছে, সে সম্পর্কে আলোচনা করছি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা ও সাধারণ পরিষদে যে সব গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে, সেগুলোর নম্বর ও তারিখ উল্লেখ করে আমরা বলেছি, এর অধিকাংশ প্রস্তাব ইহুদীবাদী ইসরাইল মার্কিন সমর্থন নিয়ে উপেক্ষা করেছে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে নিজের প্রভাব খাটিয়ে অনেক প্রস্তাব পাশ হতে দেয় নি এবং পাশ হওয়া অনেক প্রস্তাব হিমাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে। আজকের আসরে আমরা কথিত আরব-ইসরাইল শান্তি প্রক্রিয়ার নামে কীভাবে আরব দেশগুলোর ইসরাইল বিরোধী অবস্থানকে নিস্ক্রিয় করে দেয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে আলোচনা করবো।

১৯৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে সারাবিশ্বে যখন পরিবর্তনের দোলা লাগে, তখন পাশ্চাত্যের প্রধান শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফাঁকা মাঠ পেয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তার অভীষ্ট লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের কাজে হাত দেয়। তৎকালীন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্ভাচেভ বিখ্যাত সংস্কার কর্মসূচী- গ্লাসনস্ত পেরেস্ত্রোইকায় হাত দেয়ার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায় এবং মধ্য এশিয়ায় অনেকগুলো স্বাধীন দেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ওদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান প্রতিপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন বিশ্বব্যবস্থায় নিজেকে একক শক্তি হিসেবে দাবি করতে থাকে। মার্কিন সরকার মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে আরব দেশগুলোর তেল সম্পদ কূক্ষিগত করার লক্ষ্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ইসরাইলের অনুকূলে নিয়ে আসার যে সুপ্ত বাসনা ওয়াশিংটন কয়েক দশক ধরে লালন করছিল, তা বাস্তবায়নের উপযুক্ত সুযোগ পেয়ে যায়। ইহুদীবাদী ইসরাইলকে ৪০ বছরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কোনঠাসা অবস্থা থেকে বের করে আনা ছিল ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য। ইহুদীবাদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ৪০ বছর পর তখনো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ইসরাইলকে দখলদার সরকার হিসেবে চিনতো। কোনো আরব দেশ তখন পর্যন্ত ইসরাইলের সাথে কোন ধরনের সম্পর্ক স্থাপনে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল। এমনকি যে সব পশ্চিমা কোম্পানী ইসরাইলে পূঁজি বিনিয়োগ করেছিল, আরব দেশগুলো সে সব কোম্পানীর সাথেও লেনদেন করতো না। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলকে এই একঘরে অবস্থা থেকে বের করে আনার উদ্যোগ নেয়।

ইহুদীবাদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ৪ দশক পর প্রথমবারের মত আরব-ইসরাইল সংলাপ অনুষ্ঠান করার লক্ষ্যে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে ঘন ঘন দূত পাঠাতে থাকে। এ কাজে যখন আমেরিকাকে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল, তখন ইরাকের সাবেক শাসক সাদ্দাম ওয়াশিংটনের জন্য অপ্রত্যাশিত সুযোগ এনে দেন। ১৯৯০ সালের ২রা আগস্ট সাদ্দাম তার সেনাবাহিনী পাঠিয়ে কুয়েত দখল করেন। মাধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় শুরু হয় রণ উন্মাদনা। মার্কিন সরকার এবার প্রথমবারের মত সোভিয়েত ইউনিয়নকে সরাসরি উপেক্ষা করে ফ্রান্স ও বৃটেনকে সাথে নিয়ে পারস্য উপসাগরে নৌবহর প্রেরণ করে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, সিরিয়া এতদিন সোভিয়েত বলয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত থাকলেও ইরাক কুয়েত দখল করার পর দামেস্ক ইরাক বিরোধী মার্কিন জোটে যোগ দেয়।

১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাসে পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পর প্রথমবারের মত ইসরাইলের সাথে আরব দেশগুলোর বৈঠক অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের ঐ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার নাম দেয়া হয় আরব-ইসরাইল শান্তি প্রক্রিয়া- যা এখনো ঐ নামেই পরিচিত। কুয়েত থেকে ইরাকী বাহিনী প্রত্যাহারের মাধ্যমে পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ শেষ হলে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিনিয়র জর্জ বুশ ঘোষণা করেন, তার ভাষায় উপসাগরীয় যুদ্ধের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে একটি শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বুশ মার্কিন কংগ্রেসে দেয়া এক ভাষণে বলে, “আমরা এই যুদ্ধের অর্জনকে কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতির অবসান ঘটাবো”। বুশের ঐ ঘোষণার ব্যাপারে ঐতিহাসিক দলিল থেকে যতখানি জানা যায়, তা হলো, তিনি আরবদেরকে ভূমি’র বদলে শান্তির প্রতিশ্রুতি দেন। এক্ষেত্রে তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৪২ ও ৩৩৮ নম্বর প্রস্তাব বাস্তবায়নের কথা বলে। প্রকৃতপক্ষে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব ছিল, আরবরা ইসরাইল বিরোধী অবস্থান থেকে সরে গেলে তাদেরকে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল কর্তৃক দখলীকৃত ভূখণ্ড ফেরত দেয়া হবে।

ইসরাইল বিরোধী প্রধান আরব দেশগুলো লোক ভোলানো মার্কিন প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে প্রথমবারের মত আরব-ইসরাইল বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে রাজী হয়ে যায়। অবশ্য এক্ষেত্রে তাদের মাথার ওপর থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের আশীর্বাদের ছায়া নেমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। সুদূরপ্রসারি মার্কিন-ইসরাইলী চক্রান্ত বাস্তবায়নের ঐ সম্মেলন অনুষ্ঠানের জন্য এক সময়ের মুসলিম সভ্যতার গৌরব আন্দালুসিয়া বা বর্তমান স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদকে বেছে নেয়া হয়। মুসলিম রাজা-বাদশাদের ভোগবাদী জীবনের সুযোগে ইউরোপীয়রা একদিন মুসলমানদের আন্দালুসিয়া থেকে বিতাড়িত করেছিল। আর এবার আবরদের ওপর ইহুদীবাদীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা চাপিয়ে দেয়ার কাজে সেই স্পেনকেই বেছে নেয়া হয়।

মার্কিন সরকার সে সময়ে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত বলে যে কথা বোঝাতে চাচ্ছিলো, তা হলো, ফিলিস্তিনী জনগণের ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রাম। আমরা কথিত আরব-ইসরাইল সংঘাতের চিত্রটিকে এভাবে দাঁড় করাতে পারি- পশ্চিমারা ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে যে অবৈধ রাষ্ট্র চাপিয়ে দিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ফিলিস্তিনীরা তাদের হারানো অধিকার ফিরে পেতে চাচ্ছেন। অন্যদিকে ইহুদীবাদী সেনারা নিরস্ত্র ফিলিস্তিনী জনগণের ইটপাটকেলের জবাব দিচ্ছে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, কামান ও ট্যাংক দিয়ে ফিলিস্তিনীদের হত্যা করার মাধ্যমে। এই অসম লড়াইকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত নামে চালিয়ে দিয়েছেন।

এদিকে ফিলিস্তিনীদের প্রতিরোধ সংগ্রামে আরব দেশগুলো যে সহায়তা দিত, তা থেকে তাদেরকে বিরত রাখা ছিল মাদ্রিদ সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্য। অবশ্য আরব দেশগুলো অতি সহজে ইসরাইলের সাথে আলোচনায় বসতে রাজী হওয়ার কারণে ওয়াশিংটনের আশা আরো বেড়ে গিয়েছিল। মার্কিন সরকার এই সুযোগে আরবদের কাছ থেকে আরো অনেক ছাড় আদায় করে নেয়ার চেষ্টা চালায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিনিয়র জর্জ বুশ মাদ্রিদ সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে বলে : “মাদ্রিদ শান্তি সম্মেলনকে আরব ও ইসরাইলীদের মধ্যে সংঘাত বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেললে চলবে না। বরং, উভয় পক্ষকে নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হতে হবে। আরব দেশগুলোকে ইসরাইলের সাথে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিকসহ সকল ক্ষেত্রে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়ে আসতে হবে।” এভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে চাপিয়ে দেয়া একটি অবৈধ ও দখলদার সরকারের প্রতি আরব দেশগুলোর স্বীকৃতি আদায় করে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। #

২০ তম পর্ব

পাঠক! গত আসরে আমরা কথিত আরব-ইসরাইল শান্তি প্রক্রিয়ার নামে কীভাবে আরব দেশগুলোর ইসরাইল বিরোধী অবস্থানকে নিস্ক্রিয় করে দেয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আমরা বলেছি, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর নয়া আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন সরকার ইসরাইলের সাথে সংলাপে বসতে আরব দেশগুলোকে রাজী করায়। কথিত ঐ আরব-ইসরাইল সম্মেলনের জন্য এককালের মুসলিম সভ্যতার গৌরব আন্দালুসিয়া বা বর্তমান স্পেনকে বেছে নেয়া হয়। আজ আমরা মাদ্রিদ সম্মেলন পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আলোচনা করবো।

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলকে দখলদার হিসেবে না দেখে একটি রাষ্ট্র হিসেবে আরবদের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায় করা ছিল ইহুদীবাদীদের আজন্ম স্বপ্ন। কারণ, আরব দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে ইসরাইল ৪ দশক ধরে প্রতি মুহুর্তে আরবদের পক্ষ থেকে যে হামলার আশঙ্কার মধ্যে ছিল তা দূর হতো এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অবস্থানও শক্তিশালী করা সম্ভব হতো। অন্যদিকে আরব দেশগুলোর সাথে ইসরাইলের বানিজ্যিক লেনদেন শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাহায্য তেলআবিবকে করতে হয়, তা থেকেও ওয়াশিংটন মুক্ত হতে পারতো। ১৯৯১ সালের ৩১শে অক্টোবর মাদ্রিদে প্রথমবারের মত আরব-ইসরাইল আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও ঐ বছরের ৪ঠা নভেম্বর ওয়াশিংটনে সিরিয়া, লেবানন, জর্দান এবং ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে আরব-ইসরাইল শান্তি সম্মেলন শুরু হয়।

এদিকে ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটনের ক্ষমতায় পরিবর্তন আসার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্পর্কেও তার প্রভাব পড়ে। ঐ বছর যুক্তরাষ্ট্র রিপাবলিকানদের ১২ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং সিনিয়র জর্জ বুশকে পরাজিত করে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী বিল ক্লিন্টন ক্ষমতা গ্রহণ করেন। পাশাপাশি ইসরাইলের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বয়ে যায় এক দমকা হাওয়া। আইজ্যাক রবিনের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী লেবার পার্টি ১৫ বছর পর ডানপন্থী লিকুদ দলকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ক্ষমতায় দুই চির বন্ধুপ্রতীম দল ডেমোক্রেটিক ও লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার ফলে একরকম সোনায় সোহাগা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। বুশ প্রশাসনের উদ্যোগে কথিত আরব-ইসরাইল শান্তি প্রক্রিয়ায় যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, তা নতুন করে ছন্দ ফিরে পায়। লেবার পার্টির নেতারা নীল নদ থেকে ফোরাত পর্যন্ত ইসরাইলের সীমানা বিস্তৃত করার সুপ্ত-বাসনা চরিতার্থ করার নেশায় মেতে ওঠে।

ইহুদীবাদী ইসরাইলের যেসব জেনারেল এক সময় ব্যাপক সন্ত্রাস ও গণহত্যা চালিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করতে চেয়েছিলো, তারা এবার তাদের নীতিতে ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন এনে শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের ঈপ্সিত লক্ষ্য বাস্তবায়নের কাজে হাত দেয়। ৪০ বছরেরও বেশী সময় ধরে ফিলিস্তিন ও লেবাননে গণহত্যা পরিচালনাকারী আইজ্যাক রবিন ও শিমন পেরেজের মত ইহুদীবাদী নেতারা আরব-ইসরাইল শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নেতায় পরিণত হয়। মজার ব্যাপার হলো, লেবার পার্টির নেতারা ইসরাইলের ক্ষমতা গ্রহণ করে গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে কথিত শান্তি প্রক্রিয়ার গতিকে নিজেদের ইচ্ছেমত ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হন। আরব দেশগুলোর মধ্যে এ ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি করা ছিল লেবার পার্টির মূল উদ্দেশ্য। কারণ, আরব দেশগুলোকে আলাদা করে তাদের প্রত্যেকের সাথে আলাদা আলাদাভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করলে পরবর্তীতে ইসরাইল লাভবান হতে পারবে।

১৯৯৩ সালের জুলাই মাসে ইসরাইলী দৈনিক হারেতস প্রথমবারের মত খবর দেয়, ইসরাইলী কর্মকর্তাদের সাথে পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনী নেতারা গোপন সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে বিশ্ববাসী জানতে পারে, নরওয়ের রাজধানী অসলোতে ইসরাইল-ফিলিস্তিন গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। অবশেষে ১৯৯৩ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত ও ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে পিএলও নেতা দখলদার ইহুদীবাদী ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেন। জর্দান নদীর পশ্চিম তীরের ‘বিরজিত’ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ইসরাইলের সাথে সংলাপ প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনী প্রতিনিধি দলের সদস্য ড. হান্নান আশরাভি এ সম্পর্কে বলেছে, অসলো চুক্তি যিনি পড়েছেন, তিনিই বুঝবেন, ঐ চুক্তি স্বাক্ষর করে ইয়াসির আরাফাত রাজনৈতিক খেলায় মারাত্মকভাবে পরাজিত হয়েছেন। আসলে অসলো চুক্তি ছিল আরাফাতের জন্য রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল।

অবশেষে ২০০০ সালে এসে কথিত ‘মধ্যপ্রাচ্য শান্তি’ নামক ট্রেন রেললাইন থেকে ছিটকে পড়ে। ইহুদীবাদী ইসরাইল প্রায় এক দশকের আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর প্রমাণ করে, দেশটি তার কোন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না এবং সিরিয়া ও লেবাননের দখলীকৃত এলাকাগুলিও ছেড়ে দিতে নারাজ। ২০০১ সালে এরিয়েল শ্যারন ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে অসলো চুক্তির কবর রচিত হয়েছে বলে ঘোষণা করে। শ্যারন সিরিয়াকে জানায়, এতদিন গোলান মালভূমি হস্তান্তরের ব্যাপারে যে আলোচনা হয়েছে, তার ফলাফল শূণ্য। কাজেই দামেস্ককে তেলআবিবের সাথে গোড়া থেকে সংলাপ শুরু করতে হবে। এদিকে ইয়াসির আরাফাত দীর্ঘ এক দশক ইসরাইলের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পর বুঝতে পারেন, তাকে দিয়ে ইহুদীবাদীরা স্বীকৃতি আদায়সহ অন্যান্য সকল দাবি দাওয়া পূরণ করে নিলেও ফিলিস্তিনীরা তাদের হারানো অধিকারের কানাকড়িও ফিরে পায় নি। তাই তিনি আর কোন ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানান।

ইহুদীবাদীরা আরাফাতকে বেঁকে বসতে দেখে তাকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইসরাইলী সেনারা তিন বছর ধরে আরাফাতকে রামাল্লায় অবরোধ করে রাখে। এক পর্যায়ে ইসরাইলী সেনারা পশ্চিম তীরের রামাল্লায় আরাফাতের সদর দফতরের মধ্যে তাকে অবরোধ করে ফেলে। তার ভবনের একাংশ গুড়িয়ে দেয়া হয় এবং সেখানকার বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরাইল সে অবরোধ প্রত্যাহার করে নিলেও ইহুদীবাদীরা আরাফাতের খাদ্যে বিষ মিশিয়ে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। পিএলও নেতা খাদ্য বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফ্রান্সের একটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয় এবং সেখানে কয়েকদিন তীব্র রোগভোগের পর মারা যান। কথিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার ভিত্তিপ্রস্তর সুকৌশলে বাঁকা করে স্থাপন করা হয়েছিল এবং এর নকশাও ছিল দুর্বল। কাজেই মার্কিন ষড়যন্ত্রে মারাত্মক ভুলের ওপর স্থাপিত শান্তি প্রক্রিয়ার খেসারত আরাফাতসহ অন্যান্য আপোষ আলোচনাকারীকে এভাবে দিতে হলো। #

২১ তম পর্ব

পাঠক! গত দুই পর্বে আমরা ইহুদীবাদী ইসরাইলের সাথে ফিলিস্তিনী নেতাদের কথিত শান্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করেছি। ১৯৯৩ সালে মার্কিন মধ্যস্থতায় ঐ প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং এর মাধ্যমে পিএলও ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে একটি দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এছাড়া ঐ আপোষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইসরাইল তার দীর্ঘদিনের লালিত বহু আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করে। কিন্তু বিনিময়ে ফিলিস্তিনীরা অবরোধ তীব্রতর হওয়া এবং ইসরাইলী সেনাদের বন্দুকের গুলি ও ট্যাংকের গোলা ছাড়া আর কিছুই পায় নি। এছাড়া যে আরাফাতকে দিয়ে মার্কিন ও ইহুদীবাদী চক্র কথিত শান্তি আলোচনা শুরু করেছিল, প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পর সেই আরাফাতকে তারা বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। আজকের পর্বে আমরা লেবাননের ওপর ইসরাইলী আগ্রাসন সম্পর্কে আলোচনা করবো।

ইহুদীবাদী ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গোরিওন তার আত্মজীবনীতে লিখেছে, “লেবানন হচ্ছে আরব দেশগুলোর ঐক্যের প্রতীক। দেশটিতে একটি খ্রিস্টান সরকারকে ক্ষমতায় এনে মুসলমানদের সে ঐক্যকে ধ্বংস করতে হবে। ঐ খ্রিস্টান দেশের সীমানা হবে লিতানি নদী এবং আমরা সেই সরকারের সাথে ঐক্য চুক্তি স্বাক্ষর করবো। লেবাননের খ্রিস্টান সরকারের সাথে মিলিত হয়ে আমরা আরব বাহিনীকে পরাভূত করবো, আম্মানে বোমাবর্ষণ করবো এবং পশ্চিম তীরকে পদানত করবো। সিরিয়ার যখন আর কথা বলার শক্তি থাকবে না, তখন মিশর যদি আমাদের সাথে যুদ্ধ করার ধৃষ্ঠতা দেখায়, তবে দেশটির আলেকজান্দ্রিয়া, পোর্ট সাঈদ ও কায়রোয় বোমাবর্ষণ করবো। এভাবে আমরা যুদ্ধের সমাপ্তি টানবো।”

বেন গোরিওনসহ অন্যান্য ইহুদীবাদী নেতা কখনোই লেবাননের প্রতি তাদের লোলুপ দৃষ্টির কথা গোপন রাখে নি। তারা লেবাননে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়ে দেশটিতে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছে সব সময়। ১৯৭০ সালে ইসরাইল প্রথমবারের মত লেবাননে আগ্রাসন চালায়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ তাৎক্ষণিকভাবে ঐ আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের জন্য ইসরাইলের প্রতি আহবান জানায়। ১৯৭২ সালে ইহুদীবাদী সেনারা দ্বিতীয়বারের মত লেবাননে হামলা চালায় এবং এবারও নিরাপত্তা পরিষদ ঐ আগ্রাসনের নিন্দা জানায়। কিন্তু ১৯৭৮ সালে ইসরাইলী সেনারা দক্ষিণ লেবাননে আগ্রাসন চালিয়ে এর বিস্তীর্ন এলাকা দখল করে নেয়। ঐ হামলায় দক্ষিণ লেবাননের ২০০০ বেসামরিক অধিবাসী নিহত এবং অপর দুই লাখেরও বেশী মানুষ তাদের বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত হয়।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবার ৪২৫ নম্বর প্রস্তাব পাশ করে দক্ষিণ লেবানন থেকে সরে যাওয়ার জন্য ইহুদীবাদী ইসরাইলের প্রতি আহবান জানায়। ইসরাইল লেবাননের একটি নদীর নাম অনুসারে ১৯৭৮ সালের ঐ আগ্রাসনের নাম দিয়েছিল ‘লিতানি’ এবং এর মাধ্যমে তারা লেবাননের এক পঞ্চমাংশ দখল করে নিয়েছিল। নিরাপত্তা পরিষদের আহবানে সাড়া দিয়ে ইসরাইল দক্ষিণ লেবানন থেকে দৃশ্যত সেনা প্রত্যাহার করে নিলেও কিছু অনুচর বাহিনী মোতায়েন করে রেখে যায়। তখন থেকে দক্ষিণ লেবানন ইহুদীবাদী সেনাদের ঘাঁটিতে পরিণত হয়। দক্ষিণ লেবাননের ৮৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা কার্যত ইসরাইলের দখলে চলে যায়।

ইসরাইলের দক্ষিণ লেবানন দখলের পেছনে কয়েকটি উদ্দেশ্য ছিল। বেন গোরিওন যেমনটি বলেছিল, লেবাননে ইসরাইলের সমর্থন মারুনি গোত্রের খ্রিস্টানদের দিয়ে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দেয়া, যাতে ফিলিস্তিনী ও আরব ভূখন্ডের ওপর ইহুদীবাদী জবরদখলের কথা ভুলে গিয়ে আরবরা লেবানন সংকটের দিকে দৃষ্টি দিতে বাধ্য হয়। এছাড়া দক্ষিণ লেবানন দখলের ফলে বেশ কয়েকটি নদী ইসরাইলের হস্তগত হয়েছিল, যা দিয়ে দেশটির পানি চাহিদার অনেকাংশ পুরণ হতো। ইহুদীবাদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যে পানি সংকটে ভুগছিল, তার অনেকখানি উপশম করা সম্ভব হয়েছিল দক্ষিণ লেবানন দখল করার মাধ্যমে। ১৯৮২ সালে ইহুদীবাদী সেনারা পুনরায় লেবাননে আগ্রাসন চালায় এবং এবার শুধু দক্ষিণ লেবানন নয়, ইসরাইলী বাহিনী লেবাননের রাজধানী বৈরুত পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

লেবাননে ১৯৮২ সালের ইসরাইলী হামলা ছিল দেশটিতে ইহুদীবাদীদের রক্তাক্ততম আগ্রাসন। নৌ, স্থল ও আকাশপথে ঐ ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছিল এবং এ সময় ১৪টি ফিলিস্তিনী শরণার্থী শিবিরে বোমাবর্ষণ করা হয়। আন্তর্জাতিক রেডক্রসের ভাষ্য অনুযায়ী, ঐ হামলায় ইসরাইলী সেনারা ২০ হাজার বেসামরিক ফিলিস্তিনী ও লেবাননীকে হত্যা করে। ইহুদীবাদী সেনারা ৩ মাস বৈরুত অবরোধ করে রাখে। এ সময় ফিলিস্তিনী গেরিলা এবং লেবাননের দেশপ্রেমী জনগণের প্রতিরোধ আন্দোলনের কারণে ইসরাইলী সেনারা নগরীটি পুরোপুরি দখল করতে পারে নি। তবে তারা অত্যন্ত অমানবিকভাবে বৈরুতের বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র দুই পক্ষের মধ্যে কথিত মধ্যস্থতা করার লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যে দূত পাঠায়। ঐ দূতের মধ্যস্থতায় পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনী যোদ্ধারা বৈরুত ত্যাগ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ইতালির মেরিন সেনাদের সমন্বয়ে গঠিত বহুজাতিক বাহিনী বৈরুতের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর বিশ্ববাসী যখন আন্তর্জাতিক বাহিনীর হাতে লেবাননের নিরাপত্তার ব্যাপারে একরকম নিশ্চিন্ত ছিল, তখন ১৯৮২ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর জেনারেল এরিয়েল শ্যারনের নেতৃত্বাধীন ইসরাইলী বাহিনী লেবাননের সন্ত্রাসী ফ্যালাঞ্জিস্টদের সাথে নিয়ে সাবরা ও শাতিলা শরণার্থী শিবিরে লোমহর্ষক গণহত্যা চালায়। এতে সেখানে আশ্রয় গ্রহণকারী ২ হাজার ফিলিস্তিনী নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই ছিল নারী শিশু।

ইসরাইলী সেনারা ফিলিস্তিনীদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হয় নি, তাদের দেহ কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা ও সাধারণ পরিষদ সাবরা ও শাতিলা শরণার্থী শিবিরে ইসরাইলী সেনাদের গণহত্যাকে স্পষ্ট যুদ্ধ অপরাধ বলে এর নিন্দা জানায়। এরপর লেবাননের জনগণ অনেকগুলো প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তুলে ইহুদীবাদী সেনাদের বিরুদ্ধে চোরাগোপ্তা হামলা শুরু করে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে নিন্দা ও চাপ প্রয়োগের ফলে ১৯৮৫ সালের গোড়ার দিকে ইসরাইল লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। তবে দক্ষিণ লেবাননে ইহুদীবাদী সেনা অবস্থান অক্ষুন্ন থাকে।

১৯৮২ সালের ঘটনাপ্রবাহ লেবাননকে এই শিক্ষা দেয় যে, এরপর থেকে দেশটিকে প্রতি মুহুর্তে ইসরাইলী আগ্রাসন এবং ইহুদীবাদীদের স্বদেশী দোসরদের ষড়যন্ত্রের হুমকির মধ্যে থাকতে হবে। বিশেষ করে জোমাইল পরিবারের নেতৃত্বাধীন খ্রিস্টান মারুনি গোষ্ঠি ও সামির জা’জা’র নেতৃত্বাধীন এর সামরিক শাখা ফ্যালাঞ্জিস্ট বাহিনীর সাথে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় লেবাননে যে কোন সময় ইসরাইলী আগ্রাসনের আশঙ্কা ছিল। এরকম পরিস্থিতিতে লেবাননকে ইহুদীবাদীদের আগ্রাসন থেকে রক্ষার জন্য শক্তিশালী কিছু প্রতিরোধ আন্দোলন গঠিত হয়। এর মধ্যে হিযবুল্লাহ ও আমোল আন্দোলনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। বিশেষ করে হিযবুল্লাহর আত্মপ্রকাশ ছিল লেবাননের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ইহুদীবাদী ইসরাইল এর আগে দক্ষিণ লেবাননকে তার নিরাপত্তার বেষ্টনি বলে দাবি করে আসলেও হিযবুল্লাহর মুহুর্মুহু আক্রমনে দখলদার শক্তির সামরিক ভিত কেঁপে ওঠে। দক্ষিণ লেবানন ইহুদীবাদী ইসরাইলী সেনাদের জন্য এক চোরাবালিতে রূপান্তরিত হয়। প্রতিমুহুর্তে হিযবুল্লাহর আক্রমনে পর্যদুস্ত হওয়ার পর অবশেষে তৎকালীন ইহুদীবাদী প্রধানমন্ত্রী ইহুদ বারাক দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলী সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়। এভাবে দেশটিতে ইসরাইলী সেনাদের ২২ বছরের গণহত্যা ও অন্যান্য অপরাধযজ্ঞের অবসান ঘটে। #

২২ তম পর্ব
ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনী ভূখণ্ড জবরদখল করেই ক্ষান্ত হয় নি, তারা গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে লেবানন দখলের পরিকল্পনা করে। ১৯৮০র দশকে একবার তারা দেশটির রাজধানী বৈরুত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে ইসরাইলী সেনারা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সেখান থেকে সরে আসলেও দক্ষিণ লেবাননে ঘাঁটি গেড়ে বসে। কিন্তু হিযবুল্লাহর তীব্র প্রতিরোধ যুদ্ধের মুখে ইসরাইলী সেনারা ২০০০ সালের মে মাসে ২২ বছরের দখলদারিত্বের অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণ লেবানন থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়।
২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলী সেনা প্রত্যাহার ছিল ঐ অবৈধ রাষ্ট্রের ৫২ বছরের ইতিহাসে ইহুদীবাদীদের প্রথম পশ্চাদপসরণের ঘটনা। প্রথম ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেন গোরিওন বলেছিল, “ইসরাইল যদি কোন যুদ্ধের ময়দানে একবার পরাজিত হয় বা পিছু হটে আসে, তবে তেলআবিবকে ধরে নিতে হবে, এরপর তাদের জন্য আরো পরাজয় অপেক্ষা করছে । এ কারণে একবার পরাজিত হলে পরবর্তী প্রথম সুযোগেই তার প্রতিশোধ নিতে হবে।” ইহুদীবাদী ইসরাইল ২০০০ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে। কারণ, লেবাননে তারা সেদেশের সেনবাহিনীর কাছে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক দলের সামরিক শাখা অর্থাৎ হিযবুল্লাহর প্রতিরোধ সংগ্রামীদের হাতে পরাজিত হয়েছিল । কাজেই সেই লজ্জাজনক পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ভাবমুর্তি পুনরুদ্ধার করা ছিল ইহুদীবাদীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ।

২০০৬ সালের জুন মাসে ইসরাইলের সামনে ৬ বছর আগের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার সেই কাঙ্খিত সুযোগ আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য ও পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে ইহুদীবাদী সেনারা জল, স্থল ও আকাশপথে দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক আগ্রাসন চালায় । প্রথম কয়েক সপ্তায় ইসরাইলী সেনারা লেবাননের মহাসড়ক, গুরুত্বপূর্ণ সেতু, পানি ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র, আবাসিক এলাকা, কৃষিক্ষেত, হাসপাতাল ও স্কুলের ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে। দক্ষিণ লেবাননের কয়েকটি গ্রাম ইহুদীবাদীদের বোমাবর্ষণে বিরানভূমিতে পরিণত হয় । বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বেসামরিক স্থাপনার ওপর ইসরাইলী ধ্বংসযজ্ঞের নিন্দা জানিয়ে ঐ হামলা বন্ধ করার আহবান জানায় ।

কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রভাব খাটিয়ে লেবাননের ওপর ইসরাইলী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব পাশ কিংবা যে কোন ধরনের যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কনডোলিৎযা রাইস ঐ যুদ্ধের ভেতর ইসরাইল সফরে এসে দক্ষিণ লেবাননে ইহুদীবাদী আগ্রাসনের প্রতি সমর্থন জানান। তিনি বলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে নয়া বা বৃহৎ মধ্যপ্রাচ্য গঠন করতে যাচ্ছে, লেবানন যুদ্ধ হচ্ছে তার প্রসব বেদনা মাত্র। তবে ৩৩ দিনব্যাপী ঐ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মার্কিন সাপ্তাহিকী নিউ ইয়র্কারের সাংবাদিক সিমোর হার্শ এক নিবন্ধে লিখেছিলেন : “মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি ভেবেছিলেন, প্রথম কয়েকদিনের বিমান হামলায় তারা হিযবুল্লার সামরিক স্থাপনা তছনছ করে দিতে পারবে ।”

তবে কয়েক সপ্তার মধ্যেই প্রমাণিত হয়, মার্কিন ও ইসরাইলী সামরিক বিশেষজ্ঞদের পরিকল্পনা কতখানি ভুল ছিল। বিমান হামলা চালিয়ে বেসামরিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে ইসরাইল যখন স্থলপথে অভিযান চালাতে যায়, তখন হিযবুল্লাহ যোদ্ধাদের হাতে প্রচণ্ড মার খেতে থাকে। এক পর্যায়ে ইসরাইলী বাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত দেখে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসে। ফলে ৩৩ দিনের ঐ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং ইসরাইলী সেনারা অত্যন্ত লজ্জাজনকভাবে দক্ষিণ লেবানন থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। ৬ দশক ধরে যে ইসরাইলী বাহিনী নিজেদেরকে অপরাজেয় হিসেবে দাবি করে আসছিল, এবং যে বাহিনীর ভয়ে শেখ শাসিত আরব রাষ্ট্রগুলো সারাক্ষণ ভয়ে শঙ্কিত থাকতো, লেবাননের একটি গেরিলা বাহিনীর কাছে সেই বাহিনী নির্মমভাবে পরাজিত হয়। বিশ্ববাসীও বুঝতে পারে, ইহুদীবাদী ইসরাইলের শক্তির দম্ভ কাগুজে বাঘের লম্ফঝম্ফ ছাড়া আর কিছু নয়। লেবাননসহ আরব বিশ্বের ইতিহাসে হিযবুল্লাহর কাছে ইসরাইলের শোচনীয় পরাজয় ছিল একটি অভূতপূর্ব ঘটনা।

ইসরাইলী সেনারা দক্ষিণ লেবাননে ঐ আগ্রাসনের শেষের দিকে যখন নিশ্চিত পরাজয়ের বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে, তখন শেষ তিন দিনে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ১০ লাখেরও বেশী নিষিদ্ধ গুচ্ছ বোমা নিক্ষেপ করে। এখনো অবিস্ফোরিত ঐসব বোমার আঘাতে বহু মানুষ নিহত বা বিকলাঙ্গ হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল লেবাননের হিযবুল্লাহকে নির্মূল করে কথিত বৃহৎ মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনার প্রথম ধাপ বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইহুদীবাদী বাহিনী উল্টো হিযবুল্লাহর হাতে বেদম মার খেয়ে পিছু হঠে আসে। হিযবুল্লাহর হাতে ইহুদীবাদী বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের পর মার্কিন সরকারের কোন কর্মকর্তার মুখে আর সেই ‘বৃহৎ মধ্যপ্রাচ্য’ পরিকল্পনার কথা শোনা যায় নি।

এদিকে ইসরাইলের রাজনৈতিক নেতা ও সেনাবাহিনী হিযবুল্লাহর হাতে নিজেদের পরাজয়ের জন্য পরস্পরকে দায়ী করতে থাকে। ইসরাইলী পার্লামেন্ট ৩৩ দিনের লেবানন যুদ্ধে পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। বিখ্যাত উইনোগ্রাদ তদন্ত কমিটি ঐ যুদ্ধ শেষ হওয়ার এক বছর পর প্রকাশিত প্রতিবেদনে তেলআবিব সরকার ও সেনাবাহিনী উভয়কে ঐ পরাজয়ের জন্য দায়ী করে। হিযবুল্লাহ মহাসচিব হাসান নাসরুল্লাহ এ সম্পর্কে বলে, উইনোগ্রাদ কমিটির রিপোর্ট লেবানন যুদ্ধে ইসরাইলের পরাজয়কে চিরদিনের জন্য ইতিহাসের পাতায় স্থান করে দিয়েছে ।

লেবাননের জনগণ একথা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে যে, ইহুদীবাদী ইসরাইল তাদের দেশে আগ্রাসন চালালে জাতিসংঘসহ কোন আন্তর্জাতিক সংস্থাই তা বন্ধ করার জন্য এগিয়ে আসবে না । এ উপলব্ধি থেকে তারা হিযবুল্লাহর মত প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছে । আর এ আন্দোলনের নেতৃত্বে প্রতিরোধ যুদ্ধের মাধ্যমেই দক্ষিণ লেবানন থেকে তারা আগ্রাসী ইহুদীবাদী সেনাদের বিতাড়িত করেছে । একদিন যে ইসরাইলী সেনারা কয়েকটি আরব দেশের সম্মিলিত বাহিনীকে পরজিত করেছিল, সেই বাহিনী একটি অসম যুদ্ধে একটি প্রতিরোধ সংগঠনের কয়েক হাজার যোদ্ধার কাছে পরাজিত হয়েছে। ফলে ইহুদীবাদী ইসরাইলের জন্য একবিংশ শতাব্দি শুরু হয়েছে একটি শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে । আর লেবাননের হিযবুল্লাহ ইহুদীবাদী সরকারকে বুঝিয়ে দিয়েছে, ৬ দশক ধরে ফিলিস্তিনী ভূখণ্ড জবরদখল করে রাখলেও তারা নিজেদের ভিত্তি মজবুত করতে পারে নি, কাজেই দখলদার ইসরাইলের ধ্বংস অনিবার্য ।#

২৩ তম পর্ব
ইহুদীবাদী ইসরাইল এ বছর এমন সময় তার ৬০ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠান উদযাপন করেছে, যখন, বহু আগেই ঐ অবৈধ রাষ্ট্রের পতনের ঘন্টাধ্বনি বেজে উঠেছে। সমস্ত দলিল-প্রমাণ ও আলামত প্রমাণ করছে, ইসরাইল ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । এমনকি অনেক ইসরাইলী নাগরিক ও বিশ্লেষকও ইসরাইলের এ বিপর্যয়কর অবস্থার কথা স্বীকার করেছেন । এছাড়া ইসরাইল বিরোধী ইহুদী গ্রুপ ‘নাটোরি কার্টা’সহ অনেক ইহুদী বিশ্বাস করেন, ইসরাইলের ধ্বংস অনিবার্য । ইসরাইলের সম্ভাব্য পতন সম্পর্কে আন্তর্জাতিক চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবিদের অভিমত সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করবো। আর এর মাধ্যমেই আমরা ইতি টানবো ফিলিস্তিন জবরদখলের ৬০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ধারাবাহিক আলোচনার সর্বশেষ পর্ব ।

ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঐ রাষ্ট্রের অবস্থান এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, ইসরাইলী কোন কোন লেখক ও কর্মকর্তা রাখঢাক না রেখে স্পষ্ট স্বীকার করেছেন, ইহুদীবাদী ইসরাইল ক্রমেই ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হচ্ছে । কিছুদিন আগে ইসরাইল ী অধ্যাপক ‘উশিয়া বোরুমান’ বলেছে, ইসরাইল পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং ২০১০ সালে এই পতনের চুড়ান্ত পর্যায় সম্পন্ন হবে । তিনি জোর দিয়ে বলে, ইসরাইলের পতন হবেই । নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইহুদী লেখক ‘ইসরাইল উমান’ কিছুদিন আগে ইহুদীবাদী ইসরাইলের দীর্ঘস্থায়ীত্বের ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করেছে। ইসরাইলে দীর্ঘদিন বসবাসকারী ইহুদী লেখক ও গবেষক ‘বারি শামিস’ মনে করেন, ইহুদীবাদী ইসরাইল অভ্যন্তরীণ সংকট এবং ভ্রান্ত ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে এটি ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । “ইসরাইলের পতন” শীর্ষক বইয়ে তিনি আরো লিখেছে : “যে কারণে ইসরাইলের পতনের ঘন্টাধ্বনি বেজে উঠেছে, তা হলো অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ।” ইহুদীবাদী ইসরাইলের পার্লামেন্টের সাবেক স্পীকার ‘আব্রাহাম বার্গ’ কিছুদিন আগে ইসরাইলের পতনের সম্ভাবনার কথা স্বীকার করে বলেছে, এই পতনের কাউন্ট ডাউন বা উল্টো গণনা শুরু হয়ে গেছে।

প্রকৃতপক্ষে ইসরাইলের বিভিন্ন বিভাগে এরই মধ্যে পতনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। ফিলিস্তিনী জনগণের প্রতিরোধ যুদ্ধ ঐ পতন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে । অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভাগ মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন হয়েছে । প্রতি বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো ইসরাইলের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থসাহায্য দেয়, যার পরিমাণ ৬ হাজার কোটি ডলারেরও বেশী । এত বিপুল পরিমাণ বাজেট সত্ত্বেও ইহুদীবাদী কর্মকতাদের আর্থিক দুর্নীতি এবং সেই সাথে আগ্রাসী নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সামরিক খাতে প্রচুর অর্থ খরচ করার কারণে তেলআবিব তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে ।

ইসরাইলের বৈদেশিক ঋণ বাকি পড়েছে ৭ হাজার কোটি ডলারেরও বেশী। গত কয়েক বছরে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ইসরাইলের প্রায় ৭০ হাজার অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানী বন্ধ হয়ে গেছে । এদিকে ইসরাইলে বর্ণবৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে । শুধু মুসলমানদের ক্ষেত্রে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ইসরাইলে এসে বসতি স্থাপনকারী ইহুদীদের মধ্যেও বর্ণবৈষম্য তীব্রতর হয়েছে এবং সেখানে শ্রেনীবৈষম্য চরম আকারে পৌঁছে গেছে। অবস্থা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, ইসরাইলের তথ্য ও পরিসংখ্যান বিভাগও স্বীকার করেছে, শ্রেনীবৈষম্যের দিক দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই ইসরাইল অবস্থান করছে ।

অর্থনৈতিক দুর্নীতি ইহুদীবাদী ইসরাইলের আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরাইলের সকল বিভাগের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে । শীর্ষস্থানীয় ইহুদীবাদী কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিষয়টি চোখে পড়ার মত । বিভিন্ন ইসরাইলী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাগুলোই এ সরকারের নৈতিক অধোঃপতনের চুড়ান্ত রূপ বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে । অবশ্য এসব মামলার অধিকাংশই পরবর্তীতে ধামাচাপা দিয়ে ফাইলবন্দী করে রেখে দেয়া হয় । শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন দল যদি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিদের বিরুদ্ধে কখনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চায়, তখনই আর্থিক দুর্নীতির মামলাগুলোকে সচল হতে দেখা যায় । অর্থনৈতিক দুর্নীতির দায়ে সম্প্রতি ইহুদ ওলমার্ট সরকারের পতন হয়েছে। ইহুদীবাদী সরকারের সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তি অর্থাৎ ওলমার্টের এ দুরবস্থা থেকেই ইসরাইলের দুর্নীতি সম্পর্কে একটা সার্বিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে ।

ইহুদীবাদী সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে ইসরাইলী তরুনদের অনীহা কুদস দখলদার সরকারের জন্য নতুন করে মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরীপে দেখা গেছে, ইসরাইলের শতকরা ৪০ ভাগ যুবক সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেছে । এছাড়া ইসরাইলী সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডের ওপর জবরদখল বজায় রাখা এবং আগ্রাসী তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ইসরাইলের সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন সেনাবাহিনীর। সেই সেনাবাহিনীর যখন এমন করুন অবস্থা, তখন ইসরাইলের অস্তিত্ব দিন দিন কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা সহজেই অনুমান করা যায় ।
এদিকে ইসরাইলী তরুন সমাজের মধ্যে পরিচালিত জরীপে দেখা গেছে, তারা ইসরাইলের অস্তিত্ব রক্ষার ব্যাপারে উদাসিন। ইহুদীবাদী দৈনিক ‌‍’ইয়াদিউত আহারনোত’ এ সম্পর্কে লিখেছে, শতকরা ৭০ ভাগ ইসরাইলী যুবক ঐ রাষ্ট্র ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। ইসরাইলের নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশটি ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রবনতা সম্পর্কে গবেষণাকারী একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ রজার বেনেট বলেছে, ইহুদী যুবকদের মধ্যে ইসরাইল ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রবনতা বৃদ্ধি পেয়েছে । কাজেই দেখা যাচ্ছে, ইসরাইলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরাও এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন, ইহুদীবাদী সরকার পতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ।

অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ইসরাইল জনসংখ্যা এবং সীমান্ত রক্ষার দিক থেকেও নানা সমস্যায় জর্জরিত রয়েছে। নতুন নতুন ফিলিস্তিনী ভূখণ্ড দখল এবং আরো ইহুদীকে ইসরাইলে অভিবাসন গ্রহণে উৎসাহিত করে তেলআবিব এই সংকট প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। সারাবিশ্ব থেকে ইহুদীদের ধরে এনে ইসরাইলে জড়ো করার কারণে তাদের মধ্যে কোন জাতীয়বাদী চেতনা নেই এবং স্বাভাবিকভাবেই সেখানে সামাজিক বন্ধনও তত জোরালো নয় । অনেক আগে থেকে ইসরাইলে বসবাসকারী ইহুদীবাদীরা নতুন করে আসা ইহুদীদের সাথে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করে। ফিলিস্তিনী জনগণের পরেই নতুন করে অভিবাসন গ্রহণকারী ইহুদীদের সাথে চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। প্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসা ইহুদীদেরকে ইসরাইলে দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয় । আর পশ্চিমা দেশগুলো থেকে আসা ইহুদীরা নিজেদেরকে প্রথম শ্রেনীর নাগরিক মনে করে এবং তারাই ইসরাইলের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। এই দুই শ্রেনীর নাগরিকদের জন্য ইসরাইলে পৃথক পৃথক জায়গায় বসতি স্থাপন করা হয়েছে।
প্রাচ্যের ইহুদীদের জন্য অপেক্ষাকৃত কম সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন বসতি স্থাপন করা হয়েছে এবং তাদের রাখা হয়েছে ঠাসাঠাসি করে । তেলআবিবের মত গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে পাশ্চাত্য থেকে আসা ইহুদীদের রাখা হয়েছে এবং গ্রাম্য ও মফস্বল এলাকাগুলোতে প্রাচ্যের ইহুদীদের থাকতে দেয়া হয়েছে । এই দুই শ্রেনীর ইহুদীদের পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগও অত্যন্ত সীমিত । এ ধরনের চরম বৈষম্যের কারণে ইসরাইলের দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিকরা ঐ অবৈধ রাষ্ট্র থেকে নিজ নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ফলে ইসরাইল ধীরে ধীরে জনসংখ্যা বিহীন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ৬০তম বার্ষিকী উদযাপন করে ইহুদীবাদী কর্মকর্তারা নিজেদের মনকে মিথ্যে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করেছে। একটি ইসরাইলী গণমাধ্যম বলেছে, ইসরাইলের অস্তিত্ব যখন ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন এ ধরনের অনুষ্ঠান উদযাপন সত্যিই হাস্যকর।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে