টিভি চ্যানেলে অনুষ্ঠানকারী, হাদী, দাঈ, আলিম ইত্যাদি দাবীদার ইবলিশ শয়তানগুলোর মুখোশ উন্মোচন


বর্তমানে আমাদের সমাজে আলিম দাবীদার কিছু দু’পায়া জানোয়ার দুনিয়াবী ফায়দা হাছিলের জন্য বা ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে দ্বীন ইসলাম উনার নামে গণতন্ত্র ভিত্তিক আন্দোলন করছে (নাঊযুবিল্লাহ্‌), তাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ অহরহ পেপার-পত্রিকায় নিজের ছবি ছাপাচ্ছে এবং দ্বীন ইসলাম উনার নামে টিভি চ্যানেলে প্রোগ্রাম করছে ও বেপর্দা হচ্ছে। (নাঊযুবিল্লাহ্‌)

অথচ গণতন্ত্রের চর্চা করা, ছবি তোলা বা ছবি আঁকা, বেপর্দা হওয়া ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়িয। কিন্তু তারা বিনা দ্বিধায় এ হারাম কাজগুলো করে যাচ্ছে। আবার তারা নিজেদেরকে হাদী, দাঈ, আলিম ইত্যাদি বলে দাবী করছে। তারা তাদের শয়তানী মজমা বসিয়ে সেখানে কিছু লোককে মুসলমান বানানোর নাটকও করছে। কিছু নাদান ও জাহিল দর্শক-শ্রোতাও তাদের সমর্থন করে যাচ্ছে। মূলত এই হাদী, দাঈ, আলিম ইত্যাদি দাবীদার ইবলিশ শয়তানগুলো হলো উলামায়ে ‘সূ’ বা ধর্মব্যবসায়ী।

এদের প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عن زياد بن حدير رحمة الله عليه قال قال لى عمر رضى الله تعالى عنه هل تعرف ما يهدم الاسلام؟ قلت لا قال يهدمه زلة العالـم وجدال المنافق بالكتاب وحكم الائمة الـمضلين.

অর্থ : “হযরত যিয়াদ ইবনে হুদাইর রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমাকে হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, তুমি বলতে পার কি, কোন জিনিস ইসলামকে ধ্বংস করবে? আমি বললাম না (আমি জানিনা)। তখন তিনি বললেন, আলিমদের পদস্খলন, মুনাফিকদের আল্লাহ পাক উনার কিতাব নিয়ে তর্ক-বাহাছে লিপ্ত হওয়া এবং গোমরাহ শাসকদের গোমরাহীমূলক হুকুম বা আদেশ-নিষেধ (ইসলাম উনার ক্ষতি সাধন করবে)।” (দারিমী শরীফ)

হাদী, দাঈ, আলিম ইত্যাদি দাবীদার উক্ত ইবলিশ শয়তানগুলোর পদস্খলনের কারণে মুসলমানদের পবিত্র ঈমান ও আমল হুমকির সম্মুখীন। কেননা, পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

صنفان من امتى اذا صلحت صلح الناس واذا فسدت فسد الناس الامراء والفقهاء

অর্থ : “আমার উম্মতের দুই সম্প্রদায়, তারা যখন ইছলাহ বা সংশোধন হবে, তখন সকল মানুষ (মুসলমান) সংশোধন হবে। আর তারা যখন পথভ্রষ্ট হবে, তখন সকল মানুষ (মুসলমান) পথভ্রষ্ট হবে, তারা হলো (১) রাজা-বাদশাহ্‌, (২) আলিম-উলামা।”

বস্তুতঃ হাদী, দাঈ, আলিম ইত্যাদি দাবীদার এসব ইবলিশ শয়তানরা হচ্ছে সৃষ্টির নিকৃষ্ট জীব। এদের সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عن الاحوص بن حكيم عن ابيه سئل رجل النبى صلى الله عليه وسلم عن الشر فقال لاتسئلونى عن الشر وسلونى عن الخير يقولها ثلاثا ثم قال الا ان شر الشر شرار العلماء وان خير الخير خيار العلماء.

অর্থ : “হযরত আহওয়াছ ইবনে হাকীম রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট নিকৃষ্ট লোক সম্পর্কে জানার জন্য প্রশ্ন করলেন। তখন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আপনি আমাকে খারাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন না বরং ভাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। তিনি উহা তিনবার বললেন। অতঃপর বললেন, সাবধান! নিশ্চয়ই নিকৃষ্টেরও নিকৃষ্ট লোক হলো উলামায়ে ‘সূ’ অর্থাৎ দুনিয়ালোভী ধর্মব্যবসায়ী আলিমগণ আর নিশ্চয়ই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন হচ্ছেন হক্কানী-রব্বানী আলিমগণ।” (দারিমী শরীফ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে এই সৃষ্টির নিকৃষ্ট জীবদের ভয়াবহ পরিণাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عن ابى الدرداء رضى الله تعالى عنه قال ان من اشر الناس عند الله منزلة يوم القيامة عالـم لا ينتفع بعلمه.

অর্থ : “হযরত আবু দারদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ক্বিয়ামতের দিন ওই ব্যক্তি সবচেয়ে নিকৃষ্ট হবে যে তার ইল্‌মের দ্বারা উপকৃত হয়নি।” (দারিমী শরীফ)

কেননা, তারা যদি ইলম অনুযায়ী আমল করত তবে গণতন্ত্রের অনুসরণ করতো না, ছবি তুলে টিভিতে অনুষ্ঠান করতো না বা বেপর্দাও হতো না। অর্থাৎ তাদের ভিতর আল্লাহভীতি থাকত। কেননা মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন,

انـما يـخشى الله من عباده العلماء

অর্থ : “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক উনার বান্দাদের মধ্য হতে শুধুমাত্র আলিমগণই মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করেন।” (পবিত্র সূরা ফাতির শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ২৮)

এ পবিত্র আয়াত শরীফ উনার তাফসীর জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল হাম্বলী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও ইমাম, ইমামুল আইম্মাহ, ইমামুছ ছিদ্দিক্বীন, শায়খুল মুহাদ্দিছীন, হযরত আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে। তিনি এই আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় বলেন, “যাঁর ভিতর যত বেশী আল্লাহভীতি রয়েছে তিনি তত বড় আলিম।”

উক্ত আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় তাফসীরগ্রন্থ “তাফসীরে খুলাছা”-য় উল্লেখ আছে যে,

العلماء سے اصطلاحی عالم یعنی کتابیں پرہ لینے والے مراد نہیں بلکہ کبریائے ذات وعظمت صفات کو نور ایمان شمع عرفان سے دیکہنے والے اسلئے کہ اصحاب رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم وارباب ولایت وقبول سبکے سب علماء کتابی نہ تہی گو اونکا علم نافع اعلی درجے کاتہا

অর্থ : “উক্ত আয়াত শরীফ উনার মধ্যে العلماء ‘আলিম’ শব্দ দ্বারা কিতাবসমূহ পাঠকারীকে (তথা দাওরা বা টাইটেল পাশকারীকে) বুঝানো হয়নি। বরং পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত العلماء ‘আলিম’ উনারাই, যাঁরা মহান আল্লাহ পাক উনার মহিমাময় জাত ও অসীম গৌরবময় ছিফাতসমূহকে পবিত্র ঈমান ও মা’রিফাতের নূরের আলোকে অবলোকন করেছেন। কেননা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রিয়তম ছাহাবা আজমাঈন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা ও (পরবর্তী) বেলায়েতপ্রাপ্ত ও মকবুল ওলীআল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা কিতাবী তথা দাওরা বা টাইটেল পাশ আলিম ছিলেন না। তথাপিও উনারা সর্বোচ্চ স্তরের উপকারী ইল্‌মের অধিকারী ছিলেন। অর্থাৎ উনারাই পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত প্রকৃত আলিম ছিলেন।”

উল্লিখিত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় বিখ্যাত আলিম, ইমামুল মুফাস্‌সিরীন, হযরত ইবনে কাছীর রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর প্রসিদ্ধ “তাফসীরে ইবনে কাছীর”-এ উল্লেখ করেন,

عن ابن مسعود رضى الله تعالى انه قال ليس العلم عن كثرة الـحديث ولكن العلم عن كثرة الـخشية وقال احـمد بن صالـح الـمصرى عن ابن وهاب عن مالك قال ان العلم ليس لكثرة الرواية وانـما العلم نور يـجعله الله تعالى فى القلب

অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু তিনি বলেন, যে ব্যক্তি অধিক হাদীছ শরীফ জানে সে ব্যক্তি আলিম নয়। বরং যাঁর মধ্যে আল্লাহভীতি অধিক সে ব্যক্তিই আলিম। আর হযরত আহমদ বিন ছালেহ মিছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, অধিক রিওয়ায়েত শিক্ষা করলেই আলিম হওয়া যায়না। মূলত ইলম হচ্ছে নূর বা জ্যোতি স্বরূপ। মহান আল্লাহ পাক তিনি তা মানুষের অন্ত:করণে দান করেন।”

উপরের বর্ণনা হতে দেখা যাচ্ছে তারা মুখে মুখে আলিম, দাঈ, হাদী ইত্যাদি দাবী করলেও তারা মূলত আলিমই হতে পারেনি। কেননা, রিওয়ায়েত শিক্ষা করলেই আলিম হওয়া যায় না বরং আল্লাহভীতি থাকা শর্ত। অথচ তাদের ভিতর আল্লাহভীতি না থাকায় তারা নিজেরা হারাম-নাজায়িয কাজ করছে ও অন্যকে উৎসাহিত করছে এমনকি হারাম-নাজায়িয কাজগুলোকে হালাল বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করছে।

অথচ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত আছে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, হে উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম! আমার পর যেহেতু আপনি হাদী হবেন, তাই মহিলাদের জন্য কয়েকটি জিনিস ব্যবহার করা জায়িয হলেও আপনার জন্য সেগুলো ব্যবহার করা জায়িয নয়।

(১) রেশমী কাপড় পরিধান করা।

(২) লাল রং-এর কাপড়  পরিধান করা।

(৩) স্বর্ণের অলংকার ব্যবহার করা।

তখন উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীকা আলাইহাস সালাম তিনি বললেন- ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি রেশমী ও লাল রং-এর কাপড় পরিধান নাইবা করলাম, কিন্তু আমি যেহেতু মহিলা আমার তো অলংকার ব্যবহার করতে হবে। তখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, যদি অলংকার ব্যবহার করতেই হয়, তবে রূপার অলংকার ব্যবহার করবেন। উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বললেন, আমি কি সে রূপার অলংকারগুলো স্বর্ণের পানিতে রং করে নিব? নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, যদি রং করতেই হয়, তবে জাফরানের পানিতে রং করে নিবেন।

উল্লিখিত ঘটনা দ্বারা বুঝা গেল যে, যিনি বা যাঁরা হাদী, দাঈ বা আলিম হন বা হবেন, উনাদেরকে হারাম ও নাজায়িয কাজ থেকে তো বেঁচে থাকতে হবেই বরং স্থানবিশেষে মুবাহ্ কাজও তরক করতে হবে। যেমন- উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার জন্য রেশমী ও লাল রং-এর কাপড় পরিধান করা এবং স্বর্ণের অলংকার ব্যবহার করা জায়িয থাকা সত্ত্বেও, হাদী হওয়ার কারণে তা পরিধান ও ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। কাজেই যারা সব সময় হারাম ও নাজায়িয কাজে মশগুল থাকে, আর অপরকে করতে উৎসাহিত করে, তারা কি করে হাদী, দাঈ বা আলিম হওয়ার উপযুক্ত হতে পারে বা তারা নিজেরা দাবী করতে পারে।

মূলত এরা সবাই ই হচ্ছে ধর্মব্যবসায়ী। দ্বীন ইসলাম উনাকে ব্যবহার করে এরা ব্যবসা করে থাকে। তাই এদের প্রসঙ্গেই পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عن انس رضى الله تعالى عنه  قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ويل لامتى من علماء السوء يتخدون هذا العلم تـجارة يبيعونـها من امراء زمانـهم ربـحا لانفسهم لا اربع الله تـجارتـهم.

অর্থ : “হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ মুবারক করেন, আমার উম্মতের মধ্যে যারা উলামায়ে ‘সূ’ তাদের জন্য আফ্‌সুস অর্থাৎ তারা জাহান্নামী হবে। তারা ইল্‌মকে ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করতঃ তাদের যুগের শাসকদের নিকট থেকে অর্থ ও পদ লাভের প্রচেষ্টা চালাবে। মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এসকল উলামায়ে ‘সূ’দের বিরুদ্ধে এই বলে বদদু’য়া করেন যে, আয় আল্লাহ পাক! যারা নিজেদের ইল্‌ম দ্বারা দুনিয়াবী সরকারের সাথে ব্যবসা করতে চায় তাদের ব্যবসায় বরকত দিবেন না।” (কানযুল উম্মাল শরীফ)

এসকল উলামায়ে ‘সূ’ বা ধর্মব্যবসায়ীদেরকে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে দাজ্জালে কায্‌যাব বা মিথ্যাবাদী দাজ্জাল বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং এদের থেকে উম্মতদেরকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عن حضرت ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يكون فى اخر الزمان دجالون كذابون يأتونكم من الاحاديث بـما لـم تسمعوا انتم ولا ابائكم فاياكم واياهم لايضلونكم ولا يفتنونكم.

অর্থ : “হযরত আবূ হুরাইরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। মহান আল্লাহ পাক উনার প্রিয়তম রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, আখিরী যামানায় কিছু সংখ্যক মিথ্যাবাদী দাজ্জাল বের হবে, তারা তোমাদের নিকট এমনসব (মিথ্যা-মনগড়া) কথা উপস্থাপন করবে, যা তোমরা কখনো শুনোনি এবং তোমাদের বাপ-দাদারাও শুনেনি, সাবধান! তোমরা তাদের কাছ থেকে দূরে থাকবে, তবে তারা তোমাদেরকে গোমরাহ্‌ করতে পারবে না এবং ফিৎনায় ফেলতে পারবে না।” (মুসলিম শরীফ)

সুতরাং বলার অপেক্ষাই রাখে না যে, যারা জেনে-বুঝে ও দুনিয়ার লোভে হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল সাব্যস্ত করে কিম্বা হক্বকে না-হক্বের সাথে মিশ্রিত করে তারা কস্মিনকালেও আলিম নয়। বরং তারাই হচ্ছে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত দাজ্জালে কায্‌যাব। এদের ওয়াজ শুনা ও এদেরকে অনুসরণ করা সম্পূর্ণ হারাম। কেননা মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,

ولاتطع من اعفلنا قلبه عن ذكرنا واتبع هواه وكان امره فرطا.

অর্থ : “তোমরা ওই ব্যক্তিকে অনুসরণ করো না যার অন্তর আমার যিকির থেকে গাফিল। এবং যে ব্যক্তি নফসের অনুসরণ করে এবং যে ব্যক্তির কাজগুলো ইসলামী শরীয়ত উনার খিলাফ।” (পবিত্র সূরা কাহাফ শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ২৮)

অর্থাৎ যাদের আমল ইসলামী শরীয়ত উনার খিলাফ তাদেরকে অনুসরণ করা হারাম। আর পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

فانظروا عمن تاخذون دينكم.

অর্থ : “তোমরা কার নিকট থেকে দ্বীন বা ইল্‌ম গ্রহণ করছো তা লক্ষ্য করো।” (মুসলিম শরীফ, তিরমিযী শরীফ, মিশকাত শরীফ, মিরকাত শরীফ)

অর্থাৎ যার আমল ইসলামী শরীয়ত উনার খিলাফ তার ওয়াজ শুনা ও তাকে অনুসরণ করা যাবে না। আর তাদের পিছনে নামাজ পড়ার ব্যপারে ফায়সালা হলো যদি তারা হারাম জেনেও হারাম কাজগুলো করে তবে তারা চরম ফাসিক। আর ফাসিকের পিছনে নামাজ পড়া মাকরূহ তাহ্‌রীমী। তাদের পিছনে নামাজ পড়ে থাকলে নামাজ দোহরায়ে পড়া ওয়াজিব। আর যদি তারা হারামকে হালাল জেনে তা সম্পাদন করে থাকে, তবে তাদের পিছনে নামাজ পড়া সম্পূর্ণরূপে হারাম। কারণ ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে হারামকে হালাল বলা কুফরী। আর যে কুফরী করে সে মুরতাদ হয়ে যায়। আর শরীয়তে মুরতাদের ফায়সালা হলো,

তার স্ত্রী তালাক হবে যদি বিয়ে করে থাকে এবং এক্ষেত্রে পুনরায় তওবা না করে বিয়ে না দোহরানো ব্যতীত তার স্ত্রী সাথে বসবাস করা বৈধ হবে না। আর অবৈধ অবস্থায় সন্তান হলে সে সন্তানও অবৈধ হবে। হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে যদি হজ্জ করে থাকে। সমস্ত নেক আমল বরবাদ হয়ে যাবে। তার ওয়ারিশ স্বত্ত্ব বাতিল হবে। তাকে ৩ দিন সময় দেয়া হবে তওবা করার জন্য এবং যদি তওবা করে তবে ক্ষমা হবে। অন্যথায় তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড। কেননা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে রয়েছে, ৩ কারণে মৃত্যুদন্ড দেয়া জায়িয। যথাঃ

(১) ঈমান আনার পর কুফরী করলে অর্থাৎ মুরতাদ হলে,

(২) ওই যিনাকার বা যিনাকারিণী যারা বিবাহিত বা বিবাহিতা,

(৩) যে অন্যায়ভাবে কাউকে ক্বতল করে। (তিরমিযী শরীফ, নাসাঈ শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, মুসনাদে শাফিয়ী শরীফ, মুসনাদে বাজ্জার শরীফ, মুস্তাদরিকে হাকিম শরীফ)

আর মুরতাদ মারা যাওয়ার পর যারা জানাযার নামাজ পড়ে বা পড়ায় বা জানাযার নামাজে সাহায্য-সহযোগীতা করে, তাদের সকলের উপরই মুরতাদের হুকুম বর্তাবে এবং এ সকল মুরতাদ মরলে বা নিহত হলে তাকে মুসলমানদের কবরস্তানে দাফন করা যাবে না। বরং তাকে কুকুরের ন্যায় একটি গর্তের মধ্যে পুঁতে রাখতে হবে।

আর এ সমস্ত নামধারী হাদী, দাঈ বা আলিমদের উপর যে মুরতাদের হুকুম বর্তায় তা নিচের ওয়াকিয়াটি থেকে বুঝা যায়-

বাদশাহ্‌ শাহ্‌জাহান একবার তার দরবারী আলিমদের নিকট ফতওয়া তলব করে বললেন, আমি অসুস্থ, অসুস্থতার কারণে আমার জন্য রেশমী কাপড় পরিধান করা জায়িয হবে কি? দরবারী আলিমরা বাদশার মন তুষ্টির জন্যই হোক বা দুনিয়াবী ফায়দা লাভের জন্যই হোক, তারা ফতওয়া দিল, বাদশাহ্‌ নামদার যেহেতু আপনি অসুস্থ আর আপনি অসুস্থ হয়ে পড়লে রাজ্য অচল হয়ে পড়বে, কাজেই রাজ্য ও প্রজাদের বৃহত্তর স্বার্থে আপনার জন্য এ অবস্থায় রেশমী কাপড় পরিধান করা জায়িয হবে। বাদশা তার দরবারী আলিমদের মৌখিক ফতওয়ায় আশ্বস্ত না হতে পেরে লিখিত ফতওয়ার নির্দেশ দিলেন। দরবারী আলিমরা বাদশাহ্‌কে এ ব্যাপারে লিখিত ফতওয়া দিল। বাদশাহ্‌ তাতেও নিশ্চিত হতে পারলেন না, তাই তিনি বললেন, এ ফতওয়াতে অন্যান্য আরো আলিমের দস্তখত লাগবে। দরবারী আলিমরা তখন তাদের সমগোত্রীয় ৩০০ আলিমের দস্তখত সংগ্রহ করে ফতওয়াটি বাদশাহ্‌র নিকট পেশ করলো। বাদশাহ্‌ ফতওয়াটি আদ্যপান্ত ভালরূপে পাঠ করে দেখলেন এবং বললেন যে, সেখানে তার শাহী মসজিদের যিনি খতীব, নূরুল আনওয়ার ও তাফসীরে আহ্‌মদীর ন্যায় বিশ্ববিখ্যাত কিতাবের মুছান্নিফ, তৎকালীন যামানার শ্রেষ্ঠতম আলিম, হযরতুল আল্লামা মুল্লা জিউন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দস্তখত ব্যতীত এ ফতওয়া গ্রহনযোগ্য হবে না। তখন দরবারী আলিমরা উক্ত ফতওয়াটি হযরত মুল্লা জিউন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবারে নিয়ে যায় দস্তখত নেবার জন্য। হযরত মুল্লা জিউন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, আমি আজ এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করবো না, বরং বাদশাহ্‌ আমার মসজিদে পবিত্র জুমুয়ার নামাজ পড়তে আসেন, তাই আমি বাদশাহ্‌ ও মুছল্লীগণের সম্মূখে এ ব্যাপারে ফতওয়া দিব। অতঃপর পবিত্র জুমুয়ার দিন বাদশাহ্‌ তার উজীর-নাজীরসহ পবিত্র জুমুয়ার নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে গেলেন। অনেক মুছল্লীও উপস্থিত হলেন এবং দরবারী আলিমরাও উপস্থিত। সকলেই অপেক্ষা করছে হযরত মুল্লা জিউন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ফতওয়া শুনার জন্য। ইতিমধ্যে হযরত মুল্লা জিউন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মিম্বরে উঠে বসলেন এবং বললেন, মুছল্লী ভাইয়েরা আমার নিকট ৩০০ আলিমের দস্তখত সম্বলিত একটি ফতওয়া এসেছে। যাতে বলা হয়েছে যে, বৃহত্তর স্বার্থে, বাদশাহ্‌র অসুস্থতার কারণে, বাদশাহ্‌র জন্য রেশমী কাপড় পরিধান করা জায়িয।

এ ব্যাপারে আমার ফতওয়া হলো- “যারা এ ফতওয়া দিয়েছে এবং যে চেয়েছে উভয়েই কাফির হয়ে গেছে।”

কারণ ওহীর দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, হারাম হারাম হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে গেছে এবং হালাল হালাল হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে গেছে। তাই ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে হারামকে হালাল আর হালালকে হারাম বলা কাট্টা কুফরী। যারা বলবে তারা কাট্টা কাফির হবে।

উপরোক্ত ঘটনা দ্বারা যেরূপ উলামায়ে ‘সূ’ বা ধর্মব্যবসায়ী আলিমদের মুখোশ সুস্পষ্টভাবে উম্মোচিত হলো, তদ্রুপ উলামায়ে হক্ব তথাদ্বীনদার আলিমগণের পরিচয় বা লক্ষণও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো।
সুতরাং, যাঁরা দ্বীনকে রক্ষা করার জন্য সবকিছু বিসর্জন দেন, প্রতিক্ষেত্রে ছহীহ্‌ আক্বীদা পোষণ করেন, মহান আল্লাহ পাক ও উনার প্রিয়তম রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদেরকে ভয় করেন, ইল্‌ম অনুযায়ী আমল করেন, সুন্নত উনার ইত্তিবা (অনুসরণ-অনুকরণ) করেন, হারাম থেকে বেঁচে থাকেন। উনারাই হক্কানী আলিম, আর উনারাই হলেন উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম। উনাদেরকেই অনুসরণ-অনুকরণ করতে হবে।

আর যারা দুনিয়াবী ফায়দা হাছিলের লক্ষ্যে মনগড়া ফতওয়া দেয়, নফসের অনুসরণ করে, ইসলামী শরীয়ত উনার খিলাফ কাজ করে, এক কথায় না-হক্ব বা হারামের উপর দৃঢ়চিত্ত, তারাই উলামায়ে ‘সূ’ বা দুনিয়াদার আলিম তথা ধর্মব্যবসায়ী। আর তারাই উম্মতের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট।

Views All Time
2
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

  1. ঐ সমস্ত উলামা সু দের অন্তরে ইলমের নুর প্রবেশ করেনি বিধায় তারা বিভ্রান্ত।মূলত আল্লাহ পাক সয়ং তাদের নিজেদের কারণেই তাদের অন্তরে মোহর এটে দিয়েছেন তাই তারা সত্যকে কখনো বুঝবেনা আর মানতে তো পারবেও না।খালিস তওবা করে একজন হক্বানী ওলী আল্লাহর নিকট বাইয়াত হয়ে ইসলাহ হাসিল না করা পর্যন্তা তারা কখনো হেদায়েত পাবে না।

  2. বক্তাবক্তা says:

    উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার জন্য রেশমী ও লাল রং-এর কাপড় পরিধান করা এবং স্বর্ণের অলংকার ব্যবহার করা জায়িয থাকা সত্ত্বেও, হাদী হওয়ার কারণে তা পরিধান ও ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাই কিতাবে লেখা হয়েছে যে,
    حسنة الابرار سيئة المقربين.
    অর্থ : “সাধারণ লোকের জন্য যা নেকের কাজ, খাছ বা বিশেষ লোকদের (হাদীদের) জন্য তা গুণাহের কারণ।”
    তাহলে হাদী, দাঈ বা আলিম দাবীদাররা সব সময় হারাম ও নাজায়িয কাজে মশগুল থেকে হাদী, দাঈ বা আলিম দাবী করে কিভাবে?
    এসব নিকৃষ্ট জীবকে সমাজ থেকে বহিষ্কার করে একঘরে করে রাখা উচিত।

  3. গোলামে মাদানী আক্বাগোলামে মাদানী আক্বা says:

    sorasori priyote

  4. খু্ব তথ্যবহুল, দলীল সমৃদ্ধ পোস্ট। প্রয়োজনীয়। প্রিয়তে রাখলাম।

  5. ধর্ম ব্যবসাও করতে দিলেন না ওদেরকে!

    এজন্য আপনাকে ধন্যবাদ

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে