তাফসীরুল কোরআন ক্বাল্বী যিকিরের গুরুত্ব=> হাফিজুল হাদীছ মুফতী মাওলানা মুহম্মদ ফজলুল হক


 

তরজমাঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক পরিমাণে আল্লাহ্ পাক-এর যিকির কর এবং সকাল ও সন্ধ্যায় আল্লাহ্ পাক-এর পবিত্রতা বর্ণনা কর।” (সূরা আহ্যাব/৪১-৪২)

তাফসীরঃ উদ্ধৃত আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ্ পাক বান্দাগণকে বেশী বেশী তাঁর যিকির-আয্কার করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করতে বলেছেন। মূলতঃ সকাল ও সন্ধ্যা দ্বারা দিবা-রাত্রি চব্বিশ ঘন্টা আল্লাহ্ পাক-এর যিকির-আয্কার, তছবীহ্-তাহ্লীল, ধ্যান-খেয়াল, মহব্বতে মশগুল থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেননা দিনের দু’প্রান্ত সকাল ও সন্ধ্যা দ্বারা সারা দিন ও সারা রাত্রিকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সদা সর্বাদাই যিকির-আয্কারে মশগুল থাকতে হবে। এক মূহুর্তের জন্যও যিকির থেকে বিরত থাকা যাবেনা। এ প্রসঙ্গে এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে,

فامربه فى الاحوال كلها فقال فاذكروا الله قياما وقعودا وعلى جنوبكم وقال اذكروا الله ذكرا كشيرا باليل والنهار فى البر والبحر والصحة والسقم فى السر والعلانية.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক উক্ত আয়াত শরীফ দ্বারা সর্বাবস্থায় যিকির করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, তোমরা দাঁড়ানো, বসা এবং শোয়া(প্রত্যেক) অবস্থায় আল্লাহ্ পাক-এর যিকির কর। আল্লাহ্ পাক আরো বলেন, “অধিক পরিমাণে আল্লাহ্ পাক-এর যিকির কর রাত্রিকালে ও দিনে, স্থল ও সমুদ্রভাগে, সুস্থ ও অসুস্থকালে, গোপন ও প্রকাশ্য সর্বাবস্থায়।”

এখানে উল্লেখ্য যে, দাঁড়ানো, বসা এবং শোয়া দ্বারা মূলতঃ মানুষের সার্বিক অবস্থাটাকেই নির্দেশ করা হয়েছে।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সর্বস্থানে, সর্বাবস্থায় ও  দায়েমীভাবে বা সবসময় আল্লাহ্ পাক-এর যিকিরে মশগুল থাকতে হবে। কেননা যে সময় মানুষ আল্লাহ্ পাক-এর যিকির হতে গাফেল থাকে, সে সময়েই শয়তান তার সঙ্গী হয়ে নাফরমানী বা পাপে মশগুল করিয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে কালামে পাকে এরশাদ হযেছে। আল্লাহ্ পাক বলেন,

ومن يعش عن ذكر الر حمن نقيض له شيطانا فهوله قرين.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহ্ পাক-এর যিকির থেকে গাফেল থাকে, তার জন্য একটি শয়তান নির্ধারিত হয়ে যায়। সে শয়তানই তার সাথী হয়।” (সূরা যুখরুফ/৩৬)

এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

الشيطان جاثم على قلب بنى ادم فاذا ذكر الله خنس واذا غفل وسوس.

অর্থঃ- “শয়তান আদম সন্তানের ক্বল্বে অবস্থান করে। যখন সে ব্যক্তি (আদম সন্তান) আল্লাহ্ পাক-এর যিকির করে, শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়। আর যখন যিকির থেকে গাফেল (বিরত) থাকে, তখনই শয়তান তাকে (খারাপ কাজের জন্য) ওয়াসওয়াসা দেয়।” (বোখারী শরীফ)

এ হাদীস শরীফের দ্বারা প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সর্বস্থানে, সর্বাবস্থায়, সবসময় বা দায়েমীভাবে যিকির-আয্কারে মশগুল থাকার মূল হাক্বীক্বত হচ্ছে- ক্বাল্বী যিকির হাছিল করা। যে যিকির একবার হাছিল হলে আল্লাহ্র রহ্মতে তা আর কোন স্থানে, কোন অবস্থায়, কোন সময় বন্ধ থাকেনা। অন্যথায় মৌখিক যিকির দ্বারা সবসময় যিকির-আয্কারের হক্ব আদায় সম্ভব হয়না। এ প্রসঙ্গে তাফ্সীরে বর্ণিত হয়েছে।

دوام الحضور بالقلب اذ لا يتصور دوام الذكر باللسان.

অর্থঃ- দায়েমী হুজুরী বা যিকির-আয্কার ক্বাল্বের সাথে সম্পর্কযুক্ত অর্থাৎ সর্বদা যিকির করতে হলে ক্বাল্বী যিকির হাছিল করতে হবে। কেননা লিছানী বাা মৌখিক যিকিরের মাধ্যমে সর্বদা যিকির করা সম্ভব নয়।

তাই কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে,

الذكر ذكران ذكر فى القلب وذكر على اللسان.

অর্থঃ- “যিকির দু’প্রকার- (১) ক্বাল্বী যিকির (২) লেছানী যিকির।”

তাফসীরে আরো উল্লেখ করা হয়েছে,

المراد بالاول هو الذكر الخفى والحضور الدائم- وبا لثانى الذكر الجلى والعبادات الرتبة من الفرائض والسنن.

অর্থঃ- “প্রথমটি (ক্বাল্বী যিকির) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- যিকিরে খফী ও দায়েমী হুজুরী। আর দ্বিতীয়টি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- ফরজ ওয়াজিব, সুন্নত ইত্যাদি সকল ইবাদত-বন্দিগী।”

জ্ঞাতব্য যে, লেছানী বা মৌখিক যিকিরের তা’লীম দ্বীনী প্রতিষ্ঠানে ওস্তাদ, পিতা-মাতা ও মুরুব্বীগণ থেকে শিক্ষালাভ করা যায়। কিন্তু ক্বাল্বী যিকিরের একমাত্র তা’লীমদাতা হলেন- হক্কানী-রব্বানী আউলিয়া-ই-কিরাম (রঃ), বুযুর্গানে দ্বীন বা  হক্কানী পীর সাহেবগণ।

এজন্য অনুসরণীয় সকল ইমাম, মুজ্তাহিদ ও আওলিয়া-ই-কিরামগণ কামিল পীর সাহেবের হাতে বাইয়াত হওয়া ফরজ বলেছেন।

অতএব, কামিল পীর সাহেবের হাতে বাইয়াত হয়ে ক্বাল্বী যিকির হাছিল করতঃ উল্লিখিত আয়াত শরীফের হুকুমানুযায়ী সর্বস্থানে, সর্বাবস্থায় ও সবসময় বা দায়েমী যিকির-আয্কারের যোগ্যতা হাছিল করা সকলের জন্যই আবশ্যকীয় কর্তব্য বা ফরজ হিসেবে পরিগণিত।

Views All Time
2
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে