তাহাজ্জুদ নামায ও তারাবীহ নামায ভিন্ন দুইটি নামায


পবিত্র কুরআন শরীফের ৭৩তম সূরা হচ্ছে সূরা আল-মুজাম্মিল। নাযিলের দিক দিয়ে সূরাটির অবস্থান ৩য়। অর্থাৎ সূরাটি পবিত্র মক্কা শরীফে নাযিল হয়েছে। এই সূরার প্রথম ৪ খানা আয়াতে বর্ণিত আছে-

يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ ﴿١﴾ قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا ﴿٢﴾ نِّصْفَهُ أَوِ انقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا ﴿٣﴾ أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا ﴿٤﴾

অর্থ : “হে বস্ত্রাবৃত! রাত্রিতে দন্ডায়মান হোন, কিছু অংশ বাদ দিয়ে; অর্ধরাত্রি অথবা তদপেক্ষা কিছু কম অথবা তদপেক্ষা বেশী এবং পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করুন সুবিন্যস্তভাবে ও স্পষ্টভাবে।” (সূরা মুজাম্মিল : ১-৪)
উপরোক্ত আয়াত চতুষ্টয় হচ্ছে তাহাজ্জুদ নামায ফরয হওয়ার দলীল। পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়ার আগে হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর তাহাজ্জুদ নামায বাধ্যতামূলক ছিল। তাই তিনি জীবনে কখনো তাহাজ্জুদ নামায আদায় থেকে বিরত হননি। তবে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়ার পর নামাযটি নফল করা হয়।
যেমন মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ মুবারক করেন-

وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَّكَ

অর্থ : “রাত্রির কিছু অংশ পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াতসহ জাগ্রত থাকুন। এটা আপনার জন্যে অতিরিক্ত।” (সূরা বনী ইসরাঈল : ৭৯)
তাহাজ্জুদ নামায আদায় করা নফল হয়ে গেলেও, এই নামাযের গুরুত্ব বুঝানোর জন্য পবিত্র হাদীছ শরীফে ইরশাদ হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَحِمَ اللهُ رَجُلاً قَامَ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّى وَأَيْقَظَ امْرَأَتَهُ فَصَلَّتْ فَإِنْ أَبَتْ رَشَّ فِي وَجْهِهَا الْمَاءَ رَحِمَ اللهُ امْرَأَةً قَامَتْ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّتْ وَأَيْقَظَتْ زَوْجَهَا فَصَلَّى فَإِنْ أَبَى رَشَّتْ فِي وَجْهِهِ الْمَاءَ

অর্থ : “হযরত আবূ হুরায়রাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত। নবী করিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, মহান আল্লাহ পাক ওই ব্যক্তির উপর রহমত নাজিল করেন, যিনি রাতে নিদ্রা থেকে জেগে তাহাজ্জুদ নামায আদায় করেন এবং তাঁর স্ত্রীকে নিদ্রা থেকে জাগিয়ে দেন। অতঃপর তিনি (তাঁর স্ত্রী) তাহাজ্জুদ নামায আদায় করেন। এমনকি যদি তিনি (স্ত্রী) ঘুম থেকে জাগ্রত হতে না চান, তাহলে তাঁর মুখে পানি ছিটিয়ে দেন। আর মহান আল্লাহ পাক ওই নারীর উপর রহমত নাজিল করেন, যিনি রাতে নিদ্রা থেকে জেগে তাহাজ্জুদ নামায আদায় করেন এবং তাঁর স্বামীকে নিদ্রা থেকে জাগিয়ে দেন। অতঃপর তিনি (তাঁর স্বামী) তাহাজ্জুদ নামায আদায় করেন। এমনকি যদি তিনি (স্বামী) ঘুম থেকে জাগ্রত হতে না চান, তাহলে তাঁর মুখে পানি ছিটিয়ে দেন।’’ (আবু দাউদ ও নাসাঈ)
আরো বর্ণিত আছে-
عَنْ حَضْرَتْ عَبْدِ اللهِ بْنِ سَلامٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ : لَمَّا قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ انْجَفَلَ النَّاسُ إِلَيْهِ فَكُنْتُ فِيمَنْ أَتَى فَلَمَّا رَأَيْتُ وَجْهَهُ عَرَفْتُ أَنَّه وَجْه غَيْرُ كَذَّابٍ سَمِعْتُهُ وَهُوَ يَقُولُ : أَيُّهَا النَّاسُ أَفْشُوا السَّلامَ وَصِلُوا الأَرْحَامَ وأَطْعِمُوا الطَّعَامَ وَصَلُّوا بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلامٍ
অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ বিন সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন পবিত্র মদীনা শরীফে তাশরীফ আনেন তখন প্রথম যে কথাগুলো উনার যবান থেকে শুনি তা হলো : “হে লোক সকল! ইসলামের প্রচার ও প্রসার করো, মানুষকে আহার দান করো,আত্মীয়তা অটুট রাখ, আর যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকবে তখন তোমরা রাতে নামায পড়তে থাকবে। তাহলে তোমরা নিরাপদে বেহেশতে যাবে।” (হাকেম, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী)
হিজরতের ২য় বছরে পবিত্র মদীনা শরীফে অর্থাৎ ২য় হিজরীতে মহান আল্লাহ পাক তিনি রমাদ্বান মাসের রোযা ফরয করেন। পবিত্র রমাদ্বান মাসের রোযা ফরয হওয়ার পরে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-

عن حَضْرَتْ عَبْدُ الرَّحـْمٰنِ بْنِ عَوْفٌ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِنَّ اللهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى فَرَضَ صِيَامَ رَمَضَانَ عَلَيْكُمْ وَسَنَنْتُ لَكُمْ قِيَامَهُ فَمَنْ صَامَهُ وَقَامَهُ إِيـمَانًا وَاحْتِسَابًا خَرَجَ مِنْ ذُنُوبِهِ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ.

অর্থ : “হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত- সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ পাক আপনাদের জন্যে পবিত্র রমাদ্বান শরীফ মাসের রোজাকে ফরয করেছেন। আর আমি আপনাদের জন্যে তারাবীহ্ নামাযকে সুন্নত করে দিলাম। সুতরাং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও ছাওয়াবের লক্ষ্যে পবিত্র রমাদ্বান শরীফে রোজাগুলো আদায় করবে ও রাত্রে তারাবীহ্ নামায পড়বে, সে গুণাহ্ হতে এরূপ পবিত্রতা লাভ করবে, যেন সে আজই মায়ের পেট হতে ভূমিষ্ট হয়েছে।” (সুনানে নাসাঈ)
সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, রোযা ফরয হওয়ার পূর্বে তারাবীহ নামাযের কোন অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু ওহী নাযিলের পর থেকেই তাহাজ্জুদ নামাজ চালু রয়েছে। যা প্রথমে ফরজ ছিলো, পরবর্তীতে নফল হয়েছে। অর্থাৎ তাহাজ্জুদ ও তারাবীহ নামাযের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে।
পবিত্র হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে-

عَنْ حَضْرَتْ عَائِشَةَ رضى الله عنها أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم صَلَّى فِي الْمَسْجِدِ ذَاتَ لَيْلَةٍ وَصَلَّى بِصَلاَتِهِ نَاسٌ ثُـمَّ صَلَّى مِنَ الْقَابِلَةِ وَكَثُرَ النَّاسُ ثُـمَّ اجْتَمَعُوا مِنَ اللَّيْلَةِ الثَّالِثَةِ أَوِ الرَّابِعَةِ فَلَمْ يَخْرُجْ إِلَيْهِمْ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَلَمَّا أَصْبَحَ قَالَ قَدْ رَأَيْتُ الَّذِي صَنَعْتُمْ فَلَمْ يَمْنَعْنِي مِنَ الْخُرُوجِ إِلَيْكُمْ إِلاَّ أَنِّي خَشِيتُ أَنْ يُفْرَضَ عَلَيْكُمْ “

এই হাদীছ শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে- أَنِّي خَشِيتُ أَنْ يُفْرَضَ عَلَيْكُمْ
“আমি আপনাদের নিকট তারাবীহ নামাজ পড়ার জন্য না আসার কারণ এই যে, আমার আশঙ্কা হচ্ছে আপনাদের উপর ফরয হয়ে যায় কিনা।”
মূলত তারাবীহ নামাজ সুন্নত, তাই হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশঙ্কা করেছেন ফরয হয়ে যায় কিনা। কিন্তু তাহাজ্জুদ নামায শুরুতেই ফরজ ছিল বরং পরে আয়াত শরীফের মাধ্যমে নফল করা হয়েছে। তাই নতুন করে ফরয হওয়ার কোন প্রশ্নই উঠে না।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে