দাম নির্ধারণ নিয়ে শঙ্কা ॥ বিপুল পরিমাণ চামড়া ভারতে পাচারের আশঙ্কা


স্বাধীনতার ৪০ বছরে দেশে এবারই প্রথম বড় ধরনের দরপতন হয়েছে চামড়ার বাজারে। চামড়ার মূল্য অস্বাভাবিক হারে পড়ে যাওয়ায় মূলধন সংকটে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। কুরবানির আর মাত্র ৮ দিন বাকি থাকলেও চামড়া কেনার কোনো প্রস্তুতি নিতে পারেননি তারা। এদিকে ১৪৩৩ হিজরীর ঈদুল ফিতরের পর থেকে হঠাৎ করে চামড়ার বাজারে মন্দা শুরু হয়। ব্যাপক দরপতনে চামড়ার মূল্য অর্ধেকে নেমে আসে। এতে করে ব্যবসায় ধস নামে। পশু জবাইও কমে যায়। লোকসান গুনতে গুনতে গোস্ত ব্যবসায়ীদের অনেকেই এ পৈতৃক ব্যবসা ছেড়ে অন্য ব্যবসায় চলে গেছে।
ফলে এবারের ঈদে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ২০১১ সালের মতো এবার আগাম দর নির্ধারণ করা হয়নি। এতে ন্যায্য দামে বেচাকেনা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানান কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীরা। এদিকে কুরবানির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা না হলে বিপুল পরিমাণ চামড়া পাচার হয়ে যাবে। ক্ষতির শিকার হবে দেশ। তবে ট্যানারি মালিকরা এ বিষয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কমে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে। এ কারণে দাম নির্ধারণ করা হয়নি। তবে সঠিক বাজার দরেই চামড়া কেনা হবে। দাম নির্ধারণ না হওয়ায় প্রতিযোগিতা করে চামড়া কিনতে হবে। এতে চামড়ার দাম খুব বেশি-কম হবে না।
হাজারীবাগের পোস্তা চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছর প্রতিটি গরু ও মহিষের কাঁচা চামড়া গড়ে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, ছাগলের চামড়া ২০০ থেকে ২২০ টাকা, ভেড়ার চামড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় কিনেছেন। কিন্তু ২০১০ সালে দাম নির্ধারিত হওয়ায় প্রতিটি গরু-মহিষের চামড়া ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা, ছাগলের চামড়া ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, ভেড়ার চামড়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। গত বছরে দাম নির্ধারণ না করায় আগের বছরের চেয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি হয়েছে। এবারও দাম নির্ধারণ হয়নি। এতে আরও কম দামে বিক্রি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এদিকে চামড়ার দাম কমলেও এবার চামড়া সংরক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাবে। এর ফলে পোস্তা ব্যবসায়ীরা কম দামে চামড়া কিনলেও টেনারি মালিকদের বেশি দামে কিনতে হবে। লবণের দাম বাড়ায় প্রতিটি চামড়া সংরক্ষণ করতে গড়ে ৩০০-৪০০ টাকা ব্যয় হবে। কিন্তু গত বছরে প্রতিটি চামড়া সংরক্ষণে ব্যয় হয়েছে ১৫০ টাকা।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আবতাব বলেন, টেনারি ও পোস্তা ব্যবসায়ীরা যৌথভাবে দেশের চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণের জন্য চেষ্টা করছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে যাওয়ায় এবারও দাম নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। দাম নির্ধারণ না হওয়ায় চামড়া নিয়ে অনেকটা শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। বিপুল পরিমাণ চামড়া ভারতে পাচার হয়ে যেতে পারে। কেননা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের চামড়া কম দামে ব্যবসায়ীরা কেনাকাটা করলে সে ক্ষেত্রে কাঁচা চামড়া পাচার হবেই। ক্ষতির সম্মুখীন হবে দেশের অর্থনীতি। এ জন্য ন্যায্য মূল্যে চামড়া কেনার চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে লাভ কম বেশি হতে পারে। কোরবানির মৌসুমে পোস্তায় প্রায় ৩৫ লাখ চামড়া সংরক্ষণ করে টেনারিতে সরবরাহ করা হয়।
মূলধন সঙ্কটে মফস্বলের ব্যবসায়ীরা :
সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতার প্রতিবেদন : ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে বিপুল পরিমাণ টাকা বকেয়া থাকায় মূলধনের অভাবে সৈয়দপুরের (নীলফামারী) ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। ঢাকার ট্যানারি মালিকরা বকেয়া টাকা পরিশোধ না করলে সৈয়দপুরের অনেক ব্যবসায়ী চামড়া কিনতে পারবেন বলে আশঙ্কা করছেন। সৈয়দপুরের বিশিষ্ট চামড়া ব্যবসায়ী নাদিম আখতার জানান, ঈদুল ফিতরের পর থেকে হঠাৎ করে চামড়ার বাজারে মন্দা শুরু হয়। ব্যাপক দরপতনে চামড়ার মূল্য অর্ধেকে নেমে আসে। এতে করে গোস্ত ব্যবসায় ধস নামে। পশু জবাইও কমে যায়। লোকসান গুনতে গুনতে গোস্ত ব্যবসায়ীদের অনেকেই এ পৈতৃক ব্যবসা ছেড়ে অন্য ব্যবসায় চলে গেছে। ইতোমধ্যে কালাম, ফকিরা, মোহাম্মদ আলী, আজগরসহ সৈয়দপুরের অর্ধশত গোস্ত ব্যবসায়ী তাদের পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। কথা হয় সৈয়দপুরর চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আজিজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আন্তর্জাতিক চামড়ার বাজার ভারতের দখলে যাওয়ায় দেশীয়ভাবে চামড়া ব্যবসায় ব্যাপক দরপতন হয়েছে। এতে করে সীমান্ত এলাকার চোরাকারবারিরা তাদের এজেন্টের মাধ্যমে চামড়া সংগ্রহ করে ভারতে পাচার করছে। বিনিময়ে চোরাকারবারিরা ভারত থেকে মাদকসহ নানা ধরনের পণ্য চোরাপথে দেশে আনছে। তিনি অভিযোগ করে আরো বলেন, বিদেশে চামড়া রপ্তানি না হওয়ায় ঢাকার হাজারীবাগের ট্যানারিগুলোতে কমপক্ষে ৬০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার চামড়া পড়ে আছে। এ কারণে সারাদেশের ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের বকেয়া টাকাও ট্যানারি মালিকরা পরিশোধ করছেন না। শুধুমাত্র সৈয়দপুরের ব্যবসায়ীদের বকেয়া পড়ে আছে প্রায় ২ কোটি টাকা। তার মতে ট্যানারি মালিকরা টাকা সরবরাহ না করলে প্রত্যন্ত জনপদের চামড়া ব্যবসায়ীরা চামড়া কেনা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবে।
চামড়া ব্যবসায়ী নেতা আজিজুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরাতে পরিবেশবাদীরা আন্দোলন করছেন। তাদের আন্দোলনের ঢেউ ইউরোপের মাটিতে পৌঁছেছে। এ জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরাতে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে আসছে। কিন্তু সরকার এটি করতে ব্যর্থ হয়েছে। যার ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশের চামড়া বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় তা ভারতের দখলে চলে গেছে। গত ২ মাস আগেও মান ভেদে যে গরুর চামড়া ৮০ থেকে ১১০ টাকা বর্গফুট দরে বিক্রি হয়েছে বর্তমান বাজারে তা ২০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছাগলের চামড়ার বাজারেও একই অবস্থা চলছে। ৭৫ টাকা বর্গফুটের ছাগলের চামড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ এ চামড়াই ভারতে দ্বিগুণ দামে কেনাবেচা হচ্ছে। এ কারণে চামড়া ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা পবিত্র ঈদুল আযহার কুরবানির চামড়ার বৃহৎ অংশ ভারতে পাচার হয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে ভারতীয় চামড়া ব্যবসায়ীরা তাদের এজেন্টের মাধ্যমে চামড়া কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জোর গুঞ্জন চলছে।
সুধীজনরা বলছেন, চামড়ার বাজারে ধস নামলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় যেমন কমবে তেমনি চোরাই পণ্যে দেশ ভরে যাবে। ফলে দেশীয় একাধিক শিল্পে স্থরিবতা নেমে আসবে। বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে। এ জন্য সরকারের কাছে চামড়ার বাজারের মন্দাভাব নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে