দাসপ্রথা ও ইসলাম


ইসলাম বিদ্বেষীরা প্রায়ই রটনা করে থাকে যে, ইসলাম দাসপ্রথাকে ত্বরান্বিত করেছে, দাসদের উপর যৌন নির্যাতন চালানোকে বৈধতা দিয়েছে, মানুষকে পণ্য-সামগ্রী হিসেবে কেনাবেচার বৈধতা দিয়েছে-ইত্যাদি

 Slavery in Islam

যিনি খ্বালিক, যিনি মালিক, যিনি রব মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ মুবারক করেন,

فَكُّ رَقَبَةٍ

অর্থ: “আর তা হল দাসমুক্তি।” (পবিত্র সূরা বালাদ শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ ১৩)

এই পবিত্র আয়াত শরীফ উনার তাফসীরে আল্লাহ পাক তিনটি নেক আমল উনাদের কথা উল্লেখ করেছেন যা মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট অত্যন্ত সম্মানিত এবং পছন্দনীয়। এর মাঝে প্রথমটি হচ্ছে দাস মুক্ত করা।

হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,

مَنْ أَعْتَقَ رَقَبَةً مُسْلِمَةً، أَعْتَقَ اللهُ بِكُلِّ عُضْوٍ مِنْهُ عُضْوًا مِنَ النَّارِ، حَتَّى فَرْجَهُ بِفَرْجِهِ-

অর্থ: “যে ব্যক্তি একজন গোলামকে মুক্ত করল, আল্লাহ তাকে তার প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে একটি অঙ্গকে, এমনকি তার গুপ্তাঙ্গের বিনিময়ে গুপ্তাঙ্গকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন”। (সহীহ বুখারী শরীফ)

এরুপ অসংখ্য আয়াত শরীফ, হাদীস শরীফ দ্বারা দাসপ্রথা বিলুপ্তকরণের বাস্তবসম্মত তর্জ-তরীক্বা পবিত্র দ্বীন ইসলামে রয়েছে। উল্লেখ্য, আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগে সারা বিশ্বে দাস প্রথা চালু ছিল। তখন দাসদেরকে অবর্ণনীয় এবং অমানবিক নির্যাতন সহ্য করতে হতো। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা নির্বিশেষে সবাইকে ব্যাপক হারে জোরপূর্বক দাস বানানো হতো এবং বৈধভাবে দাস বাজারে কেনাবেচা চলতো।

এমনই এক সময়ে পবিত্র দ্বীন ইসলাম প্রকাশিত হলেন। দাস প্রথার নিকৃষ্ট দিকগুলো সংস্কার ও সর্বোপরি দাস প্রথার বিলুপ্তি সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র দ্বীন ইসলাম উনার দ্বারা।

ইসলামবিদ্বেষীরা যে পবিত্র আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ উনাদের অপব্যাখ্যা করে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়:

“মহান আল্লাহ পাক আরেকটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন, দুইজন ব্যক্তির, একজন বোবা যে কোন কাজ করতে পারে না। সে মালিকের উপর বোঝা। যেদিকে তাকে পাঠানো হয়, সঠিকভাবে কোন কাজ করে আসে না। সে কি সমান হবে ঐ ব্যক্তির, যে ন্যায় বিচারের আদেশ করে এবং সরল পথে কায়েম রয়েছে?” (পবিত্র সূরা নাহল শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ ৭৬)

ইসলামবিদ্বেষীরা বলতে চায় যে, উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ দ্বারা ইসলামে দাস প্রথাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

অথচ এই আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় তাফসীর ইবনে কাসীর শরীফ উনার মাঝে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াত শরীফ দ্বারা মুশরিকদের প্রতিমার দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে।

একইভাবে তারা আরো বলে থাকে যে,

“কিতাবধারীদের মধ্যে যারা কাফেরদের পৃষ্টপোষকতা করেছিল, তাদেরকে তিনি তাদের দুর্গ থেকে নামিয়ে দিলেন এবং তাদের অন্তরে ভীতি নিক্ষেপ করলেন। ফলে আপনারা একদলকে হত্যা করেছেন এবং একদলকে বন্দী করেছেন। (পবিত্র সূরা আহযাব শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ ২৬)

এখানে মূলত বনু কুরাইজার ইহুদীদের সাথে সংঘটিত জিহাদের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। আর যুদ্ধবন্দী তো প্রত্যেক যুগেই ছিল এবং এখনও আছে। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়ায় আমেরিকা নির্বিচারে শিশু, নারী, বৃদ্ধদেরকে কুখ্যাত গুয়ান্টানামো বে নামক কারাগারে বন্দী করে আজও তাদের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচার চালাচ্ছে, সেটা আমেরিকার পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত ইসলামবিদ্বেষীরাও অস্বীকার করতে পারবে না।

একমাত্র ইসলামই যুদ্ধবন্দীদেরকে বিনিময় করা, পণ আদায় করে মুক্তি দেওয়া, ইসলাম গ্রহনের মাধ্যমে মুক্ত করা ইত্যাদি তর্জ-তরীক্বার উদ্ভাবন করেছে।

যে বিষয়ে ইসলামবিদ্বেষীরা বেশী অপপ্রচার করে থাকে যে নারীদেরকে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি নাকি দ্বীন ইসলামে আছে।

ইসলামবিদ্বেষীদের অন্যতম কৌশল হলো বাস্তববিমুখী কথার মাধ্যমে স্বল্পজ্ঞান মুসলমানদের বিভ্রান্ত করা। তারা যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করার কথাটি এমনভাবে উপস্থাপন করে যাতে সাধারন মানুষ মনে করে যে, ইসলামের পুর্বে এমনটা প্রচলিত ছিলো না। কিন্তু বাস্তব হচ্ছে যে ক্রীতদাস-ক্রীতদাসীদেরকে মালিক পক্ষের যতজন খুশি ততজন যথেচ্ছা ব্যবহার করতো, দাসীদের সন্তানদেরকেও দাসত্ব বরণ করতে হতো, শাস্তি হিসেবে কেটে টুকরো করা হতো ইত্যাদি অমানবিক রীতি তখন দুনিয়াব্যাপী ব্যাপক প্রচলিত ছিলো।

ইসলামই সর্বপ্রথম বলে যে,

১. শুধুমাত্র মনিব ব্যতীত অন্য কেউ দাসীদেরকে ব্যবহার করতে পারবে না,

২. মনিবের ঔরসজাত দাসীদের সন্তানরা জন্মের সাথে সাথে মুক্ত হয়ে যাবে,

৩. মনিবের ঔরসজাত দাসীদের সন্তানকে মনিবের সম্পত্তির উত্তরাধিকার দিতে হবে অর্থাত সেই সন্তান মনিবের বৈধ সন্তানরুপে পরিগণিত হবে,

৪. মনিবের ঔরসজাত সন্তান থাকলে মনিবের মৃত্যুর পর সেই দাসীও মুক্ত হয়ে যাবে।

৫. দাসীর গর্ভে মনিবের সন্তান ভুমিষ্ঠ হলে সেই দাসী স্থায়ীভাবে মনিবের পরিবারের সদস্য হয়ে যাবে।

৬. দাসীদেরকে কোনভাবেই অন্য কারো সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা যাবে না।

৭. মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ মুবারক করেন, “তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ন, তাদেরও। (পবিত্র সূরা নূর শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ ৩২)

পবিত্র দ্বীন ইসলাম সর্বপ্রথম দাসীদেরকে বিবাহ করার নির্দেশ দেয় যা ইতিপুর্বে একটি কল্পনাতীত বিষয় ছিলো। এছাড়া মনিবের অনুমতি সাপেক্ষে অন্য যে কেউ দাসীদেরকে বিবাহ করতে পারবে।

দাসপ্রথা বিলুপ্তির জন্য দুটো কাজ করা আবশ্যক ছিল। প্রথমত: দাসদের মুক্তি দেওয়া, নতুন করে কেউ যেন দাস না হয় সেই ব্যবস্থা করা।

পবিত্র দ্বীন ইসলাম এই দুইটি কাজই প্রবর্তন এবং প্রচলন করেছে। দাসদের মুক্ত করার জন্য পবিত্র দ্বীন ইসলামে যে শক্ত তাগিদ দেওয়া হয়েছে তা তো পূর্বেই আলোচনা হয়েছে।

সহীহ বুখারী শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে, পবিত্র হাদীসে কুদসী শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ মুবারক করেন,

نْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ:
” قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: ثَلَاثَةٌ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: رَجُلٌ أَعْطَى بِي ثُمَّ غَدَرَ وَرَجُلٌ بَاعَ حُرًّا فَأَكَلَ ثَمَنَهُ، وَرَجُلٌ اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَاسْتَوْفَى مِنْهُ وَلَمْ يُعْطِهِ أَجْرَهُ”
رواه البخاري (وكذلك ابن ماجه وأحمد)

অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বর্ণনা মুবারক করেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, হাশরের দিন তিন (০৩) ব্যক্তি আমার শত্রু হবে; প্রথমত যে ব্যক্তি আমার পবিত্র নাম মুবারক উনার কসম খেয়ে তা ভঙ্গ করেছে, দ্বিতীয়ত যে ব্যক্তি কোন স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রি করে তার মূল্য নিজে ভক্ষন করেছে এবং তৃতীয়ত যে ব্যক্তি কোন শ্রমিককে নিয়োগ দিয়ে তার থেকে পুর্ণ শ্রম আদায় করেছে কিন্তু তাকে তার প্রাপ্য মজুরি প্রদান করেনি। -(সহীহ বুখারী শরীফ, হাদীসে কুদসী শরীফ, ২২২৭)

অর্থাৎ দ্বীন ইসলামই দাস-দাসীদেরকে সামাজিক মর্যাদা লাভ করা, স্ত্রীর অধিকার লাভ করা, মুক্ত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে যা কিনা ইতিপুর্বে ছিল না। সর্বোপরি নতুন করে কাউকে যেন দাসত্ব বরণ করতে না হয় সেটাও নিশ্চিৎ করেছে।

পরিশেষে, আজকের বিশ্ব দাসপ্রথা থেকে মুক্ত। এই পরিবর্তন শুধুমাত্র দ্বীন ইসলামের একক কৃতিত্ব। কাফের-মুশরিকরা এখনো এই প্রথার প্রচলন ঘটাতে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে যা তাদের মালিকানাধীন নিষিদ্ধ পল্লী, কারাগার, অন্দরমহলের কাজের লোক ইত্যাদির মাধ্যমে প্রায়ই বিশ্ববাসীর সামনে ফুটে ওঠে।

মহান আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে যামানার ইমাম, মুজাদ্দিদে আ’যম পবিত্র রাজারবাগ শরীফ উনার মামদুহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার কদম মুবারকে আশ্রয় নিয়ে কাফের-মুশরিকদের ষড়যন্ত্র থেকে ঈমান হিফাযত করার তৌফিক দান করুন।

আমীন!

Views All Time
2
Views Today
5
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে