ধর্মব্যবসায়ী জামাতীরা শুধু যুদ্ধাপরাধী নয়, দেশদ্রোহীও


জামাতীদের ইসলামবিরোধী নানা অপকর্ম ও খুন-খারাবি সত্ত্বেও এই দলটির প্রতি সউদী ওহাবী রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই। এখন শোনা যায়, বাংলাদেশে জামাতী নেতাদের যাতে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করা না হয় সেজন্য বঙ্গবন্ধু তনায়ার বাংলাদেশ সরকারের উপর প্রচণ্ড চাপ আসছে সউদী আরবের ওহাবী বাদশাহদের কাছ থেকেই।

মওদুদীবাদী জামাত একটি ফ্যাসিবাদী দল। ফ্যাসিবাদের চরিত্র-বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে সে ধর্মকে তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির বাতাবরণ হিসেবে ব্যবহার করে। গত বিংশ শতকের ত্রিশের দশকে ইউরোপের জার্মানি, ইতালিতে ও স্পেনে যখন খ্রিস্টান ফ্যাসিবাদীদের উদ্ভব ঘটে, তখন তারা পেয়েছিল চরম উগ্রতাবাদী জঙ্গিবাদী ক্যাথলিক চার্চের সমর্থন। এই ফ্যাসিবাদীদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, অকারণে অন্য ধর্ম ও বিশ্বাসের লোকদের শত্রু হিসেবে গণ্য করে তাদের উপর নির্যাতন চালানো, এমনকি হত্যা করাকেও নিজেদের ধর্মীয় বিধান পালন করা বলে প্রচার করা। এই ফ্যাসিবাদী জঙ্গি খ্রিস্টানরা যুগে যুগে স্পেন, বসনিয়া, চেচনিয়া, কাশ্মীর, ফিলিস্তন, ইরাক, আফগানিস্তান, মিন্দানাওসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম নিধন তথা গণহত্যা চালিয়েছে, চালাচ্ছে।

ওহাবীরা আজন্ম ফ্যাসিবাদী; তারা উগ্র জঙ্গিপনায় সিদ্ধহস্ত। ইউরোপের খ্রিস্টান জঙ্গি ফ্যাসিস্টদের নেপথ্য মদদে সউদী আরবের ওহাবী রাজারা ওহাবীজম প্রতিষ্ঠাকালে জাজিরাতুল আরবের বিভিন্ন অঞ্চল বা প্রদেশ আগ্রাসন চালিয়ে দখল করতে থাকে। ওহাবী জঙ্গি ফ্যাসিস্টরা তখন সউদী আরবের সুন্নী জনগোষ্ঠীকে অকাতরে নির্মমভাবে হত্যা করে। ঘর-বাড়ি ছাড়া করে। লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণযজ্ঞ চালায়। এধারা সউদী আরবে এখনো বহাল। সউদী আরবের আশিকে রসূল সুন্নী জনগোষ্ঠীর কেউ ওহাবী সরকারের কোনো অপকর্মের প্রতিবাদ করলে তাদেরকে অপহরণ করে গায়েব করে ফেলে।

মওদুদীবাদী জামাতীরা সউদী আরবের ওহাবী রাজা-বাদশাহদের ভাবাদর্শে, মদদে, অর্থে এদেশে মওদুদীবাদ প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত। মওদুদীবাদ ওহাবীজমের একটি শাখা মাত্র। তাই তো সউদী আরবের ওহাবী রাজা-বাদশাহরা মওদুদীবাদী জামাতীদের সব রকম পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। একাত্তরে বাংলার সুন্নী মুসলমানদের হত্যা করতে সউদী আরবের ওহাবী রাজা-বাদশাহরা মওদুদীবাদী জামাতীদের মদদ যুগিয়েছে। যুদ্ধাপরাধী ঘাতকদের দেশ ছেড়ে পালাতে সাহায্য করেছে। ঘাতকদের আশ্রয় দিয়েছে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাতে দিতে ভূমিকা রেখেছে। আর এখন যুদ্ধাপরাধী ঘাতকদের বাঁচাতে তৎপর। যুদ্ধাপরাধী ঘাতকদের বিচারকে প্রভাবিত করতে চাইছে।

গত বিংশ শতকের শেষ থেকে বর্তমান একুশ শতকের প্রারম্ভ পর্যন্ত উপমহাদেশে মওদুদীবাদী ওহাবী জামাতীদের কার্মকাণ্ড লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ধর্মের নামে বিভিন্ন মতাবলম্বী বা গোষ্ঠীর উপর চরম নির্যাতন (বাংলাদেশে অসংখ্য বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক হত্যা) এবং মওদুদীবাদী ওহাবী জামাতীরা নিজেরা মুসলমান দাবি করা সত্ত্বেও পীরানে তরীক্বতপন্থী তথা সুন্নী মুসলমানদের উপর বল প্রয়োগে তাদের অস্তিত্ব বিনাশের চেষ্টা করে যাচ্ছে। বর্তমান একবিংশ শতকের গোড়ায় বিএনপি’র কৃপায় সরকারি ক্ষমতার ভাগিদার হয়েই উত্তর জনপদে সন্ত্রাসী সর্বহারাদের দমনের নামে জঙ্গিবাদী ছাত্রশিবির নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা সন্ত্রাসীকে দিয়ে শুরু করেছিল মুসলমানদের বিভিন্ন সেক্টের উপর নির্যাতন।

যারা জীবনে একটি পাখি শিকারও করেনি বলে দাবি করছে- পাকিস্তানে এবং বাংলাদেশে তাদের ফ্যাসিবাদী অত্যাচার থেকে সুন্নী মুসলমান, বাঙালি বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের হাজার হাজার লোক বাঁচতে পারেনি। যাদের একথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে, তারা একাত্তরের ইতিহাস পাঠ করে দেখুন।

আজকাল বাংলাদেশে জামাত নেতাদেরর মুখে যেসব কথা শোনা যাচ্ছে, তা চল্লিশের দশকে জার্মানীর নুরেমবার্গে ইউরোপীয় নাৎসি ফ্যাসিস্ট নেতাদের বিচারের সময়েও শোনা গিয়েছিল। এই ট্রায়ালের সময় অভিযুক্ত এক নাৎসি নেতা বলেছিলো, “আমরা গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে ইহুদি হত্যা করবো কি করে? গ্যাস জ্বালানো দূরের কথা, আমরাতো আগুন দিয়ে একটি সিগারেট ধরাতেও জানি না।” এ কথার নির্গলিতার্থ এই যে, হিটলার তার যুব নাৎসি দলে নৈতিকতার প্রতীক হিসেবে ধূমপান পান করা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলো।” নাৎসি যুবকেরা ধূমপান (সিগারেট) পান করতো না। কিন্তু সিগারেট জ্বালিয়ে তা দিয়ে ইহুদী তরুণী ও কিশোরীদের গোপন অঙ্গে ছ্যাকা দেয়া কোনো অন্যায় ও অনৈতিক কাজ মনে করতো না। বাংলাদেশে জামাত নেতারা হয়তো পাখি শিকার করেনি। তারা পাখি শিকার করতে যাবে কেন? যেখানে নর-নারী, শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে মানুষ শিকারের এমন সহজ এবং সুবর্ণ সুযোগ দেখা দিয়েছিল একাত্তরে।

কারবালার হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছিলো মুরতাদ ইয়াজিদ প্রায় দেড় হাজার বছর আগে। সে কথা দেড় হাজার বছর পরে তার বহুযুগ পরের বংশধরেরাও অস্বীকার করে না। তারা ক্ষমতায় থাকাকালেও ইতিহাস-বিকৃতি ঘটায়নি। নাৎসিদের ইহুদি হত্যা, হলোকাস্টের দায় অস্বীকার করে না জার্মানীর কোনো রাজনৈতিক দল। বরং সেজন্যে তারা লজ্জিত। আর বাংলাদেশে একাত্তরের বর্বর গণহত্যার নায়কেরা মাত্র চার দশক না যেতেই নিজেদের ঘৃণ্য অপরাধের কথা বেমালুম অস্বীকার করে ইতিহাস বিকৃতি দ্বারা বিচার ও শাস্তি এড়াবার চেষ্টা করছে। আর ভাবছে, মানুষ একাত্তরের ইতিহাস ভুলে গেছে। ছাত্রসংঘ, রাজাকার, আল-বাদর, আশ-শামস শান্তিকমিটি নামগুলো এবং তাদের ভয়াবহ অত্যাচার ও খুন-খারাবির কথা ভুলে গেছে। ঘাতক গুরু গো’আযম, মইত্যা রাজাকার মাওলানা নিজামী গং তখন কি এসব বাহিনীরই একজন অধিনায়ক ছিলো না?

একাত্তরের গণহত্যা এবং এই গণহত্যায় জামাতীদের সহযোগিতার কথা দেশের জনমনে এখনো এতো বেশি জাগরূক যে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা করতে চাই না। প্রশ্ন, একাত্তরে জামাতীরা রাজাকার, আল-বাদর, আশ-শামস ইত্যাদি নাম ধরে যদি পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগে সহযোগীর ভূমিকা গ্রহণ না করে থাকে, তাহলে রায়েরবাজার বধ্যভূমিসহ অসংখ্য বধ্যভূমি তৈরি এবং তাতে দেশের বুদ্ধিজীবীদের কঙ্কালগুলো কি অদৃশ্য জিন-ভূত দৈত্য-দানবে হত্যা করে রেখে গেছে? পাক সৈন্যেরা নির্বিচারে হত্যা করেছে একথা সত্য। কিন্তু দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের, বুদ্ধিজীবীদের তাদের কাছে চিনিয়ে দিয়েছে এবং ধরিয়ে দিয়েছে কারা? কারা মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরে আগুন ধরিয়েছে? কারা তাদের পরিবারের বধূ-কন্যাদের ধরে এনে পাক সেনাদের বাঙ্কারে তাদের হাতে তুলে দিয়েছে? শহীদুল্লাহ কায়সার থেকে ডা. ফজলে রাব্বী ঢাকার এই বুদ্ধিজীবীদের ডিসেম্বরের কালো-রাত্রিতে বাড়িতে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় বিছানা থেকে তুলে চোখ বেঁধে পাক সেনাদের কাছে ধরে এনেছিল কারা? নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের সাক্ষ্য- সেই ভয়াল রাতে জামাতী ক্যাডারদের ভূমিকা সম্পর্কে কি বলে? সেই রাতে নিহত শিক্ষকদের জামাতী ছাত্রেরাই (ছাত্রসংঘ নেতারা) কি মধ্যরাতে শিক্ষকদের বাসায় ঢুকে ‘তাদের কিছুক্ষণের জন্য বাইরে নিয়ে যাচ্ছি’-এই কথা বলে বধ্যভূমিতে নিয়ে যায়নি? অতঃপর তাদের আর জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়নি। তাদের মৃতদেহ সঠিকভাবে চিহ্নিত করাও যায়নি। পাওয়া গেছে গলিত লাশ এবং কঙ্কাল।

এখন নিজামী গংরা যে কোনোদিন পাখি শিকারও করেনি বলে একাত্তরের সত্য গোপন করতে চাইছে, তার কারণ যুদ্ধাপরাধী এবং গণহত্যার সহযোগী হিসেবে বিচার ও শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনার ভয় ও আতঙ্ক। ৪০ বছরের যে ইতিহাস তারা মুছে ফেলতে পারেনি, তা এখন ভয়ঙ্কর সত্যের মতো আবার জেগে উঠতে শুরু করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, জামাতী নেতারা যদি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী না হবে, তাহলে পরাজিত পাক সৈন্যদের একাংশের সঙ্গে গো’আযমসহ তাদের মূল নেতারা পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিলো কেন? পাকিস্তানের পাসপোর্টে বিদেশে গিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব ধ্বংস করার জন্য চক্রান্ত শুরু করেছিলো কেন? তাদের এই কার্যকলাপ দ্বারা কি এ কথাই প্রমাণিত হয় না যে, তারা শুধু যুদ্ধাপরাধী নয়, দেশদ্রোহীও?

২০০৯ সালে প্রদত্ত মইত্যা রাজাকার নিজামীর একটি উক্তি নিয়ে এই আলোচনার অবতারণা। দেশে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে মইত্যা রাজাকার নিজামী তখন বলে যে, “তারা কেউ যুদ্ধাপরাধী নয়। তারা, অর্থাৎ জামাত-নেতারা জীবনে একটি পাখি শিকারও করেনি; তারা কি করে যুদ্ধাপরাধী হবে? সুতরাং যুদ্ধাপরাধে তাদের বিচার করা হলে অত্যন্ত অন্যায় করা হবে।” নিজামী ভাঁওতাপূর্ণ কথাটা আজ নতুন বলেনি। এটা তাদের পূর্বসূরীদের থেকেই শিখেছে। তাছাড়া তারা তাদের গুরু মওদুদীর নির্দেশ ও ভ্রান্ত মতবাদের প্রতি এখনো তাদের আস্থা অবিচল রেখেছে। জামাত নেতারা তাদের গুরু সিআইএ’র এজেন্ট মিস্টার মওদুদীর সেই উপদেশ একনিষ্ঠভাবে মানছে। মাসিক তরজুমানুল কোরআন, খণ্ড ৫০, ২য় সংখ্যা, ১৩৭৭ সনে মওদুদী লিখেছে- “বাস্তব জীবনে এমন কিছু চাহিদা রয়েছে যেগুলোর খাতিরে মিথ্যা বলা কেবল জায়িযই নয় বরং ওয়াজিব।” [নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ!! আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম]

মূলত, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সম্ভাবনা যতো বেশি অনিবার্য হয়ে উঠছে, ততোই ধর্মব্যবসায়ী মওদুদীবাদী জামাত-শিবিরে ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। তার প্রমাণ মতিউর রহমান নিজামীর মুখে পাখি শিকারও করতে না জানার এই গল্প। জামাত নেতাদের মধ্যে বিচারাতঙ্ক এতো বেশি ছড়িয়ে পড়েছে যে, এখন তারা স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস পালন, এমনকি বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস পালনেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও পালন করছে। সেই জন্যেই বলছি হাসবো, না কাঁদবো? জামাত নেতাদের আতঙ্কগ্রস্ত কথাবার্তা শুনে এখন হাসি আসে, আবার কান্নাও পায়। চোরের মুখে এখন ধর্মের কাহিনী। গত ৪০ বছর ধরে যাদের মুখে একাত্তরের বর্বরতার জন্য একবারও অনুশোচনার অথবা দুঃখ প্রকাশের একটি বাক্যও শোনা যায়নি, এখন তারা বিজয় দিবস পালন করা থেকে বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস পর্যন্ত পালন করছে! কিন্তু তাতে কি তরী ভাসবে? ইতিহাস বড় নির্মম বিচারক। ৪০ বছর পর হলেও সেই বিচারের দণ্ড আজ সমুদ্যত। মইত্যা রাজাকার নিজামী গংরা কি পারবে সেই দণ্ড এড়াতে? কখনোই না। না, না পারবে না। অবশ্য অবশ্যই তাদের বিচার হবে। শাস্তি হবে। শাস্তি হতেই হবে।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+