ধর্মীয় শিক্ষা থেকে দূরে সরার পরিণতি: বাড়ছে বিয়ে বহির্ভূত গর্ভবতী ও ভ্রুণহত্যা


আল ইহছান ডেস্ক, নিজস্ব প্রতিবেদক;

রমিজ-সুমনা (ছদ্মনাম) পরিবারের সম্মতি নিয়ে বিয়ে করবেন বলে ঠিক করেছেন। রমিজের পরিবার রাজি না হওয়ায় বিয়েটা পিছিয়ে যায়। ইতোমধ্যে সুমনা জানতে পারেন তিনি মা হতে চলেছেন। প্রথম তিন মাস রমিজের পরিবারকে রাজি করানোর অপেক্ষা এবং পরের একমাস ভ্রƒণহত্যার বিষয়ে সিদ্ধান্ত, তারও পরে কোথায় গর্ভপাত করাবেন সেটা খুঁজে বের করতে ৫ মাস পেরিয়ে যায়। অবশেষে যেখানে-সেখানে গজিয়ে ওঠা ক্লিনিকের খোঁজ করে তার একটিতে যাওয়া। রমিজ জানান, তিনি সুমনার সঙ্গে ক্লিনিকে গিয়েছিলেন, অবিবাহিত জেনে তাদের কাছ থেকে গর্ভপাতের জন্য নেয়া হয় ১৫ হাজার টাকা। তবে ৫ মাসের সন্তান হারিয়ে রমিজকে আর বিয়ে করেননি সুমনা।
১৭ বছরের মেয়েকে নিয়ে তন্ন তন্ন করে একটা নিম্নমানের ক্লিনিক খুঁজে বের করেছেন উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের এক মা। মা-মেয়ে হাজির হয়েছেন শ্যামলী রিং রোডের এক সাইনবোর্ড সর্বস্ব ক্লিনিকে। ক্লিনিক না বলে, ভাড়া বাসা বলা যায়। বাড়িওয়ালা জানেন না সেখানে কী হয়। সাবেক এক নার্স এখানে একটা ঘরের অর্ধেক অংশে অর্থের বিনিময়ে নিয়মিত ভ্রƒণহত্যা করে। এটাই তার ব্যবসা। কিন্তু কোনও সাইনবোর্ড নেই। যোগাযোগগুলো হয় বড় বড় হাসপাতাল থেকেই। ভ্রƒণহত্যার অনুমতি না থাকায় বিপদে পড়া এইসব মানুষ হাসপাতালের সোর্স ধরেই চলে আসেন শ্যামলী, মিরপুর, শান্তিনগরের এসব নামহীন ক্লিনিকগুলোতে।
এই ক্লিনিকের মালিক চল্লিশোর্ধ সাবেক নার্সের অনুমতি নিয়ে কথা হয় বিপদগ্রস্ত সেই মায়ের সঙ্গে। মেয়ে এইচএসসিতে পড়ে নামকরা স্কুলে। অবৈধ প্রথম তিন মাস বোঝেওনি কী হতে চলেছে ওর জীবনে। পরে না-পেরে মায়ের সঙ্গে শেয়ার করে। ততদিনে হাউজ টিউটর ভাইয়া দেশ ছেড়েছেন। অসহায় মা বলেন, এই বয়সে মেয়ে না বুঝে যাই করুক, দায়টা আমারই। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সঠিক পথে কিছু করার উপায় নেই, তাই বাঁকা পথে আসতে বাধ্য হয়েছি। এখানে এসে জানলাম, যার কাছে যেমন খুশি টাকা নেয়া হয়। যত টাকাই লাগুক, যারা এখানে আসেন তারা বিপদের মুখে টাকার হিসাব করেন না।
রাজধানীর মিরপুর, শ্যামলী, শান্তিনগর, যাত্রাবাড়ী এলাকার কয়েকটি স্থানে গজিয়ে ওঠা এক কামরার ক্লিনিকে দেখা গেছে, অবিবাহিত প্রেগনেন্ট আর বিবাহিতরা মেয়েশিশুর ভ্রƒণ নষ্ট করতে আসেন। এসব এলাকার ক্লিনিকগুলোয় এক মাসের বেশি সময় যোগাযোগ রেখে জানা গেছে, এখন অবিবাহিত গর্ভপাতের সংখ্যা বেশি এবং এ নারীদের বয়স ১৭ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। শান্তিনগরের একটি বাসায় গর্ভপাতের ব্যবস্থা করা এক বয়োজ্যেষ্ঠ নার্স বলেন, গত দশ বছরের তুলনায় ২০১৪ থেকে গর্ভপাত করতে আসা কমবয়সী অবিবাহিত নারীদের সংখ্যা বেশি।
তিনি বলেন, গর্ভপাতের সময় আমি তাদের সঙ্গে গল্প করি। সবার গল্পই কম বেশি এক। তারা বলেন, বিয়ে হবে এই কথা বলে শারীরিক সম্পর্ক হওয়ার পরই প্রতারণার শিকার হতে হয়। কোনও উপায় না দেখে বন্ধু বা মা-খালার মাধ্যমেই এসব জায়গায় আসেন তারা।
প্রতিদিন গর্ভপাতের সংখ্যা কেউ বলতে পারেন না বা বলতে চান না। তবে নামে মাত্র এই ক্লিনিকগুলোর পরস্পরের যোগাযোগ সূত্র থেকে একটা ধারণা পাওয়া সম্ভব। তাদের হিসাবে, শুধু রাজধানীতেই দৈনিক গর্ভপাত হচ্ছে প্রায় ২শ’র মতো। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার প্রজনন স্বাস্থ্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, পরিবার পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠান, কয়েকটি ক্লিনিক ঘুরে দেখা যায়, গর্ভপাত করতে যারা চাচ্ছেন বা আসছেন তাদের মধ্যে ১৬ বছরের কিশোরী থেকে মধ্য বয়স্ক নারীও রয়েছেন। বিয়ের আগে অনেকেই অনিরাপদ দৈহিক সম্পর্কের কারণে গর্ভবতী হওয়ায় বাধ্য হয়ে গর্ভপাত করছেন।
রাজধানীর মিরপুর-কল্যাণপুর-শান্তিনগর-যাত্রবাড়ী-শ্যামলীর অন্তত ২৫টি জায়গা ঘুরে জানা যায়, এসব হাসপাতালে দৈনিক প্রায় শ’ খানেক গর্ভপাত হচ্ছে। এর বাইরে অনেক জায়গা আছে যেগুলোর খোঁজ জানা যায়নি। ভ্রƒণগুলো সংগ্রহ করে ফেলে দেয়ার পৃথক একটি গোষ্ঠী আছে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া হিসাব জানিয়ে গর্ভপাত ঘটান এমন একজন সিতারা নাহার। তিনি বলেন, সাধারণত আমাদের ব্যবসাটা অবিবাহিত দম্পতির কাছ থেকে বেশি হয়। বিবাহিতরাও আসেন। কিন্তু গত দুই বছরে অবিবাহিত গর্ভপাতের হার বেড়েছে। কী করে বুঝলেন যে তারা অবিবাহিত- জানতে চাইলে বলেন, সঙ্গে কখনও স্বামী সাজিয়ে ছেলেবন্ধু বা ভাই নিয়ে এলেও আচরণ দেখেই বুঝতে পারি।
মানবাধিকার নেত্রী এলিনা খান বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কম বয়সীরা গর্ভধারণ করলে যখন প্রতারণার শিকার হন, তখন তারা মামলা করা বা যিনি তার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন, তাকে শিক্ষা দেয়ার পদক্ষেপ নিতে পারেন না। ভিকটিমের সঙ্গে পরিবার থাকলেও সমাজের কারণে সম্মানহানি ঘটার ভয়ে পিছিয়ে যায়। ফলে প্রতারণা বাড়ছে। প্রতারণার মামলা করলে তিনি যখন বিচারের মুখোমুখি হবেন, তখন সমাজের আর দশজন নারীও বাঁচবেন- এটা মনে রাখা জরুরি।
এদিকে, উঠতি বয়সের এসব ছেলে মেয়েদের নৈতিকতা ও চারিত্রিক অধঃপতনের কারণ হিসেবে ধর্মীয় শিক্ষাহীনতাকে দায়ি করছেন আলেম সমাজ। তারা বলেন এখনকার পরিবারগুলোতে বাবা-মায়েরা সন্তানদের পশ্চিমা কিংবা ভারতীয় সংস্কৃতির আদলে লালন-পালন করছেন বিধায় নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েগুলো ধর্মীশিক্ষা পাচ্ছেনা। তাই তারাই বড় হয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষা ব্যবস্থাকে দায়ি করে আল মুতমাইন্নাহ মা ও শিশু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম রুহুল হাসান বলেন, আমাদের দেশে মিডিয়ার মাধ্যমে এবং টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে ছেলে মেয়েদের অনৈতিক সম্পর্কটা এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এমনকি বিবাহ বহির্ভূত দৈহিক সম্পর্কটাও অপরাধ হিসেবে প্রচার পাচ্ছেনা। ফলে অবুঝ ছেলে মেয়েরা এটাকে অপরাধ হিসেবে দেখছেনা। এছাড়াও বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও সিলেবাসে কোথাও ধর্মীয় শিক্ষার লেশমাত্র নেই। শিক্ষকরা এসব বিষয়ে সতর্ক করবেতো দূরে থাক, বরং উৎসাহ দিয়ে থাকে। আমাদের পরিবার থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ থেকে রাষ্ট্র কোথাও ধর্মীয় শিক্ষা, ধর্মীয় আবহ, ধর্মীয় চর্চা নেই। খোদাভীরুতা নেই। ফলে অপরাধ করতে করতে ‘অপরাধ’টাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এখন এসমস্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ধর্মীয় শিক্ষার বিকল্প নেই, পাশাপাশি এটাকে ‘অপরাধ’ হিসেবে এবং এর কুফল ব্যাপক প্রচার প্রসার করতে হবে।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে