নদী ড্রেজিং এর মাধ্যমেই নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, বন্যা হ্রাস, নদী দূষনমুক্তকরন, নৌপথ যাতায়াত সুগম সহজ ও সম্ভব।


মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, ‘মহান আল্লাহ পাক উনার নিয়ামত গণনা করে তোমরা শেষ করতে পারবে না।’
নৌপথ মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে এদেশবাসীর জন্য বিরাট নিয়ামত।
নৌপথে খুবই কম মূল্যে পণ্য পরিবহনই শুধু নয়; বরং ব্যাপক উপযোগী করলে রেল ও সড়কপথের চেয়েও উন্নত ও স্বল্প খরচে যোগাযোগ ব্যবস্থা হবে; যার ফলে পবিত্র ঈদেও ঘরমুখো মানুষের চাপ থাকবে না। তবে এজন্য হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে শুধু গুটিকতক নদীতে ড্রেজিং করলেই হবে না;
বরং দেশের ২৫৪টি নদীই ড্রেজিং করে সবগুলিতেই নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। এ কাজে সরকারকে অবশ্যই বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে।
নদীমাতৃক দেশের নৌপরিবহন ব্যবস্থা ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে অস্তিত্বই এখন হুমকির মুখে। প্রায় ২৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথের মধ্যে হারিয়ে গেছে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার।

দেশের ছোট-বড় মিলিয়ে ২৫৪টি নদীর (নদী, খাল, হাওর) নৌপথ ছিল ২৫ হাজার ১৪০ কিলোমিটার। ১৯৭০ সালে এই আয়তন কমে দাঁড়ায় ১২ হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে রয়েছে ৫ হাজার ৯৬৮ কিলোমিটার (বর্ষা মৌসুমে)। শুকনো মৌসুমে কমে হয় মাত্র দুই থেকে আড়াই হাজার কিলোমিটার।

দ্রুত নদীপথের দিকে নজর না দিলে আগামী ১০ বছরে দেশের অধিকাংশ নদীপথ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।
গত তিন দশকে দেশের ১৭০টি নদীর অস্তিত্বও বিলীন হয়ে গেছে। দেশের অভ্যন্তরে একসময় ৫৬টি নৌপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল করত। এখন ২৪টি নৌপথ একেবারেই বন্ধ। ৫৬টি নৌপথের মধ্যে ৩২টি নৌপথ কোন রকম সচল আছে।

নাব্যতা সঙ্কটের কারণে এখন সচল নৌপথেরও শতকরা ৮০ ভাগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দেশে মাত্র ৩০ ভাগ যাত্রী যাতায়াত করে নৌপথে আর পণ্য পরিবহন হয় ২০ ভাগ। অথচ দেশের অর্থনীতিতে নৌপথের রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সাশ্রয়ী, নিরাপদ নৌপরিবহন ও আরামদায়ক যাতায়াত ব্যবস্থা এখন অনেকটা বেহাল দশায়। ইতোমধ্যে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ১৮টি নৌরুট পুরো বন্ধ হয়ে গেছে। গত কয়েক দশকে দেশে ১৭টি নদী বিলীন হওয়ার খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
কেবল উজানের বয়ে আনা পলি নদীতে চর সৃষ্টি ও গভীরতা হ্রাস করেছে তাই নয়; নদীগুলোর পাড় দখল, নদীর ভেতরে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের মধ্য দিয়ে নদীর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করা হয়েছে। তাছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সেচ প্রকল্পসহ নদীর পানি নানা প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা বাঁধ, স্লুইস গেট, বোল্ডারসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীর প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তাছাড়া নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিক পন্থায় ড্রেজিং না হওয়ায় নদীর চলাচল পথ যথাযথভাবে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

দেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নৌপথ রক্ষণাবেক্ষণের ভিন্ন ভিন্ন কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সমন্বয়ের চেয়ে সমন্বয়হীনতাই বেশি। নৌপথ ব্যবহার করে এখনো দেশের এক চতুর্থাংশ পরিবহন কাজ সম্পাদিত হয় (সড়কপথে ৭৩ শতাংশ)। কিন্তু দেশের খাতে উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ এক শতাংশেরও কম। এত স্বপ্নের বড় বড় সেতুর নিচে যেমন নদী চর জেগে উঠছে, তাতে ভবিষ্যতে বর্ষা মৌসুম ছাড়া সেতুগুলোর প্রয়োজন ও ব্যবহার কেমন হতে তাও লক্ষ্য করার বিষয় হয়ে উঠছে।

প্রকাশিত তথ্য মতে, প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রেজিং না করার কারণে ইতোমধ্যে প্রায় ২২ হাজার কিলোমিটার নৌপথ নৌ-চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত নদীপথের দিকে নজর না দিলে আগামী ১০ বছরে দেশের অধিকাংশ নদীপথ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ ও বুয়েটের সূত্র মতে, শুধু নৌপথই নয়, গত তিন দশকে দেশের ১৭০টি নদীর অস্তিত্বও বিলীন হয়ে গেছে। বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর ও পরিবহন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরে একসময় ৫৬টি নৌপথে সবধরনের নৌযান চলাচল করতো। এখন ২৪টি নৌপথ একেবারেই বন্ধ। এই ৫৬টি নৌপথের মধ্যে ৩২টি নৌপথ কোন রকম সচল আছে।

অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও ফেরি রুটগুলো সারাবছর নাব্য রেখে ফেরি, লঞ্চ, কার্গো ও অয়েল ট্যাঙ্কার চলাচল নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে প্রতিবছর কোটি কোটি (১১০ কোটি) ঘনমিটার পলি ও মাটি ড্রেজিং করে অপসারণ করা প্রয়োজন। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএ’র প্রয়োজনীয় ড্রেজার ও ড্রেজিং কাজে ‘লজিস্টিক সাপোর্ট’ না থাকায় এ সংস্থা বছরে ১৮ লাখ ঘনমিটারের বেশি ড্রেজিং করতে পারছে না।

পবিত্র ঈদ এমনি একটি বিষয় যে, এ সময় মানুষ ঘরমুখো হয় নাড়ির টানে। প্রতি পবিত্র ঈদে অর্ধকোটিরও বেশি মানুষ ঢাকা থেকে বহির্মুখী হয়। এছাড়া জেলা থেকে জেলান্তরেও যায় কোটিরও বেশি লোক। এক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ও দুর্বল রেল যাত্রা এবং ভঙ্গুর ও নষ্ট সড়ক যাত্রার চেয়ে নৌযাত্রা যেমনি একদিকে হতে পারে অনেক স্বল্প খরচে তেমনি তুলনামূলক ঢের আরামে। অথচ নদী মাতৃক দেশের সেই আদরণীয়, অবিচ্ছেদ্য ও সহজ নৌপথগুলোই এখন হারিয়ে গেছে সরকারের ক্রমাগত অবহেলা, অনাদরে আর অনিয়মে। সবচেয়ে দুঃখজনক কথা, অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এ নৌপথ সম্পর্কে সব মহলই যেন বিশেষ বেখবর। সরকারি শীর্ষমহল থেকে বেসরকারি বিশেষজ্ঞ মহল কারোই কোন নজর, অনুভূতি ও পরামর্শ নেই এ ব্যাপারে। অথচ রেল ও সড়কের অস্বস্তিকর মাত্রাতিরিক্ত চাপ ও ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগের প্রেক্ষিতে খোদায়ীভাবে নৌপথের অবদান থাকায়, সঙ্গতকারণেই বিষয়টি আলোচনায় ও বাস্তবে আসা জরুরী।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে