নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন : ইউরোপে চরম দারিদ্র্য : সংসার চলছে শরীরের অঙ্গ বিক্রি করে


পাভল মিরকভ এবং তার সঙ্গী ডেনিয়েলা আতঙ্কিত হয়ে প্রতি ১৫ মিনিট পরপর ই-মেইলের ইনবক্স চেক করছিলো। মিরকভের একটি কিডনি কেনার জন্য একজন ক্রেতা ৪০ হাজার ডলার দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। টাকাটা ওদের খুবই দরকার। সার্বিয়ার বেলগ্রেডের বাসিন্দা এ দম্পতির রয়েছে দুটো কিশোর বয়সী সন্তান। মিরকভ একটি মাংসের কারখানায় চাকরি করতো। চাকরি চলে যাওয়ার পর ছয় মাস আগে কিডনি বিক্রির জন্য তারা স্থানীয় একটি অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেয়।
মিরকভ জানায়, অনেক চেষ্টা করেও তিনি একটি চাকরি জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়েছে। কাজেই এখন সে মরিয়া। সম্প্রতি মিরকভের বাবা মারা যায়। কিন্তু অর্থের অভাবে সে বাবার সমাধির ওপর একটি নামফলক পর্যন্ত লাগাতে পারে নি। বিল পরিশোধ করতে না পারায় টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। দৈনিক একবেলা রুটি ও সালামিই (এক প্রকার ইতালীয় খাবার) ওদের কাছে এখন বাড়তি ব্যয় বলে মনে হচ্ছে। মিরকভ জানায়, ‘যখন আপনার টেবিলে খাবার রাখাটাই বড় কথা তখন কিডনি বিক্রি খুব বড় ধরনের ত্যাগের ব্যাপার নয়।’
বিশেষজ্ঞরা বলছে, চরম দারিদ্র্যের শিকার হয়ে অনেক ইউরোপীয় এখন ওদের কিডনি, ফুসফুস অথবা চোখের কর্নিয়া বিক্রি করছে। তবে সার্বিয়ায় এই প্রবণতা তুলনামূলকভাবে নতুন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি বর্তমানে ইউরোপ মহাদেশের অন্যান্য অনেক দেশের মতোই আর্থিক সঙ্কটে পর্যুদস্ত। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, প্রতিস্থাপনের জন্য বিশ্বব্যাপী অঙ্গের স্বল্পতা এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে ইউরোপে অবৈধ অঙ্গ বিক্রি ছড়িয়ে পড়েছে। এসবের সুযোগ নিচ্ছে অঙ্গ পাচারকারীরা।
স্পেন, ইতালি, গ্রিস ও রাশিয়ার নাগরিকরা বিজ্ঞাপন দিয়ে অদরকারি অঙ্গ বিক্রি করছে। এছাড়া চুল, শুক্রাণু এবং বুকের দুধও বিক্রি হচ্ছে। ইন্টারনেটে ফুসফুসের দাম হাঁকা হচ্ছে আড়াই লাখ ডলার পর্যন্ত। ইউরোপীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছে, মে মাসের শেষের দিকে ইসরাইলি পুলিশ আন্তর্জাতিক অঙ্গ পাচারকারী চক্রের ১০ সদস্যকে গ্রেফতার করে। তারা ইউরোপে অঙ্গ পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলো। কর্মকর্তারা জানায়, সন্দেহভাজন এসব পাচারকারী মলদোভা, কাজাখস্থান, রাশিয়া, ইউক্রেন এবং বেলারুশের অসচ্ছল লোকদের টার্গেট করে থাকে।
জনাথন রাটেল নামের ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক বিশেষজ্ঞ আইনজীবী জানায, ‘অঙ্গ পাচার একটি বিকাশমান শিল্প।’ সে বর্তমানে সাত পাচারকারীর বিরুদ্ধে একটি মামলা পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। এসব পাচারকারী তুরস্ক, সাবেক কমিউনিস্ট শাসিত দেশগুলোর এবং কসোভোর গরিব লোকদের কিডনি বিক্রি করতে প্ররোচিত করত। প্রতিটি কিডনির বিপরীতে ২০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ১৬ লাখ টাকা) দেয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতো তারা। রাটেল জানায়, ‘চরম দারিদ্র্যের শিকার হয়ে যেসব লোক অঙ্গ বিক্রি করতে মরিয়া এবং যেসব বিত্তশালী লোক বেঁচে থাকার জন্য যে কোনো কিছু করতে রাজি, তাদের শিকারে পরিণত করছে এসব সংগঠিত অপরাধীচক্র।’

ঐতিহ্যগতভাবে চীন, ভারত, ব্রাজিল এবং ফিলিপিন্স ছিল প্রধান অঙ্গ সরবরাহকারী দেশ। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপিয়ানরাও এখন ক্রমবর্ধমান হারে এদিকে ঝুঁকছে। ক্যালিফোর্নিয়ার বারকেলে ভিত্তিক মানিবাধিকার সংগঠন অর্গানস ওয়াচ জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর অবৈধভাবে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার কিডনি বিক্রি হয়। এ সংগঠনটি অবৈধ অঙ্গ বিক্রির তথ্য পর্যবেক্ষণ করে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের চাহিদার মাত্র ১০ ভাগ পূরণ করা হয়।
অর্গানস ওয়াচের পরিচালক ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার চিকিত্সা মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ন্যান্সি স্কেপা হগস বলেন, ‘দরিদ্র ইউরোপীয়দের অঙ্গ বিক্রির এ প্রচেষ্টা আমাদের সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পরের সময়কার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। সে সময় বেকারত্ব চরম আকার ধারণ করায় অনেকেই অঙ্গ বিক্রি করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
সার্বিয়ায় অঙ্গ বিক্রি অবৈধ এবং ১০ বছর পর্যন্ত শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এ আইন দক্ষিণ সার্বিয়ার ডলজেভাক সম্প্রদায়ের ১৯ হাজার অধিবাসীর অঙ্গ বিক্রির জন্য নাম নিবন্ধন করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। স্থানীয় একটি সংস্থা লাভের বিনিময়ে বিদেশে অঙ্গ ও রক্ত বিক্রির জন্য আগ্রহীদের নাম নিবন্ধনের বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। এতে ব্যাপক সাড়া পড়ে। যদিও সরকার ওই সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।
ওই সংস্থার ভায়োলেটা কাভাক বলেন, ‘ডলজেভাকে বেকারত্বের হার ৫০ শতাংশেরও বেশি এবং ৩ হাজারেরও বেশি লোক অঙ্গ বিক্রির জন্য নিবন্ধিত হয়েছিল। বৈধপথে দেহের অঙ্গ বিক্রি করতে না পেরে এখানকার অধিবাসীরা এখন প্রতিবেশী বুলগেরিয়া ও কসোভোতে দেহের অঙ্গ বিক্রির চেষ্টা করছে।’ ভায়োলেটা বলেন, ‘বেঁচে থাকার জন্য আপনি কিডনি, লিভার বিক্রি করতে পারেন অথবা প্রয়োজনে যে কোনো কিছুই করতে পারেন।’
বেলগ্রেড থেকে ২৫ মাইলে দূরে অবস্থিত কভিনে কম্পিউটারের ওপর উপুড় হয়ে মিরকভ একজন রিপোর্টারকে তার কিডনি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছিলেন। সেখানে তার ব্লাড গ্রুপ ও ফোন নম্বরও দেয়া ছিল। এতে লেখা, ‘কিডনি বিক্রি অপরিহার্য, ব্লাড গ্রুপ এ।’ মিরকভ বলেন, ‘আমার অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। আমি চাকরি হারিয়েছি এবং আমার দুই সন্তানের স্কুলের জন্য টাকা দরকার।’
মিরকভ জানান, ছয় মাস আগে তিনি বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তিনি হতাশ। জার্মানির ম্যানহেইম থেকে একজন লোক তাকে জার্মানিতে নিয়ে নিজ খরচে তার কিডনি প্রতিস্থাপন করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এ জন্য ওই ক্রেতা মিরকভকে ৪০ হাজার ডলার দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু মিরকভ যখন তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলেন, তখন আর তার হদিস পাওয়া যায়নি।
মিরকভের সঙ্গিনী ডেনিয়েলার কিডনির জন্য ২৪ হাজার মার্কিন ডলার অফার করেন ম্যাসিডোনিয়ার একজন নারী। কিন্তু ডেনিয়েলা তার কিডনির জন্য যে দাম চেয়েছিল এটা ছিল তার চেয়ে ১২ হাজার ডলার কম। ডেনিয়েলা বলেন, তার ব্লাড গ্রুপ ‘ও’ হওয়ায় তার কিডনির দাম ১২ হাজার ডলার বেশি হওয়ার কথা। কারণ এ গ্রুপের কিডনি বেশিরভাগ রোগীর জন্য নিরাপদ। মিরকভ জানান, অঙ্গ দিতে তিনি শারীরিক কিংবা আইনগত কোনো ভয়ের তোয়াক্কা করেন না। তিনি বলেন, ‘শরীর আমার এবং আমার যেভাবে ইচ্ছে একে ব্যবহার করার অধিকার থাকা উচিত।’
সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, সার্বিয়া এতটা দরিদ্র দেশ নয় যে লোকজনকে শরীরের অঙ্গ বিক্রি করতে হবে। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গত ১০ বছরে সার্বিয়ায় অঙ্গ পাচারের জন্য একজনকেও বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। অবৈধ অঙ্গ বিক্রির বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারও বিচার করা যাচ্ছে না। কারণ তৃতীয় কোনো দেশে প্রতিস্থাপনের কাজটি হয়ে থাকে, যেটার তথ্য পাওয়া কঠিন।
বেলগ্রেডের মিলিটারি মেডিকেল একাডেমিতে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের কাজ করে থাকেন বিশিষ্ট নেফরোলজিস্ট (কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ) ডা. ডিজোক মাকসিক। তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি সার্বিয়ায় অবৈধ অঙ্গ বিক্রির কোনো ঘটনা ঘটছে না। হাসপাতাল কমিটির ডাক্তার, নীতিশাস্ত্রবিদ ও আইনজীবীদের সমন্বয়ে সম্ভাব্য দাতাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিস্থাপনের অনুমোদন দেয়া হয়।
তবে দক্ষিণ সার্বিয়ার একটি দরিদ্র গ্রামের বাসিন্দা ৫২ বছর বয়স্ক মিলোভান ওই ডাক্তারের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। কারখানার সাবেক শ্রমিক মিলোভান বলেন, তিনি একজন বিত্তশালী রাজনীতিককে তার কিডনি দিয়েছিলেন। বিনিময়ে ওই রাজনীতিক তাকে একটি চাকরি দিয়েছিলেন এবং ওষুধপথ্য কেনার অর্থ দিয়েছিলেন। বেলগ্রেডের একটি সরকারি হাসপাতালেই তাদের প্রতিস্থাপনের কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। তবে তাদের বলতে হয়েছে যে তারা একে অপরের ভাই।
ঋণজর্জরিত মিলোভান প্রতিবেশীদের উপহাসের ভয়ে তার পুরো নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সম্প্রতি তার কিডনি গ্রহীতা তার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখছেন না। তার পরিবার অভিযোগ করছে তিনি টাকাপয়সা অপচয় করেছেন। এখন তিনি স্থানীয় একটি বাজারে ডিম বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন।

সূত্র : আমারদেশ 07.07.2012

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+