নিয়ামতওয়ালার পথ


“হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ননা করেন, আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, প্রত্যেক মুসলামান নর-নারীর জন্য ইলম অর্জন করা ফরজ।” [মুসলিম শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, বায়হাক্বী শরীফ, মিশকাত শরীফ, মাছাবীহুস সুন্নাহ শরীফ, মসনদে আবূ হানীফা শরীফ]

হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা আল্লাহ পাক উনার কাছ থেকে সরাসরি ইলম পেয়েছেন। হযরত সাহাবায়ে কেরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম ইলম শিক্ষা করেছেন নবী করিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাছ থেকে। তাবেঈগন শিখেছেন হযরত সাহাবায়ে কেরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের থেকে। তাবেঈগন আবার শিখিয়েছেন তাবে-তাবেঈগনকে। উনাদের যামানা শেষ হবার পর ইলমের ধারা টিকে আছে কিভাবে? হাজারো ফিতনা-ফাসাদের ভীড়ে দ্বীন ইসলামের সহীহ ধারা বজায় রাখতে আল্লাহ পাক যুগে যুগে হক্কানী-রব্বানী ওলী-আল্লাহগন উনাদের পাঠিয়েছেন।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত আছে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “মহান আল্লাহ পাক তিনি প্রত্যেক হিজরী শতকের শুরুতে এই উম্মতের জন্য একজন করে মহান মুজাদ্দিদ তথা দ্বীন ইসলাম উনার মহান সংস্কারক উনাকে পাঠাবেন।” (আবূ দাঊদ শরীফ)
উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ অনুযায়ী সুস্পষ্ট যে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অবর্তমানে উনার রেখে যাওয়া পবিত্র দ্বীন ইসলামকে দুনিয়ার যমীনে ‘হাক্বীক্বী নববী নকশায়’ উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে যামানার খাছ লক্ষ্যস্থল, যামানার মহান মুজাদ্দিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা এ ধরাপৃষ্ঠে মুবারক তাশরীফ এনে থাকেন। সুবহানাল্লাহ!

হযরত আওলিয়ায়ে কেরাম রহমাতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের শান মুবারক কেমন?
মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ মুবারক করেন, “যে ব্যক্তি আমার দিকে রুজু হয়েছেন উনাকে অনুসরণ করো।” [পবিত্র সূরা লুক্বমান শরীফঃ পবিত্র আয়াত শরীফ ১৫]

হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের ফযীলত বা মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কাল্লামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “জেনে রাখ! নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক উনার যাঁরা ওলী উনাদের কোনো ভয় নেই এবং কোনো চিন্তা বা পেরেশানীও নেই। উনারাই হচ্ছেন প্রকৃত ঈমানদার এবং প্রকৃত মুত্তাক্বী। উনাদের জন্যেই রয়েছে সুসংবাদ পার্থিব জীবনে এবং পরকালেও। মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র কালাম বা কথা মুবারকসমূহের কোনো পরিবর্তন হয় না। ইহা হচ্ছে ওয়ালিয়্যুল্লাহ উনাদের জন্য বিরাট সফলতা।” (পবিত্র সূরা ইউনুস শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৬২, ৬৩, ৬৪)

অন্য পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক উনার রহমত মুহসিনীন বা আল্লাহওয়ালাগণ উনাদের নিকটবর্তী।” (পবিত্র সূরা আরাফ শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৬)

হাদিসে কুদসী শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ননা করেন, আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ মুবারক করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক বলেন, যে ব্যাক্তি আমার ওলীর বিরোধিতা করে আমি তার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করি।” [বুখারী শরীফ, মিশকাত শরীফ, মাছাবীহুস সুন্নাহ শরীফ]

মহান আল্লাহ পাক তিনি হাদীছে কুদসী শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক করেন, “নিশ্চয়ই আমার ওলীগণ উনারা আমার কুদরতী জুব্বা মুবারক উনার নিচে অবস্থান করে থাকেন। আমি ব্যতীত এবং আমার ওলীগণ ব্যতীত উনাদেরকে কেউই চিনে না।” (রাহাতুল মুহিব্বীন) অর্থাৎ উনাদের হাক্বীক্বী মর্যাদা-মর্তবা, শান-মান, বুযুর্গী-সম্মান কত উর্ধ্বে তা সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা বা অনুধাবন করা কখনোই সম্ভব নয়।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “মহান আল্লাহ পাক উনার ওলীগণ উনাদেরকে তোমরা মুহব্বত করো; কেননা উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে কবুলকৃত, আর উনাদের বিদ্বেষ বা শত্রুতা পোষণ করো না; কেননা উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত।” (কানযুল উম্মাল শরীফ)

আল্লাহওয়ালাদের সাহচার্য লাভের ফযীলত সম্পর্কে মাওলানা হযরত জালালুদ্দীন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন-
“কিছু সময় আল্লাহওয়ালা উনাদের সাহচার্যে (ছোহ্বতে) থাকা, একশত বৎসরের রিয়াহীন নফল ইবাদতের চেয়েও উত্তম।”
তিনি আরো বলেন-
“যদি তুমি মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে বসতে চাও, তবে আল্লাহওয়ালা উনাদের সাথে বস।”

এ পবিত্র আয়াত শরীফসমূহ থেকে হযরত ওলী আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের মর্যাদা সহজেই উপলব্ধি করা যায়।

শুরুতে যা বলছিলাম, “ইলম অর্জন করা ফরজ।”
এই ইলম হচ্ছে ২ প্রকার। হযরত হাসান বছরী রহমাতুল্লাহি আলাইহী তিনি বর্ননা করেন, “ইলম দু’প্রকার। একটি হচ্ছে ক্বলবী ইলম অর্থাৎ ইলমে তাছাউফ (যা দ্বারা আত্নিক শুদ্ধি অর্জন করা যায়)। অপরটি হচ্ছে যবানী ইলম বা ইলমে ফিক্বাহ (যা দালীলীক জ্ঞান)। [দারিমী শরীফ, মিশকাত শরীফ, মিরকাত শরীফ, আশয়াতুল লুময়াত শরীফ, লুময়াত শরীফ]

মিশকাত শরীফের বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার রঈছুল মুহাদ্দিছীন হযরত মুল্লা আলী ক্বারী রহমাতুল্লাহি আলাইহী তিনি তিনি “মিরকাত শরীফ” এ উল্লেখ করেন,”মালিকী মাজহাবের ইমাম, ইমামুল আইম্মাহ হযরত ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহি আলাইহী বলেন, যে ব্যক্তি ইলমে ফিক্বাহ শিক্ষা করলো অথচ ইলমে ইলমে তাছাউফ শিক্ষা করলো না, সে ফাসিক। আর যে ব্যক্তি ইলমে ইলমে তাছাউফ শিক্ষা করলো অথচ ইলমে ফিক্বাহ শিক্ষা করলো না, সে কাফির। আর যে উভয়টাই অর্জন করলো, সে মুহাক্কিক।”
উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মু’মিনে কামিল হতে হলে উভয় প্রকার ইলমই শিক্ষা করতে হবে।

এখন এই ইলম শিক্ষাটা করব কোথায়? দুনিয়াবী জ্ঞান অর্জনের জন্য আমরা শিক্ষকের কাছে যাই, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের। এমন কিন্তু হয়না যে, বাজারে বই পাওয়া যায় বলে আমরা সেগুলো কিনে এনে পড়লাম। অতঃপর সার্টিফিকেট অর্জন করলাম এবং তা চাকুরীদেনেওয়ালার দরবারে গৃহীত হলো। বরং এক্ষেত্রে শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লাগে। তাহলে খোদায়ী ইলম কোথায় পাব? আমরাতো এতখানি যোগ্য নই যে, আল্লাহ পাক আমাদেরকে সরাসরি ইলম দেবেন। আবার আমরা এমন সময় এসে উপনীত হয়েছি যখন কোন নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত নেই যিনি আমাদের শেখানোর দ্বায়িত্ব নেবেন। তবে নায়েবে নবী বা আউলিয়ায়ে কেরাম রহমাতুল্লাহি আলাইহীম উনারা কিন্তু রয়ে গেছেন। সুতরাং, ইলম শিখতে হলে একজন হক্কানী-রব্বানী শায়েখ উনার কাছে বাইয়াত হয়ে উনার দরবার শরীফে যাতায়াতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কামিয়াবী হাসিল করতে হবে।

আমরা সবাই দিনে বেশ অনেকবার সূরা ফাতেহা শরীফ পাঠ করে থাকি। কিন্তু অর্থটা জেনে দেখেছি কি? না জেনে থাকলে প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সূরা ফাতেহা শরীফের ৬ এবং ৭ নম্বর আয়াত শরীফের অর্থ তালাশ করা। এবং বর্নিত আয়াত শরীফ দুটোর ব্যাখ্যা খুঁজতে সূরা আন-নিসা শরীফের ৬৯ নম্বর আয়াত শরীফের অর্থ অনুধাবন করা।

আয় আল্লাহ পাক, সকল মুসলমানকে সরল পথ দান করুন। যে পথে রয়েছেন আপনার নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দা-বান্দীগন। আমীন।

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে