পবিত্র “আশূরা” নামকরণের কারণ


আশূরা (عَاشُوْرَاءِ) শব্দ মুবারক আশারাহ (عَشَرِةَ) শব্দ থেকে নিঃসৃত। আর দশকে আরবী ভাষায় বলে আশারাহ (عَشَرِةَ)। সুতরাং আশূরা মিনাল মুহররম হলো মুহররমুল হারাম উনার ১০ তারিখ। তবে ইসলামী চন্দ্র মাসের বাকী ১১ মাসেও ১০ তারিখ আছে কিন্তু সে তারিখগুলো আশূরা হিসেবে মশহূর হয়নি। শুধুমাত্র মুহররমুল হারাম উনার ১০ তারিখ আশূরা নামে পরিচিত।
আশূরার নামকরণের ব্যাপারে হযরত উলামায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা বিভিন্ন মত পোষণ করেন। তবে অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা বলেন যে, এ দিনটি মুহররমুল হারাম উনার ১০ তারিখ বলেই উনার নাম মুবারক ‘আশূরা’ হয়েছে।
কোন কোন আলিম বলেন যে, খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উম্মতে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদেরকে যে দশটি সম্মানিত দিন উপহার দিয়েছেন, তন্মধ্যে আশূরা দিনটি ১০ম স্থানীয়। এ কারণেই উনার নাম মুবারক ‘আশূরা’ রাখা হয়েছে।
আবার কারো মত এই যে, এ দিন মুবারক-এ যেহেতু খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি স্বীয় ১০ জন হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে দশটি ভিন্ন ভিন্ন রহমত দান করেছিলেন, তাই উনার নাম মুবারক হয় ‘আশূরা’।
আবার কারো মত এই যে, এই দিন মুবারক-এ যেহেতু খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি স্বীয় দশজন হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে ১০টি ভিন্ন ভিন্ন রহমত বর্ষণ করেছেন তাই উনার নাম মুবারক আশূরা হয়েছে।

পবিত্র আশূরা শরীফ উনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য
খালিক্ব, মালিক, রব, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
اَكْرِمُوْا عَاشُوْرَاءَ مِنَ الْمُحَّرَمَ مَنْ اَكْرَمَ عَاشُوْرَاءَ مِنَ الْمُحَّرَمَ اَكْرَمَهُ اللهُ تَعَالٰى بِالْـجَنَّةِ وَنَـجَّاهُ مِنَ النَّارِ.
অর্থ : “তোমরা পবিত্র আশূরা শরীফ উনাকে সম্মান কর। যে ব্যক্তি পবিত্র আশূরা শরীফ উনার সম্মান করবে, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে জান্নাত দ্বারা সম্মানিত করবেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন।”
এ প্রসঙ্গে কিতাবে একটি ওয়াকিয়া বর্ণিত রয়েছে, যখন কাজী সাহেবদের (বিচারক) যুগ ছিল। এক ব্যক্তি ছিলেন গরিব ও আলিম। একবার অসুস্থতার কারণে গরিব আলিম ছাহিব তিনি তিনদিন যাবত কাজ করতে পারলেন না। চতুর্থ দিন ছিল পবিত্র আশূরা শরীফ। তিনি পবিত্র আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে উক্ত দিনে ভাল খাওয়ার ফযীলত সম্পর্কে জানতেন। যেমন, পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে –
عَنْ حَضْرَتْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِىَ اللهُ تَعَلـٰى عَنْهُ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ وَسَّعَ عَلـٰى عِيَالِه فِىْ النَّفَقَةِ يَوْمَ عَاشُوْرَاءِ وَسَّعَ اللهُ عَلَيْهِ سَائِرَ سَنَتِه. قال سفيان : إنا قد جربناه فوجدناه كذلك. رواه رزين.
অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি তার পরিবারবর্গকে পবিত্র আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে উক্ত দিন ভাল খাদ্য খাওয়াবে, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে এক বছরের জন্য সচ্ছলতা দান করবেন।” (তবারানী শরীফ, মা-ছাবাতা বিসসুন্নাহ)
পবিত্র হাদীছ শরীফখানা গরিব আলিম ছাহিব তিনি কাজী ছাহিবের কাছে উল্লেখ করেন এবং নিজের অসুস্থতা ও পরিবারের অভুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে ১০ সের আটা, ১০ সের গোশ্ত ও ২ দিরহাম চাইলেন যে, ‘এই পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য হাদিয়া অথবা কর্জ হিসেবে দিন।’ কাজী ছাহিব উনাকে যুহরের সময় আসতে বললো। যুহরের সময় কাজী ছাহিব বললো, আছরে আসতে। কিন্তু এরপরে আছরের সময় মাগরিব, মাগরিবের সময় ঈশা এবং ঈশার সময় সরাসরি না করে দিলো। তখন গরিব আলিম ছাহিব বললেন, হে কাজী ছাহিব! আপনি আমাকে দিতে পারবেন না, সেটা আগেই বলতে পারতেন, আমি অন্য কোথাও ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু তা না করে আমাকে সারাদিন ঘুরিয়ে শেষ মুহূর্তে নিষেধ করলেন? কাজী ছাহিব সেই গরিব আলিম ছাহিব উনার কথায় কর্তপাত না করে ঘরের দরজা বন্ধ করে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো।
মনের দুঃখে আলিম ছাহিব তিনি তখন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। পথে ছিলো এক খৃস্টানের বাড়ি। একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে কাঁদতে দেখে উক্ত খৃস্টান ব্যক্তি উনাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলো। কিন্তু বিধর্মী হওয়ার কারণে খৃস্টানকে প্রথমে তিনি কিছু বলতে চাইলেন না। অতঃপর খৃস্টানের অধীর আগ্রহের কারণে তিনি পবিত্র আশূরা শরীফ উনার ফযীলত ও উনার বর্তমান দূরাবস্থার কথা ব্যক্ত করলেন। খৃস্টান ব্যক্তি তখন উৎসাহী হয়ে উনাকে পবিত্র আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে ১০ সের আটা, ১০ সের গোশত, ২ দিরহাম এবং অতিরিক্ত আরো ২০ দিরহাম দিল এবং বললো যে, আপনাকে আমি পবিত্র আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে প্রতিমাসে এ পরিমাণ হাদিয়া দিবো। ওই আলিম ছাহিব তিনি তখন তা নিয়ে বাড়িতে গেলেন এবং খাবার তৈরি করে ছেলে-মেয়েসহ আহার করলেন। অতঃপর দুয়া করলেন, “আয় মহান আল্লাহ পাক! যে ব্যক্তি আমাকে সন্তুষ্ট করলো, আমার ছেলে-মেয়েদের মুখে হাসি ফোটালো, মহান আল্লাহ পাক আপনি তার দিল খুশি করে দিন, তাকে সন্তুষ্ট করে দিন।”
ওই রাতে কাজী ছাহিব স্বপ্ন দেখলো। স্বপ্নে কাজী ছাহিবকে বলা হচ্ছে, হে কাজী ছাহিব! তুমি মাথা উত্তোলন করো। মাথা তুলে কাজী ছাহিব দেখতে পেলো যে, তার সামনে দুটি বেহেশতের বালাখানা। একটি স্বর্ণের আরেকটি রৌপ্যের। কাজী ছাহিব বললো, ‘আয় মহান আল্লাহ পাক! এটা কি?’ গায়িবী আওয়াজ হলো, ‘এ বালাখানা দুটি তোমার ছিলো। কিন্তু এখন আর তোমার নেই। কারণ তোমার কাছে যে গরিব আলিম ছাহিব তিনি পবিত্র আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে সাহায্যের জন্য এসেছিলেন উনাকে তুমি সাহায্য করোনি। এজন্য এ বালাখানা দুটি এখন ওমুক খৃস্টান লোকের হয়েছে।’ অতঃপর কাজী ছাহিবের ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম থেকে উঠে ওযূ করে নামায আদায় করে সেই খৃস্টানের বাড়িতে গেলো। খৃস্টান ব্যক্তি কাজী ছাহিবকে দেখে বিস্ময়াভূত হলো। কারণ কাজী ছাহিব খৃস্টানের পড়শি হওয়া সত্ত্বেও জন্মের পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো সময় তার বাড়িতে আসতে দেখেনি।
অতঃপর খৃস্টান ব্যক্তি কাজী ছাহিবকে বললো, ‘আপনি এতো সকালে কি জন্য এলেন?’ কাজী ছাহিব বললো, ‘হে খৃস্টান ব্যক্তি! তুমি গত রাতে কি কোনো নেক কাজ করেছো?’ খৃস্টান ব্যক্তি বললো, আমার খেয়ালে আসে না যে, আমি কোনো উল্লেখযোগ্য নেক কাজ করেছি। তবে আপনি যদি জেনে থাকেন তাহলে আমাকে বলতে পারেন। তখন কাজী ছাহিব বললো, তুমি গত রাতে পবিত্র আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে এক গরিব আলিম ছাহিব উনাকে ১০ সের আটা, ১০ সের গোশত, ২ দিরহাম এবং তার সাথে আরো ২০ দিরহাম হাদিয়া করেছো এবং প্রতি মাসে উনাকে এ পরিমাণ হাদিয়া দেয়ার ওয়াদা করেছো। খৃস্টান ব্যক্তি তা স্বীকার করলো। কাজী ছাহিব বললো, তুমি তোমার এই নেক কাজ এক লক্ষ দিরহামের বিনিময়ে আমার নিকট বিক্রি করে দাও এবং তুমি উনার সাথে প্রত্যেক মাসে যে ওয়াদা করেছো আমি উনাকে তা দিয়ে দিবো।’
খৃস্টান ব্যক্তি বললো, হে কাজী ছাহিব! আপনি কি জন্য এই সামান্য হাদিয়া করার বিনিময়ে আমাকে এক লক্ষ দিরহাম দিবেন সেটা স্পষ্ট করে বলুন? তখন কাজী ছাহিব তার স্বপ্নের কথা খুলে বললো যে, উক্ত গরিব আলিম ছাহিব তিনি পবিত্র আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে আমার কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন আমি উনাকে সাহায্য করিনি। যার কারণে রাতের বেলা আমাকে স্বর্ণ ও রৌপ্যের দ্বারা তৈরি বেহেশতের দুটি বালাখানা স্বপ্নে দেখিয়ে বলা হয়েছে, হে কাজী ছাহিব! ‘এ বালাখানা দুটি তোমার ছিলো। কিন্তু এখন আর তোমার নেই। কারণ তোমার কাছে যে গরিব আলিম ছাহিব পবিত্র আশূরা শরীফ উনার সম্মানার্থে সাহায্যের জন্য এসেছিলেন উনাকে তুমি সাহায্য করোনি। এজন্য এ বালাখানা দুটি এখন ওমুক খৃস্টান লোকের হয়েছে।’ কাজী ছাহিব বললো, তুমি তো খৃস্টান। তুমি তো এই বালাখানা পাবে না। কারণ, দ্বীন ইসলাম উনার আগমনের পরে পূর্ববর্তী সমস্ত ধর্ম বাতিল হয়ে গেছে। কাজেই সেই ধর্মের উপর যারা থাকবে তারা জান্নাত লাভ করতে পারবে না। তখন খৃস্টান ব্যক্তি বললো, আমি যদি পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করি তাহলে কি এই বালাখানার মালিক হতে পারবো? তখন কাজী ছাহিব বললো, হ্যাঁ, তুমি যদি পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করো তাহলে বালাখানা লাভ করতে পারবে। তখন খৃস্টান ব্যক্তি বললো, হে কাজী ছাহিব! আপনি সাক্ষী থাকুন-
اَشْهَدُ اَلَّا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَاَشْهَدُ اَنَّ مُـحَمَّدًا رَّسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
আমি এক্ষুণি কালিমা শরীফ পড়ে মুসলমান হয়ে গেলাম। সুবহানাল্লাহ! অর্থাৎ খৃস্টান ব্যক্তি পবিত্র আশূরা শরীফ উনাকে সম্মান করার কারণে মহান আল্লাহ পাক তিনি উনাকে ঈমান দান করলেন এবং জাহান্নাম থেকে নাযাত দিয়ে জান্নাত দান করলেন। সুবহানাল্লাহ!

পবিত্র আশূরা শরীফ ও হযরত আহ্লে বাইত আলাইহিমুস সালাম উনাদের আলোচনা
পবিত্র মুহররমুল হারাম তথা পবিত্র আশূরা শরীফ উনার সর্বশ্রেষ্ঠ আমল হচ্ছে- হযরত আহ্লে বাইত আলাইহিমুস সালাম বিশেষ করে সাইয়্যিদু শাবাবী আহলিল জান্নাহ, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলে বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পুত:পবিত্রতম জীবন মুবারক উনার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা-পর্যালোচনা করা। কেননা যার আলোচনা যত বেশী করা হয় তার মুহব্বত ততই বৃদ্ধি পায়। আর হযরত আহ্লে বাইত আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতি গভীর মুহব্বত, ভালবাসা, পরকালীন মুক্তি এবং মহান আল্লাহ্ পাক উনার ও উনার রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টির কারণ। রহমত, বরকত ও সাকীনা লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়।
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এই মর্মে মুবারক দোয়া করেন যে-
اَللّٰهُمَّ اِنّـىْ اُحِبُّهُمَا فَاَحِبَّهُمَا وَاَحِبَّ مَنْ يُّـحِبُّهُمَا.
অর্থ : “হে মহান আল্লাহ্ পাক! আমি উনাদেরকে (হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম এবং হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনাদেরকে) মুহব্বত করি। আপনিও উনাদেরকে মুহব্বত করুন এবং যে ব্যক্তি উনাদেরকে মুহব্বত করবে তাকেও আপনি মুহব্বত করুন।” (তিরমিযী শরীফ, ৪১৩৮; মিশকাত শরীফ : ৫৭০)
সাথে সাথে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলে বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়িত করা। সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলে বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের দুশমন, কাফির, চিরজাহান্নামী, ইয়াযীদ লা’নতুল্লাহি আলাইহির কুখ্যাত বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করেন কিন্তু তবুও অসত্যকে মেনে নেননি। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি।
সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলে বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্পর্কে আলোচনা করতে যেয়ে কোনভাবেই শীয়া সম্প্রদায়ের অনুসরণে তাজিয়া বের করা, বুকে চাপড় মেরে মাতম করে, কালো পোষাক পরিধান করে শোক প্রকাশ করা ইত্যাদি ইসলামী শরীয়ত বিবর্জিত আমল থেকে দূরে থাকতে হবে। কেননা ইসলামী শরীয়ত মুতাবিক যে কোন আত্মীয়-স্বজন ইন্তিকাল করলে তিন দিন শোক প্রকাশ করা জায়িয। আর স্বামী ইন্তিকাল করলের স্ত্রীর জন্যে চার মাস দশ দিন শোক প্রকাশ করার বিধান রয়েছে। এর বেশি শোক প্রকাশ করা ইসলামী শরীয়ত মুতাবিক বৈধ নয়। আবার আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনার ফতওয়া মুতাবিক শীয়া সম্প্রদায় বাতিল ৭২ ফিরক্বার অনুসারী। তাই শীয়া সম্প্রদায়ের অনুসরণ-অনুকরণে এ ধরনের শোক প্রকাশের অনুষ্ঠান না করে বরং পবিত্র আশূরা শরীফ উনার উপলক্ষ্যে হযরত আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম বিশেষ করে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলে বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পুত:পবিত্রতম জীবনী মুবারক আলোচনার মাহফিল করা যেতে পারে।
অতএব, পবিত্র মুহররমুল হারাম শরীফ মাস এবং উনার মধ্যস্থিত পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিনের ফাযায়িল-ফযীলত ও আমল এবং আক্বীদা সম্পর্কে জেনে সে মুতাবিক আক্বীদা পোষণ ও আমল করে মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টি হাছিল করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর দায়িত্ব-কর্তব্য।

পবিত্র আশূরা শরীফ উনার ফযীলতপূর্ণ বিশেষ আমল মুবারকসমূহ

পবিত্র মুহররম শরীফ মাসের উল্লেখযোগ্য ও শ্রেষ্ঠতম দিন হচ্ছে ১০ই মুহররম শরীফ ‘আশূরা’র দিনটি। এ দিনটি বিশ্বব্যাপী এক আলোচিত দিন। সৃষ্টির সূচনা হয় এ দিনে এবং সৃষ্টির সমাপ্তিও ঘটবে এ দিনে। বিশেষ বিশেষ সৃষ্টি এ দিনেই করা হয় এবং বিশেষ বিশেষ ঘটনাও এ দিনেই সংঘটিত হয়।
বর্ণিত রয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে শুরু করে সাইয়্যিদুনা আবুল বাশার হযরত আদম ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পর্যন্ত প্রায় সকল হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের কোন না কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা এ দিনে সংঘটিত হয়েছে। সঙ্গতকারণে এ দিনটি আমাদের সবার জন্যে এক মহান আনুষ্ঠানিকতার দিন, যা রহমত, বরকত, সাকীনা, মাগফিরাত, নিয়ামত মুবারক হাছিল করার দিন।
ফলে এ দিনে বেশ কিছু আমল করার ব্যাপারে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেমন-
১। পবিত্র আশূরা শরীফ উপলক্ষে দু’দিন রোযা রাখা: পবিত্র আশূরা শরীফ উপলক্ষে দু’দিন রোযা রাখা সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللهِ الْمُحَرَّمُ
অর্থ : হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “পবিত্র রমাদ্বান শরীফ উনার ফরয রোযার পর উত্তম রোযা হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক উনার মাস পবিত্র মুহররম শরীফ উনার রোযা।” (মুসলিম শরীফ)
عَنْ حَضْرَتْ أَبِىْ قَتَادَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ‏ صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ إِنِّـىْ أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُّكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِىْ قَبْلَهٗ
অর্থ : হযরত আবূ কাতাদাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “পবিত্র আশূরা শরীফ উনার রোযা পালনে আমি মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে আশা করি যে, তিনি (উম্মতের) বিগত বছরের গুনাহখতা ক্ষমা করে দিবেন।” (মুসলিম শরীফ)
عَنْ حَضْرَتْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صُوْمُوا التَّاسِعَ وَالْعَاشِرَ وَخَالِفُوْا فِيْهِ الْيَهُوْدَ.
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “তোমরা ৯ ও ১০ই মুহররম শরীফ রোযা রেখে ইহুদীদের খিলাফ তথা বিপরীত আমল করো।” (তিরমিযী শরীফ)
২। রোযাদারদেরকে ইফতার করানো: রোযাদারদেরকে ইফতার করানো সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-
مَنْ فَطَّرَ فِيْهِ صَائِمًا فَكَاَنَّـمَا أَفْطَرَ عِنْدَهٗ جَمِيْعَ أُمَّةِ (سَيِّدِنَا حَبِيْبِنَا شَفِيْعِنَا مَوْلَانَا) مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
অর্থ : “পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে, তিনি যেন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সমস্ত উম্মতকে ইফতার করালো।” সুবহানাল্লাহ!
৩। পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন পরিবারবর্গকে ভালো খাওয়ানো : পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন পরিবারবর্গকে ভালো খাওয়ানো সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ وَّسَّعَ عَلٰى عِيَالِهٖ فِى النَّفَقَةِ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ وَسَّعَ اللهُ عَلَيْهِ سَائِرَ سَنَتِهٖ
অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি আশূরা শরীফ উনার দিন তার পরিবারবর্গকে ভালো খাওয়াবে-পরাবে, মহান আল্লাহ পাক তিনি সারা বৎসর ওই ব্যক্তিকে সচ্ছলতা দান করবেন।” সুবহানাল্লাহ! (তবারানী শরীফ, শুয়াবুল ঈমান, মা ছাবাতা বিস্সুন্নাহ, মুমিন কে মাহে ওয়া সাল ইত্যাদি)
৪ ও ৫। গরিবদের পানাহার করানো ও ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলানো :
গরিবদের পানাহার করানো ও ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলানো সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-
مَنْ مَّسَحَ فِيْهِ عَلٰى رَأْسِ يَتِيْمَ وَاَطْعَمَ جَائِعًا وَسَقٰى شَرْبَةً مِّنْ مَّاءَ أَطْعَمَهُ اللهُ مِنْ مَّوَائِدِ الْـجَنَّةِ وَسَقَاهُ اللهُ تَعَالٰى مِنَ الرَّحِيْقِ الْسَلْسَبِيْلِ
অর্থ: “পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন কোন মুসলমান যদি কোন ইয়াতীমের মাথায় হাত স্পর্শ করে, কোন ক্ষুধার্তকে খাদ্য খাওয়ায় এবং কোন পিপাসার্তকে পানি পান করায় তাহলে মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে জান্নাত উনার দস্তরখানায় খাদ্য খাওয়াবেন এবং ‘সালসাবীল’ ঝর্ণা থেকে পানীয় (শরবত) পান করাবেন।” সুবহানাল্লাহ!
৬। চোখে (ইছমিদ) সুরমা দেয়া :
চোখে সুরমা দেয়া সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-
مَنْ اِكْتَحَلَ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ بِكُحْلٍ فِيْهِ مِسْكٌ لَـمْ يَشْكُ عَيْنُهٗ إِلٰى قَبِيْلٍ مِّنْ ذٰلِكَ الْيَوْمِ
অর্থ : “যে ব্যক্তি পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন মিশক মিশ্রিত সুরমা চোখে দিবে, সেদিন হতে পরবর্তী এক বৎসর তার চোখে কোন প্রকার রোগ হবেনা।” সুবহানাল্লাহ! (মাক্বাছিদে হাসানাহ, শুয়াবুল ঈমান, দায়লামী, মা ছাবাতা বিস্সুন্নাহ্)
৭। গোসল করা : পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিনে গোসল করা সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
مَنْ اِغْتَسَلَ فِيْهِ عُفِىَ وَلَـمْ يَـمْرَضْ اِلَّا مَرَضَ الْـمَوْتِ وَاَمِنَ مِنَ الْكَسْلِ وَالتَّعْلِيْلِ
অর্থ : “যে ব্যক্তি পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন গোসল করবে, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে রোগ থেকে মুক্তি দান করবেন। মৃত্যু ব্যতীত তার কোন কঠিন রোগ হবেনা এবং সে অলসতা ও দুঃখ-কষ্ট হতে নিরাপদ থাকবে।” সুবহানাল্লাহ!
অতএব, পবিত্র মুহররমুল হারাম মাস এবং উনার মধ্যস্থিত পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিনের ফাযায়িল-ফযীলত ও আমল সম্পর্কে জেনে সে মুতাবিক আমল করে মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টি মুবারক হাছিল করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর দায়িত্ব-কর্তব্য।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে