পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে বিজ্ঞান চর্চার নির্দেশনা!


পবিত্র কুরআন শরীফ বিজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও এর চর্চার অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস। কারণ পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
اَلَـمْ تَرَ اَنَّ اللهَ يُسَبِّحُ لَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِ وَالطَّيْرُ صَافَّاتٍ كُلٌّ قَدْ عَلِمَ صَلَاتَهُ وَتَسْبِيحَهُ وَاللهُ عَلِيمٌ بِـمَا يَفْعَلُونَ.
অর্থ : “আপনি কি দেখেন না যে, নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যারা আছে তারা এবং পাখা বিস্তার করা উড়ন্ত পাখি তাদের মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণার পদ্ধতি জানে। তারা যা করে, মহান আল্লাহ পাক তিনি সে বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।” (পবিত্র সূরা নূর শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ : ৪১)
মহান আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-
سَنُرِيهِمْ اٰيَاتِنَا فِي الْاٰفَاقِ وَفِي اَنفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لـَهُمْ اَنَّهُ الْـحَقُّ اَوَلَـمْ يَكْفِ بِرَبِّكَ اَنَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ.
অর্থ : “এখন আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী প্রদর্শন করব পৃথিবীর দিগন্তে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে; ফলে তাদের কাছে ফুটে উঠবে যে, এ কুরআন শরীফ সত্য। আপনার পালনকর্তা সর্ববিষয়ে স্বাক্ষ্যদাতা, এটা কি যথেষ্ট নয়?” (পবিত্র সূরা হা-মীম সিজদাহ শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ : ৫৩)
মহান আল্লাহ পাক তিনি আদম সন্তানকে আসমান-যমীন, পাহাড়-পর্বত, তারকারাজি, উদ্ভিদজগৎ, প্রাণীজগৎ, বীজ, রাত ও দিনের আবর্তন, মানব সৃষ্টি, ঝড়-বৃষ্টি এবং অন্যান্য সৃষ্টিকুল সম্পর্কে অনুসন্ধান ও চর্চার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তারা সৃষ্টিকুলের রহস্য সম্পর্কে জানতে পারবে এবং সাথে সাথে তার স্রষ্টা, যিনি শূণ্য হতে সমস্ত কায়িনাত সৃষ্টি করেছেন, উনার ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার সাথে পরিচিত হবে। কুরআন শরীফ-এ বর্ণিত এই নিদর্শনাবলী বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিরাজমান- নভোম-ল, প্রাণীজগৎ, উদ্ভিদ জগৎ, মানব বংশবিস্তার এবং আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে। আর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও এর চর্চাই হচ্ছে এই নিদর্শনগুলো উৎঘাটনের চাবিকাঠি।
বিজ্ঞান এমন এক পদ্ধতিগত জ্ঞান, যা সমাজে মহান আল্লাহ পাক উনার সৃষ্টিসমূহের রহস্য সম্পর্কিত জ্ঞানের উন্মেষ ঘটায়। তাই দ্বীন ইসলাম বিজ্ঞানকে স্বীকৃতি দেয়। দ্বীন ইসলাম শুধু বিজ্ঞান চর্চাকেই উৎসাহিত করে না সাথে সাথে ইসলামে স্বীকৃত সত্যকে ধারণ করে চর্চিত বিজ্ঞান কার্যকরী ও দ্রুত ফলপ্রসু হিসেবে মনে করে। কেননা, ইসলামে রয়েছে জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত বিশুদ্ধ ও সুস্পষ্ট ধারণা। সঠিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত গবেষণা স্বল্প সময়ে ও স্বল্প খরচে জগতের উৎপত্তি ও জীবন প্রবাহের রহস্য উন্মোচন করে। ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান চর্চা ফলপ্রসু হয় না, তা হয় শুধুই অর্থ ও সময়ের অপচয়। প্রচলিত বিশ্বে যত বস্তুবাদী বৈজ্ঞানিক বর্তমানে বিজ্ঞান চর্চা করছে তার বেশির ভাগই অসফল আর এর পরিণামে বিপুল পরিমাণ অর্থের ও সময়ের অপচয় হচ্ছে।
আসল সত্যটি হচ্ছে যে, যা সবার সুস্পষ্ট রূপে জানা উচিৎ- বিজ্ঞান ও এর চর্চা শুধুমাত্র তখনই নির্ভরযোগ্য ফলাফল নিয়ে আসে যখন এই চর্চার মূখ্য উদ্দেশ্যই হয় মহান আল্লাহ পাক উনার সৃষ্টি সমূহে উনার নিদর্শনাবলীর জন্য আন্তরিক অনুসন্ধান। আর এভাবেই বিজ্ঞান অতি অল্প সময়ে তার শিখরে উঠতে পারে যদি এর চর্চা সঠিক দিকে ও সঠিক পথে থাকে।
আর মহান আল্লাহ পাক উনার সৃষ্টিসমূহে উনার নিদর্শনাবলীর জন্য যারা আন্তরিক অনুসন্ধান করেন তাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে ঘোষণা মুবারক দেন-
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىَ جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذا بَاطِلاً سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.
অর্থ : “যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় মহান আল্লাহ পাক উনাকে স্মরণ করে এবং চিন্তা-গবেষণা করে আসমান ও যমীন সৃষ্টির বিষয়ে, (তারা বলে), হে পরওয়ারদিগার! এসব আপনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি। সকল পবিত্রতা আপনারই, আপনি আমাদেরকে দোযখের শাস্তি হতে বাঁচান।” (পবিত্র সূরা আল-ইমরান শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ : ১৯১)
যেমনিভাবে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক তিনি বিভিন্নভাবে মানুষকে সৃষ্টিসমূহে নিদর্শনাবলীর উপর চিন্তা-গবেষণা করার নির্দেশ মুবারক দিয়েছেন, তেমনি উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিও নির্দেশ মুবারক দিয়েছেন-
عن حصرت انس رضى الله تعالى عنه قال رسو الله صلى الله عليه وسلم قل طلب العلم فريضة على كل مسلم.
অর্থ : “হযরত আনাস বিন মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরয।” (ইবনে মাজাহ শরীফ, তিরমিযী শরীফ, মিশকাত শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত, “তোমরা শিক্ষা অর্জন কর এবং তা জনগণের মাঝে পৌঁছে দাও।” (তিরমিযী শরীফ)
মহান আল্লাহ পাক তিনি কুরআনুল কারীম উনার মধ্যে আসমান-যমীন সম্পর্কে বলেন-
أَفَلَمْ يَنظُرُوا إِلَى السَّمَاء فَوْقَهُمْ كَيْفَ بَنَيْنَاهَا وَزَيَّنَّاهَا وَمَا لـَهَا مِن فُرُوجٍ. وَالْأَرْضَ مَدَدْنَاهَا وَأَلْقَيْنَا فِيهَا رَوَاسِيَ وَأَنبَتْنَا فِيهَا مِن كُلِّ زَوْجٍ بَـهِيجٍ. تَبْصِرَةً وَذِكْرَى لِكُلِّ عَبْدٍ مُّنِيبٍ. وَنَزَّلْنَا مِنَ السَّمَاء مَاء مُّبَارَكًا فَأَنبَتْنَا بِهِ جَنَّاتٍ وَحَبَّ الْـحَصِيدِ. وَالنَّخْلَ بَاسِقَاتٍ لَّـهَا طَلْعٌ نَّضِيدٌ.
অর্থ : “তারা কি তাদের উপরিস্থিত আকাশের প্রতি দৃষ্টিপাত করে না- আমি কিভাবে তা নির্মাণ করেছি এবং সুশোভিত করেছি। তাতে কোন ছিদ্রও নেই। আমি ভূমিকে বিস্তৃত করেছি, তাতে পর্বতমালার ভার স্থাপন করেছি এবং তাতে সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি। এটা জ্ঞান আহরণ ও স্মরণ করার মত ব্যাপার প্রত্যেক অনুরাগী বান্দার জন্যে। আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তদ্বারা বাগান ও শস্য উদগত করি, যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয়। এবং লম্বমান খেজুর বৃক্ষ, যাতে রয়েছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর।” (পবিত্র সূরা ক্বাফ শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ : ৬-১০)
الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَـمَاوَاتٍ طِبَاقًا مَّا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْـمَنِ مِن تَفَاوُتٍ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَى مِن فُطُورٍ.
অর্থ : “তিনি সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন। আপনি করুণাময় মহান আল্লাহ পাক উনার সৃষ্টিতে কোন তফাত দেখতে পাবেন না। আবার দৃষ্টি ফেরান; কোন ফাটল দেখতে পান কি?” (পবিত্র সূরা মুলক, পবিত্র আয়াত শরীফ : ৩)
أَفَلَا يَنظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ. وَإِلَى السَّمَاء كَيْفَ رُفِعَتْ. وَإِلَى الْـجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ. وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ.
অর্থ : “তারা কি উষ্ট্রের প্রতি লক্ষ্য করে না, কিভাবে তৈরী করা হয়েছে তা, এবং আকাশের প্রতি লক্ষ্য করে না কিভাবে উচ্চ করা হয়েছে? এবং পাহাড়ের দিকে যে, তা কিভাবে স্থাপন করা হয়েছে? এবং পৃথিবীর দিকে যে, তা কিভাবে সমতল বিছানো হয়েছে?” (পবিত্র সূরা গাশিয়াহ, পবিত্র আয়াত শরীফ : ১৭-২০)
অত:পর মহান আল্লাহ পাক তিনি কুরআনুল কারীম-এ বলেন-
فَلْيَنظُرِ الْإِنسَانُ مِمَّ خُلِقَ
অর্থ : “অতএব মানুষের উচিৎ, কি বস্তু থেকে সে সৃজিত হয়েছে।” (পবিত্র সূরা আত-ত্বারিক, পবিত্র আয়াত শরীফ: ৫)
এ সমস্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনাদের মাঝে যে বিষয়টি প্রমাণিত হয় তা হচ্ছে, মহান আল্লাহ পাক তিনি আদম সন্তানকে আসমান-যমীন, পাহাড়-পর্বত, তারকারাজি, উদ্ভিদজগৎ, প্রাণীজগৎ, বীজ, রাত ও দিনের আবর্তন, মানব সৃষ্টি, ঝড়-বৃষ্টি এবং অন্যান্য সৃষ্টিকুল সম্পর্কে অনুসন্ধান ও চর্চার নির্দেশ দিয়েছেন। আর বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে বিজ্ঞানীগণ স্রষ্টার ক্ষমতা সম্পর্কে জ্ঞাত হতে পারে। তাই দেখা যায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিজ্ঞানী যারা মানব সভ্যতা নির্মানে বিশেষ অবদান রেখেছেন, উনারা ছিলেন মুসলিম।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে