পবিত্র মাজার শরীফ বিষয়ে বাতিলদের মূর্খতাসূচক বিতন্ডার দাঁতভাঙ্গা জবাব


মদিনা শরীফের জান্নাতুল বাকি’র একাংশ যেখানে পবিত্র মাজার শরীফ সমূহকে গম্বুজ দ্বারা আবৃত করা হয়েছিলো। প্রায় ১৩শ’ বছর  মুবারক মাজার শরীফগুলো গম্বুজ দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলো। সকল সাহাবী তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীন , ইমাম-মুজতাহিদ, আওলিয়া কিরামসহ সকল মুসলমানগণ অতি শ্রদ্ধার সাথে এ সকল মাজার শরীফ জিয়ারত করতেন। কিন্তু ১৯২৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের সহযোগীতায় ইবনে সউদ (বর্তমান সউদী সরকারের পূর্বপুরুষ) হেজাজ দখল করার পরই সে দাবি করে বসলো এতদিন যা হয়েছে সব ইসলাম বিরোধী হয়েছে, এ সকল পবিত্র মাজার শরীফ ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। তাই ১৯২৫ সালের ২১শে এপ্রিল (হিজরী ১৩৪৫, ৮ই শাওয়াল) বুলডোজার দিয়ে পবিত্র জান্নাতুল বাকি’র সকল মাজার শরীফ গুড়িয়ে দেয়। (দ্বিতীয় ছবিতে জান্নাতুল বাকি গুড়িয়ে দেয়ার পরের অবস্থা)
বলাবাহুল্য, দীর্ঘ ১৩০০ বছর জগৎশ্রেষ্ঠ বড় বড় বুজুর্গ মদীনা শরীফে এসেছিলেন কিন্তু কেউ এতদিন জানতেন না মাজার শরীফ ইসলাম বিরোধী, কেউ জানাতেন না মাজার শরীফ ভেঙ্গে দিতে হয়, কিন্তু ব্রিটিশ গোয়েন্দা টিই লরেন্সের সৃষ্টি ইবনে সউদ প্রথম বুঝলো মাজার শরীফ ইসলাম বিরোধী, তাই সেগুলো সে ভেঙ্গে দিলো।

আসুন দেখি, সউদী ওহাবী শাসক, সালাফিপন্থী, পিসটিভির আলোচক জাকির নায়েক-বিলাল ফিলিপস কিংবা সাম্প্রতিক ইরাকে আইএসআইএল নামক দলটি কোন কোন দলিলের ভিত্তিতে সকল মাজার শরীফ গুড়িয়ে দিচ্ছে বা দিতে বলছে, যেগুলো এর আগে কোন ইমাম মুজাতাহিদ জানাতেন (!) না।

(১) তারা দলিল দিচ্ছে:
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরের উপর চুনকাম করা, ইমারাত তৈরী করা এবং এর উপর বসাটা নিষেধ করেছেন। (মিশকাত শরীফ)

অথচ এ হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা হচ্ছে,
ক) কবরের ভেতরের অংশ পাকা করা নিষেধ, কারণ রওজা শরীফের চর্তুপাশ ইটের দেয়াল তুলেছেন স্বয়ং হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নিজেই। সেটা যদি হারাম হতো তবে তিনি তা কখনই করতেন না।
খ) সাধারণ মানুষ নয়, তবে বিশিষ্ট বুজুর্গদের জন্য করব ইট বা পাথর দিয়ে স্মৃতি রক্ষা বা চিহ্নিত করা যায়। কারণ নবীজি নিজে হযরত উছমান ইবনে মযউন রদ্বিয়াল্লাহু’র মাজার শরীফ পাথর দ্বারা সংরক্ষণ করেছিলেন। (সূত্র: মিশকাত শরীফ, কিতাবুর জানায়েজ)

গ) ইমারত বলতে এখানে একেবারে কবরের উপর মাটির স্তুপ করা কিংবা কিছু নির্মাণ করা ঠিক নয়। কিন্তু মাজারের চর্তুপাশে পরিবেষ্টন করা নিষেধ নয়। কারণ
-স্বয়ং হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু নবীজির রওজা শরীফের চারিদিকে এ ইটের দেয়াল তুলেছেন।
– হযরত ইবনে যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তা আরো সুন্দর করেছিলেন।
– গম্বুজের বিষয়টা শুধু নবীজির জন্য খাস না, কারণ ঐখানে আরো দুইজন বিশিষ্ট সাহাবী শায়িত আছেন। তারমানে বিষয়টা উম্মতে মুহম্মদীর মধ্যে বুজুর্গদের জণ্যও করা যায়।
-হযরত যাইনুল আবেদিন রহমতুল্লাহি’র পবিত্র মাজার শরীফের উপর উনার সম্মানিত স্ত্রী তাবু স্থাপন করেছিলেন যেন সবাই সেখানে যিকর-আজকার, কুরআন তিলাওয়াত দোয়া প্রার্থনা করতে পারে।
-হযরত আয়িশা সিদ্দিকা রদ্বিয়াল্লাহু নিজের ভাই হযরত আবদুর রহমান রদ্বিয়াল্লাহু এবং হযরত মুহম্মদ ইবনে হানিফা ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু’র মাজার শরীফের উপর গম্বুজ নির্মাণ করেছিলেন। (মুনতাকা শহরে মুতা ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি)
-হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু হযরত যয়নব বিনতে যাহশ রদ্বিয়াল্লাহু’র মাজার শরীফের উপর গম্বুজ নির্মাণ করেছিলেন। (মুনতাকা শহরে মুতা ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি)
-হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু ইন্তেকালের পর মুহম্মদইবনে হানিফা উনার মাজার শরীফ প্রস্তুত করেছিলেন এবং গম্বুজ নির্মাণ করেছিলেন। (বদায়েউস সানায়ে গ্রন্থের ১ম খণ্ডের ৩২০ পৃষ্ঠায় বর্ণিত)

এত বড় বড় সাহাবীগণ গম্বুজ নিমার্ণ করলেন, কিন্তু সেই গম্বুজ ভেঙ্গে দিলো সউদী ওহাবী বাদশাহ!! হায়রে মানুষ কত নির্বোধ হলে এগুলো মেনে নিতে পারে!

(২)তারা দলিল দিচ্ছে:
মিশকাত শরীফে বর্ণিত আছে:
“আবু হায়াজ আসদী থেকে বর্ণিত আছে, “হযরত আলী আমাকে রদ্বিয়াল্লাহু বলেছেন, “আমি কি তোমাদের ঐ কাজের জন্য পাঠাবো না, যে কাজের জন্য নবীজি আমাকে পাঠাতেন। কোন ছবি বিনষ্ট করা ছাড়া রাখিও না এবং কোন উচু করব রাখিও না, একে সমান করে দাও। ”

এই হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় বলতে হয়:
ক) যারা উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা দিয়ে সকল মাজার শরীফ গুড়িয়ে দেয়, তারা কিন্তু কখনই হাদীস শরীফের প্রথম অংশ মানে ছবি তোলার বিরুদ্ধচারণ করে না। বরং তারা নিজেরাই অহরহ ছবি তুলে। অথচ কিতাবের কিছু অংশ মানা এবং কিছু অংশ না মানা মুনাফিকি ছাড়া অন্য কিছু নয়।
খ) হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু যে সকল কবর গুড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেগুলো কি মুসলমানদের কবর ছিলো??? কখনই নয়। কারণ ঐ সময় যে মুসলমানগণ ইন্তেকাল করেছিলেন তাদের প্রত্যেকের মাজার শরীফ নবীজি নিজে উপস্থিত থেকে বা অনুমতি সাপেক্ষে করেছিলেন। তাহলে মুসলমানদের কবর ভাঙ্গার প্রশ্নই আসে না। তাহলে তিনি কোন কবরের কথা বললেন?? আসলে তিনি কাফিরদের উচু কবর ভাঙ্গার কথা বলেছেন, কারণ ঐ সময় মুশরিকরা উচু করব তৈরী করতো এবং ঐ সকল কবর ভাঙ্গতে বলেছিলেন। অথচ দেখুব এ সকল বিভ্রান্ত লোকরা কাফিরদের জন্য প্রদান করা হাদীস শরীফ মুসলমানদের জন্য ব্যবহার করছে!!

(৩) তারা দলিল দিচ্ছে:
বুখারি শরীফে আছে:
“হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু হযরত আব্দুর রহমানের মাজার শরীফের উপর তাবু দেখে বলেছিলেন, “হে বৎস, একে সরিয়ে ফেলো, উনার আমলই উনার উপর ছায়া দিচ্ছে”

এই হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা হচ্ছে, হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু’র পিতা নিজেই গম্বুজ নির্মাণ করেছিলেন। তারমানে এর অর্থ হচ্ছে, কেউ যদি ভাবে ঊক্ত গম্বুজ মাজার শরীফে অবস্থিত ব্যক্তিতে আরাম দিচ্ছে তবে তা ভুল, বরং উনার আমল উনাকে ছায়া দিচ্ছে। আর গম্বুজ নির্মাণের উদ্দেশ্য মাজার শরীফে অবস্থানকারী বুজুর্গকে আরাম দেয়ার জন্য নয় বরং যিয়ারতকারীদের ছায়া ও নির্বিঘ্নে আমল করার জন্য।

(৪) তারা দলিল দিচ্ছে:
মিশকাত শরীফের হাদীসে আছে:
“হে আল্লাহ! আমার কবরকে মূর্তিতে পরিণত করো না, যার পূজা করা হবে। ঐ কওমের জন্য খোদার কঠিন গযব আছে, যারা স্বীয় নবীদের কবরসমূহকে মসজিদে পরিণত করেছে”

উপরোক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা হচ্ছে:
কবরকে মসজিদে পরিণত করা বা সেদিকে কিবলা মেনে নামাজ পড়া বা করবকে ইবাদতের লক্ষ্যবস্তু বা খোদা মনে করা যা স্পষ্ট শিরক ও কুফরী।
কিন্তু কোন মুসলমান কি বলবে, সে যখন পবিত্র মাজার শরীফ যিয়ারত করে তখন সে ঐ বুজুর্গকে পূজা করতে যায়, কিংবা তাকে আল্লাহ মনে করে। কখনই এ কথা কেউ বলবে না। বরং যাকে আল্লাহ মনে করার সবাই তাকেই আল্লাহ মনে করে, এবং ওলী আল্লাহগণকে আল্লাহর বন্ধুই মনে করে। ‍দুইজনকে কখনই এক করে না।

উপরের আলোচনা দ্বারা এটা নিশ্চিত, যারা মাজার শরীফ ভাঙ্গছে তারা ইচ্ছাকৃত ভাবেই পবিত্র হাদীস শরীফগুলোকে বিকৃত করে বলছে। কিন্তু এর পেছনে তাদের উদ্দেশ্যটা কি????

উদ্দেশ্যটা খুব সোজা। যখন আপনি আপনার আব্বার কবর জিয়ারত করেন, তখন ইচ্ছায় অনিচ্ছায় আপনার আব্বার আদেশ নিষেধগুলো আপনার স্মরণে আসে, আপনার আব্বার কথা আপনার মনে পড়ে, সেগুলো আপনি পালন করেন। কিন্তু যদি কখন আপনার আব্বার কবর নাই পান তবে ইচ্ছা অনিচ্ছায় বাবার স্মরণ বেখালেই ভুলে যাওয়াটা স্বাভাবিক।
প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ সম্রজ্যবাদীদের বসানো সউদ পরিবার কাফিরদের হয়ে সেই কাজটি করেছে। তারা চায় মুসলমানদের অনুসরণীয় ব্যক্তিদের চিহ্নগুলো ধ্বংস হোক, তবে মুসলমানরা পূর্ব পুরুষ দের কথা ভুলে যাবে এবং উনারা কিভাবে নবীজিকে অনুসরণ করতো তাও ভুলে যাবে। আর এই সুযোগে কাফির ব্যক্তিদের স্মরণ মুসলমানদের মাথায় প্রবেশ করানো সহজ হবে।
যেই জিনিস এখন হচ্ছে। মুসলমানরা মুসলমানদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের চিনে না, নামও জানে না। কিন্তু ঠিকই কোন নাদান কাফির কোন কালে এসেছিলো তার কথা হুবুহু বলে দেয়, তার কথাই সারা দিন স্মরণ করে এবং ইচ্ছা অনিচ্ছায় ঐ কাফিররকেই অনুসরণ করে। ফলে সে ইসলাম থেকে দূরে সরে কাজ কর্মে কাফিরই হয়ে যায়।

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে