পবিত্র যাকাত ও আয়কর সরাসরি সাংঘর্ষিক!


‘যাকাত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধি, পবিত্রতা, বরকত ইত্যাদি। যেহেতু পবিত্র যাকাত প্রদানে যাকাতদাতার মাল বাস্তবে কমে না; বরং বৃদ্ধি পায়, পবিত্র হয় এবং কৃপণতার কলুষ হতে নিজেও পবিত্রতা লাভ করে।
সম্মানিত শরিয়ত উনার পরিভাষায় মৌলিক চাহিদা মিটানোর পর অতিরিক্ত যদি কোনো মাল বা অর্থ-সম্পদ নিছাব পরিমাণ তথা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রৌপ্য অথবা এর সমপরিমাণ অর্থসম্পদ কারো অধীনে পূর্ণ এক বছর থাকে তাহলে তা থেকে চল্লিশ ভাগের একভাগ মাল বা অর্থ-সম্পদ যাকাত বা ছদকা খাওয়ার উপযোগী কোনো গরিব, ফকীর-মিসকীন মুসলমানকে তথা সম্মানিত শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত খাতে মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি মুবারক লাভের উদ্দেশ্যে বিনা স্বার্থে ও শর্তে প্রদান করাকে যাকাত বলে।
আর ‘আয়কর’ হলো প্রত্যক্ষ কর। এটি গণতান্ত্রিক অথবা মানবরচিত মতবাদ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের জাতীয় রাজস্বের একটি প্রধান উৎস। যাদের করযোগ্য আয় আছে তাদেরকে আয়কর দিতে হয়। এই ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে যেমন কর দিতে হয়, তেমনি এসোসিয়েসন অব পারসন, কোম্পানি, ফার্মকেও কর দিতে হয়। অর্থাৎ যারা আয়কর দেয় আইনের ভাষায় তারা সবাই ব্যক্তি। আমাদের দেশের আয়কর ও এই সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রিত হয় আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ দ্বারা। এর আগের আইনটি ছিল ১৯২২ সালের। এই আইন অনুসারে সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোনো করারোপ করা সিদ্ধ নয়। সংসদ প্রতিবছর ফাইনান্স এ্যাক্ট আকারে নতুন করহার নির্ধারণ করে থাকে। আয়কর অধ্যাদেশে সাতটি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলো- ১। বেতন হতে আয়, ২। গৃহসম্পত্তি হতে আয়, ৩। কৃষি হতে আয়, ৪। ব্যবসা বা পেশা হতে আয়, ৫। মূলধনী আয়, ৬। সিকিউরিটি হতে আয়, ৭। অন্যান্য উৎস হতে আয়।
বতর্মানে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাধারণ করদাতাদের জন্য দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে বাৎসরিক আয় তিন লক্ষ টাকার উপরে হলে আয়কর দিতে হবে।
গণতান্ত্রিক অথবা মানবরচিত মতবাদ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের একজন নাগরিক মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত একজন আয়কর প্রদানকারী আয়কর আইনের আওতাধীন। সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে আয়কর কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। তবে পবিত্র যাকাত উনার প্রভাব একজন মুসলমানের উপর ইহকাল ও পরকাল দুইকাল পর্যন্ত ব্যাপ্তি। পবিত্র যাকাত সঠিকভাবে আদায় করলে ইহকালে সম্পদের নিরাপত্তা ও পবিত্রতা অর্জন আর পরকালে জান্নাত প্রাপ্তির নিশ্চিত সম্ভাবনা। যুক্তিসঙ্গত কারণেই একজন মুসলমানের জন্য পবিত্র যাকাত আয়করের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ববহন করে।
এখানে পরিতাপের বিষয় হচ্ছে- মুসলমান দেশসমূহের তথাকথিত মুসলমান নেতা/নেত্রীরা ইহুদী-নাছারা কৃর্তৃক চালুকৃত আয়কর পদ্ধতিকে বেশি প্রাধান্য দেয়। আর মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে ফরযকৃত যাকাতসহ অন্যান্য হুকুম-আহকাম মুবারক তা সঠিকভাবে আদায় করা হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ বেখবর। এহেন তথাকথিত মুসলমান নেতা/নেত্রীদের জন্য রয়েছে ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ।
যখন মুসলমান দেশসমূহে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সঠিকভাবে পবিত্র যাকাত আদায় হতো তখন ঐ সকল দেশবাসীদের জন্য দুনিয়াই বরকতময় বেহেশতে পরিণত হয়েছিলো। আর এখন মুসলমানদের উপর চাপানো হয়েছে ইহুদী-নাছারাদের আয়কর প্রথা।
উল্লেখ্য, মুসলমানগণ উনাদের জন্য পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের বিধান মুতাবিক পবিত্র যাকাত আদায় করা ফরজ। অথচ একই সাথে তাদের থেকে আয়করও আদায় করা হচ্ছে যা গণতান্ত্রিক অথবা মানবরচিত মতবাদ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের আইনে বাধ্যতামূলকভাবেই প্রদান করতে হয়। একজন মুসলমান পবিত্র যাকাত প্রদান করার পর যদি আবার তাকে আয়কর দিতে বাধ্য করা হয়, তাহলে মুসলমানগন সচ্ছলতা লাভ করবেন কিভাবে। আর অমুসলিমরা তাদের আয় থেকে কর দেয় শুধুমাত্র একবার তা হচ্ছে আয়কর।
উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী ধর্মাবলম্বীগণ যেমন ইহুদী, নাছারা ইত্যাদি সম্প্রদায় তারা তাদের ধর্মীয় কিতাব বিকৃতি করার কারণে রব্বী হুকুম-আহকাম হারিয়ে ফেলেছে। ফলে সাধারণ জনগণ থেকে কীভাবে কর আদায় করতে হবে তা পরিষ্কারভাবে লিপিবদ্ধ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তারা নিজেরা আয়কর পদ্ধতি প্রণয়ন করেছে।
আর সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার মধ্যে পবিত্র যাকাত প্রদানের হুকুম-আহকাম পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং বিস্তারিতভাবে মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদেরকে জানিয়েছেন এবং উদাহরণসহ বুঝিয়ে দিয়েছেন। চরম নিষ্ঠাবান হযরত খুলাফায়ে রাশিদীন আলাইহিমুস সালাম উনারা আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছেন সেই পবিত্র যাকাত আদায়ের পদ্ধতি। পবিত্র হাদীছ শরীফ অনুযায়ী পবিত্র যাকাত প্রদানের পূর্বে নিয়ত করা ওয়াজিব। নিয়ত না করলে উক্ত পবিত্র যাকাত ‘দান’ হিসেবে গণ্য হবে; পবিত্র যাকাত হিসেবে নয়। তবে যাকাতগ্রহণকারীকে যখন পবিত্র যাকাত প্রদান করা হয় তা সৌজন্যতার কারণে উল্লেখের প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহ পাক উনার কি অপূর্ব শরাফত মুবারক। সুবহানাল্লাহ!
আয়কর আইন এত জটিল করা হয়েছে যে, সবকিছু ঠিক রেখে আয়কর রিটার্ন জমা দেয়া অত্যন্ত কঠিন। আপনি কষ্ট করে অর্জন করবেন, জটিল হিসাব সম্পন্ন করে ট্যাক্স জমা দিবেন, তার বিনিময়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার নাগরিক সুবিধা দেয়া তো অনেক পরের বিষয়, জীবনের সামান্য নিরাপত্তাটুকুও তারা দিতে ব্যর্থ। অপরদিকে ইনকামট্যাক্স ফাইল সাবমিট করার মানেই হচ্ছে নিজ গলায় রশি লাগিয়ে তার অপরপ্রান্ত সরকারে হাতে ন্যাস্ত করা। যে কোনো মুহূর্তে সরকার ঐ ফাইলকে কাজে লাগিয়ে উক্ত ব্যক্তিকে চরম জিল্লতিতে নিক্ষেপ করতে পারে। নাউযুবিল্লাহ!

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে